Sajidullah Farhad

The Bengali Storyteller

 ১| আমি অলীক; যা আছে, কিন্তু নেই। এই ‘আছে কিন্তু নেই’-এর ফাঁকটাতেই সব সম্পর্কের জন্ম, মৃত্যু, আবার জন্ম। আমি মায়া। কিন্তু নামটার কোনো দাম না...

ফিকশন: শীতল রক্তের প্রেম।

 ১| আমি অলীক; যা আছে, কিন্তু নেই। এই ‘আছে কিন্তু নেই’-এর ফাঁকটাতেই সব সম্পর্কের জন্ম, মৃত্যু, আবার জন্ম।


আমি মায়া। কিন্তু নামটার কোনো দাম নাই। কারণ আমি নাম বদলাই, রূপ বদলাই, কণ্ঠও বদলাই; যেহেতু যুগটা আধুনিক, রূপ নিয়েছি মানুষের, তাই মানুষ তার চোখের সামনে যা দেখতে চায়, আমি ঠিক তাই হয়ে উঠতে পারি। এটাই আমার একমাত্র ক্ষমতা—অভিনয়। 


আমি অভিনয় করি; মানুষ টের পায় না। সে ভাবে, ‘এটাই সত্যি’। অথচ সত্যিটা হলো, মানুষের ‘সত্যি’টাই সবচেয়ে বড় মিথ্যে।

এই 'মিথ্যে- সত্যির' ভিতর সাতশো বছর ধরে টিকে আছি।


আমি শীতল, আমার শরীরের তাপমাত্রা চব্বিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস; শীতকালে আরেকটু কমে, বর্ষায় বাড়ে না। এই তাপমাত্রায় মানুষের রক্ত জমে যায় না, কিন্তু ভালোবাসা জমে যায়। ভালোবাসার জন্য চায় সাতানব্বই ডিগ্রির ফুটন্ত রক্ত, হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি, গাল টকটকে লাল। আমার এসব নেই; আমি ছিলাম বনের বিবি, রাতের ভয়, পথহারানির দেবী।


আমি যাকে খুশি ভুলাইতে পারি; কিন্তু যে আমারে ভুলাইতে চায়, তার জন্য আমার ভেতর এক অদ্ভুত ক্ষুধা জাগে।


শালিকের ক্ষুধাটা এমনই। বলছি সে কথা!


তার আগে বলি আমি এখনো মামলা লড়ছি শালবনের জমির জন্য; এই সাতশো বছরে অনেক জাগায় গিয়েছি অনেক কিছুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি—কখনো গ্রামীণ সালিশে, কখনো জমিদারের কাছারিতে, কখনো ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে; কিন্তু কাজ হয়নি। বাকি শুধু গণতান্ত্রিক আদালতে যাওয়ার! 

সেখানেও যদি না হয়, তাহলে ভাবব, মানুষের বিচারব্যবস্থা আসলে একটা লুডো খেলা—ছক্কা না পড়লে কেউ ঘর থেকে বেরোয় না।


এখন আছি চট্টগ্রামে; শালবনের সেই রিসোর্টের বিরুদ্ধে আদালতে রিট পিটিশন করেছি—ঢাকায়ও করেছিলাম, তারপর টের পেলাম আসল ভূমিদস্যুর অফিস চট্টগ্রামে। আগ্রাবাদের বাণিজ্যিক এলাকায়, সাইনবোর্ডে লেখা "শালবন ইকো রিট্রিট প্রাইভেট লিমিটেড"। নিচে ছোট অক্ষরে "এ কনসার্ন অফ কর্ণফুলী গ্রুপ"।


প্রথম যেদিন আগ্রাবাদের ওই কর্পোরেট ভবনের সিঁড়িতে শালিকের সঙ্গে দেখা হল, আমি বুঝে গেছি—এই ছেলে অনেক মেয়ের সঙ্গে খেলছে। ওর হাঁটার ভঙ্গিতে এক ধরনের তরল অহংকার, চোখের চাহনিতে ক্লান্ত বিরক্তি। যে পুরুষ সব পেয়ে গেছে, তার চোখ এমনই হয়—একটা ঘুমঘুম একঘেয়েমি, যেন দুনিয়ার কোনো কিছুই আর নতুন না।


সেদিন আমার পরনে ছিল সাদামাটা থ্রী-পিস, চুলে তেল দেওয়া, মুখে একটু উদাস ভাব। ও সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে থামল। বলল, "তুমি কাকে খুঁজো?"


"ম্যানেজিং ডিরেক্টররে।"


"অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে?"


"নাই। কিন্তু দেখা করতেই হবে!"


ও এক পা এগিয়ে এলো; আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর হাসল—সেই ক্লান্ত হাসি, যেই হাসির অর্থ "আরে, পেয়ে গেছি আরেকটা"। 


বলল, "স্যার তো ব্যস্ত। তুমি যদি একটু অপেক্ষা করতে চাও, আমার রুমে চলো; চা খাবে?"


"চা খাই না।"


"কফি?"


"কিছু না।"


ওর ভ্রু কুঁচকালো! এই প্রথম ওর জগতের বাইরের কেউ দাঁড়াল। কারণ যত মেয়ে ওর রুমে গেছে, সবাই চা খায়ছে; তারপর কিছু একটা হয়ছে। আমি সেই ফর্মুলা ভাঙলাম।


এই ভাঙাটাই আমার ফাঁদ! পুরুষেরা ফাঁদ পাততে ভালোবাসে, কিন্তু কেউ যখন তাদের ফাঁদে পা না দিয়ে নিজেই জাল বোনে, তারা বুঝতেই পারে না। আর না বুঝতে পারার এই ধাঁধাটাই তাদের পাগল করে রাখে।


শালিক এই শহরের অনেক মেয়ের সঙ্গে এই ফর্মুলা ইউটিলাাইজ করেছে। কারও কাজ দিয়েছে, কারও পাশে দাঁড়িয়েছে বৃষ্টির দিনে ছাতা ধরে, কাউকে বলেছে "তুমি অন্যদের মতো না।"


আমিও অন্যদের মতো না। তবে সে যেভাবে ভাবে, সেভাবে না।

সে বিশ্বাস করে ; পৃথিবীতে সব মেয়ে ম্যানেজ হয়—টাকা দিয়ে, চাকরি দিয়ে, মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে, একটু শরীরী ছোঁয়া দিয়ে; আর তাই সে ভাবে, আমিও হব। কারণ প্রেমিকা থেকে প্রোজেক্ট করার—সব কিছুরই একটা এক্সেল শিট ওর মাথায় আছে।


কিন্তু আমি তো আর এই পৃথিবীর মেয়ে না। প্রেমও না!

আমার কাছে প্রেমের অভিজ্ঞতা হলো এক অন্ধকার থেকে আরেক অন্ধকারে ঝাঁপ দেওয়া।

প্রেমে কিসে আছে? মিথ্যে আশ্বাস? শরীরী টান? আর্থিক হিসাব-নিকাশ? নাকি শুধু একাকিত্ব থেকে বাঁচার জন্য দুইজন মানুষের জড়াজড়ি?" এই পৃথিবীর কেউ প্রেম চাই না। শুধু একা থাকার ভয়টা ভুলে থাকার সঙ্গী চাই।"


২.

শালিকের আসল নাম সীমান্ত। কিন্তু অফিসের সবাই ডাকে শালিক। কারণ ও সারাক্ষণ কিচিরমিচির করে, আর পাখিটার মতো চটপটে। ওর কাজ কী? কাগুজে কাজ—কিন্তু আসলে ওর কাজ হল মানুষরে ভুলিয়ে জমির স্বাক্ষর নেওয়া, সরকারি অফিসারদের চা খাইয়ে ফাইল পাশ করানো, আর এমডি স্যারের সব বদমায়েশির আইনি চাদর দেওয়া।


ওর দাঁত খুব সাদা, অসম্ভব সাদা, যেন দাঁত না, টাইলসের বিজ্ঞাপন, চুলে সবসময় জেল মাখে, গায়ে কড়া সেন্টের গন্ধ, কৃত্রিম, হয়তো কোনো নামী ব্র্যান্ডের নকল; ঠিক ওর ব্যক্তিত্বের মতো। কথা বলে একটু বাঁকা করে, চোখে সবসময় একটা চাপা ধূর্তামি। মেয়েদের সঙ্গে ওর আচরণ দেখলেই বোঝা যায়— ওর ধারণা, মেয়ে মানে গলে যায়; শুধু সময় আর তাপমাত্রার ব্যাপার।


কিন্তু আমি গলি না; আমার শরীরের তাপমাত্রা চব্বিশ ডিগ্রি। তাই আমি গলি না, বরং জমিয়ে রাখি।


দ্বিতীয়বার যখন দেখা হল, ও রিসেপশনে বসা ছিল। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল, হাসল। বলল, "তুমি আবার আসছো। স্যার আবার ব্যস্ত।"


"জানি।"


"জানো মানে?"


"স্যার ব্যস্ত থাকবেই; কারণ তুমি চাও স্যার ব্যস্ত থাকুক। তাহলে তুমি আমাকে আবার তোমার রুমে ডাকতে পারো।"


ওর হাসি এক সেকেন্ডের জন্য থমকালো, তারপর আরও চওড়া হল। "বাহ! তুমি তো আমাকে পড়ে ফেলছো।"


"আমি পড়ি না; আমি দেখি।"


"কী দেখো?"


"তোমার ভেতরের ফাঁপা জায়গাটা।"


ওর চোখ বদলে গেল! ওর চোখে কৌতূহল দেখলাম। কৌতূহলই খেলার শুরু, কারণ যে পুরুষ সব পাইছে, তার একটাই জিনিস চাই—কিছু একটারে বোঝা, যারে বোঝা যায় না।


আমি সেই কিছু।


৩.

এর ভিতর মালতি খোঁজ নিতে ষোলশহর গেলাম; কারণ আমি যেখানে যাই, ওরাও যায়।


মালতি এখন স্টেশন চত্বরের ফুটপাথে থাকে। ওর চায়ের দোকানের পাশে টিনের চালা। আমাকে দেখে বলল, "তুমি আবার আইছো? কী মনে কইরা?"


"তোরে দেখতে ইচ্ছা করল।"


"মিথ্যা কইও না। তুমি মানুষরে ভুলাইতে জানো, আমারে না।"


আমি হাসলাম। মালতি সত্যি বোঝে; কারণ ও নিজেও এককালে পথিক ভুলাইত। এখন আর পারে না। বলল, "শুইনা খুশি হইবা—তোমার শত্রু কর্ণফুলী গ্রুপের এমডি স্যার নাকি রাইতে ঘুমাইতে পারে না।"


"কেন?"


"তোমার ভয়ে। আর ওই শালিক পোলাটারে তুমি পাগল বানাইছো। অফিসে নাকি কয়, 'মায়া অন্যরকম অন্যদের মত না, ওর পাশে থাকতে ইচ্ছে করে, আবার ভয়ও করে।' এইটা শুইনা আমার খুব হাসি পায়।"


"হাসি কেন?"


 "দুনিয়া উল্টা ঘুরতেছে মায়া।"

তুমি মানুষরে ভয়ও দিচ্ছো, প্রেমও দিচ্ছো, অথচ নিজে কিছুই দিচ্ছো না। ব্যালেন্স শিটে তোমার লাভ ছাড়া লস নাই।”


মালতির কথা সত্যি। এই দুনিয়ায় ভয় আর প্রেম একই মুদ্রার দুই পিঠ হয়ে গেছে। আর আমি সেই মুদ্রা। তবে আমি কারেন্সি না, আমি ক্রিপ্টোকারেন্সি—কেউ জানে না আমার অস্তিত্ব সত্যি না মিথ্যা, তবু সবাই খুঁজে।


৪.

রইসুদ্দিন সঙ্গে দেখা করলাম আছিয়ান সিটির মসজিদের গুদামে। ও এখন শুধু স্বপ্ন দেখে, আর নিজে নিজে ডেকে আনা বিপদগ্রস্ত মানুষের স্বপ্নে যায়।


আমি ঢুকতেই বলল, "মায়া, তুমি জানো তোমার ওই শালিকের স্বপ্নে কী দেখছি?"


"কী?"


"ও স্বপ্নে তোমারে ধরে, কিন্তু তুমি বরফ হইয়া গলে যাও। গলার পরেও তুমি থাকো—পানির মতো, কিন্তু পানি ধরা যায় না। ও খুব হতাশ হয়। ঘুম ভাইঙা গেলে বালিশে মুখ লুকায়।"


"তুই দেখলি কী করে?"


"আমি ওর স্বপ্নে গেছিলাম; আসলে ও নিজেই আমারে টানছে। কারণ ও জানে, তুমি ওর স্বপ্নেও ধরা দেবে না।"


"তুই ওরে কিছু বলছস স্বপ্নে?"


"বলছি, 'শালিক ভাই, আপনে বড় ভুল করলেন। মায়ারে পাইতে গেলে আপনেরে আগে হারাইতে হইবে।'"


আমি হাসলাম। "তুই দার্শনিক হইছস রইসুদ্দিন।"


"মসজিদের গুদামে থাকলে দর্শন না করে উপায় আছে? চার দেয়াল, কোনো জানালা নাই, অথচ প্রতিদিন আজান শুনি। মনে হয়, আল্লাহ যেন আমারে মানুষের মতো কোন ইশারায় কিছু একটা বুঝাইতে চান। কিন্তু আমি তো অন্ধকার ছাড়া কিছু বুঝি না।"


৫.

গাবু এখন জাহাজ ভাঙার ইয়ার্ডের রাতের গার্ড। ওর শরীরে এখন লোহার গন্ধ, কিন্তু চোখে সেই পুরোনো কোমলতা।


আমি যখন ইয়ার্ডে গেলাম, ও একটা প্রকাণ্ড জাহাজের তলায় বসে ছিল। হাতে স্লেজহাতুড়ি, কিন্তু কাজ করছে না। শুধু বসে আছে।


"কী করস রে গাবু?"


"মায়া, জাহাজরে জিজ্ঞেস করছি, সে এত বছর সমুদ্রে থাকছে, একাকীত্ব কেমন লাগে?"


"উত্তর পাইছস?"


"পাইছি। জাহাজ কয়, 'আমার একাকীত্বের ভেতর মানুষজন থাকে। তাদের জুতার শব্দ, ফোনের রিংটোন, প্লেট ভাঙার শব্দ—এইসব শুধু একাকীত্বরে ঢাইকা রাখে। লোহা আর কোমলতা একসঙ্গে থাকে না। কিন্তু আমি থাকি। আদতে আমি একা; একা থাকাই আমার ধর্ম।'"


আমি কিছুক্ষণ চুপ রইলাম। তারপর বললাম, "জাহাজ তোরে দর্শন শিখায়।"


"সবাই কিছু না কিছু শিখায় মায়া। তুমি শিখাইছো ভয়। মালতি শেখায় হাসি। রইসুদ্দিন শেখায় স্বপ্ন। আর ওই শালিক তো শেখাবে ধোঁকা। কিন্তু তুমি তো ধোঁকায় পড়বা না। তুমি নিজেই ধোঁকা।"


"আমি ধোঁকা না। আমি অভিনেত্রী।"


"পার্থক্য কী?"


"ধোঁকা দিলে মানুষ টের পায়। অভিনয় করলে মানুষ টের পায় না। সে ভাবে, এই সত্যি।"


গাবু হাতুড়িটা তুলল, তারপর আবার নামাল। বলল, “সাবধানে থেকো মায়া। তুমি সাতশো বছর ধরে একমাত্র শিক্ষিত, তাই কৌশলে বেঁচে আছো ভয়ের রাজ্যে ধনী হয়ে, আর এতো বড় শিক্ষিত হয়েও তুমি আমাদের মতো দুর্বলদের ছেড়ে যাওনি। কিন্তু মায়া, এই শহরটা বড় নিষ্ঠুর। এখানে জাহাজ ভাঙার হাতুড়ির শব্দে মানুষের হৃদয় ভাঙার আওয়াজ চাপা পড়ে যায়।”


৬.

শালিক এবার সরাসরি প্রস্তাব দিল—তার বাসায় নিমন্ত্রণ। নগরীর এক গলির ভেতর তার ছোট বাসা। ও এখন পুরোপুরি আমার প্রেমে মগ্ন, তার কারন আমাকে ভাঙতে পারে নাই, এটাই ওর প্রেম না, মোহ, এই মোহের কারণে আমার প্রতি দিশেহারা, ও এখন আমাকে নিয়ে বিয়ের স্বপ্ন দেখে, কারণ বিয়ের আগে মোহ ভাঙলে বিয়ের আগ্রহ থাকে না, এই জাগায় বোকারা ধরা খায়— চতুরদের খুশি করতে গিয়ে। 

আর দুজন চতুর হলে; কী হয়, কিছুদিনের লিভ টুগেদার? ও বলল, "মায়া একদিন আমার রান্না খাইতে আসো।"


"তুমি রান্না করো?"


"মাঝে মাঝে, মেয়েদের খাওয়াইতে ভালো লাগে।"


"কয়জন মেয়েকে খাওয়াইছো?"


ও হাসল, সেই চাপা হাসি; যার ভেতর লুকানো স্বীকারোক্তি। বলল, "গণনা করি নাই।"


"এখন থেকে করো। কারণ আমারে খাওয়াইতে গেলে স্মৃতি জমা রাখতে হবে।"


আমি ওর বাসায় গেলাম। বাসাটা ছিমছাম, কিন্তু এক ধরনের সাজানো ফাপ্পর। দেয়ালে অশ্লীল পেইন্টিং, টেবিলে ক্যাকটাস, রান্নাঘরে একটা এপ্রোন ঝোলানো—এইসব দেখলেই বোঝা যায়, এই বাসায় নিয়মিত মেয়ে আসে, আর সবকিছু তাদের জন্য সাজানো; একটা মঞ্চ। শালিক এই মঞ্চের নায়ক।


আমি সোফায় বসলাম। শালিক রান্নাঘর থেকে উঁকি দিয়ে বলল, "মুরগির মাংস খাবে?"


"আমি খাই না।"


"কেন? ডায়েট?"


"আমার শরীর খাবারের তাপমাত্রা নিতে পারে না।"


"মানে?"


"তুমি যা খাও, তা গরম। আর আমার শরীর ঠান্ডা।"


ও হেসে ফেলল। "তুমি সাধিকা না পাগল?"


"সাধিকাও না, পাগলও না। অভিনেত্রী। আর তুমি?"


শালিক চুলার আঁচ কমিয়ে বেরিয়ে এলো। বলল, "আমি কী?"


হঠাৎ আমার কণ্ঠস্বর বদলে গেল, কাঁপা গলায় বললাম;

"তুই কী? তুই কিচিরমিচির করস, মানুষ ভুলাস, অথচ তোর নিজের কোনো গল্প নাই। তুই ভাবস সব মেয়ে তোরে চায়, কিন্তু তুই কাউরে চাস না। আরে চাইতে গেলে তো আগে নিজেরে লয়াল হতে হয়, উজাড় করে দিতে হয়, আর তোর তো দেওয়ার কিছু নাই।"

"তোর ভালোবাসা মানে শুধু কালেক্ট করা—যেমন কেউ ডাকটিকিট জমায়, তেমনই তুই মেয়েদের জমাস। কিন্তু তোর অ্যালবামে কোনো ছবিই স্থায়ী না।”


ওর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। একদম চলে গেল না, কিন্তু ম্লান হলো। বলল, "তোমার কথা শুনলে মনে হয় তুমি আমার মনের ভেতর বসে আছো।"


"আমি তোর মনে বসি নাই। আমি তোর ফাঁপা জায়গাটায় দাঁড়ায়া আছি। জায়গাটা এত বড় যে, আমি দাঁড়াইলেও কেউ টের পায় না।"


ও আমার দিকে তাকিয়ে রইল। অনেকক্ষণ। তারপর বলল, "তুমি কি সব পুরুষরে এমন বলো?"


"না। শুধু যারা চিপ অভিনেতা, তাদের বলি।"


"আমি অভিনেতা?"


"তুই তো তাই। তুই প্রেমের অভিনয় করস। কিন্তু তোর ভেতর প্রেম নাই। আছে শুধু জয়ের নেশা; সেই নেশাটাই তোরে চালায়।"

তুই যেন একটা ক্যা'সিনো—সবাই তোর টেবিলে খেলে, আর তুই সবসময় জিততে চাস।”


ওর চোখ এবার পুরোপুরি বদলে গেল। সেখানে কৌতূহল আর ভয় একসঙ্গে ভাসছে। বলল, "তাহলে তুমি আমারে চিনছো কেন? আমারে ভুলাতে চাও কেন?"


আমি সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। "আমি তোরে ভুলাতে চাই না; আমি শুধু তোরে দেখতে চাই। কারণ তোর মতো ফাঁপা পুরুষ আমি অনেক দেখছি। কিন্তু তুই তাদের চেয়ে বড় ফাঁপা! যে চরিত্রে তুই দিন রাত অভিনয় করে বাঁচস, সেটা পুরুষের না কাপুরুষের। পুরুষ হও।


শালিক হা করে তাকিয়ে থাকলো; এই প্রথম কোনো মেয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে তুই তুকারিতে ছিঁড়ে ফেললো।

হিসাব মিলাতে পারছে না— এই ভেবে যে, সস্তায় গলে যাওয়া মেয়েদের সাথে আমি মায়া কে? আমি ওর সামনে এক উল্টো আয়না; ও যত কাছে আসে, নিজেকে তত ক্ষুদ্র করে দেখতে হয়।


৭.

গভীর রাতের শহরটা আমার খুব পছন্দ। পাথরঘাটার সরু গলি, দূরে কর্ণফুলীর জাহাজের ভেঁপু, শিপইয়ার্ডের গন্ধ—এইসব আমারে মনে করায় যে আমি মায়া এখনো আছি।


শালিক এখন প্রায়ই আসে। কখনো চায়ের কাপ হাতে, কখনো খালি হাতে। বলে, "তোমার এই বাসাটায় এত ঠান্ডা লাগে কেন?"


"কারণ আমি ঠান্ডা।"


" আমাকে জড়াইয়া ধরলে গরম হইতে পারো?"


"পারব না। জড়াইয়া ধরলে তুমি ঠান্ডা হয়ে যাবে "


ও হাসে। "আমি ঠান্ডা হতে চাই না।"


"জানি। তুমি গরম হতে চাও। কিন্তু গরম হতে গেলে যে জিনিস লাগে, সেটা তোমার নাই।"


"কী?"


একটা উষ্ণ শুভ্র মন। যা আমার নাই, আমি হিমবাহ।

কিন্তু তুমি ভুলে যাও, আমার ভেতর আগুন নাই, শুধু কুয়াশা আছে। আর কুয়াশায় কেউ গরম হয় না, শুধু পথ হারায়।”


ও কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর ফিসফিস করে বলে, " "তোমাকে আমার হারাতে ইচ্ছা করে না।"


"তুমি তো আমারে পাও নাই। হারাবা কী?"


"পাওয়া-হারানোর বাইরেও কিছু থাকে?"


"থাকে! কিছু সন্দেহ থাকে নিজের প্রতি; তুমি খুঁজো এখন তোমার নিজের ঘাটতিটা কি? যে ঘাটতিতে তুমি ক্ষয় হয়েছো সেটাই খুঁজো- যদি পাও, তখন এই সন্দেহই সবচেয়ে বড় সত্য। ভালোবাসা মিথ্যা, ঘৃণাও মিথ্যা। শুধু সন্দেহটা রয়ে যায়। তুমি কি সন্দেহ করতে শিখেছো নিজেকে?"


ওর চোখে পানি চিকচিক করছে। বলল, "জানিনা?"


জানো। "তাহলে তুমি বেঁচে থাকবে., কারণ সন্দেহই মানুষরে বাঁচায়। সন্দেহ না থাকলে মানুষ মরে যায়—হয়তো শরীরে না, মনে।"


ও উঠে দাঁড়ায়। দরজার দিকে যায়। থামে। পেছন ফিরে বলে, "কাল আবার আসব।"


"আইসো। কিন্তু কিছু নেওয়ার আশা কইরো না।"


"নেওয়ার আশা করলে কী হবে?"


"তুমি শূন্য হাতে ফিরবে। আর শূন্য হাতের কষ্টটা খুব গরম। সেই গরম তুমি সইতে পারবা না।"


ও চলে যায়। দরজার বাইরে কর্ণফুলীর জাহাজের ভেঁপু আবার বাজে।


আমি একা বসে থাকি। আমার শরীর চব্বিশ ডিগ্রির ঠান্ডা, কিন্তু বুকের ভেতরটা আজ একটু গরম। সন্দেহের গরম। ওর ভিতর হয়তো সন্দেহ কাজ করছে। এই সন্দেহই আমার খাদ্য।


আমি খুশি।


৮.

শালিকের বাসায় যে রাতে গেলাম, ওর আসল চেহারাটা স্পষ্ট দেখা হল।


রান্নাঘর থেকে মাংসের তরকারি তুলে এনে টেবিলে রাখল। প্লেটে ভাত, বাটিতে ডাল। বলল, "চলো, খেতে বসো। তুমি না খেলেও বসো। আমি খাই, তুমি দেখো। তোমারে দেখলেই আমার ক্ষুধা বাড়ে।"


আমি বসিনি। জানলার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। হঠাৎ কণ্ঠ অস্বাভাবিক হয়ে গেল, যেন গুহার ভেতর থেকে কেউ কথা বলছে—প্রতিধ্বনি হয়, কিন্তু উৎস খুঁজে পাওয়া যায় না। বললাম, “তোর ক্ষুধা তো বরাবরই বাড়ে। কিন্তু পেট ভরে না কখনো।”


"আফসোস, তুমি পেট ভরানোর চিন্তা করো কেন? পেট তো আর একজনের জন্য না।"


"জানি। তোর টেবিলে অনেক প্লেট পড়ে। একেকদিন একেকজনের জন্য।"


শালিক চামচ নামিয়ে রাখল। হাসল, কিন্তু হাসিটা আগের চেয়ে কঠিন। বলল, "মায়া, তুমি আমাকে খুব জাজ করো। কিন্তু তুমি নিজে কী? তুমিও তো আমাকে ঘোরাও। আমার চারপাশ এখন শুধু তুমি; আর আমি জানি তুমি আমারে দু'পয়সার পাত্তা দাও না, তবু আসো। কেন আসো?"


"আসি তোরে পড়তে।"


"পড়তে?"


"তুই একটা ট্রিকস্টার। প্রথম অধ্যায়ে কিচিরমিচির, দ্বিতীয় অধ্যায়ে চা খাওয়ানো, তৃতীয় অধ্যায়ে দুর্বল মুহূর্তের অপেক্ষা। আমি তোর প্লট বুঝে গেছি।"


ওর চোয়াল শক্ত হলো। বলল, "তাহলে তুমি তো নায়িকা না। তুমি তো লেখিকা।"


"লেখিকা আর নায়িকা এক হতে পারে না?"


"পারে না। কারণ লেখিকা যখন নায়িকা হয়, তখন পুরুষের খেলাটা আর খেলা থাকে না। সেটা হয়ে যায় গবেষণা। আর গবেষণায় প্রেম হয় না।"


আমি জানালা থেকে সরে এলাম। টেবিলের কাছে দাঁড়ালাম। বললাম, "তোর প্রেমের সংজ্ঞা কী শালিক?"


"কী আবার? একজনরে ভালো লাগা, তার সঙ্গে সময় কাটানো, একটু শরীরী টান—"


"শরীরী টান? তুই তো আমার হাত ছুঁতে পারিস না পাঁচ সেকেন্ডের বেশি। কারণ ঠান্ডা।" তোর আঙুল জমে আসে।”


"ঠান্ডা হলেও শরীর তো।"


"না, শরীর না! এটা একটা ছদ্মবেশ। আমার কোনো উত্তেজনা নাই। আমি শুধু মানুষের সন্দেহ আর ভয় দেখে বাঁচি।"


শালিক উঠে দাঁড়াল। আমার খুব কাছে এলো। ওর গায়ের সেন্টের গন্ধে আমি ডুবে গেলাম—কিন্তু শুধু ঘ্রাণে, অনুভবে না। ও আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করল, "তাহলে আজ রাতে আমি যদি অন্য মেয়েকে ডাকি, তোমার কিছু লাগবে না?"


আমার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল, না; বরং আমাকে বল, কয়জন আসবে। আমি দেখতে চাই, তোর রোটেশন কেমন।" সিজনাল ফ্লেভার না কি অল-টাইম স্টক?”


ও সরে গেল। ওর চোখে এবার রাগ। কারণ কোনো মেয়ে কখনো এমন বলতে পারে না। বলল, "তুমি মানুষ না।"


"জানি। তুই আগেও বলেছিস।"


"না, এবার সিরিয়াসলি বলছি। তুমি মানুষ না। তুমি কোনো রাক্ষুসী শয়তান। তুমি আমার ভেতরে ঢুকে গেছ। আমি তোমারে ঘৃণা করি, আবার তোমারে ছাড়তে পারি না। এইটা তুমি কী করলে?"


আমি হাসলাম। সেই ঠান্ডা হাসি—যে হাসিতে দাঁত দেখা যায় না, শুধু চোখের মণিটা অন্ধকারে লাল হয়ে যায়!


"এইটাকে বলে মোহ। তুই আমারে পেতে চাস, কারণ আমি তোরে বিলিয়ে দিই না। তুই যতজনরে পাইছস, তারা সবাই নিজেরে দিয়ে দিছে। আর আমি দেই না বলেই তুই পাগল। কিন্তু জানিস, এই মোহ সাতদিনের বেশি থাকে না। তারপর তুই আরেকজনের কাছে ছুটবি।"


"না। তোমার কাছে ছুটলে আমি হারাইয়া যাই। আর কোনো মেয়ের কাছে ফিরতে পারি না। তুমি কী জাদু জানো?"


"জাদু না। এটা অভিনয়ের চূড়ান্ত ফর্ম—যারে ইংরেজিতে বলে 'ব্রেডক্রাম্বিং'। তোরে আমি একটু একটু করে ইশারা দেই, পুরোপুরি কিছু দেই না। এই খেলাটা দুনিয়ার সব স্মার্ট মেয়েরা জানে। তবে আমি ওদের চেয়ে বেশি জানি, কারণ আমি সাতশো বছর ধরে শিখতেছি।" তোর মতো হাজারো শালিকের স্ন্যাপশট আমার অ্যালবামে জমা আছে।”


শালিক চেয়ারে বসে পড়ল। ওর মুখ ফ্যাকাসে। বলল, "তাহলে তুমি আমারে শুধু খেলার পুতুল বানাইছো?"


"তুইও তো তাই করেছিস এতদিন। এটা পাল্টা খেলা।"


ও কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ওর ফোন বেজে উঠল। ও ফোন ধরল। অপর পাশ থেকে এক মেয়ের গলা—নরম, কোমল, মায়াবী। বলল, "সীমান্ত ভাই, কাল দেখা করবেন? আপনি বলেছিলেন শনিবার—"


শালিক তাড়াতাড়ি ফোন কেটে দিল। কিন্তু আমি শুনে ফেলেছি।


আমি মুচকি হাসলাম। "শনিবারের মেয়েটা কি মঙ্গলবারের চেয়ে আলাদা?"


ওর মুখ লাল হয়ে গেল। "তুমি কীভাবে জানো মঙ্গলবারের কথা?"


"আমি জানি। কারণ তুই তো একটা প্যাটার্নে চলস। সোমবার-মঙ্গলবার কাউকে চা খাওয়াস, বুধবার কাউকে অফিসের কাজে সাহায্য করস, বৃহস্পতিবার কাউকে বাসায় ডাকস। শুক্রবার তোর রেস্ট ডে। আর শনিবার নতুন কাউকে দিয়ে শুরু করস। এই প্যাটার্ন তো ভাঙে না তোর।" তুই একজন শিডিউল-বন্দী ক্যাসানোভা।


শালিক চুপ। ওর হাত কাঁপছে।


আমি বললাম, "ভয় পাস না। তুই যে অসচ্চরিত্র, এটা তোর দোষ না। এটা তোর স্বভাব। এই তুই কি জেনিটিকলি এমন ? নাকি প্রথম প্রেমে তোকে কেউ ঠকাইছিল?"


ওর চোখ ছলছল করল। বলল, "তুমি এত কিছু জানো কীভাবে?"


"আমি বলেছি, আমি পড়তে পারি। আর তোর মতো পুরুষ সাতশো বছরে হাজার হাজার দেখছি। তোরা ট্রিকস্টার পুরুষরা সবাই একই— মেয়েদের ঠকাস, তাদের ব্যবহার করস, তারপর যখন কেউ তোদের ঠকায়, তখন ভাবস দুনিয়ার সব মেয়ে খারাপ।"


শালিক মাথা নিচু করল। তারপর আস্তে করে বলল, "তুমি আমাকে ছাড়বা না?"


"ছাড়ব না। যতক্ষণ না তোর এই স্বভাব তোরে ছাড়ে, ততক্ষণ আমি থাকব। তারপর যখন তুই একা হবি, তখন আমি চলে যাব। কারণ আমার কাজ শেষ।"


"কী কাজ?"


"তোরে শেখানো যে, মানুষরে ব্যবহার করা যায় না। মানুষের ভেতরও সম্মান থাকে, ভয় থাকে, সন্দেহ থাকে। আর সেই ভয়ই একদিন তার সবকিছু খেয়ে ফেলে।"


ও উঠে দাঁড়াল; আমার দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। তারপর বলল, "তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। আর সবচেয়ে বড় সত্য।"


আমি দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। যাওয়ার আগে বললাম, "শুনে রাখ শালিক—আমি তোরে ঘৃণা করি না। ঘৃণা করলে তোরে ছুঁইতে পারতাম না। আমি তোরে ব্যবহার করছি। ঠিক যেমন তুই অন্য মেয়েদের করেছিস। পার্থক্যটা শুধু এই—তুই করছস শরীরী, আর আমি অশরীরী ।" তোর ব্যবহারের দাগ শরীর আর সমাজে পড়ে, আমারটা শুধু ভয়ের উপর।”


আমি এখন থেকে তোর আরও গভীরে চলে যাব। এই শহরের নর্দমায়, চায়ের দোকানের ধোঁয়ায়, পোশাক কারখানার সাইরেনে, জাহাজ ভাঙার হাতুড়ির শব্দে—আমি ঢুকে যাব। তোর ভিতর আমি আরেকটা অন্ধকারের জন্ম দেব। তার নাম হবে 'স্মৃতি'।


তোর মনে ফিসফিস করব, 'তোর কিছু ছিল, সব হারিয়ে গেছে, শুরু হবে একাকিত্বর ভয়। কারণ আমি তোর ভিতরের অপূর্ন ক্ষুধার আফসোস ছিলাম! আর এই ক্ষুদাকে তুই বুকে টেনে প্রেম বলে ধারণ করবি। কিন্তু প্রেম না।


এরপর আমি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। রাতের চট্টগ্রামের বাতাসে কর্ণফুলীর গন্ধ। দূরে শিপইয়ার্ডের আলো জ্বলছে; যেন সমুদ্রের বুকে আরেকটি গ্যালাক্সি নেমে এসেছে।


শালিক আমার পেছনে দাঁড়িয়ে রইল। কিছু বলল না। ওর মুখে সেই পুরনো কিচিরমিচির নেই। এখন শুধু ফাঁপা বিস্ময় আর একরাশ নিজেকে হারানোর ভয়। 


সেই ভয়টাই আমার জিত। আর এই জিতের কোনো শেষ নাই।


আমি মায়া বেগম। পুরনো হাওয়া। আমি কারও হই না, কারণ আমি সবার। আর এটাই আমার সবচেয়ে বড় রহস্য; আমি ভয়, কিন্তু ভয়ের ভেতরই আমি শান্তির বীজ বুনি, লেখে দিই— শীতল রক্তের প্রেম; যে প্রেমে শরীর জমে না, মন জমে; সন্দেহের বরফে।



0 Comments: