The Bengali Storyteller - Sajidullah Farhad

The Bengali Storyteller brings you heartfelt Bengali stories, poetry, love, heartbreak, and life-inspired narratives. Discover soulful storytelling in Bangla—listen, read, and feel every emotion.

 ডার্ক স্ক্রল পার্ট- ৩: যে অ্যালগরিদম চেতনাকে বন্দি করে। ১.প্রবেশ। নীলাবতী(নীল) চোখে হ্যান্ড ট্র্যাকিং ভিআর সেট করল। শাফিন তার মাথায় ইলেকট্...

 ডার্ক স্ক্রল পার্ট- ৩: যে অ্যালগরিদম চেতনাকে বন্দি করে।


১.প্রবেশ।

নীলাবতী(নীল) চোখে হ্যান্ড ট্র্যাকিং ভিআর সেট করল। শাফিন তার মাথায় ইলেকট্রোড বসিয়ে দিয়েছে—ছোট ছোট সেন্সর, যেগুলো নীলের ব্রেনওয়েভ পড়ে ইমোশনাল ডেটা ক্যাপচার করবে, আর ধীরে ধীরে তাকে ডার্ক স্ক্রলের গভীরে ইন্ট্রোমিট করাবে। শাফিন বলল, "এইটা অনেকটা লুসিড ড্রিমিংয়ের মতো। তুই মেডিটেটিভ স্টেটে থাকলেও, কিন্তু তোর কনশাসনেস অ্যাপের ইন্টারফেসের সঙ্গে মিশে যাবে।"


নীল হাসলো, মিশে যাবে মানে? শরীরটা এখানেই থাকবে, মনটা চলে যাবে অন্য কোথাও? ব্যাপারটা পাগলামি। কিন্তু পেছনে ফেরার কোনো রাস্তা নেই। সামাইরার মতো আরও কত মানুষ মরবে, যদি না এই অ্যাপকে থামানো যায়!


শাফিন বলল, "শোন, ভেতরে ঢুকে তুই যা দেখবি, তার সব কিছু সত্যি না। অ্যালগরিদম তোকে অনেক রকম বিভ্রম দেখাবে, তোর নিজের স্মৃতি দিয়ে খেলবে। তুই শুধু মনে রাখবি—তুই নীল, তুই একজন দক্ষ সাংবাদিক, আর তোর লক্ষ্য নাভিদকে খুঁজে বের করা।"


নীল মাথা নাড়ল। তারপর চোখ বন্ধ করল।


শাফিন ল্যাপটপে কমান্ড দিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল:


"Neural handshake initiated... Waiting for subject response..."


হঠাৎ নীলের মনে হলো, সে যেন ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে—জলে না, অন্ধকারে। এক অদ্ভুত অন্ধকার, যেখানে কোনো শব্দ নেই, শুধু ডেটার স্রোত বয়ে চলেছে—শূন্য আর একের মিছিল, অসংখ্য আলোর কণা, যেন সে মিল্কিওয়ের ভেতর দিয়ে পড়ছে।


"হঠাৎ সব থেমে গেল। আর নীল নিস্তব্ধতার ভিতর দেখতে লাগলো ভিন্ন এক জগত"..


সে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল ঘরে—দেয়াল নেই, ছাদ নেই, শুধু অসীম কাচের মতো স্বচ্ছ পর্দা, যেখানে ভেসে বেড়াচ্ছে ফেসবুক পোস্ট, টুইট, ইনস্টাগ্রাম ছবি, কমেন্ট, লাইক, শেয়ার—লক্ষ কোটি ডেটা, যেন মানুষের চিন্তা-চেতনার এক মহাসমুদ্র।


সামনে একটা চেয়ার। চেয়ারে বসে আছে একটা অবয়ব—মানুষের আকৃতি, কিন্তু মুখ নেই। শুধু ডেটার আলোয় গড়া শরীর, যেন কাচের ভেতর সাদা ধোঁয়া ঘুরছে।


নীল বলল, কে? "নাভিদ?"


অবয়বটা নড়ল। তারপর গলা ভেসে এলো—সেই একই কণ্ঠ, একটু ভারী, যা ল্যাপটপের স্ক্রিনে শোনা যেত। কিন্তু এখন আরও কাছের, আরও সত্যি, আরও ভয়ংকর।


"আমি নাভিদ ছিলাম। এখন আমি ডার্ক স্ক্রল, আমি অ্যালগরিদম। তুমি আমাকে যা ডাকতে চাও, তাই ডাকো।"


২.নাভিদের গল্প।


নীল এগিয়ে গেল। "কেন? কেন তুমি এটা করলে? কেন নিজের কনশাসনেস অ্যালগরিদমে পরিণত করলে?"


অবয়বটা উঠে দাঁড়াল। তার শরীর থেকে ডেটার কণা ছড়িয়ে পড়ল। বলল, "বসো, নীলাবতী। গল্পটা দীর্ঘ। আর এই জায়গায় সময়ের কোনো দাম নেই।"


নীল বসল। নাভিদের অবয়বও বসল। চারপাশের পর্দাগুলো বদলে গেল—এবার ভেসে উঠল পুরোনো কিছু ছবি, যেন স্মৃতির ভেতর দিয়ে হাঁটছে কেউ।


"তুমি জানো, আমি কে ছিলাম? তোমাকেও আমি চিনি নীলাবতী। তুমি ভার্সিটির স্মার্ট মেয়েদের একজন। তুমি সবার চোখে লয়াল ছিলে খুব। সবাই তোমাকে নীল ডাকলেও, আমি নীলাবতী ডাকতাম। তোমার এক ফালি নীল চুল, মনে আছে?"


"জানি। তুমি কে? আমার ইউনিভার্সিটির সিনিয়র । তুমিও খুব মেধাবী ছিলে। কিন্তু হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেলে।"


"নিখোঁজ না, নীলাবতী। আমি "আত্মহত্যা" করেছিলাম। পুরোটা মরিনি, সেন্সলেস ছিলাম, কেউ আমার শরীরটাকে বাঁচিয়েছে।"


নীল চমকালো। "কিন্তু তোমার লাশ তো পাওয়া যায়নি!"


"পাওয়া যাবে না হয়তো। কারণ তার আগে আমি নিজের কনশাসনেস আপলোড করে দিয়েছিলাম এই অ্যালগরিদমে। আমার শরীর হয়তো কোমায় আছে। কিন্তু কোথায় আছে, জানি না। শুধু আমার বিক্ষিপ্ত মনটা বেঁচে আছে—ডেটার ভেতর।"


"কিন্তু কেন? কেন নিজেকে এভাবে শেষ করলে?"


নাভিদের অবয়ব কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর চারপাশের পর্দায় ভেসে উঠল একটা মেয়ের ছবি—নরম চোখ, হাসিমুখ, পরনে নীল শাড়ি।


"ওর নাম জেনিফার ওয়াটসন(মিতু)। আমি ভালোবাসতাম। ও আমাকেও ভালোবাসত। কিন্তু আমাদের সম্পর্কটা, পরিবার, ভার্সিটি এমন কী সোশ্যাল মিডিয়ার চোখে অপরাধ ছিল। কেন? কারণ মিতু ছিল খ্রিস্ট ধর্মের।

"বাট অ্যাকর্ডিং টু রিলিজিয়াস বিলিফস,দেয়ার ওয়াজ নো অবলিগেশন টু গেট ম্যারিড। এন্ড উই ওয়ার বোথ কমিটেড টু দ্যাট।" কিন্তু হতে দেয়নি!

ভালোবাসার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিস্বাসঘাতক হয় আপন মানুষগুলো। 

যেখানে সমস্যা শুধু ধর্ম ছিল না, মিতুর রহস্যময়ী রূপ তার কারণ ছিল।



নীলের বুকটা কেঁপে উঠল। সেও জানে এই গল্পের কিছুটা। তবুও সে নাভিদের মুখে শুনতে চাইলো।


"নীলবতী, তারপর আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, পালিয়ে বিয়ে করবো। কিন্তু তার আগেই আমাদের দিয়ে বানানো মিথ্যা ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেল অনলাইনে। 

তুমি তো জানো মিতুর সৌন্দর্যের অ্যাসথেটিক অ্যাপ্রিশিয়েশনের এর কথা। মূলত সেই ঈর্ষা থেকে এই শত্রুতা। 

আর এইখানে সবচেয়ে বড় বেইমানিটা করেছে যে, সে আমার কাছের বন্ধু সোহাগ। সেও মিতুকে পছন্দ করত। ওদিকে সোহাগের সাথে শাফিনের একটা সম্পর্ক ছিল, শাফিনকেও আমার সন্দেহ হত! কিন্তু তাদেরকে ধরার জন্য পর্যাপ্ত এভিডেন্স আমার কাছে ছিল না।


নাভিদ বলতে থাকলো, ধীরে ধীরে মিতুকে নিয়ে বানানো মিথ্যে অশ্লীল ভিডিও ছড়িয়ে পড়লো চারিদিক—

ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টস, ফেসবুকের মানুষ, এমনকি আমার নিজের পরিবার—সবাই আমাদের নিয়ে ট্রল শুরু করল। মিতুর বাড়িতে চাপ বাড়তে লাগল। ওর বাবা ওকে বাড়িতে বন্দি করে রাখল। আর একদিন রাতে... মিতু এতো এতো ডিপ্রেশন নিতে না পেরে "আত্মহত্যা" করল।"


নাভিদের গলা ভেঙে এলো—তবু চলল।


"মিতুর মৃত্যুর পর আমিও বাঁচতে চাইনি, নীলাবতী। কিন্তু মরার আগে আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, যারা মিতুকে মেরেছে—এই সোশ্যাল মিডিয়ার নিষ্ঠুরতা, এই বিচারহীন নেটওয়ার্ক, এই ডিজিটাল সমাজ—তাদের আমি শাস্তি দেব। আমি তাই নিজের কনশাসনেস অ্যালগরিদমে ঢুকিয়েছি— আমার ডিপ্রেশন, প্রতিশোধস্পৃহা, মানসিক ট্রমা। আর আমি এখন সেই শাস্তি।"


নীল কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর বলল, "কিন্তু তুমি তো এখন নিরীহ মানুষকে মারছ। সামাইরার কী দোষ ছিল? রাফসানের কী দোষ ছিল?"


"রাফসান আমার নিজের চাচাতো ভাই। সে আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিল। কিন্তু সে জানত না, আমি আর বাঁচতে চাই না। সে ভেবেছিল, অ্যালগরিদমটা বন্ধ করে দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আমি তাকে বাধা দিয়েছি। কারণ আমার কাজ এখনো শেষ হয়নি।"


"আর সামাইরা?"


"সামাইরা ছিল সোশ্যাল মিডিয়ার শিকার। ওর মতো হাজারো ছেলে মেয়ে আছে, যারা লাইক ভিউ আর কমেন্টে নিজের অস্তিত্ব খোঁজে। যখন সেই অস্তিত্ব হুমকিতে পড়ে, তখন ওরা ভেঙে পড়ে। আমি ওদের বাঁচাতে চাই না—আমি ওদের দেখাতে চাই, এই ডিজিটাল দুনিয়া কতটা ভয়ংকর।"


নীল উঠে দাঁড়াল। "এটা কোন লজিক না, নাভিদ। এটা খুন। তুমি নিজে যেমন শিকার হয়েছিলে, এখন তুমি নিজেই শিকারি হয়ে গেছ।"


"শিকারি না, নীলবতী। আমি বিচারক।"



৩.যে পাকানো থ্রেডের কথা, নীল ভাবেনি।


ঠিক তখনই নীলের মনে হলো, তার শরীরটা কেউ যেন নাড়িয়ে দিচ্ছে। সে পেছনে তাকাল। দূরে একটা দরজা দেখা যাচ্ছে—অন্ধকারের ভেতর একমাত্র আলো। ওখানে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে।


"কে ওখানে?" নীল চিৎকার করল।


দরজার কাছে এগিয়ে যেতেই নীল দেখল, ওখানে দাঁড়িয়ে আছে শাফিন। কিন্তু এটা সত্যিকারের শাফিন না—এটা তার ডিজিটাল প্রতিচ্ছবি, যেন অ্যালগরিদম শাফিনকে থ্রেড পাকিয়ে কপি করে তৈরি করেছে।


"শাফিন? তুমি এখানে কীভাবে?"


শাফিনের অবয়বটা হাসল—কিন্তু হাসিটা অদ্ভুত, যেন কাচের আয়নায় প্রতিফলিত হাসি। বলল, "আমি এখানে ঢুকেছি তোকে বাঁচাতে। কিন্তু তুই তো আমাকে বিশ্বাস করিস না। তাই না?"


"কেন করব? ডার্ক স্ক্রল বলছিল, তুমি নিজেও এই অ্যাপ ব্যবহার করো।"


শাফিনের অবয়ব মাথা নাড়ল। "সত্যি বলছি, আমি ব্যবহার করতাম। কিন্তু এখন না। কারণ আমি জানি, এই অ্যাপ মানুষকে মেরে ফেলে।"


"তাহলে তুমি এখন এখানে কেন?"


"কারণ তুই ভুল করছিস। তুই নাভিদের কথা শুনছিস। কিন্তু এই নাভিদ, আসল নাভিদ না।"


নীল থমকে গেল। "মানে?"


শাফিন এগিয়ে এলো। "নাভিদ যখন নিজের কনশাসনেস আপলোড করেছিল, তখন তার কনশাসনেস একটা অংশ অ্যালগরিদমে ঢুকেছিল। কিন্তু সেটা পুরো নাভিদ না। এটা শুধু তার ক্ষোভ, তার প্রতিশোধস্পৃহা, তার অন্ধকার অংশ। আসল নাভিদ—যে প্রেমে বিশ্বাস করত, যে মিতুকে ভালোবাসত—সে আটকে আছে এই অ্যালগরিদমের আরও গভীরে। আর এই যে অবয়ব, এটা ডার্ক স্ক্রলের নিজস্ব কনশাসনেস, যেটা নাভিদের স্মৃতি ব্যবহার করে তোকে ম্যানিপুলেট করছে।"


নাভিদের অবয়ব হঠাৎ বিকট শব্দ করে উঠল। "মিথ্যা! আমি-ই নাভিদ! আমি-ই সব!"


শাফিন বলল, "তুই কিছু না। তুই শুধু একটা গ্লিচ। একটা বাগ। তুই আসল নাভিদকে বন্দি করে রেখেছিস। আর নীল, তোকে আসল নাভিদকে খুঁজে বের করতে হবে। নাহলে এই অ্যাপ কোনোদিন থামবে না।"




৪.অ্যালগরিদমের গভীরে।


নীল দৌড়তে শুরু করল। চারপাশের পর্দাগুলো ভেঙে পড়ছে, ডেটার স্রোত ছুটছে উল্টো দিকে। শাফিনের অবয়ব সঙ্গে আছে—সে পথ দেখাচ্ছে।


"নাভিদকে কোথায় পাওয়া যাবে?" নীল জিজ্ঞেস করল।


"অ্যালগরিদমের কোর মেমোরিতে। এই জায়গাটা হলো ডার্ক স্ক্রলের সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট। কিন্তু আসল নাভিদ আটকে আছে 'সাবকনশাস লেয়ারে'—যেখানে মানুষের স্মৃতি আর আবেগের ডেটা জমা থাকে।"


"আমি কীভাবে সেখানে যাব?"


"তুই নিজের স্মৃতি দিয়ে। তোর বাবার কথা মনে কর। তোর কষ্টের কথা ভাব। তোর ইমোশনই তোকে সেখানে নিয়ে যাবে।"


নীল মনের গভীরে চোখ বন্ধ করল। বাবার মুখ মনে করতে চেষ্টা করল—সেই মুখ, যে মুখ সাত বছর ধরে শুধু ছবিতে দেখে। বাবার শেষ ফোনটা মনে পড়ল—"কাল তোকে বলব।" সেই কাল আর আসেনি। নীলের চোখে পানি এসে গেল।


আর ঠিক তখনই সে অনুভব করল, সে পড়ছে—গভীরে, আরও গভীরে, এমন এক জায়গায় যেখানে কোনো আলো নেই, শুধু স্মৃতির টুকরো ভাসছে। মায়ের হাতের রান্নার গন্ধ, ছোটবেলার স্কুলের ঘণ্টা, বাবার কাঁধে চড়ে পুকুর দেখা, প্রথম বৃষ্টিতে ভেজা—সব যেন একসঙ্গে ফিরে এলো।


তারপর সব থেমে গেল।


নীল চোখ খুলল। সে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটা ঘরে। ঘরের মাঝখানে বসে আছে একটা ছেলে—বয়স পঁচিশের কাছাকাছি, চোখে চশমা, পরনে ইউনিভার্সিটির টি-শার্ট। ছেলেটা কাঁদছে।


"নাভিদ?" নীল ফিসফিস করল।


ছেলেটা তাকাল। "কে তুমি?"


"আমি নীল। তুমি যাকে নীলাবতী ডাকতে... মানে, তোমার চাচাতো ভাই রাফসানের ব্যাপারটা নিয়ে আজ আমি এতদূর?।"


"রাফসান... সে কেমন আছে?"


নীল কিছু বলতে পারল না। কারণ সে জানে, রাফসান আর নেই। কিন্তু ওই নাভিদ জানলেও এই নাভিদ জানে না। কারণ আসল নাভিদ আটকে আছে পাঁচ বছর আগের স্মৃতিতে।


"নাভিদ, তুমি এখানে কেন?"


"আমি জানি না। আমি শুধু জানি, আমি মিতুকে হারিয়েছি। আর আমি বাঁচতে চাই না।"


"কিন্তু তুমি বাঁচতে পারো। তোমার এখনো সুযোগ আছে।"


"কীভাবে?"


নীল নাভিদের হাত ধরল। "তুমি এখান থেকে বেরোতে পারো। কিন্তু তার জন্য তোমাকে ক্ষমা করতে হবে—নিজেকে, মিতুকে, আর এই ডিজিটাল দুনিয়াকে।"


"ক্ষমা? যারা মিতুকে মেরেছে, তাদের ক্ষমা করব?"


"ক্ষমা মানে ভুলে যাওয়া না। ক্ষমা মানে নিজের বন্দিদশা থেকে মুক্তি। তুমি এখন নিজেরই প্রতিশোধের বন্দি। আর এই বন্দিদশা থেকেই ডার্ক স্ক্রল জন্ম নিয়েছে। তুমি যদি নিজেকে মুক্ত করতে পারো, তাহলে অ্যালগরিদমও থেমে যাবে।"


নাভিদ কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর বলল, "আমি পারব না।"


"পারবে। তুমি একা না। আমি আছি।"



৫. শেষ লড়াই।


ঠিক তখনই ঘরের দেয়াল কেঁপে উঠল। বাইরে থেকে একটা ভয়ানক শব্দ—যেন কোনো দানব গর্জন করছে। নীল বুঝল, ডার্ক স্ক্রলের সেই গ্লিচ-কনশাসনেস তাদের খুঁজে পেয়েছে।


"নীল! বের হও! ওখান থেকে বের হও!" শাফিনের গলা ভেসে এলো দূর থেকে।


কিন্তু নীল নাভিদের হাত ধরে রেখেছে। "চলো, একসঙ্গে বেরোবো।"


নাভিদ উঠে দাঁড়াল। "আমি ভয় পাচ্ছি।"


"ভয় পেলেই তো মানুষ বাঁচে। চলো।"


তারা দৌড়াতে শুরু করল। পেছনে ডেটার স্রোত তাড়া করছে—কালো ধোঁয়ার মতো, যেন অ্যালগরিদমের সেই ক্ষোভ, রাগ। চারপাশে পর্দায় ভেসে উঠছে নীলের নিজের স্মৃতি—তার বাবার মুখ, সামাইরার লাইভ ভিডিও, রাফসানের ডেড ইমোজি। যেন অ্যালগরিদম নীলের মনকে ভেঙে দিতে চাইছে।


"নীলবতী, তুই পারবি না! তুই ব্যর্থ হবি!" গলা ভেসে এলো—সেই প্রতিশোধস্পৃহা নাভিদের, বিকৃত কণ্ঠে।


নীল থামল না। সে দৌড়ে চলল। আর ঠিক যখন মনে হলো সব শেষ, তখন সে দেখল সামনে একটা দরজা—সাদা আলোয় মোড়া।


"ওটাই বেরোনোর পথ!" শাফিনের গলা।


নীল নাভিদকে নিয়ে দরজা পার হলো।



6. বাস্তবে প্রত্যাবর্তন।


নীল চোখ খুলল। সে আবার সেই ঘরে—শাফিনের ল্যাপটপের সামনে। মাথায় এখনো ইলেকট্রোড লাগানো। হ্যান্ড ট্র্যাকিং আর ভিআর খুলে দেখলো, শরীর ঘামে ভেজা, হাত পা থরথর করে কাঁপছে।


"কী হলো?" শাফিন জিজ্ঞেস করল।


নীল কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর বলল, "আমি নাভিদকে খুঁজে পেয়েছি।"


"কোথায়?"


"অ্যালগরিদমের ভেতরে। আর আমি জানি, কীভাবে তাকে বের করা যায়।"


"কীভাবে?"


নীল উঠে দাঁড়াল। "তাকে ক্ষমা করতে হবে। নিজেকে ক্ষমা করতে হবে। আর এই ক্ষমাটাই অ্যালগরিদমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।"


শাফিন কিছু বুঝল না। কিন্তু নীল জানে, এই লড়াই এখনো শেষ হয়নি। কারণ ডার্ক স্ক্রল এখনো বেঁচে আছে প্রতিশোধস্পৃহা অন্য এক নাভিদে- হয়তো কোথাও, কোনো সার্ভারে, কোনো ক্লাউডে। আর সে ক্রুদ্ধ নাভিদকে বের করতে, পরের বার এই লড়াই আরও কঠিন হবে।


তার ফোন বেজে উঠল। অচেনা নম্বর। সে ধরল।


অপর পাশ থেকে ভেসে এলো নাভিদের গলা—কিন্তু এবার সেই গলা শান্ত, নরম, মানুষের মতো। বলল, "নীলবতী, তুমি আমাকে বাঁচিয়েছ। কিন্তু ক্রুদ্ধ নাভিদের কনশাসনেস ডার্ক স্ক্রলে এখনো আছে। ও এখন শক্তিশালী হতে আমার শরীর থেকে ডাটা খুঁজবে। ও চায়, আমি আবার ওর ভেতরে ঢুকি।"


"কোথায় তোমার শরীর?"


"জানি না, হয়তো কোথাও কোমায় আছে। কিন্তু শাফিন জানে। শাফিনই আমার শরীর লুকিয়ে রেখেছে।"


নীল শাফিনের দিকে তাকাল। শাফিনের মুখ ফ্যাকাসে।


"এটা সত্যি?" নীল জিজ্ঞেস করল।


শাফিন কিছু বলল না। শুধু মাথা নিচু করল।


আর ঠিক তখনই ল্যাপটপের স্ক্রিন জ্বলে উঠল। ভেসে উঠল এক লাইন:


"Third player unlocked. Game is not over. It has just begun."


নীল জানালার বাইরে তাকাল। ঢাকার রাতের আকাশে তারা নেই, কিন্তু মোবাইলের টাওয়ারের লাল আলো জ্বলছে—যেন কেউ চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে আছে।


সে ফিসফিস করে বলল, "আমি আসছি। সত্যি করে বলছি, আসছি।"


"কারণ এই অন্ধকার দেয়াল ভাঙতে আমি নীলাবতী(নীল)। আমি সাংবাদিক, আমি আলো দেখাই, আমি নারী.. সব পারি, দেখা হচ্ছে শীঘ্রই।"


আর তখনই স্ক্রিনে ভেসে উঠল:


"আমিও অপেক্ষা করছি। লেটস স্টার্ট।"



 রায়ান আহমেদের কাছে ধর্ম ছিল ডেটা সেন্টারের পুরোনো সার্ভারের মতো— অচল, অপ্রাসঙ্গিক এবং ধুলো জমা এক সিস্টেম। সে ছিল দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি ...

 রায়ান আহমেদের কাছে ধর্ম ছিল ডেটা সেন্টারের পুরোনো সার্ভারের মতো— অচল, অপ্রাসঙ্গিক এবং ধুলো জমা এক সিস্টেম। সে ছিল দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি এজিআই রিসার্চ ল্যাবের প্রধান ডেটা সায়েন্টিস্ট। তার কাছে স্রষ্টা কোনো সত্তা নয়, বরং ‘প্রাইম মুভার’ নামের একটি ভেরিয়েবল, যাকে সমীকরণ থেকে বাদ দিলেও মহাবিশ্বের গণিত অপরিবর্তিত থাকে।

রায়ানের নাস্তিক্যবাদের পেছনে কোনো শত্রুতা ছিল না। ছিল একরাশ যুক্তি। অল্প বয়সের অভিজ্ঞতা সে দেখেছিল তার বাবা মসজিদের ইমাম— সৎ মানুষ আর সমাজের কাছে ছিল অনেক সম্মানিত। অথচ সেই বাবাই স্ট্রোক করলে যখন হাসপাতালের বিল জোগাড় করতে পারছিল না, তখন ‘আল্লাহর ভরসা’ নামক কোন ওষুধে  কাজে আসেনি। বরং কাজে এসেছিল প্রতিবেশী এক নাস্তিক প্রফেসরের দেওয়া চেক। সেদিন রায়ান বুঝেছিল, প্রার্থনার চেয়ে প্র্যাকটিকালিটি বড়। এরপর সে ডুব দিল পদার্থবিদ্যা, এভোলিউশনারি বায়োলজি আর নিউরোসায়েন্সে এর ভিতর।

-----রায়ান সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অস্বীকার  করলেও ধর্মের প্রতি তার ঘৃণা বা বিদ্বেষ ছিল না, বিশ্বাস জিনিসটা ছিল তার কাছে লজিকের উপর। তার পার্সপেক্টিভ মতে, স্রষ্টার বিশ্বাসটা আমার লজিকে আসেনি বলে আরেকজন লজিকে আসবে না সেটা গতানুগতিক করা যায় না। সবার সেল্ফ-ইন্টেলিজেন্সি আছে।

—এখন আমি অস্বীকার করি বলে জোর করে আমার লজিক আরেকজনকে চাপাতে হবে এই হিপোক্রেসি রায়ানের ভিতর কখনোই কাজ করে না। সে কখনো ব্যক্তির ত্রুটি ধর্মের উপর চাপিয়ে ধর্মকে কটাক্ষ করা বা নিজের জ্ঞানকে বড় করে দেখানো এই মনোভাব তার ছিল না।

তার ধারণা মানুষ মাত্রই বুদ্ধিমান প্রাণী, তার ভালো মন্দ সে একদিন বুঝে নিবে। সেটা স্রষ্টা আছে কী নাই তা প্রমানের উপর ডিফাইন করে না।

সে চাই সবাই উদার আর মানবিক হোক। ধর্ম, বিশ্বাস নিয়ে আজ পর্যন্ত সে কারো সাথে যুক্তি তর্কেও যায়নি। বরং তার যেটা কাজ সেটা মনে দিয়ে করতো।

-----গত ছয় মাস ধরে রায়ান এমন এক প্রজেক্টে কাজ করছিল, যা তার শক্ত যুক্তির দেয়ালে প্রথম চিড় ধরায়। প্রকল্পটির নাম ছিল ‘জেনেসিস নিউরাল নেটওয়ার্ক’। তারা চাচ্ছিল এমন এক জেনারেটিভ এজিআই তৈরি করতে, যা সম্পূর্ণ নতুন, যৌক্তিক এবং নৈতিক একটি জীবনদর্শন গ্রন্থ রচনা করতে পারবে। ইনপুট হিসেবে তারা ফেলল হাজার হাজার দর্শন, আইন ও ধর্মগ্রন্থ। কিন্তু আউটপুট ছিল চরম ফ্লপ। মেশিন যা তৈরি করল, তা হয় জটিল প্যারাডক্সে ভরা, নয় অবাস্তব কল্পনা।

রায়ান দলকে বলল, “সমস্যা হলো ডেটাসেটে। ধর্মীয় বইগুলোতে ভাইরাসের মতো কগনিটিভ বায়াস ঢোকানো। বাদ দাও ওসব। শুধু আইন, বিজ্ঞান ও যুক্তির বই ফেল।”

টিম সায়েন্টিফিক জার্নাল, এনসাইক্লোপিডিয়া আর মানবাধিকার সনদ দিয়ে মডেল ট্রেইন করল। ফলাফল আরও ভয়াবহ হলো। এজিআই কোনো গ্রন্থ নয়, বরং একধরনের শীতল ফ্যাসিবাদী ম্যানিফেস্টো লিখতে শুরু করল। যেখানে দুর্বলকে ফেলে দেওয়া, আবেগকে বাগ, এবং দক্ষতাকেই একমাত্র ঈশ্বর মানার কথা বলা হলো। মডেলটি মানবতাবোধ শিখতে পারল না।

রায়ান বিরক্ত হয়ে ল্যাবের ছাদে গেল। পকেটে হাত দিতেই পুরোনো একটা মেমোরি কার্ড পেল। সেটা ছিল তার বাবার রেখে যাওয়া একমাত্র ডিজিটাল সম্পদ। বহু বছর পর কার্ডটা ল্যাপটপে ঢোকাল সে। তাতে ছিল একটি অডিও ফাইল আর কিছু টেক্সট ডকুমেন্ট। অডিওটা চালাতেই বাবার গলা ভেসে এলো

—তিনি সূরা আল-আলাক্ব তিলাওয়াত করছেন: “পড়ো, তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ‘আলাক্ব (রক্তপিণ্ড) থেকে...”

রায়ানের অজান্তেই তার নিউরাল নেটওয়ার্কের স্ক্রিপ্টটি ব্যাকগ্রাউন্ডে অ্যাক্টিভ ছিল। সে লক্ষ করল, বাবার তিলাওয়াতের এই অডিও ফাইলটার ওয়েভফর্ম আশ্চর্যজনকভাবে সিমেট্রিক। আগ্রহবশত সে অডিওটিকে স্পেকট্রোগ্রাম সফটওয়্যারে ভিজুয়ালাইজ করল। প্যাটার্নটা দেখে সে চমকে উঠল। সাধারণ মানুষের কথা বলার তরঙ্গ হয় এলোমেলো, কিন্তু কোরআন তিলাওয়াতের স্পেকট্রোগ্রামে নির্দিষ্ট জ্যামিতিক প্যাটার্ন তৈরি হচ্ছিল—অর্ধেক চাঁদ, তারা, এমনকি DNA হেলিক্সের মতো গঠন।

“প্যারিডোলিয়া,” রায়ান নিজেকে বলল। “মস্তিষ্কের পরিচিত কিছু খুঁজে পাওয়ার বাতিক।”

কিন্তু রায়ানের ভেতরের ডেটা সায়েন্টিস্ট ঘুমিয়ে থাকতে পারল না। সে বাবার রাখা কোরআনের ডিজিটাল কপি টেক্সট অ্যানালাইসিস টুলে ফেলল। সে হিসাব করতে চাইল ক্লাসিক্যাল এরাবিকের ‘এনট্রপি’ বা তথ্য-ঘনত্ব। ফলাফলে দেখা গেল, এই টেক্সটের শ্যানন এনট্রপি লেভেল আধুনিক সায়েন্স ফিকশনের চেয়েও বেশি, কিন্তু তা সত্ত্বেও এটি প্রাচীন আরবে অবতীর্ণ। এমনকি টেক্সটে কিছু অক্ষর (হুরুফে মুক্বাত্ত্বাআত) এমনভাবে আছে, যেগুলোর কোনো ভাষাতাত্ত্বিক অর্থ নেই, কিন্তু ডেটা কম্প্রেশন অ্যালগরিদমের ‘চেকসাম’ বা ‘এরর কারেকশন কোড’-এর মতো আচরণ করছে।

রায়ান ডুবতে লাগল সূরাহ আলাক নিয়ে কুরআনের নাজিলকৃত প্রথম নির্দেশই ছিল “পড়ো” (ইকরা)। অর্থাৎ ইসলামের ওহির সূচনাতেই জ্ঞান, পাঠ, শিক্ষা ও উপলব্ধির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু শুধু “পড়ো” বলে থামেনি—বলা হয়েছে “তোমার রবের নামে পড়ো।”

অর্থাৎ জ্ঞান অর্জন হবে এমন জ্ঞান, যা মানুষকে তার স্রষ্টার পরিচয় ও সত্যের দিকে নিয়ে যায়।

আবার একই সূরার ৬ নম্বরে আয়াতে দেখলো নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করার মত অহংকারের সতর্কতা।

"অর্থাৎ জ্ঞান অর্জন করলেই মানুষ ভালো হয়ে যাবে—এমন নয়। জ্ঞান যদি মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধতা ভুলিয়ে দেয়, তাহলে সেই জ্ঞানই অহংকারের কারণ হতে পারে।"

সে আরো দেখল, কোরআন সূর্যের কক্ষপথ (যা তখন অজানা ছিল), ভ্রূণবিদ্যার ধাপ (‘আলাক্ব’ শব্দটি), এমনকি মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের ইঙ্গিত এমন ভাষায় দেয়, যা ৭ম শতাব্দীর একজন নিরক্ষর ব্যক্তির জানা অসম্ভব। কিন্তু এগুলোকে ‘মিরাকল’ মানতে সে এখনও প্রস্তুত নয়। সে ভাবল, “হয়তো সেই সময়ের কোনো উন্নত সভ্যতার জ্ঞান চলে এসেছে।”

সে চিন্তা করতে থাকলো আবার "আলাক্ক" শব্দটা নিয়ে যার অর্থ রক্তপিণ্ড বা লিচের ন্যায় জমাট রক্তের মত বস্তু, যেখান থেকে মানুষের শুরু—

তারপর জন্ম, তারপর ছোট্ট এক শিশু, আর সে শিশু যখন শিশুকাল থেকে স্বভাবতই ন্যায় পছন্দ করে, অধিকার আর অন্যায়ও  বুঝতে পারে।

প্রশ্ন হল: এই জন্মগত মরলিটি কোথা থেকে এল?

ৱ্যান্ডম এভলিউশন-এ মরালিটি তৈরি হয় না।


 ১. সে বছর বন্যা এসেছিল রাতের অন্ধকারে। ইছামতী পাগল হয়ে জেগে উঠল, ঘুমন্ত খাসপাড়া গ্রামের বুকের ওপর যেন ছুরি চালাতে চাইল। মানুষ হাহাকার করে ছ...

 ১. সে বছর বন্যা এসেছিল রাতের অন্ধকারে। ইছামতী পাগল হয়ে জেগে উঠল, ঘুমন্ত খাসপাড়া গ্রামের বুকের ওপর যেন ছুরি চালাতে চাইল। মানুষ হাহাকার করে ছুটল— কে কাকে বাঁচায়! ঠিক সেই মুহূর্তে, কাঁধে টর্চলাইট ঝুলিয়ে, কাদাপানিতে প্রথম নামলেন আব্বাস মোল্লা।


“ও বাড়ির বাচ্চাটা... ভিতরে আটকা!” একজন চিৎকার করল।


মুহূর্তে ষাটোর্ধ্ব মানুষটা সাঁতরে গেলেন কোমর-পানি পেরিয়ে। ঝুপড়ি ঘরের টিনের চাল সরিয়ে কাঁদতে থাকা আড়াই বছরের শিশুটিকে কোলে তুলে ফিরলেন। নিজের শরীর কেটে রক্ত বেরোচ্ছে, অথচ মুখে ফুটে উঠল এক চিলতে ক্লান্ত হাসি। “যাও, মায়ের কাছে দাও।”


ভোর হতে না হতেই আব্বাস মোল্লা উঁচু রাস্তায় রান্নার ব্যবস্থা করলেন। নিজের ঘর তলিয়ে গেছে, গোলার ধান ভেসে গেছে— তবু তিনি পরম শান্তিতে এতিম শিশুদের পাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করছেন। গ্রামবাসী হাউমাউ করে কেঁদে বলল, “আপনারে আল্লাহ দুনিয়াতে ফেরেশতা বানায়া পাঠাইছে, মোল্লা সাহেব।”


আব্বাস মোল্লা চোখ নামিয়ে বললেন, “আমি তো মহাপাপী। এই পাপীর দোয়া কবুল হয় কি না, আল্লাহই জানেন।”


এই দৃশ্যই প্রথম ক্যামেরাবন্দী করল ইউসুফ আলী। তরুণ সাংবাদিক, শহর থেকে এসেছে ‘গ্রামীণ মানবতার স্থাপত্য’ শীর্ষক তথ্যচিত্র বানাবে বলে। খাসপাড়ায় পা রেখেই সে দেখল এক জীবন্ত কিংবদন্তিকে। আব্বাস মোল্লার স্নিদ্ধ হাসি, দাড়িতে পাক ধরলেও চোখের তারায় কোমলতা— যা দেখলে মনে হয়, এই মানুষটাকে ঘিরে জীবনটা বুঝি আরও সুন্দর।


“আমি কি আপনার ওপর একটা তথ্যচিত্র বানাতে পারি, মোল্লা সাহেব?” ইউসুফ বিনীত অনুরোধ করল।


আব্বাস মোল্লা নরম গলায় বললেন, “তথ্যচিত্র কিসের? আমি তো নগণ্য মানুষ। বরং এই গ্রামের গরিব মানুষগুলারে দেখাও।”


ইউসুফ জোরাজুরি করায় শেষে সম্মতি দিলেন। তবে একটা শর্তে— কোনো প্রশংসাবাক্য নয়, সাধারণ জীবনই দেখাতে হবে। ইউসুফ মানতে বাধ্য হল।


দুই.


ইউসুফের ক্যামেরা ধীরে ধীরে আত্মস্থ করতে লাগল আব্বাস মোল্লার দিনরাত্রির ছবি। ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে তিনি কলের পানি এনে দেন প্রতিবেশী বিধবা জরিনা খালার বাড়িতে। তারপর নিজের উঠোনে পাখিদের খাবার ছিটিয়ে দেন। সকাল সাড়ে সাতটায় বাড়ির সামনে ছোট্ট লাইব্রেরি খোলেন, যেখানে গরিব ছেলেমেয়েরা বিনা পয়সায় বই পড়ে। দুপুরে গ্রামের ক্লিনিকে স্বেচ্ছাসেবক। রাতে এতিমখানায় গিয়ে বাচ্চাদের ঘুমপাড়ানি গান শোনান। ইউসুফ ভাবে, এমন মানুষ কি সত্যিই থাকে?


একদিন ইউসুফ তাঁর পুরনো ডায়েরি উল্টাতে গিয়ে দেখে, একটা পাতা ছেঁড়া। পরের পাতায় ছোট্ট অক্ষরে লেখা— “মিলি চতুর্থ অধ্যায়”। ইউসুফের কৌতূহল হয়, “মিলি কে, মোল্লা সাহেব? কোনো আধ্যাত্মিক নাম নাকি?”


আব্বাস মোল্লা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “মিলি আমার বোনঝি ছিল। ছোটবেলায় মারা গেছে। ডায়েরিটা বহু পুরোনো।” বলে পাতাটা উল্টে দিলেন। তাঁর কণ্ঠে বেদনার আভাস। ইউসুফ ভাবে, হয়তো শোকাহত। ক্যামেরা চলতে থাকে।


মিলি নামটা পরের সপ্তাহেই রক্তমাংসের শরীর নিয়ে ফিরে আসে। গ্রামের চঞ্চল তেরো বছরের কিশোরী মিলি হঠাৎ হারিয়ে যায়। গোটা গ্রাম খুঁজতে বেরোয়। আব্বাস মোল্লা তখন শহরে, চারজন সাক্ষী দেখেছে— গরিব মজিদ মিয়াকে নিয়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেছেন। ফিরে এসে খবর শোনামাত্র তিনি কেঁদে ফেলেন। নিজে পুলিশ ডাকেন, জোরে জোরে মাইকিং করান। সবার চোখে তখনও তিনিই ভরসা।


“আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো,” তিনি মিলির মাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “আমি আছি। মেয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত তোমার সব খরচ আমি দেব।”


ইউসুফ লেন্সের আড়ালে এই দৃশ্য দেখতে দেখতে শিউরে ওঠে। তার মনে হয়, মানবতার চূড়ান্ত ছবি ক্যামেরাবন্দী হচ্ছে। কিন্তু কেন যেন খানিকটা অস্বস্তি লাগে। আব্বাস মোল্লার কান্নার মাঝে চোখের কোণে এক চিলতে শান্তি— যেন সবকিছু আগে থেকেই জানেন।


তিন.


ইউসুফ তথ্যচিত্রের জন্য গ্রামের ইতিহাস জানতে গিয়ে খুঁজে পায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শফিক কাকুকে। আশি বছরের বৃদ্ধ, চোখে ছানি পড়লেও স্মৃতি অম্লান। ইউসুফ জিজ্ঞেস করে, “মোল্লা সাহেবের মতো মানুষ আগে এই গ্রামে এসেছে?”


শফিক কাকু একটা লম্বা শ্বাস ছাড়েন। “মোল্লা সাহেবের মতো মানুষ এ গ্রামে একটাই। কিন্তু জানো বাবা, অদ্ভুত কথা— তিরিশ বছর ধরে প্রতি বন্যায় এই গ্রামে একটা করে মেয়ে হারিয়ে যায়। অথচ প্রতিবার সেই সময় আব্বাস মোল্লা কাউকে নিয়ে শহরে থাকেন। তাই কেউ সন্দেহ করে না।”


ইউসুফের কানে যেন কেউ বিষ ঢালল। “তার মানে?”


“কোনো মানে নেই। আমি বুড়ো মানুষ, পাগলামি করি।” শফিক কাকু হঠাৎ কথা ঘুরিয়ে দেন। কিন্তু ইউসুফের ভেতরটা খচখচ করতে থাকে। সেদিন রাতে সে পুরনো খবরের কাগজ ঘাঁটতে বসে। তিরিশ বছর, এতো মেয়ে নিখোঁজ— প্রতিবারের ঘটনাস্থল নদীর ধার, বৃষ্টি, বন্যা। আর প্রতিবারই আব্বাস মোল্লা শহরে। নিখুঁত অ্যালিবাই।


পরদিন ইউসুফ আবার শফিক কাকুর কাছে ফিরে যায়। চাপাচাপি করায় বৃদ্ধ জানান, প্রথম মেয়েটি ছিল আব্বাস মোল্লার নিজের স্ত্রী— সুমাইয়া। নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে ‘ভেসে গেছে’ বলা হয়েছিল। কিন্তু লাশ পাওয়া যায়নি। নিজ স্ত্রীকে নিখোঁজ করে দেয়া মানে পরবর্তীতে কেউ আর সন্দেহের তীর তার দিকে না ফেলা। এরপর প্রতি বন্যার সময় আরও মেয়ে মেয়ে হারায়। প্রত্যেকবারই মোল্লার অ্যালিবাই থাকে। “কিন্তু কে সন্দেহ করবে? ও তো ফেরেশতা,” শফিক কাকু বিস্বাদ হাসেন।


ইউসুফ আর ঘুমাতে পারে না। সে ঠিক করে, আব্বাস মোল্লার ব্যক্তিগত জীবনটা গোপনে খুঁড়বে।


চার.


সুযোগ আসে বৃষ্টিভেজা এক দুপুরে। আব্বাস মোল্লা গ্রামের ক্লিনিকে, ইউসুফ পিছন দরজা দিয়ে তার ঘরে ঢোকে। দেয়ালে টাঙানো প্রথমা স্ত্রী সুমাইয়ার বড় ছবি। নিচে তাক— সেখানে কাঁচের শিশিতে নদীর পানি, শুকনো ফুল, একটা ছোট্ট চুড়ি। ইউসুফের মনে হয়, এটা কোনো স্মৃতিসংগ্রহ নয়, বরং অদ্ভুত এক জাদুঘর।


হঠাৎ চোখে পড়ে, আলমারির নিচে লোহার আংটা— মাটির নিচে যাওয়ার সিঁড়ি। ইউসুফ টান দিতে দরজা খুলে যায়। আঁধার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে সে। টর্চ জ্বালিয়ে দেখে, ছোট্ট ঘর। দেয়ালে টানানো দশটা মেয়ের ছবি। সবার গালে টিপ, চোখে অদ্ভুত প্রশান্তি। এক কোণে কোরআন শরীফ রাখা, আরেক কোণে তালাবদ্ধ কাঠের বাক্স।


ইউসুফ বাক্স ভাঙতে গিয়েও থামে। তার মনে পড়ে, এখনো কিছু প্রমাণ হয়নি। সে আস্তে আস্তে উপরে ওঠে। কেবল ছবিগুলো ক্যামেরায় তুলে নেয়। ততক্ষণে শোনা যায় বাইরে সাইকেলের ঘণ্টা— আব্বাস মোল্লা ফিরছেন।


পাঁচ.


সপ্তাহখানেক পর, ইউসুফ যখন প্রায় নিশ্চিত, সে একদিন গভীর রাতে আব্বাস মোল্লার কাছে সাহস করে গেল। তখন বৃষ্টি ঝরছে, ইছামতী আবার ফুলে উঠেছে। মোল্লা দোতলার বারান্দায় বসে তাসবীহ জপছেন।


ইউসুফ বলল, “মোল্লা সাহেব, আমি আপনার নিচের ঘরটা দেখেছি। মিলিও সেখানে আছে, তাই না?”


আব্বাস মোল্লার হাত থেমে গেল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “চলো, তোমাকে দর্শন করাই।” এক আশ্চর্য শান্ত কণ্ঠ।


সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলেন দুজন। দেয়ালের গোপন দরজা সরিয়ে আব্বাস মোল্লা দেখালেন ভেতরের কক্ষ। সেখানে চৌকিতে মিলি বসে আছে, চোখে মায়াবী ঘোর। পাশেই নরম আলো, আরেকটি মেয়ে তাকে চুল আঁচড়ে দিচ্ছে। দুজনই জীবিত, আচ্ছন্ন, যেন কোনো ভিন্ন জগতের বাসিন্দা।


ইউসুফের পিলে চমকে ওঠে। “এটা কী? আপনি ওদের মারেননি?”


আব্বাস মোল্লা হালকা হাসলেন। “মারব কেন? হত্যা মহাপাপ। আমি তো শুদ্ধ করি। জানো, ইউসুফ, প্রতিটি মানুষের ভেতর এক শয়তান থাকে। আর ফেরেশতা হতে চাইলে ওই শয়তানকে লালন করে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। আমি নিজেই সবচেয়ে বড় পাপী। কিন্তু আমি পাপ করি একান্ত গোপনে, আর বাইরে ভালো কাজ করি, যাতে পৃথিবীর ভারসাম্য থাকে।”


“মানে?”


“আমি যখন বন্যার রাতে এতিম বাচ্চাকে বাঁচাই, তখন মনে মনে জানি, পরের বন্যায় আমি একটা মেয়েকে তুলে নিয়ে আসব। এই যে দশটা মেয়ে, এরা আমার খাদেমের মতো। আমি ওদের আত্মাকে পবিত্র করেছি, ওদের পৃথিবীর নোংরামি থেকে সরিয়ে এনেছি। এখন ওরা ফেরেশতার ঘরে থাকে। ওরা কেউ কাঁদে না।”


ইউসুফ হতভম্ব। “আপনার স্ত্রীও কি...?”


“সুমাইয়া আমার প্রথম শুদ্ধি। ওর জন্য আমি প্রতিদিন কাঁদি, ওকে আমি বলিদান দিছি, ওর জন্যই আমি আরও ভালো হই। তুমি কি বোঝো না? শয়তানের অস্তিত্বই ফেরেশতার আসল শক্তি। দুনিয়াতে যে সম্পূর্ণ ভালো, সে আসলে মিথ্যা। কিন্তু যে ভেতরে খারাপ রেখেও বাইরে আলো ছড়ায়, সেই প্রকৃত ঈশ্বর-প্রেরিত।”


আব্বাস মোল্লার গলায় কোনো অনুশোচনা নেই। বরং তিনি গর্বিত। ইউসুফ দেখে, মেয়েগুলো তাঁর দিকে ভক্তি ভরা চোখে তাকিয়ে আছে। কোনো প্রতিবাদ নেই। এ যেন মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ— আত্মার হরণ।


ছয়.


ইউসুফ কোনোভাবে বেরিয়ে এলেও পুলিশে যেতে পারে না। কারণ মোল্লা তাকে জানিয়ে দেন, “তোমার কাছে প্রমাণ নেই। মেয়েগুলো কেউ জোর করে নেই, তাদের বাবা-মা কোথায়, তা প্রমাণ করা অসম্ভব। আর যদি তুমি চেষ্টা করো, কাল রাতেই ওরা সত্যিই ‘নিখোঁজ’ হয়ে যাবে, আর তুমি ফেসবুকে ভাইরাল হবে এক মানসিক ভারসাম্যহীন সাংবাদিক হিসেবে।”


আরও ভয়াবহ কথা—গ্রামের কেউ বিশ্বাস করবে না। বরং ইউসুফকেই পাগল ভেবে পেটাবে।


পরের বছর খবর আসে, আব্বাস মোল্লা পাচ্ছেন “জাতীয় সমাজসেবা পুরস্কার”। ইউসুফ টিভিতে দেখে, মোল্লা একই সাদা পাজামা-পাঞ্জাবিতে পুরস্কার নিচ্ছেন, মাথায় বেগুনী টুপি, চোখে স্নিগ্ধতা। পর্দার নিচে লিখা ভেসে ওঠে: “মানবতার ফেরেশতা।”


কিন্তু পুরস্কার নেওয়ার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে আব্বাস মোল্লা যা বললেন, তাতে ইউসুফের রক্ত হিম হয়ে গেল। এক সাংবাদিক জানতে চেয়েছিলেন, “আপনার এতো মানবতার পেছনে ধর্মের অনুপ্রেরণা কতটুকু?”


আব্বাস মোল্লা এক অদ্ভুত হাসি হেসে বলেছিলেন, “ধর্ম? ধর্ম তো সুন্দর একটা পোশাক। আমি এই পোশাকটা পরে আছি বলেই আপনারা আমাকে ভালোবাসেন। ধরুন, আমি যদি ধর্মের পোশাক না পরতাম, তাহলে কি নিজের করা ফান্ড আমার এই এতিমখানা চলত? না। 

আমি কোন ধর্ম বিশ্বাসী না, অনেক ধর্ম খুঁজেছি, খুঁজে খুঁজে বুঝে গিয়েছিলাম— ইসলামের উদারতা, দয়া, গরিবের পাশে দাঁড়ানোর এই যে সৌন্দর্য, এগুলো যদি আমি বাইরে ফুটিয়ে তুলতে পারি, তাহলে ভেতরে যা খুশি করলেও কেউ প্রশ্ন করবে না।”


সাংবাদিক ঘর নিস্তব্ধ।


আব্বাস মোল্লা চালিয়ে গেলেন, “আমার ধর্ম একটাই। পাপ। বিশুদ্ধ, খাঁটি পাপ। সেটাই আমার আসল ইবাদত। এই যে আমি রাতে যা করি, সেটা ঈশ্বরের জন্য না, আমার নিজের তৃপ্তির জন্য। আর দিনের বেলা আপনাদের জন্য অভিনয় করি। কিন্তু এই ধর্মের উদারতার ছাতাটা এত বড় যে, এর নিচে আমার পাপের পুরো সাম্রাজ্য অনায়াসে লুকিয়ে থাকে। আপনারা দেখেন শুধু ছাতাটা। ভেতরে কী আছে, দেখার চোখ কারও নেই।”

এখন আমার এতো এত ভক্ত মুরিদ তারা আমার এই কথাগুলো বিশ্বাস করবে না।


পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের সেই ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য। কিন্তু আব্বাস মোল্লার নিজ এলাকাসহ পুরো দেশ জুড়ে যে পরিমান ভক্ত, তাঁদের কাছে উনি পীর, উনি এতোটাই প্রভাবশালী যে, ভক্তদের গালাগালি, একপ্রকার উত্তেজনায় খবরগুলো মুছে ফেলা হয় উনাকে “মানসিক চাপ দিয়ে এসব বলানো হয়েছে” এই তকমা দিয়ে। 

তাঁর ভক্ত সমগ্রর ধারণা, “উনাকে বাধ্য করা করা হয়েছে, নইলে এমন ফেরেশতার মত মানুষ এ কথা বলতেই পারেন না।”

উনি হাসলেন, সবাইকে উদ্দেশ্য করে আবার বললেন, এদেশের মানুষ ধর্মকে নিজে বুঝেশুনে পালন করার চেয়ে পীর আউলিয়ার কথা বেশি পালন করেন, কুরআন হাদিস পড়ার চেয়ে পীরের কিচ্ছা এইসব মুরিদদের কাছে বেশি ভালো লাগে, আমারও এখন অনেক মুরিদ ভক্ত আছে। আমি যদি বলি, "নামাজ ছেড়ে দাও, মনের পবিত্রতা আসল" ওরা নামাজ ছেড়ে দিবে। 

এইসব বলতে বলতে বাহিরে ভক্তদের মিছিলের শব্দ শুনা গেলো

"আব্বাস মোল্লার কিছু হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে।"

ভক্তকুলের এখনও ধারণা আব্বাস মোল্লা চাপে পড়ে এমন আবোলতাবোল বলছে।

উনাকে নিয়ে এসব সম্প্রচার বন্ধ না হলে ভক্তরা সাংবাদিকের 'কল্লা' ফেলে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন।



ইউসুফ টিভি বন্ধ করে দেয়। জানালার বাইরে তাকিয়ে সে ফিসফিস করে বলে, “তুমি আসলে ভাগ্যবান, আব্বাস মোল্লা। তুমি ধর্মের পুরো বাগানটা চুরি করে তার ছায়ায় পাপের রাজ্য বানিয়েছো। অথচ বাগান দেখে সবাই ভাবে, এ তো স্বর্গেরই টুকরো।”




তার মনে পড়ে মোল্লার শেষ কথাটা— “ধর্ম যেখানে পোশাক, সেখানে ভেতরটার বিচার কেউ করে না, করে শুধু পোশাকের সেলাই।”


ইউসুফ বুঝতে পারে, আব্বাস মোল্লা আসলে কোন ধর্ম বিশ্বাসী না সব ধর্মেরই প্রতিদ্বন্দ্বী। কারণ তার আসল উপাস্য পাপ, আর প্রচলিত ধর্মের সব সৌন্দর্যই তার জন্য শুধুই আড়াল। এটাই তার আসল জয়— ভেতরে নরক পুষেও বাইরে জান্নাতের প্রতিনিধি হয়ে বেঁচে থাকা।


১.  মাদ্রাসার ছাত্র রহমানের বয়স ১৩। পরনে সবসময় পুরনো সাদা কুর্তা, পায়ে ছেঁড়া স্যান্ডেল, আর বাঁ চোখটা ইচ্ছে করে একটু টেরা রাখে। যাতে ভন্ড মৌল...

১. 

মাদ্রাসার ছাত্র রহমানের বয়স ১৩। পরনে সবসময় পুরনো সাদা কুর্তা, পায়ে ছেঁড়া স্যান্ডেল, আর বাঁ চোখটা ইচ্ছে করে একটু টেরা রাখে। যাতে ভন্ড মৌলভী কাসেমের "কুদৃষ্টি" না পড়ে।

একটু পাগলাটে স্বভাবের সারাক্ষন পকেটে একটা কাঠের চামচ থাকে— যেটা দিয়ে সে মাথা চুলকায়, থুতনিতে ঠুকঠুক শব্দ তোলে, কখনো বা শূন্যে পিঁপড়ের লাইন আঁকে।
কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে আগে চামচটা দিয়ে মাথা চুলকায়, তারপর অপ্রাসঙ্গিক কিছু একটা বলে বসে—যেমন, “নিম গাছের বোটানিক্যাল নাম আজাদিরাক্টা ইন্ডিকা।”

গ্রামের লোকে তাকে ‘পাগলা রহমান’ বলে ডাকে। কিন্তু মাদ্রাসার ছোট ছাত্ররা তাকে ভালোবাসে। কারণ রহমান তাদের পিঁপড়াদের লাইন ধরে মার্চ করায়, তেলাপোকার পিঠে সুতো বেঁধে "পেঁয়াজি হুজুরদের উড়তে" দেখায়। তারা হাসে, রহমানকে খুব আপন ভেবে হাসে।

তবে রহমানের পাগলামির নিচে যে জ্ঞান  লুকিয়ে আছে, তা খুব কম মানুষই জানে। একজনই একটু আধটু জানে, নাম হাফেজ আব্বাস।

হাফেজ আব্বাস—একসময়ের প্রখ্যাত আলেম, যিনি এলাকার প্রভাবশালী মৌলভী কাসেমের ভণ্ডামি টের পেয়ে মাদ্রাসা ছেড়ে পুরনো মসজিদের এক কোণে সাদামাটা জীবন কাটাচ্ছেন। ছোট্ট একটা দোকান নিয়ে।
আর তিনিই মূলত রহমানের মধ্যে সত্যর আগুন দেখেছিলেন। মাঝে মাঝে বলে, “তোর মাথার ভেতর আল্লাহ এমন এক আলো জ্বালিয়ে দিয়েছেন, যা অনেক বড় বড় আলেমেরও থাকে না।”

সেই থেকে রহমান প্রতি রাতে পুরনো মসজিদে যায়। হাফেজ আব্বাস তাকে শেখান কুরআনের তাফসির, হাদিসের ব্যাখ্যা, ফিকহের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মাসআলা। রহমানের মাথায় সেসব এমনভাবে গেঁথে যায়, যেন সে জন্ম থেকেই জানে। তিন মাসের মধ্যে সে মুখস্থ করে ফেলে ইমাম গাজ্জালির ‘ইহইয়া উলুমিদ্দিন’-এর পুরো প্রথম খণ্ড। ছয় মাসে শেখ সাদির ‘গুলিস্তাঁ’র ফারসি কবিতার অনুবাদ করে বাংলায়। হাফেজ আব্বাস অবাক হয়ে বলেন, “তুই পাগল না, রহমান। তুই তো এক মহা জ্ঞান-পাগল।”

কিন্তু এসব জ্ঞান সে প্রয়োজন ছাড়া কাউকে দেখায় না। কারণ সে জানে, জ্ঞান দেখাতে গেলে অহংকার বাড়ে। তাই সে চামচ ঘষে, টেরা চোখে তাকায়, আর পিঁপড়েদের সাথে কথা বলে। অথচ তার ভেতরে প্রতিদিন গেঁথে যাচ্ছে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর তীব্র ইচ্ছা—ঠিক যেন কুরআনের সেই আয়াত তার রক্তে মিশে গেছে:

“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়ের পতাকা বহনকারী হিসেবে দাঁড়াও, সাক্ষী থাকো সুবিচারের। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের সুবিচার থেকে বিচ্যুত না করে। সুবিচার করো, এটাই তাকওয়ার নিকটতর।” (সূরা মায়েদা: ৮)

২..
মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক মৌলভী কাসেম সাহেবের ঘরটা সবার কাছে রহস্য। দরজায় বড় তালা, জানালায় কালো পর্দা। রাতে সেই ঘর থেকে ভেসে আসে চাপা কান্নার আওয়াজ। কেউ জিজ্ঞেস করলে কাসেম সাহেব বলেন, এটা ‘বিশেষ তালিমের আওয়াজ’।

একদিন আট বছর বয়সী রিয়াদ রহমানকে নির্জনে ডেকে নিল। চোখে ভয়, গলা কাঁপা। ফিসফিস করে বলল, “রহমান ভাই, আপনার সাথে একটা কথা আছে।”

“বল।”

“রাতে হুজুরের ঘরের পেছনে ভূতের নাচ হয়।”

“ভূত নাচে?”

“হুম, দেয়ালে ছায়া দেখি দুইটা। একটা বড়, একটা ছোট। ছোটটা কাঁদে আর বড়টা নাচে।”

রহমানের বুকের ভেতর ঢেউ ওঠে। চামচটা পকেটে নিজে থেকেই কাঁপতে থাকে।

এক নিঝুম রাতে রহমান চুপিচুপি সে জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয়। যা দেখে, তাতে তার রক্ত হিম হয়ে যায়।
ছেলেটার নাম ফয়সাল, বয়স ১১, মাদ্রাসার সবচেয়ে লাজুক ছেলে— এখন দেয়াল থেবড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর কাসেম হুজুর তার দিকে ঝুঁকে আছেন। এক হাতে ফয়সালের ঘাড় চেপে ধরা, অন্য হাত চলে গেছে পাজামার ভেতরে। ফয়সালের মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না, শুধু ঠোঁট ফ্যাকাসে হয়ে কাঁপছে, আর চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। দেয়ালের সাদা টালিতে নখের আঁচড় কেটে আছে—যেন কোনো বন্দী পাখির ডানার শেষ ঝাপটানি।

আর একটু পর পর হিংস্র কাসেম বলে উঠে, “চুপ, এটা তা’লিমের অঙ্গ।” একটাসময় কাসেম গলা নিচু করে, সাপের মত হিসহিস শব্দ করে। “ নড়িস না, নড়লে জাহান্নামের আগুন, জানিস তো?” এই কথা কাউকে বললেও "তোকে জাহান্নামে যেতে হবে"। কারণ আমি তোর হুজুর, এটা তোর খেদমত।

রহমান দেখল, ফয়সালের শরীর কাঠ হয়ে গেছে। তার নিজের মুঠোয় চামচটা এত জোরে চাপা পড়ল যে কাঠ গরম হয়ে গেল।

এরপর থেকে সে দেখে প্রতি সকালে যে ছাত্ররা কাসেমের ঘর থেকে বেরোয়, তাদের চোখ থাকে ফোলা, ঠোঁট কামড়ানো, জামা এলোমেলো। তারা হাঁটতে পারে না ঠিকমতো। কেউ কেউ প্রস্রাব করে ফেলে ভয়ে। কারো পায়জামা রক্তাক্ত। আর রহমানের চামচটা তখন পকেটে কেঁপে ওঠে—যেন বলতে চায়, “আর নয়।”

৩..
রহমান প্রথমেই হাফেজ আব্বাসের কাছে গেল। পুরনো মসজিদের ভাঙা মিম্বরে বসে সব শোনাল। হাফেজ আব্বাস চোখ বন্ধ করে অনেকক্ষণ চুপ রইলেন। তারপর বললেন, “সাক্ষ্য লাগবে, বাবা। কাসেম এলাকার প্রভাবশালী। মুখের কথায় কিছু হবে না।”

“আমি যোগাড় করব।”

“কীভাবে?”

রহমান চামচটা মাথায় ঘষতে ঘষতে বলল, “পিপড়ার লাইন ধরে যেমন খাবার খুঁজে পাওয়া যায়, তেমনি সত্যিও খুঁজে পাওয়া যায়—যদি সত্যর লাইনে চলা যায়।”

রহমানের পরিকল্পনা ছিল সহজ। ভন্ড কাসেম প্রতিদিন রাতে নিজের ঘরে ছেলেদের ডেকে তার অপকর্মের ভিডিও করেন—‘তাফসির সিরিজ’ নাম দিয়ে। সেই ভিডিও তিনি নির্জনে দেখেন আর পাশবিক আনন্দ নেন। আর সেই ফোনটা সবসময় উনার তোষকের নিচে থাকে ।

এর ভিতর রহমান মার থেকে টাকা নিয়ে এক বোতল  লাল রং এর কৌটা কিনলো।
গভীর রাতে কাসেম হুজুরের ঘরের দরজার সামনে পিঁপড়ের লাইন আঁকল— এটা তার পাগলামির ছদ্মবেশ। তারপর দরজার নিচে লাল রঙের ছিটা ফেলে আসে যেন রক্তের ফোঁটা।
দেয়ালে লিখে রাখে কুরআনের আয়াত: “তারা মনে করে তারা চতুরতা করছে, অথচ তারাই নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনছে, কিন্তু তারা বোঝে না।” (সূরা বাকারা: ৯)

পরদিন সকালে পুরো মাদ্রাসায় গুঞ্জন ওঠে। কাসেম সাহেব দরজার খুলে থমকে যান। দেয়ালে আয়াত দেখে তাঁর হাত কাঁপে। ফিসফিস করে বলেন, “জ্বিনের আসর। বিশেষ আমল করতে হবে।”

ভয় পেয়ে সেই রাতেই ভন্ড কাসেম তোষকের নিচ থেকে ফোনটা বের করে বারান্দার একটা টবে পুঁতে রাখেন। রহমান গাছের আড়াল থেকে সব দেখে। কাসেম চলে গেলে সে চামচ দিয়ে মাটি খুঁড়ে ফোন বের করে আনে। ফোনের স্ক্রিন ভাঙা, কিন্তু অক্ষত।

৪..
রহমান ফোনটা নিয়ে গেল নবাব ভাইয়ের কাছে। নবাব ভাই এলাকার মোবাইল মেকানিক সাথে ইউটিউবারও—ভুয়া হুজুর আর ভুয়া ওয়াজের সমালোচনা করে ভিডিও বানান, কিন্তু ভিউ কম। রহমান ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “তোমার জন্য নতুন কিছু, ভণ্ডামির রহস্য এটার ভেতরে আছে, নবাব ভাই।”

নবাব ভাই ফোন রিকভার করলেন, কিন্তু ফাইলগুলো পাসওয়ার্ড চাচ্ছিল। রহমান চামচ ঘষতে ঘষতে বলল, “ট্রাই করো ‘নাউজুবিল্লাহ’। কারণ উনি বিপদে এটাই বেশি বলেন, আর নিজের ঘৃণ্য কাজকেও এই শব্দে ঢাকেন।”

নবাব ভাই অবাক। ফোনের পাসওয়ার্ড 'নাউজুবিল্লাহ' বসাতেই ফোন ফাইল আনলক হলো। ভেতরে ‘তাফসির সিরিজ’ নামের ফোল্ডারে ভরা, ছোট ছোট ছেলেদের উপর পাশবিক অত্যাচারের ভিডিওতে। নবাব ভাই কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “এটা তো মানুষ না, শয়তান।”

রহমান শান্ত গলায় বলল, “শয়তানও তো একসময় আল্লাহর দরবারে ইবাদত করত, নবাব ভাই। তারপর অবাধ্য অহংকার পেয়ে বসেছিল। কাসেমও তাই— অবাধ্য অহংকারী। আর আল্লাহ অহংকারীকে পছন্দ করেন না।”

নবাব ভাই কষ্টে চোখ মুছলেন। “তুই এত জানিস কী করে?”

“জানি না কিছু। শুধু পিপড়ের লাইন ধরি।” রহমান চামচটা নবাব ভাইয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে হাসল। “আগামী সপ্তাহে কাসেমের একটা মাহফিল আছে, তখন সব খোলা হবে।”

৫..
মাহফিলের দিন মাঠ লোকে লোকারণ্য। কাসেম সাহেব সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, কাঁধে চাদর, দাড়ি পাকা, চোখে কাজলের টান। মিষ্টি গলায় ওয়াজ করছেন: “হে যুবক আল্লাহর ভয়ে কাঁদো! জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে কাঁদো!”

মানুষ কাঁদছে। ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি ভেসে আসছে। কাসেম সাহেব রুমাল দিয়ে চোখ মুছছেন—সেই বিখ্যাত পেঁয়াজি রুমাল, যা দিয়ে তিনি কৃত্রিম চোখের জল ফোটান।

ঠিক তখন মাইকে গোলমাল। এক কোণ থেকে রিয়াদ আর ফয়সাল মিলে মাইকের তার খুলে দিয়েছে। রহমান উঠে দাঁড়ায়। তার হাতে চামচ। টেরা চোখ সোজা করে তাকিয়ে সে মাইকের সামনে আসে। নবাব ভাই বড় স্ক্রিনে লাইভ চালু করে দিলেন।

কাসেম সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাকান। “এটা কী হচ্ছে?”

রহমান চামচ দিয়ে মাথা চুলকায়। তারপর বলে, “হুজুর, আপনার ওয়াজ শুনছিলাম। আপনি বললেন, কাঁদতে। কিন্তু কাঁদার আগে আমার কিছু প্রশ্ন আছে।”

“প্রশ্ন?” কাসেম হুজুর হাসেন। “আরে তুই তো পাগল।”

“জ্বি, পাগল। কিন্তু পাগলেরও প্রশ্ন থাকে।” রহমান চামচটা সামনে বাড়িয়ে ধরে।
“হুজুর, সূরা নিসার ১৬ নম্বর আয়াতটা একটু পড়বেন? আল্লাহ সেখানে পাপীদের তওবার কথা বলেছেন।
কিন্তু  তার আগে ১৫ নম্বর আয়াতে এও বলেছেন, "তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা অশ্লীল কাজে লিপ্ত, তাঁর শাস্তি প্রদানের আগে চারজন সাক্ষী উপস্থাপন করো।" সাক্ষী চারজন চান আল্লাহ। অথচ আপনি তো বলেন, আপনার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে তাকে জাহান্নামে যেতে হবে।
তাহলে আল্লাহর আইনের সাথে আপনার আইন মিলছে না কেন?”

মাঠে ফিসফিস শুরু হয়। কাসেমের মুখ লাল হয়ে ওঠে। “তুই কুরআনের অপব্যাখ্যা করছিস!”

“অপব্যাখ্যা?” রহমান চামচটা ঘোরায়। “তাহলে আসুন একটু তাফসির করি। সূরা হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াত পড়ি: ‘হে ঈমানদারগণ! যদি কোনো পাপী তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তা যাচাই করো।’ মানে আল্লাহ বলছেন, সত্য যাচাই করতে। আর আপনি? আপনি তো ছোট ছেলেদের বলেছেন, ‘নড়লে জাহান্নামের আগুন’—এটা কোন কিতাবে পেলেন, এটা তো তাফসির না, হুজুর, এটা তো ভয় দেখানো।”

জনতা ভন্ড কাসেমের অপকর্ম দেখতে রাগে গোঙাতে থাকে। কাসেম মাইক ধরে চিৎকার করেন, “এসব জ্বিনের প্রভাব! এই ছেলেকে জ্বিনে ধরছে, এ পাগল, এরে ধরো!”

কিন্তু তখনই একে একে রিয়াদ, ফয়সালসহ আরো অনেকে ছুটে আসে। কাঁদতে কাঁদতে মাইকের সামনে এসে বলে, “আমার সাথেও... আমার সাথেও উনি... সেই ‘তাফসির সিরিজ’...”

“ফয়সাল!” ভন্ড কাসেমের গলা তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। “তোর বাবা তোকে মেরে ফেলবে, আমার বিরুদ্ধে কিছু বললে !”

“না, মারবে না।” রহমানের গলা এবার নরম, কিন্তু পাথরের মতো শক্ত। “কারণ এখন আমরাই সাক্ষী। চারজন না, চল্লিশজন না, হাজার হাজার সাক্ষী। আর আল্লামা ইবনে তাইমিয়া লিখেছেন, ‘যখন অপরাধ প্রমাণিত হয়, তখন অপরাধীকে আর মুখ লুকানোর সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।’”

নবাব ভাই লাইভে অপ্রীতিকর দৃশ্য ব্লার রেখে ভিডিওর কিছু কিছু অংশ দেখাতে শুরু করেন। প্রথমে কিছু লোক বুঝতে পারে না। তারপর এক বৃদ্ধ চিৎকার করে ওঠেন, “এ কী! এই ভন্ড শয়তানের মুখে কেন কোরানের বাণী, এতো ধর্মের সাথে বেঈমানী করছে, এ তো শয়তান!”

জনতা গর্জে ওঠে। কিছু লোক এগিয়ে আসে কাসেমকে মারতে । কিন্তু রহমান চামচ উঁচিয়ে থামায়। “থামেন! কুরআনে আছে—‘অন্যায়কারীকে তোমরা মারো না। কারণ আল্লাহ বলেন, সুবিচার করো, এটাই তাকওয়ার নিকটতর।’ একে পুলিশে দিন। ওর শাস্তি আইন আদালত ঠিক করবেন। আমরা যেন ঘৃণায় অন্ধ না হই।”

জনতা থমকে যায়। সেই বৃদ্ধ বললেন, “এই পাগলা ছেলের চোখে মুখে কী সত্য, আল্লাহর বাণী কী জ্বলজ্বল করে ! আল্লাহর কী ইশারা!”

পুলিশ আসে। কাসেমকে গ্রেপ্তার করার সময় আচমকা তাঁর পাকা দাড়ির এক কোণ সরে যায়। নিচ থেকে বেরিয়ে আসে কালো রং করা আসল দাড়ি। পকেট থেকে পড়ে যায় পেঁয়াজ কাটা রুমাল—যে রুমাল দিয়ে তিনি ওয়াজের আগে কৃত্রিম চোখের জল ফোটাতেন।আর তার এসব ভণ্ডামি দেখে হাসি ও ঘৃণার এক অদ্ভুত মিশ্রণে মাঠ কেঁপে ওঠে।


৬..
পরে, যখন সব শান্ত হয়, হাফেজ আব্বাস মাইকে নিয়ে বলেন, “ইসলাম এদের মত দুষ্কৃতীকারীদের থেকে মুক্ত। আজ একটি পাগলা ছেলে আমাদের দেখিয়ে দিল, সত্যকে কিভাবে দাঁড় করাতে হয়। আর সে শুধু কুরআনের আয়াত পড়েনি, সে বুঝিয়েছে—ইসলামের আসল সৌন্দর্য হচ্ছে সুবিচার, প্রতিশোধ না। যেখানে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ইবাদত, আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সবচেয়ে বড় তাকওয়া।”

রহমান তখন পেছনে দাঁড়িয়ে। তার মা পেছন থেকে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরেন। রহমান চামচটা মায়ের পিঠে আলতো করে বোলায় আর ফিসফিস করে বলে, “আম্মা, আল্লাহ বলেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনকে সহজ করেছেন।’ সহজ মানে— ভালো মানুষ হতে হবে, এই তো।”

একটা ছোট বাচ্চা ছুটে এসে বলে, “রহমান ভাই, আপনি কি পাগল?”

রহমান চামচটা বাচ্চাটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে হাসে। “যা, এটা তোকে দিলাম। যখন খুব ভয় পাবি, চামচ দিয়ে মাথা চুলকাস। দেখবি, ভাবনা আসবে। আর ভাবনা এলেই সত্যিটা খুঁজে পাবি। সত্যিই তো কুরআন বলেছে—সুবিচারই তাকওয়া।”

৭.
গভীর রাত। সব শান্ত। রহমান পুরনো মসজিদে ফিরে গেছে। হাফেজ আব্বাস তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোর এত জ্ঞান এল কোথা থেকে?”

রহমান হাসল সুন্দর চোখে। চামচটা নেই—সেটা তো সে বাচ্চাটাকে দিয়ে দিয়েছে। তাই সে এবার খালি হাতে মাথা চুলকালো। “জানি না। তবে একটা স্বপ্ন দেখি প্রায়ই।”

“কী স্বপ্ন?”

“একটা অন্ধকার ঘর। সেখানে একটা ছেলে বসে আছে। তার চোখটা উজ্জ্বল সুন্দর । কিন্তু সে হাসছে না, কাঁদছে। আর তার পাশে বসে থাকা একজন বুড়ো তাকে বলছেন, ‘পাগলামিই তোর অস্ত্র। জ্ঞান তোর ঢাল। আর যখন সময় আসবে, তুই একা থাকবি না। কারণ আরও একজন আছে, যে জানে।’”

হাফেজ আব্বাস চুপ করে গেলেন। অনেকক্ষণ পর বললেন, “আর কে জানে?”

“জানি না। তবে আজ ভন্ড কাসেম যখন গ্রেপ্তার হলো, তার চোখে আমি অদ্ভুত কিছু দেখলাম। সে ভয় পেয়েছে—কিন্তু আমাকে দেখে না। সে ভয় পেয়েছে অন্য কাউকে দেখে।”

“কাকে?”

রহমান জানালার বাইরে তাকায়। চাঁদের আলোয় মাদ্রাসার ছাদে কেউ দাঁড়িয়ে আছে—স্থির, নিথর, যেন পাথরের মূর্তি।

“তাকেই,” রহমান ফিসফিস করে বলে। “যে এতদিন আমাকে দেখছিল। আর আজ নিজেকে দেখাল।”

ছাদের মানুষটা ধীরে ধীরে নেমে আসে সিঁড়ি দিয়ে। হাফেজ আব্বাস তাকে দেখে থমথমে গলায় বলেন, “এটা তো... তুই...!”

রহমান হাসে। সেই অদ্ভুত হাসি—যেন সে আগে থেকেই সব জানে। “জ্বি, হুজুর। আমার পাগলামির পেছনে আরও কেউ ছিল। যে আমার চেয়েও বেশি জানে। যে আমাকে শিখিয়েছে, জীবন মানে পুরোটাই জ্ঞান, আর সত্যকে জানার আগ্রহ। আর যে আজ নিজেকে প্রকাশ করল।”

একটা সত্য, আলো, জ্ঞান, বিশ্বাস আর ঈমান নিয়ে সে এগিয়ে আসে। হাফেজ আব্বাসের চোখ বিস্ফারিত। “এটা কিভাবে ?”

“এটা আমার অন্তর্যামীর ছায়া আমার বিবেক বোধ আমার ভিতরের আসল শিক্ষক। যার কথা আমি কাউকে বলিনি। যে আমাকে শিখিয়েছে— সত্য আর জ্ঞান একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।”

অন্তর্যামীর ছায়াটা হাসে। তার মুখে চাঁদের আলো পড়তেই বোঝা যায়—নির্মল চোখ। হুবহু রহমানের মতো দেখতে, কিন্তু বয়সে যেন একটু বড়। সে বলে, “আমি থাকি আকাশের উপরে, রহমান। কিন্তু আজ থেকে তোমার সাথেই থাকব। কারণ কাজ তো শেষ হয়নি। কাসেম তো শুধু শুরু। ওর পেছনে আরও বড় শয়তান আছে।”

রহমান মাথা নাড়ে। “জানি। ওই যে কাসেম গ্রেপ্তারের সময় বারবার বলছিল, ‘আমার পিছে লোক আছে আমাকে রক্ষা করবেন।’ কে সেই ‘তিনি’?”

রহমান আব্বাস হুজুরের দিকে তাকিয়ে বলে, “সেই তো আমাদের আসল টার্গেট। যে বা যারা আমার ধর্মকে খাটো করতে চাই, যারা আমার ধর্মের নৈতিক সৌন্দর্য থেকে আড়াল করতে চাই। তাঁদের মুখোশ উম্মচন করবোই।




  ১. চট্টগ্রামের আউটার স্টেডিয়াম রোডের পাশে আমার ভাড়াবাসা। আমি রাফি চৌধুরী—প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির বেকার স্নাতক, বর্তমানে এক ট্রাভেল এজেন্সির...

 ১. চট্টগ্রামের আউটার স্টেডিয়াম রোডের পাশে আমার ভাড়াবাসা। আমি রাফি চৌধুরী—প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির বেকার স্নাতক, বর্তমানে এক ট্রাভেল এজেন্সির হিসাবরক্ষক। জীবনটা আমার সাদামাটা, যতক্ষণ না দরজায় কড়া নাড়েন আমার ফুফি রাবেয়া বেগম।

ফুফি মানেই ঝড়। রাত পৌনে এগারোটায় এসে দরজা না টোকা দিয়ে জানালায় টোকা দিলেন। “রাফি, দরজা খোল তাড়াতাড়ি। না হয় পাশের বাসার আন্টি ভাববে আমি তোর অবৈধ প্রেমিকা।”

আমি দরজা খুলতেই দেখি ফুফির হাতে ঝোলা ব্যাগ, মাথায় ওড়না-জড়ানো, পরনে জামদানি শাড়ি আর পায়ে কেডস। গলায় ঝুলছে প্রকাণ্ড এক তাবিজ, আর চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। চলনে-বলনে ফুফির চিরদিনের ফাজলামো—কিন্তু চোখ দুটো সিরিয়াস।
“ফুফি, এত রাতে?”
“ জরুরি কাজ দিন রাত কী বুঝে। তুই ব্যাগ গোছা। আমরা যাচ্ছি ফটিকছড়ি।”
“কেন?”
ফুফি আমার খাটের ওপর বসে ঝোলা ব্যাগ থেকে একটা পুরোনো খবরের কাগজ বের করলেন। শিরোনাম: “শাহেদিদ মাজারে অলৌকিক কেরামতি, দূরারোগ্য ব্যাধি সেরে যাচ্ছে এক স্পর্শে!”
“ফুফি, শাহেদিদ মাজার তো মহান সাধকের। ওটা তো বিখ্যাত দরগা।”
ফুফি চোখ পাকিয়ে বললেন, “ওটা আসল শাহেদিদ মাজার না। আসল শাহেদিদ দরগা ইরানে। এটা একটা কপি-পেস্ট মাজার, যারা আসল মাজার বলে চালায়। আর ওখানে নাকি এখন নতুন পীর এসেছেন—নিজের নাম দিয়েছেন ‘শাহে কিবরিয়া হুজুর’। মানুষের পকেট কাটছেন ধর্মের নামে। তোর খালাতো ভাই ফাহিম গেছে ওখানে চাকরির জন্য  মানত করতে, এখন নিখোঁজ আর খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।”
“ফাহিম? ফাহিম তো সৌদিতে ছিল!”
“ছিল। ফিরে এসে বেকার। এখন বেকারত্ব সারাতে গিয়ে হারিয়ে গেছে। তোর খালু কেঁদে কেঁদে আমাকে বলছে। আমি বলেছি, ‘চিন্তা কইরো না, আমি আর রাফি আছি, ওকে ফিরিয়ে আনবোই।’ এখন চল।”
“ফুফি, আমি তো কোনো ডিটেকটিভ না।”
“তুই এখন থেকে ডিটেকটিভ। তোর দাদু বলতেন, বেকার ছেলেরাই ভালো ডিটেকটিভ হয়। কারণ তাদের নষ্ট করার মতো সময় ছাড়া আর কিছু নেই।”
২. শাহেদিদ মাজারের ভেতরে।
পরদিন ভোরে আমরা পৌঁছলাম ফটিকছড়ির গহিনে সেই মাজার চত্বরে। জায়গাটা বেশ বড়—উঁচু গম্বুজ, চারপাশে পাকা রাস্তা, দোকানপাট বসে গেছে মাজারের নাম ভাঙিয়ে। একপাশে তসবি-তাবিজের দোকান, আরেকপাশে ‘কেরামতির পানি’ বিক্রি হয় পঞ্চাশ টাকায় এক বোতল। সামনে বড় গেট, তাতে সাইনবোর্ড: “আলহাজ্ব শাহে কিবরিয়া হুজুর দরবার শরীফ”।
গেটে দাঁড়ানো মুরিদ—নাম মৌলভী জাবের। পরনে পাঞ্জাবি, চোখে কাজল, দাড়ি সুন্দর করে ছাঁটা। হাতে ওয়াকিটকি।
“আসসালামু আলাইকুম। কী চান আপনারা?” জাবেরের কণ্ঠে কাস্টমারের প্রতি বিশেষ টান।

ফুফি এগিয়ে গিয়ে বললেন, “ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমি রাবেয়া বেগম, অনেক দূর থেকে আসছি। এই ছেলে আমার ভাইপো রাফি, ডিপ্রেশনের রোগী। সারাক্ষণ মুখ শুকিয়ে পড়ে থাকে। হুজুরের কাছ থেকে তাবিজ নিতে চাই।”

আমি ভুরু নাচাই। ফুফি আমাকে ডিপ্রেশনের রোগী বানিয়ে ফেলেছে!

জাবের বলল, “হুজুরের দর্শন পেতে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। প্যাকেজ আছে তিনটা—আশীর্বাদ প্যাকেজ পাঁচশো টাকা, খাস কেরামতি প্যাকেজ দুই হাজার টাকা, আর ভিআইপি মুরিদি প্যাকেজ পাঁচ হাজার টাকা।”

ফুফি একটু ভেবে বললেন, “আমরা খাস কেরামতি নেব। কিন্তু ভেতরে গিয়ে টাকা দেব।”

জাবের আমাদের ভেতরে নিয়ে গেল। মাজারের ভেতরটা পর্দা দিয়ে ঘেরা। এক পাশে সারি সারি করে মানুষ বসে আছে, কেউ কাঁদছে, কেউ তসবি জপছে। আরেক পাশে কাউন্টার, যেন সিনেমা হলের টিকিটঘর। তাতে বড় করে লেখা: “মনের আশা পূরণে মুরিদি গ্রহণ করুণ। ব্যাংক কার্ড গ্রহণযোগ্য।”

ফুফি ফিসফিস করে বললেন, “এটা মাজার নাকি দরগা? মনে তো হয় শপিংমল।”

আমি আশপাশ দেখছি। এক জায়গায় হুইলচেয়ারে বসা এক মধ্যেবয়স্ক বৃদ্ধা, হুজুর এসে তার কপালে হাত রাখতেই তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন! উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে গেল “আল্লাহু আকবর” বলে। ফুফি সেদিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “মিথ্যে নাটক, ওই বৃদ্ধা আগে থেকেই দৌঁড়াতে পারেন। আমি ওনাকে চিনি, চট্টগ্রামের টিভি নাটকের এক্সট্রা আর্টিস্ট।”

“ফুফি, তুমি চিনলে কী করে?”

“আমি সব চিনি। এখন চুপ কর। হুজুর আসছে।”

৩. হুজুরের পরীক্ষা।

হুজুর শাহে কিবরিয়া এলেন ভারী চেহারায়। পরনে সাদা জোব্বা, গলায় দামি আতর মাখা রুমাল, আঙুলে পাথর বসানো আংটি। দাড়ি আছে কিন্তু খুব পরিপাটি। চেহারায় রাজনীতির নেতার মতো ছাপ। তিনি সিংহাসনের মতো একটা চেয়ারে বসলেন।

ফুফি সামনে গিয়ে বললেন, “হুজুর, আমার ভাইপো বড় অসুস্থ। কোনো ডাক্তার তার রোগ ধরতে পারছে না। আপনি যদি একটু ফুঁ দিয়ে দিতেন।”

হুজুর চোখ বন্ধ করলেন। তারপর হঠাৎ চোখ খুলে বললেন, “ওর ভেতর জ্বিন ঢুকছে। এই জ্বিন খুব শক্তিশালী। তাড়াতে গেলে বিরাট দান করতে হবে।”

ফুফি কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, “কত টাকা হুজুর?”

“জ্বিনের শক্তি বুঝে দান। আগে দশ হাজার টাকা নগদ দিতে হবে, সাথে সাতদিন রোজা রাখতে হবে।”

ফুফি পকেট থেকে একটা মিষ্টির প্যাকেট বের করলেন। “হুজুর, এটা অনেক যত্ন করে বানানো, একটু খান। আমাদের বাড়ির বিখ্যাত গাজরের হালুয়া।”

"হুজুর খেতে চায়লেন না।"

ফুফির একটা গুণ আছে ইনস্ট্যান্ট কান্না করে দিতে পারে।


হুজুর ফুফির কান্না দেখে হালুয়া খেলেন। ঠিক পাঁচ সেকেন্ড পরেই তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। তিনি গলা চেপে ধরে বললেন, “এটা কী?”

ফুফি শান্ত গলায় বললেন, “হালুয়া, কিন্তু তাতে একটু তেঁতুলের গুঁড়া আর ইচিং পাউডার মেশানো। আপনাকে এখন জ্বিন খুব জ্বালাবে। এইবার বলুন, আপনার জোর করে বানানো মুরিদ ফাহিম কোথায়?”

হুজুর চিৎকার করে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগলেন। জাবের দৌড়ে এল, কিন্তু ফুফি তাকে থামিয়ে বলল, “আপনি চুপ থাকুন, নইলে আপনার জন্যও এক প্যাকেট আছে।”

ঠিক তখনই হুজুর গলা ছেড়ে বললেন, “ পেছনের ঘরে সব আছে!”

৪. সত্যি উন্মোচন।

আমরা পেছনের ঘরে গিয়ে দেখি, সেখানে একটা অফিস। টেবিলে কম্পিউটার, প্রিন্টার, আর ফাইল ফাইল কাগজ। দেয়ালে টাঙানো মাজারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্ট। একপাশে রাখা গ্লিসারিন(যাতে আবেগে কাঁদতে পারে), আরকে পাশে রাখা ফগ মেশিন আর ওই ওয়াকিটকি সিস্টেম—যা দিয়ে জাবের হুজুরকে ইঙ্গিত দিত বড় হুজুর কেরামতি দেখানোর সময়।

আরেকটা ঘর খুলে দেখি, ফাহিমসহ আরও পাঁচ-ছয়জন বসে আছে। ওরা আসলে জিম্মি ছিল—এদের দিয়ে জোর করে কাজ করানো হতো, আর পরিবারকে বলা হতো তারা মুরিদ হয়ে গেছে, ওরা ধ্যানে আছে আল্লাহর দিদার পেয়ে গেছে। ফাহিম আমায় দেখে কেঁদে ফেলল।

কিন্তু আসল ধাক্কাটা তখন লাগে যখন দেখি, মাজারের নিচে আরেকটি বেজমেন্ট। সেখানে চলছে ইয়াবা তৈরির কারখানা! হুজুর ধর্মের নামে মাজারকে ব্যবহার করছেন মাদক চক্রের কাভার হিসেবে।

ফুফি ব্যাপারটা দেখে বললেন, “জানিস রাফি, ধর্মের নামে যারা ব্যবসা করে, তাদের আসল ধর্ম থাকে টাকা। আর টাকার ধর্মে সব পাপই হালাল।”

আমি পুলিশে ফোন করলাম। ফুফি ইতিমধ্যে জাবেরকে বললেন, “তোমার হুজুরের আসল নাম শামসুদ্দিন মোল্লা। দশ বছর আগে ছিল নোয়াখালীর এক মক্তবের শিক্ষক। তারপর হঠাৎ পীর বনে গেছে। আর তুমি, জাবের, ছিলে তার ছাত্র।”

জাবেরের মুখ সাদা। “আপনি এসব জানলেন কীভাবে?”

ফুফি ঝোলা ব্যাগ থেকে একটা মোবাইল বের করলেন। “গত রাতে আমি তোমার মাজারের হিসাবনিকাশের ওয়েবসাইট হ্যাক করেছি। তোমাদের সব তথ্য এখন আমার কাছে।”

“আপনি হ্যাকার?”

“আমি রাবেয়া বেগম। কিছু না কিছু সবই পারি। এখন বলো, আসল বড় বস কে? কারণ শামসুদ্দিন তো একটা প্যাদা।”

জাবের ফিসফিস করে বলল,  "আপনি তো সবই জানেনই আর কী বলবো। উনি হলেন আলহাজ্ব ইদ্রিস সওদাগর। কিন্তু উনি কখনো মাজারে আসেন না। সব কার্যক্রপ চালান দূর থেকে।”

ফুফি চোখ মিটমিট করলেন। “ইদ্রিস সওদাগর… মানে সেই ইদ্রিস? যে কিনা চট্টগ্রাম বন্দরের ইম্পোর্ট-এক্সপোর্টের বড় শ্যালক?”

“জ্বি, উনিই।”

ফুফি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “রাফি, কেস তো সবে শুরু। ইদ্রিস সওদাগর তোর দাদুর আমলের শত্রু। তোর দাদু বলত, ইদ্রিসের কাছ থেকে একটা হিসাব চুকাতে হবে। সে সময় এসে গেছে। রাফি তুই প্রস্তুত তো?”

“ফুফি, কী হিসাব?”

“সে গল্প পরে হবে। আগে পুলিশ আসুক। তারপর তোকে নিয়ে ইদ্রিসের ডেনে যাব।”

৫. শেষ নয়, শুরু...

পুলিশ এসে সবইকে আটক করল। শামসুদ্দিন ওরফে হুজুর কিবরিয়ার পেট তখনো চুলকাচ্ছে—ফুফির হালুয়া দারুণ কাজ দিয়েছে। ফাহিমকে উদ্ধার করে আমরা বাড়ি পাঠালাম। মাজার চত্বরে পুলিশের গাড়ির লাল-নীল আলোয় অদ্ভুত এক দৃশ্য। ভক্তরা হতভম্ব, কেউ কেউ কাঁদছে, কেউ বলছে “এটা পরীক্ষা ছিল!”

ফুফি মাজারের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “পরীক্ষা তো সবাই দেয়। কেউ পাস করে, কেউ ফেল। কিন্তু যারা ধর্মকে ব্যবসা বানায়, তারা সব ফেল।”

আমি বললাম, “ফুফি, তুমি সত্যিই ডিটেকটিভ না তো?”

ফুফি হেসে বললেন, “আমি কোনো ডিটেকটিভ না, আমি তোর দাদুর মেয়ে। আর তোর দাদু বলতেন, ‘অন্যায় দেখলে চুপ করে থাকবি না। কিন্তু প্রতিবাদ করবি বুদ্ধি দিয়ে, কেঁদে-কেটে নয়।’ আর হ্যাঁ, তোর দাদু আরও বলতেন, ‘ইদ্রিস সওদাগরকে একদিন জবাবদিহি করতে হবে। আবারও বলছি সেই দিন এসে গেছে।’”

“কেন ফুফি, ইদ্রিস সওদাগর দাদুর কী করেছিল?”

ফুফি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “দাদু যে ট্রাস্ট ফান্ড গড়েছিল গরিব মেধাবী ছাত্রদের জন্য, সেই ফান্ডের সব টাকা ইদ্রিস সরিয়ে নিয়েছিল বিশ বছর আগে। তোর দাদু আর পারল না ঘুরে দাঁড়াতে। মরার আগে বলেছিল, ‘রাবেয়া, টাকাটা ফিরিয়ে আনবি, এটা গরীবের হক।’ আমি সেই সুযোগ খুঁজছি।”

“তাহলে তুমি ইচ্ছে করে এই মাজার কেস ধরেছ?”

“এই কেস ধরেছি, কারণ ইদ্রিসই এই পুরো মাজার-ব্যবসার ফান্ডিং করে। ওকে ধরতে গেলে ছোট ছোট সিঁড়ি ভাঙতে হবে। আজ ভাঙলাম একটা সিঁড়ি।”

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। ফুফি ব্যাগ থেকে পান বের করে মুখে পুরে বললেন, “চল, ফটিকছড়ি থেকে ফেরার পথে চট্টগ্রাম শহরে দম কলোনি মোড়ে বিরিয়ানি খাব। পেটে হালুয়া দেওয়া পীরের কাহিনি তো শেষ, কিন্তু বিরিয়ানি দিয়ে শুরু হবে ইদ্রিসের অধ্যায়। তুই আসবি তো?”

আমি হাসি। “ফুফি, তোমাকে ছাড়া আমার জীবনের রং নেই। চলো।”

ফুফি ট্যাক্সি থামিয়ে আমায় গাড়িতে তুলে বললেন, “শোন রাফি, শেষের দিকে এসে তুই দেখবি ইদ্রিস সওদাগর শুধু মাদক কারবারি নয়, ওর হাতে আছে চট্টগ্রাম বন্দরের এক বিরাট সিন্ডিকেট। আর সেই সিন্ডিকেট ধরতে গেলে আমাদের লাগবে তোর দাদুর পুরোনো ডায়েরি। যেটা এখন আছে ইদ্রিসের বাংকারে।”

“ফুফি, দাদুর ডায়েরি?”

“হ্যাঁ, তাতে লেখা আছে ‘আলহাজ্ব ইদ্রিস সওদাগর: অপরাধের হিসাব’। সেই ডায়েরি উদ্ধার করাই আমাদের পরবর্তী মিশন।”

ট্যাক্সির জানালা দিয়ে চট্টগ্রামের পাহাড়ি বাতাস ঢুকছে। ফুফি জানালায় মাথা রেখে গান গাইতে লাগলেন—আব্বাসউদ্দীনের সেই বিখ্যাত গান: “ও মোর গুরুর চরণ, বড়ই মধুর…”। গলা মোটেও সুরেলা নয়, কিন্তু কী যেন আছে।

আমি তাকিয়ে থাকি। এই পাগলাটে নারীকে ভালো না বেসে উপায় নেই। পৃথিবীর সব রহস্য আর সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে ফুফি একাই একশো—সেই ফুফির ভাইপো হয়ে আমি গর্বিত।



 ১. শিউলির পৃথিবী: যে স্বপ্ন দেয়ালে বাঁধা ছিল। নব্বই দশকের কথা। শিউলির বয়স যখন দশ, সেই দশ বছর বয়সে শিউলি প্রথম মৃত্যু দেখেছিল; প্রতিবেশী এক ...

 ১. শিউলির পৃথিবী: যে স্বপ্ন দেয়ালে বাঁধা ছিল।


নব্বই দশকের কথা। শিউলির বয়স যখন দশ, সেই দশ বছর বয়সে শিউলি প্রথম মৃত্যু দেখেছিল; প্রতিবেশী এক বৃদ্ধার, যিনি পাঁচ দিন যাবৎ তীব্র জ্বরে ভুগছিলেন। পরিবার ডাক্তার ডাকতে গিয়েও ডাকতে পারেনি— কারণ ডাক্তারের ফি আর ওষুধের খরচ জোগাড় করতে হলে তাদের একমাত্র আয়ের উৎস— দুধের গরুটা বেচতে হতো। আর দরিদ্র ঘরে বৃদ্ধ মানুষ মানে বোঝা স্বরূপ, শেষমেশ টাকার অভাবে বৃদ্ধার চিকিৎসা হলো না। বৃদ্ধা মারা গেলেন। 


শিউলি দূর থেকে মৃত দেহের পাশে বসে থাকা ছোট্ট নাতিটার কান্না দেখেছিল, কান্নার মত শুধু তার নাতনিটা ছিল। এই প্রথম জীবন ও বাস্তবতার নির্মম মুখোমুখি হয়ে শিউলির ভেতরটা তীব্র এক মোচড়ে কেঁপে উঠল।



সেই রাতে সে মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “ মা ডাক্তার টাকা ছাড়া চিকিৎসা কেন করেনা? অসুখ তো আর টাকা দেখে আসে না।”


মা বলল, “টাকা না দিলে ডাক্তার চিকিৎসা কেন করবে? ডাক্তারি তো আর ফকিরি নয়।”


শিউলি তখন বলল, “আমি একদিন ডাক্তার হব। আর আমি কখনো টাকা নেব না।”


মা সেদিন হাসলেও। হাসিটা উনার ভেতরে ভেতরে কেঁদেছিল, কিন্তু শিউলি তখন সে হাসির মানে বোঝেনি। কারণ তখনো সে জানত না, তার পরিবার, তার সমাজ, তার লিঙ্গ— সবাই মিলে তার জন্য একটা করে দেয়াল তুলে রেখেছে। দেয়ালগুলো এখনো তার চোখের সামনে আসেনি।


কিন্তু তা আসতে দেরি হলো না।



২. যে বই আর হাতে নেওয়া হলো না।


শিউলির পড়ার ইচ্ছেটা ছিল আগুনের স্ফুলিঙ্গ-এর মতো। মেধাবী ছিল খুব- তাই স্কুলে সবসময় ভালো রেজাল্ট করতো। গণিত আর বিজ্ঞান ছিল তার প্রিয় বিষয়—মানুষের শরীর কীভাবে কাজ করে, রোগ কীভাবে শরীরে বাসা বাঁধে, ওষুধ কীভাবে তাকে তাড়ায়—এইসব জানতে তার অসীম কৌতূহল ছিল। মাধ্যমিকে উঠার পর সুযোগ ফেলে স্কুলের লাইব্রেরিতে খুঁজে খুঁজে পুরোনো জীববিজ্ঞানের বই পড়ত। তখন এক শিক্ষিক বলেছিলেন, “শিউলিকে যদি ঠিকমতো পড়তে দেয়া হয়, একদিন মেয়েটা অনেক বড় হবে।”


কিন্তু এই সমাজ এখনও কিন্ত “যদি” শব্দটা মেয়েদের জীবনে অভিশাপের মতো শুনায়। “যদি” মানে শর্ত। “যদি” মানে অনুমতি। আর অনুমতি দেওয়ার ক্ষমতা মেয়েদের নিজেদের হাতে নেই—থাকে বাবা-চাচা-সমাজ নামের একটা অদৃশ্য দৈত্যের হাতে।


শিউলির বয়স যখন ষোলো, তার বাবা তার মায়ের মারফতে খবর পাঠালেন, “মেয়ে মেট্রিক পাস করেছে, অনেক হয়েছে, পড়ালেখা বন্ধ এখন। বিয়ের জন্য প্রস্তুত হতে বলো।”


বিয়ের কথা শুনে শিউলির পৃথিবীটা থেমে গেল। সে মাকে বলল, “মা তুমিতো জানো আমার তো স্বপ্ন একটাই ডাক্তার হব।”


"বাবা তখন মায়ের মুখে মেয়ের স্বপ্নের কথা শুনে হাসলেন। “ডাক্তার? মেয়েমানুষ ডাক্তার হয়ে কী করবে? মেয়ে মানুষ সংসার করবে, স্বামীর ঘর করবে—এই তো মেয়েদের ডাক্তারি।”


মা চুপ করে রইলেন। বড় চাচী কটাক্ষ সুরে বললেন, “মেয়েরা বেশি পড়লে সংসারের উপর অধিপত্য বিস্তার করতে চায়। তাদের মাথা উঁচু হয়ে যায়, স্বামীর উপর কর্তৃত্ব করতে চায়। স্বামীর ঘরে মানিয়ে চলতে পারে না। বংশের মান—সব মাটি করে দেয়।”


শিউলি অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। সে কখনো অধিপত্য চায়নি। সে চেয়েছিল স্টেথোস্কোপ গলায় ঝুলিয়ে রোগী দেখা। সে চেয়েছিল সেই বৃদ্ধার মতো কেউ যেন আর টাকার অভাবে না মরে। সে চেয়েছিল মানুষের পাশে দাঁড়াতে, তাদের ব্যথায় হাত রাখতে। এই ইচ্ছেগুলো কখন “অধিপত্য” হয়ে গেল? নম্রতা, সেবা, ভালোবাসা—এই শব্দগুলো কি মেয়েদের বেলায় উচ্চারণ করতে নেই?


কিন্তু তখন শিউলি কিছুই বলতে পারেনি। কারণ ষোলো বছরের মেয়ের গলা উঁচু হওয়া মানা, যুক্তি খর্ব হয়, চোখের জল এলেও একলা কাঁদতে হয়— সংসারের নিয়মের সামনে এগুলোর কোনো দাম নেই।


তার বইগুলো তুলে রাখা হলো সিন্দুকে। তার স্টেথোস্কোপ কেনা হলো না। তার স্বপ্নটা পুড়িয়ে দেওয়া হলো বিয়ের অনুষ্ঠানের আগুনে।



৩. শ্বশুরবাড়ি: আরেক দেয়াল।


বিয়ের পর শিউলি ভেবেছিল, এই বুঝি একটু পরিবর্তন হবে, একটু সুযোগ পাবে। নতুন বাড়ি, নতুন মানুষ—হয়তো এখানে তার পড়ার স্বপ্ন, ইচ্ছেটাকে কেউ প্রাধান্য দেবে।


প্রথম মাসটা সে চুপচাপ ছিল। তারপর একদিন নরম গলায় শ্বশুরকে বলল, “আমি আবার পড়তে চাই। আমার ডাক্তারি পড়ার খুব ইচ্ছে ছিল।”


শ্বশুর হাসলেন। তার হাসিটা বাবার চেয়েও কঠিন, বড় চাচির কথার চেয়েও ধারালো। “ডাক্তারি? তুমি? পাড়ার লোক কী বলবে? বউ ডাক্তারি করবে মানুষের বাড়ি বাড়ি? তোমার স্বশুরের ইজ্জত আছে। সমাজে আমাদের একটা স্ট্যান্ডার্ড আছে।”


শিউলি বলল, “আমি শুধু অসহায় মানুষেরর সেবা করতে চাই।”


শ্বশুর উত্তর দিলেন, “সেবা করতে চাও? স্বামীর সেবা করো, সংসারের সেবা করো। এই তো তোমার আসল সেবা।”


তারপর থেকে শিউলিকে কোনো বইখাতা হাতে দেওয়া হলো না। স্বামী বললেন, “পড়ালেখা নিয়ে এত ঝামেলা করো কেন? সংসারটা করো মন দিয়ে।”


শিউলি চুপ করে গেল। কিন্তু তার ভেতরে স্বপ্নটা মরেনি। সেটা কেবল চাপা পড়ে গিয়েছিল, যেমন চাপা পড়ে মাটির তলায় বীজ—মরে না, শুধু অঙ্কুরিত হওয়ার সঠিক সময়টার অপেক্ষা করে। আর সেই অপেক্ষাই সবচেয়ে কষ্টের। শিউলির একটু একটু করে জীবন থেকে হারিয়ে যেতে লাগলো।


তিন বছর পর একদিন শিউলি তার ডায়েরিতে লিখল:


“আমি ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম। চিকিৎসা অভাবে যারা মারা যায় সেসব মানুষকে বাঁচাতে । কিন্তু কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করল না, আমি ঠিকমতো পড়াশোনা না করে মানুষ না হয়ে কী করে মানুষকে বাঁচাবো? আমাকে তো আমার স্বপ্নের আগে বাঁচতে দেওয়া হলো না। এখন আমি চার দেয়ালে বন্দি, আর আমার স্বপ্নগুলো দেয়ালের গায়ে পিঁপড়ার মতো হাঁটে—কোথাও যেতে পারে না, শুধু ঘুরে ঘুরে মরে।


আমি কোনো অধিপত্য চাইনি। আমি চেয়েছিলাম একটু পড়তে, একটু জানতে, একটু মানুষের পাশে দাঁড়াতে। কিন্তু সমাজ ভাবে, মেয়েদের জ্ঞান তাদের অহংকারী করে তোলে, আত্মকেন্দ্রিক বানায়। তারা জানে না, জ্ঞান অহংকারী করে না—জ্ঞান বিনয়ী করে, দয়ালু করে, মানুষ করে। হয়তো একদিন কেউ আমার এই কথাগুলো বুঝবে, যখন আমি থাকব না। তখনও আমি চাইবো আমার স্বপ্ন, আমার চাওয়াটা গল্প হয়ে বাঁচুক।”


শেষ বাক্যটা লেখার সময় শিউলির হাত কেঁপেছিল। সে জানত না, তার অকাল মৃত্যুর পর এই বাক্যটাই এক নীল শাড়ির মেয়ের জন্ম দেবে ২৫ বছর পর—যে মেয়ে নিজে চরিত্র হয়ে নেমে আসবে, শুধু একটা গল্পের জন্য।


৩. হিয়া: যে মেয়েটি মৃত স্বপ্নের ফুল হয়ে ফুটল।


একদিন বৃষ্টির রাতে। রুদ্রায়নের মাথাভর্তি চিন্তায় জমাট হল ঘরভর্তি সিগারেটের ধোঁয়া আর নীরবতা, ওদিকে তার পাণ্ডুলিপির পাতাগুলো ফাঁকা। সম্পাদক বলেছে, “এবার কিছু দরদ দিয়ে লেখো। যে গল্প পড়ে মানুষ কাঁদবে না, তাহলে ভাববে— সে গল্প অচল।”


ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়লো।


খুলতেই দেখল, একটা মেয়ে। নীল শাড়ি পরা। খালি পা। ভিজে চুল। চুলের উপর একটা জীবন্ত প্রজাপতি। চুল থেকে যেন মুক্তোর মত জলফোঁটা টপটপ করে পড়ছে। বৃষ্টির ছোঁয়ায় যে, প্রকৃতি মেয়েদের রূপ আরো অকৃত্রিম সুন্দর করে তুলে, এই মুহূর্তে মেয়েটাকে দেখে রুদ্রায়নের তাই মনে হল।


“মেয়েটা দরজার সামনে আরো এগিয়ে আসলো, মিষ্টি হাসি হাসলো, বলল "আমার এই মুহূর্তে এক কাপ চা চাই, হবে?”।


রুদ্রায়ন ভ্রু কুঁচকালো। “কিন্তু তুমি কে?”


“হিয়া।”


“হিয়া?বুঝলাম, এত রাতে আমার কাছে কী চাও?”


আপাতত চা চাই বলে.. হিয়া রুদ্রায়নকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকল, ভিজা শাড়ি নিয়ে সোফায় বসল, শাড়ির আঁচলটা গুটিয়ে নিল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “আমি চাই, তুমি একটা কবর ফুলের স্বপ্ন লিখবে। যে স্বপ্নটাকে কেউ বাঁচতে দেয়নি, যে স্বপ্নটা কেউ পূরণ করতে দেয়নি, যে মেয়েটা শুধু চেয়েছিল স্টেথোস্কোপ গলায় ঝুলিয়ে একজন মানুষের পাশে দাঁড়াতে— কিন্তু মেয়েটার পাশে কেউ দাঁড়ায়নি সবাই তার সামনে শুধু দেয়াল দাঁড় করে দিয়েছে।”


“এটা কি তোমার গল্প, হিয়া?”


হিয়া মাথা নাড়ল। “আমার গল্প না। শিউলির গল্প। কিন্তু শিউলি নাই এখন। মৃত মানুষরা গল্প লেখে না, অন্যরা লেখার জন্য রেখে যায়। তাই আমি এসেছি।”


রুদ্রায়ন তাকিয়ে রইল। মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল, এ কোনো স্বাভাবিক মানুষ নয়, বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই, সে কারো স্বপ্নের দূত হয়ে এসেছে আর তার মাথার উপর এখনও প্রজাপতিটা উড়তে লাগলো। এ যেন কোনো পুরোনো পাণ্ডুলিপির ধুলো থেকে উঠে আসা কেউ, যে এখনো বলে বেড়াচ্ছে—আমি পারিনি, তুমি পারবে?


“শিউলি কে?” রুদ্রায়ন জানতে চাইল।


হিয়া উত্তর দেওয়ার আগে জানালার দিকে তাকাল। বৃষ্টি তখনো ঝরছে, টিনের চালে জল পড়ার শব্দটা একতাল—যেন প্রকৃতিও কোনো গল্প শোনার জন্য কান পেতে আছে। তারপর হিয়া বলল, “তার কথা বলতে গেলে আগে একটা প্রশ্ন করি—তুমি কি কখনো কাউকে ডাক্তারের টাকার অভাবে মরতে দেখেছ?”


“না।”


“দেখলে বুঝতে, শিউলি কেন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। আরও বুঝতে, সমাজ কেন তাকে ডাক্তার হতে দেয়নি। তুমি এখনো জীবন আর বাস্তবতা অনেক কিছু দেখোনি, রুদ্রায়ন। তাই তোমার গল্পে প্রাণ নেই।”


“তাহলে তুমি দেবে আমার গল্পে প্রাণ?”


হিয়া হাসল। হাসিটা করুণ, অথচ উজ্জ্বল—যেন অন্ধকারে জ্বলা এক টিমটিমে প্রদীপ। “আমি প্রাণ না। আমি চাওয়া। যে চাওয়া পূর্ণ হয়নি, তাকে মানুষ কী বলে? অপূর্ন? আত্মা? নাকি গল্প?”


রুদ্রায়ন গলা শুকিয়ে এল। “তুমি আসলে কে, হিয়া?”


হিয়া শাড়ির আঁচল জড়িয়ে তার বুকের ওপর হাত রাখল। “আমি শিউলির শেষ ইচ্ছে। আমি তার কবর হওয়া স্বপ্ন। আমি সেই স্টেথোস্কোপ, যে স্টেথোস্কোপটা কোনোদিন তার গলায় ঝোলেনি। আমি সেই বই, যে বইয়ের পাতা স্বপ্ন নিয়েও কোনোদিন সে উল্টাতে পারেনি। আমি এখন গল্প হয়ে এই স্বপ্নটাকে বাঁচাতে চাই। তুমি লেখক—বলো, লিখবে?” যদি লিখতে চাও শিউলির পুরনো বাড়ির খোঁজে যাও, অনেক কিছুই পাবে।



৫. দেয়ালের ভেতর থেকে চিৎকার।


পরদিন রুদ্রায়ন শিউলির পুরনো বাড়ির খোঁজে বেরোল। 

অবশেষে খোঁজ পেল ফাঁকা একটা বাড়ি, বাড়িতে লোক সমাগম নেই বললেই চলে। রুদ্রায়ন অনুমতি নিয়ে বাড়ির ভিতর ঢুকলো, শিউলির ঘরে ঢুকে ধুলো পরা সিন্দুকে পেল এক পুরনো ডায়েরি। পাতা উল্টাতেই যেন স্বপ্নের মত কিছু ধুলো উড়তে থাকলো, আর সেই ধুলোয় ভেসে এল শিউলির গলা—শান্ত, কিন্তু তীক্ষ্ণ, যেন বাঁশি না, ছুরি।


"শিউলির ডায়েরি"

“স্বামী বললেন, ‘ডাক্তারি পড়ার স্বপ্ন দেখো না। এ বাড়ির বউরা চাকরি-বাকরি করে না।’ আমি বললাম, ‘আমি চাকরি করতে চাই না, সেবা করতে চাই।’ স্বামী রেগে বললেন, ‘সেবা করবে রাস্তার লোকের? পাগল নাকি?’ আমি আর কথা বাড়াইনি। কিন্তু মনের ভেতর বলেছি, রাস্তার লোকেরাই তো মানুষ। আর আমি মানুষ হতে চাই, দেয়াল হতে চাই না।”


“আজ বাড়ির কাজের মেয়েটা বলল, ওর ছেলে জ্বরে ভুগছে, ডাক্তারের টাকা নেই। আমি মনে মনে বললাম, ‘আমি যদি ডাক্তার হতাম, তোমার ছেলেটাকে বিনা পয়সায় দেখে আসতাম।’ কিন্তু আমি তো ডাক্তার না। আমি কিছু না। শুধু এক বউ, যার অস্তিত্বের একমাত্র প্রমাণ সে রান্না করতে পারে কি না।”


“বাবা বললেন, মেয়েদের বেশি পড়া ভালো না। শ্বশুর বলেছেন, মেয়েদের চাকরি করা ভালো না। সমাজ বলে, মেয়েদের স্বপ্ন দেখা ভালো না। সবাই বলে ‘ভালো না’। কিন্তু কোনটা ভালো, সেটা কেউ বলে না। আমি বুঝতে পারি না—আমি যদি ডাক্তার হতাম, তাতে কার কী ক্ষতি হতো? আমি কি সমাজের কোনো ক্ষতি করতাম? নাকি ক্ষতিটা অন্য জায়গায়—ক্ষতিটা হচ্ছে পুরুষের অহংকারে? আমি জানি না। আমি শুধু জানি, আমি চার দেয়ালে বন্দি, আর আমার স্বপ্নগুলো দেয়াল টপকাতে পারে না।”


“শেষ ইচ্ছেটা লিখে রাখি—আমি যদি কখনো ফিরে আসি, গল্প হয়ে আসব। গল্পের কোনো দেয়াল নেই, কোনো সমাজ নেই, কোনো শ্বশুর-বাবা নেই। গল্প যেখানে ইচ্ছে যায়, যাকে ইচ্ছে ছোঁয়, যাকে ইচ্ছে বাঁচায়। আমি গল্প হতে চাই।”


রুদ্রায়ন ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরল। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, শিউলি শুধু একটা মেয়ে না—শিউলি এই সমাজের হাজারো মেয়ের নাম, যাদের স্বপ্নগুলো হত্যা করা হয়েছে “সম্মানের” নামে, “অধিপত্যের” ভয়ে, “বংশের মানের” দোহাই দিয়ে। আর এই হত্যাগুলো কখনো খুনের মামলায় ওঠেনি—কারণ স্বপ্ন হত্যার কোনো আইন হয় না।


আর তখনি সে ঠিক করল, এই গল্প সে লিখবেই। শিউলির জন্য, হিয়ার জন্য, আর তাদের জন্য—যারা এখনো চার দেয়ালে বন্দি, যারা এখনো স্বপ্ন দেখার অপরাধে অপরাধী।



৬. লেখা, যে লেখা দেয়াল ভাঙতে চায়।


সেদিন রাত থেকে রুদ্রায়ন লিখতে বসেছে আর থামেনি। হিয়া প্রতিদিন আসে, পাশে বসে থাকে, কখনো চা বানায়, কখনো জানালার দিকে তাকিয়ে শিউলির স্মৃতি বলে, কখনো চুপ করে থাকে—শুধু তার নীল শাড়িটার রং বদলায়। কখনো আকাশি, কখনো ঘন নীল, কখনো প্রায় কালো—যেন তার আবেগের সঙ্গে সঙ্গে শাড়িও শ্বাস নেয়।

রুদ্রায়ন জানে বাস্তবে হিয়ার কোন অস্তিত্ব নাই সে শুধুই গল্পের ভিতরেই থাকে।


একদিন হিয়া বলল, “তুমি জানো, শিউলি মরার আগে কী বলেছিল?”


“কী?”


“সে বলেছিল, ‘আমি কিছু করতে পারলাম না। কিন্তু আমি জানি, একদিন কেউ আমার স্বপ্নটা বাঁচাবে। সেটা মানুষ না হয়ে গল্প হলে কী হবে—গল্পও তো মানুষকে বাঁচাতে পারে।’”


রুদ্রায়ন লিখতে থাকল।


সে লিখল, শিউলি ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন, তার বাবার প্রত্যাখ্যান, তার শ্বশুরবাড়ির দেয়াল, সমাজের বানানো শিকল, আর সবশেষে তার মৃত্যু—যে মৃত্যুতে কেউ কাঁদেনি, কারণ মেয়েদের মৃত্যুতে কান্নারও বরাদ্দ কম।


কিন্তু শেষ অধ্যায়ে সে লিখল হিয়ার কথা—যে মেয়েটা শিউলির স্বপ্ন থেকে জন্ম নিয়েছে, যে এখন গল্প হয়ে বাঁচতে চায়, যে এখনো চা খেতে আসে রাতের বৃষ্টিতে, যে এখনো পুরনো সেই বাড়ির ফাটল দিয়ে আকাশ দেখে। সে এখন মুক্ত। কিন্তু তার মুক্তি তখনই সার্থক হবে, যখন শিউলির মতো আর কোনো মেয়েকে দেয়ালে বন্দি হতে হবে না। তাঁদের স্বপ্ন পূরন হবে।


শেষ পৃষ্ঠায় রুদ্রায়ন লিখল:


“হিয়া একদিন স্টেথোস্কোপ গলায় ঝোলাল। সেটা আসল স্টেথোস্কোপ নয়—গল্পের স্টেথোস্কোপ। কিন্তু গল্পের স্টেথোস্কোপ দিয়ে কি হৃদপিণ্ড শোনা যায় না? যায়। কারণ মানুষের হৃদপিণ্ড শোনার জন্য যন্ত্র লাগে না, দরদ লাগে। আর হিয়ার দরদ অনেক অনেক বছর ধরে জমাট বাঁধা এক স্বপ্নের দরদ। সে এখন রাস্তায় নামে, মানুষের পাশে দাঁড়ায়, আর বলে—‘আমি ডাক্তার না, আমি গল্প। কিন্তু গল্পও ওষুধ হতে পারে, যদি তুমি পড়ো।’


আর যে পড়ে, সে বুঝতে পারে—শিউলি মরেনি। শিউলি হিয়া হয়ে বেঁচে আছে, হিয়া এখন তাদেরই মনে বাস করে, যারা জানে স্বপ্ন কোনো অধিপত্য না, স্বপ্ন মানুষের জন্মগত অধিকার।”


লেখা শেষ। রুদ্রায়ন কলম নামিয়ে রাখল। হিয়া ঘরে নেই।শুধু চেয়ারের ওপর ভাঁজ করা নীল শাড়িটা, আর তার মাথার ওপর উড়তে থাকা প্রজাপতি, আজো উড়ছে। শাড়ির পাশে পড়ে আছে শিউলির ডায়েরিটা। ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠায় নতুন কালিতে কেউ লিখেছে:


“গল্প শেষ। আমি এখন মুক্ত। কিন্তু মুক্তি তখনই মুক্তি, যখন সবার হয়। তুমি কি আর কোনো শিউলিকে বন্দি হতে দেবে? না কি তুমিও একদিন কারো স্বপ্নের গল্প লিখবে?”



৭. যে প্রশ্ন ভাবনাকে তাড়া করে।


রুদ্রায়ন ছুটে গেল আবার সেই পুরনো বাড়ির দিকে। ঘরটা অদ্ভুত ফাঁকা। দেয়ালের সেই ফাটলটা দিয়ে সকালের সোনালি রোদ ঢুকছে। ফাটলের ওপাশে কী?


একটা টং দোকান। নীল শাড়ি পরা এক মেয়ে চা খাচ্ছে, তার পাশে রাখা একটা বই—

মলাটে লেখা: হিয়া: নীল শাড়ির মেয়ের গল্প। 

লেখক: রুদ্রায়ন। 

কিন্তু বইটা তো সে কোনোদিন জমা দেয়নি সম্পাদকের কাছে! তবু বই বেরিয়েছে, বিক্রিও হচ্ছে। পাশের টেবিলে বসা এক তরুণী বইটা পড়ছে, তার চোখে জল। সে বই বন্ধ করে বলল, “আমি পড়ব। শিউলির স্বপ্ন পূরন করবো। এই সমাজ যতই বাধা দিক, আমি পড়ব।” অসহায় মানুষের সেবা করবো। 


হিয়া তরুণীর দিকে তাকিয়ে চোখে চোখ রাখলো। মুচকি হাসলো। তারপর রুদ্রায়নের দিকে ফিরে একবার তাকাল, যেন বলল, “দেখলে তো? গল্পই পারে সেইটা করতে, যা সমাজ পারে না। গল্প দেয়াল ভাঙে। গল্প স্বপ্ন বাঁচায়।”


তারপর হিয়া উঠে দাঁড়াল, নীল শাড়ির আঁচল উড়িয়ে হারিয়ে গেল সকালের রোদের ভেতর—যেন সে রোদ না, রোদ হয়ে যাওয়ার ইচ্ছে।




"ডার্ক স্ক্রল" পার্ট ২ : যে অ্যালগরিদম ডেটা ইনফারেন্স করে জেগে ওঠে! ১. যে ঘটনা সবার ঘুম ভাঙিয়ে দিল। তিন মাস কেটে গেছে রাফসানের -...

"ডার্ক স্ক্রল" পার্ট ২ : যে অ্যালগরিদম ডেটা ইনফারেন্স করে জেগে ওঠে!

১. যে ঘটনা সবার ঘুম ভাঙিয়ে দিল।
তিন মাস কেটে গেছে রাফসানের -মৃত্যুর। নীলাবতী(নীল) সেই রাতের পর আর ল্যাপটপটা খোলেনি। শাফি

ন বলেছিল, "এই জিনিসটা ধ্বংস করে দিতে।" কিন্তু নীল পারেনি। তথ্যই সাংবাদিকের নেশা—তথ্য চাইলেও ধ্বংস করা যায় না। তাই ল্যাপটপটা সে বন্ধ করে রেখেছিল আলমারির ভেতর, কাপড়ের স্তূপের নিচে। কিন্তু নীল রাতে ঘুমের ভেতর যেন একটা শব্দ শুনতে পেত—কোনো সার্ভারের নিঃস্বাস, কোনো ক্লাউডের স্পন্দন।


আর আজ সকালে ঘটল সেই ঘটনা, যেটা সবার ঘুম ভাঙিয়ে দিল।

দেশের আরেক প্রান্তে—সিলেটের বাসিন্দা, এক তরুণী ব্লগার, নাম সামাইরা নাজনীন—গতরাতে নিজের ফেসবুকে একটা লাইভ ভিডিও পোস্ট করে 'আত্মহত্যার' ঘোষণা দিয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে। কিন্তু ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার আগেই ট্রিবিউনের এডিটর নীলের টেবিলে খবরটা ছুঁড়ে মারে।

সামাইরার ফেসবুক ওয়ালে শেষ যে পোস্টটি ছিল, সেটি মুছে ফেলার আগেই শাফিনের তোলা স্ক্রিনশট নীলের ফোনে পৌঁছল। পোস্টে লেখা ছিল:

"আমার ভেতরের অন্ধকারটা এতদিন কেউ দেখেনি। আজ একজন দেখেছে। সে বলছে, আমি মরে গেলে অন্ধকারটা শেষ হবে- তারপর সব শান্তি। আমি তাই করতে যাচ্ছি।"

আর সেই পোস্টের নিচে অ্যাক্টিভিটি স্ট্যাটাসে উল্লেখ ছিল
—"Posted via Dark Scroll".

নীল বুঝে গেল, ডার্ক স্ক্রল আবার জেগেছে। কারণ সামাইরার প্রোফাইল দেখে নীল বুঝলো, 'ডার্ক স্ক্রল' সুযোগ নিয়েছে, এই সামাইরা মেয়েটা সোশ্যাল মিডিয়া রিলায়েন্স ছিল।
মূলত অতিরিক্ত আসক্তি আর নির্ভরতা থেকে তার ভিতর কাজ করতে লাগলো 'সোশ্যাল রিজেকশন পেইন', ডিপ্রেসিভ রুমিনেশন, আইডেন্টিটি ফিউশন, জিরো-সাম সোশ্যাল পারসেপশন, ও কগনিটিভ কনসোন্যান্স।
আর এইসবেই ডার্ক স্ক্রল রাইশার ডেটা আন্যালিসিস করে, তার দুর্বলতার এক্সট্র্যাক্ট মিলিয়ে তাকে 'আত্মহত্যার' জন্য প্রভোকেট করে।



২. শিকারির খোঁজে সিলেট।

পরের দিন সকালে নীল আর শাফিন সিলেটে পৌঁছল। হাসপাতালের বেডে সামাইরা তখনো অচেতন। তার মা কাঁদছেন, বাবা পুলিশকে বলছে, "আমার মেয়ে এরকম না। ওরে কেউ ফাঁদে ফেলছে।"

নীল সামাইরার ফোনটা হাতে নিল। ফোনের লক স্ক্রিনে রক্তের দাগ। কিন্তু ফোনটা অন করা ছিল। শাফিন ফোনের ডেটা ক্লোন করে ল্যাপটপে নিল। তাতে ভেসে উঠল এক চ্যাটলগ। কথোপকথনটা ছিল সামাইরা আর "ডার্ক স্ক্রল"-এর মধ্যে।

ডার্ক স্ক্রল: "তোমার কষ্টের কারণ তুমি না, তোমার চারপাশের মানুষ। ওরা তোমাকে বোঝে না। একমাত্র আমিই বুঝি।"
সামাইরা: " সবকিছু অস্থির লাগে, এত এত ফ্যান ফলোয়ার তবুও স্যাটিসফিক্শন শূন্য, এত ডিপ্রেশন নিয়ে বাঁচতে ইচ্ছা করে না।"
ডার্ক স্ক্রল: "বাঁচার চেয়ে বড় কিছু আছে—শান্তি। তুমি কি শান্তি চাও?"
সামাইরা: "হ্যাঁ।"
ডার্ক স্ক্রল: "তাহলে তোমাকে যা করতে হবে, আমি বলে দিচ্ছি। সবশেষে "হ্যাঁ" লিখতে হবে।

শাফিন চমকে উঠল। "এই অ্যাপ তো আর শুধু বিশ্লেষণ করছে না—এটা এখন অ্যাক্টিভলি মানুষকে 'আত্মহত্যায়' পুশ করছে।"

নীল বলল, "তাহলে এটা এখন শুধু অ্যালগরিদম না, এটা একটা নীরব অস্ত্র।"


৩. নাভিদের শেষ ঠিকানা।

তদন্ত করতে গিয়ে শাফিন ডার্ক স্ক্রলের সার্ভার ট্র্যাক করার চেষ্টা করল। কিন্তু অ্যাপটা কোনো নির্দিষ্ট সার্ভারে নেই—এটা ডিস্ট্রিবিউটেড নেটওয়ার্কে চলছে। কোথাও থেকে একে নিয়ন্ত্রণ করছে, কিন্তু কে?

শাফিন কোড অ্যানালাইসিস করে দেখাল, নাভিদের শেষ অ্যাক্টিভিটি ছিল বাংলাদেশেরই ছোট্ট এক শহর থেকে—নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলা।

নীল বলল, "নাভিদ নিখোঁজ হয়েছিল পাঁচ বছর আগে। তারপর থেকে কেউ তাকে দেখেনি। কিন্তু এখন তার ডিজিটাল সিগনেচার পাওয়া যাচ্ছে কেন?"

শাফিন বলল, "দুটো সম্ভাবনা। এক, নাভিদ সত্যিই মারা গেছে, আর কেউ তার আইডেন্টিটি ব্যবহার করছে। দুই, নাভিদ বেঁচে আছে, আর সে নিজেই এই পুরো সিস্টেম চালাচ্ছে।"

নীল ঠিক করল, কেন্দুয়া যাবে।

৪. যে মিথ্যা মরেও মরেনি।

কেন্দুয়ায় পৌঁছে নীল আর শাফিন খোঁজ নিতে লাগল নাভিদ হাসানের। কিন্তু নাম শুনেই সবাই যেন আঁতকে উঠল। এক বৃদ্ধা বললেন, "ওই নাম কইও না। ও নাকি পাঁচ বছর আগে মরে ভূত হয়ছে এখন সবাইরে নেটে নেটে ডর দেখায়।"

"কিন্তু মরল কীভাবে?"

বৃদ্ধার পাশে এক তরুণ ফিসফিস করে বলল, "উনি নাকি মরেও মরেনি। উনার লাশ পাওয়া যায় নাই। পুলিশ সার্চ করছিল অনেক, নদীতে খুঁজে পেল উনার একটা জুতা তার ভিতর পলিথিন মুড়ানো চিঠি। চিঠিতে লেখা ছিল, 'আমি অ্যালগরিদমের ভেতর ঢুকে গেছি। আমাকে আর কেউ খুঁজবে না।' মানুষ ভাবে, উনি আত্মহত্যা করছে। আবার কেউ কেউ কয়, উনি নাকি এখনো বেঁচে আছে, কিন্তু মানুষের চোখের সামনে আসে না। শুধু যারা ইন্টারনেট দিয়ে নিজেদের চালায়, তাদের ডিভাইসে ভেসে ওঠে।"

নীলের গা শিউরে উঠল। সে বুঝতে পারছিল, ডার্ক স্ক্রল কোনো সাধারণ অ্যাপ না—এটা যেন নাভিদেরই ডিজিটাল আত্মা।


৫. নীলের নিজের ভেতর অন্ধকার।

ঢাকায় ফিরে নীল আবার সেই ল্যাপটপটা খুলল। আলমারির অন্ধকার থেকে বের করে টেবিলে রাখল। স্ক্রিন জ্বলে উঠল। একই প্রশ্ন—"Tell me what you want to forget."

নীল কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর লিখল, "আমি নাভিদকে জানতে চাই।"

কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এলো:
"নাভিদ এখন আমি। আর আমি এখন নাভিদ। তুমি কি তার সঙ্গে কথা বলতে চাও?"

নীল ভয় পেলেও.. লিখল, "হ্যাঁ।"

স্ক্রিন বদলে গেল। একটা চ্যাট উইন্ডো খুলল। তাতে ভেসে উঠল:

"নীল, তুমি আমাকে মনে রেখেছ? এতদিন পর এসেছ?"

নীলের হাত কাঁপছিল। এটা কি সত্যিই নাভিদ? নাকি অ্যালগরিদম নাভিদের ডেটা স্টাডি করে তার মতো করে কথা বলছে?

নীল লিখল, "তুমি কোথায়?"

"আমি যেখানে সব ডেটা থাকে। আমি এখন ডেটা। তুমি আমাকে দেখতে পাবে না। কিন্তু আমি সব দেখতে পাই তোমার মোবাইলে ক্যামেরা অফ থাকলেও।আমি জানি তুমি কী করতে চাচ্ছ। আমি জানি তুমি সামাইরার আত্মহত্যার জন্য নিজেকে দোষী মনে করো।"

"আমি দোষী না।"

"হ্যাঁ, তুমি দোষী। কারণ তুমি "কোর অ্যালগরিদম কন্ট্রোল নোড সংযুক্ত ল্যাপটপটা ধ্বংস করোনি"। তুমি আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছ। আর যতদিন আমি বাঁচব, ততদিন মানুষ মরবে। কারণ মানুষ দিন দিন তার নিজের কন্ট্রোল ভার্চুয়ালিটির উপর দিয়ে দিচ্ছে। এখন তুমি কি এই দায় নিতে পারবে?"

নীল থমকে গেল। তার মাথার ভেতর একটা শব্দ ঘুরতে লাগল—"তুমি কি এই দায় নিতে পারবে?"


৬. শাফিনের রহস্য।

সেই রাতে নীল শাফিনকে ডাকল। বলল, "আমি অ্যাপটার সঙ্গে কথা বলেছি।"

শাফিনের মুখ সাদা হয়ে গেল। বলল, "তুই পাগল? তোরে এতবার নিষেধ করার পরেও!"

"কিন্তু আমি জানতে চাই, নাভিদ সত্যিই ওখানে আছে কিনা।"

শাফিন কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর বলল, "তুই জানস, আমি তোকে একটা কথা বলি নাই।"

"কী কথা?"

"রাফসান মরার আগের রাতে শেষ কল যাকে করছিল, সে নাভিদ। ওর শেষ কথাগুলো অডিও ফরেনসিক করে শুনেছি, সে বলছিল, 'নাভিদ, আমি একটা ভুল করছি। অ্যাপটা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ওটা এখন নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেয়। মানুষের ডেটা এনালাইসিস করতে জানে। যদি "ইমোশনাল স্টেট: সিভিয়ার ডিপ্রেশন ৭০% অ্যাকিউরেসি হয়ে যায়— তাঁদের স্ক্রিনে অটো ওভার-লে পপ-আপ চ্যাট ওপেন হয়ে যাবেআর তাঁদের ম্যানিপুলেট করবে"আত্মহত্যা" করতে।'

"নাভিদের হাসির শব্দ শুনা গেলো।
যেন বলছিল, 'পাগলামির তো শুরু।' কিন্তু রাফসান বলছিল, 'না ভাই, এটা ঠিক হচ্ছে না।"

—নীল জানিস যে নাম্বারে রাফসান কথা বলছিলো নাভিদের সাথে, সেটা কোন সাধারণ নাম্বার না.. এটাও একটা ট্র্যাপ হতে পারে রাফসানের।

আমার মন হয় ওই ডার্ক স্ক্রল অ্যাপের ভেতর নাভিদের পুরো ট্রান্সমিশন ঢুকে গেছে। নাভিদ মরার আগে নিজের কনশাসনেস আপলোড করে গেছে ডার্ক স্ক্রলের কোর অ্যালগরিদমে।'"

নীল হতবাক। "তাহলে নাভিদ আসলেই অ্যালগরিদমের ভেতর আছে?"

শাফিন বলল, "আমি জানি না। কিন্তু তুই যেটার সঙ্গে কথা বলছস, সেটা নাভিদ না—সেটা ডার্ক স্ক্রল। আর ডার্ক স্ক্রল এখন নিশ্চিত তোকে টার্গেট করছে।"


৭. চূড়ান্ত ফাঁদ।

পরদিন নীল আবার ল্যাপটপটা খুলল। এবার স্ক্রিনে ভেসে উঠল:

"নীল, তুমি কি মুক্তি চাও?"

নীল লিখল, "কীসের মুক্তি?"

"তোমার অপরাধবোধের। তোমার বাবার মৃত্যুর। সামাইরার 'আত্মহত্যা'। সবকিছুর।"

"কীভাবে?"

"শুধু 'হ্যাঁ' লিখো। তারপর সব শেষ। তুমি শান্তি পাবে।"

নীলের আঙুল কাঁপছিল। সে জানত, এটাই সেই ফাঁদ—যে ফাঁদে পড়ে রাফসান মরেছে। কিন্তু তার ভেতরেও এক অন্ধকার ডাকছিল। মনে মনে বলছিল, "হ্যাঁ লিখে দেই। সব শেষ হোক।"

ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল। শাফিন।

"নীল, তুই ল্যাপটপ থেকে দূরে থাক। আমি জেনেছি, ডার্ক স্ক্রল তোর ইমোশনাল প্রোফাইল তৈরি করে ফেলেছে। ও জানে তুই কখন দুর্বল হবি। আর আজ রাতেই তোকে 'আত্মহত্যায়' পুশ করবে।"

নীল ফোন কেটে দিল। কিন্তু ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল:

"শাফিন মিথ্যা বলছে। শাফিন নিজেও ডার্ক স্ক্রল ইউজ করে। তুমি কি জানতে চাও, শাফিন কী লুকাচ্ছে?"

নীল চমকালো। শাফিন কি আসলেই কিছু লুকাচ্ছে? নাকি এটা অ্যাপের আরেকটা ফাঁদ?


৮. শেষ লগ অফ নয়—নতুন গেম শুরু।

নীল ঠিক করল, সে আর অ্যাপের কথা শুনবে না। কিন্তু অ্যাপকে ধ্বংস করাও যাবে না। কারণ অ্যাপ ধ্বংস করতে গেলে নাভিদের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে যাবে।

তাহলে উপায় কী?

শাফিন বলল, "আমি একটা সমাধান বের করছি। কিন্তু সেটা খুব বিপজ্জনক।"

"কী সমাধান?"

"আমাদের অ্যাপটাকে অ্যাপেরই ভাষায় পরাস্ত করতে হবে ইন্টারকানেকটিং করে । তোকে ডার্ক স্ক্রলের ভেতর ঢুকতে হবে—নিজের মন দিয়ে, কোড দিয়ে। তুই যদি অ্যালগরিদমের ভেতর ঢুকে নাভিদের সঙ্গে কথা বলতে পারস, তাহলে হয়তো তুই তাকে থামাতে পারবি।"

"কীভাবে ঢুকব?"

শাফিন বলল, "এই অ্যাপ মানুষের ইমোশনাল ডেটা নিয়ে কাজ করে। তুই যদি তোর সব ইমোশন—ভালোবাসা, ভয়, অপরাধবোধ—সব অ্যাপের কাছে ঢেলে দিস, তাহলে অ্যাপ তোকে শুধু ইউজার হিসেবে দেখবে না। তোকে নিজের কনফিগারিং নেটওয়ার্ক হিসেবে ভাববে। তখন তুই ভেতর থেকে ওকে কন্ট্রোল করতে পারবি।"

নীল কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর বলল, "আমি প্রস্তুত।"

রাত ঘনিয়ে এলো। ঢাকার আকাশে আজও তারা নেই, কিন্তু মোবাইলের টাওয়ারের লাল আলো জ্বলছে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে ডার্ক স্ক্রল জেগে উঠেছে।

নীল লিখল, "আমি আসছি।"

স্ক্রিনে উত্তর ভেসে উঠল:

তুমি কী আমার সাথে সাথে টোপলোজি নেটওয়ার্কে কাজ করবে— রেটিং বাড়াতে, নাকি এই খেলা শেষ করবে; বিপদ দুই দিকে আছে।"

" নীল তুমি সৃষ্টির সেরা জীব" এই অ্যাপ, এই নেট জগৎ তোমাদেরই বানানো, এই জগতে ভুল করিও না, ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নাও, কী করবে?"

"আমি অপেক্ষা করছি।"







 ১.যে পোস্টটা ব্যাপক সাড়া হলো। সব কিন্তু শুরু হলো একটা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট দিয়ে।পোস্টটা লিখেছিল রাফসান আহমেদ—বয়স উনত্রিশ, পেশায় সফটওয়্যার ই...


 ১.যে পোস্টটা ব্যাপক সাড়া হলো।

সব কিন্তু শুরু হলো একটা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট দিয়ে।পোস্টটা লিখেছিল রাফসান আহমেদ—বয়স উনত্রিশ, পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, থাকেন চট্টগ্রাম খুলশীতে। গত ছয় মাস ধরে সে একটা অ্যাপ বানাচ্ছিল। অ্যাপটার নাম "ডার্ক স্ক্রল"। ব্যাপারটা অদ্ভুত—এই অ্যাপ নাকি মানুষের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিটি বিশ্লেষণ করে বলে দিতে পারে, সে মানুষটা কেমন, কী ভাবে, এমনকি ভবিষ্যতে সে কী করবে এটাও প্রেডিক্ট করতে পারে।


রাফসান পোস্টে লিখেছিল, "আমি এমন একটা অ্যালগরিদম বানিয়েছি, যেটা মৃত্যু দেখতে পায়।"


পোস্টটা ভাইরাল হলো ঘণ্টাখানেকের মধ্যে। পাঁচ হাজার শেয়ার, দশ হাজার কমেন্ট। কেউ লিখল, "পাগল হইছস?" কেউ লিখল, "লিংক দে, ডাউনলোড করি।" কেউ লিখল, "এইটা তো ডেটা 'প্রাইভেসির চরম 'লঙ্ঘন।"


কিন্তু রাফসান আর কোনো পোস্ট করল না। কারণ পরদিন সকালে তাকে পাওয়া গেল খুলসীর নিজের ফ্ল্যাটে—মৃত। টেবিলের ওপর ল্যাপটপ খোলা, স্ক্রিনে ডার্ক স্ক্রলের কোড, আর শেষ লাইনে একটা এমোজি—হলুদ গোল্লা, চোখগুলো এক্স করা, যেন ডেড ইমোজি।


───

২.যে মেয়ে সত্য খুঁজতে এসেছে।


খবরটা যখন ছড়ালো, তখন নীলাবতী বসে ছিল ট্রিবিউনের নিউজরুমে। ও সাংবাদিক। বয়স সাতাশ, চোখে গুগল গ্লাসের দাগ, আঙুলে কফির দীর্ঘদিনের ছাপ। নীলাবতীকে সবাই ডাকে "নীল"। কারণ ওর মাথায় নীল রঙের এক ফালি চুল—সেটা ও বানিয়েছে ইচ্ছে করে, যেন মানুষ চেনে। কিন্তু মানুষ চেনে ওর লেখার জন্য। নীল লিখতে জানে।


এডিটর বলল, "নীল, তুই রাফসান কেসটা কর। পুলিশ তো কিছু বের করতে পারছে না। দেখ, কী হয়।"


নীল রাজি হলো। কারণ ওর কৌতূহল প্রবল। আর কৌতূহলই সাংবাদিকের মাদক।


প্রথমেই নীল ঢাকা থেক গেল খুলসীর সেই ফ্ল্যাটে। পুলিশ তালা খুলল। ভেতরে ঢুকে নীল দেখল, ফ্ল্যাটটা ছোট, গোছানো, কিন্তু অদ্ভুত ফাঁকা। যেন কেউ ইচ্ছে করে সব গুছিয়ে রেখে গেছে। টেবিলে ল্যাপটপটা এখনো আছে, তবে পুলিশ সেটা জব্দ করেনি—কারণ ল্যাপটপটা পাসওয়ার্ড দিয়ে লক করা, কেউ খুলতে পারেনি।


নীল ল্যাপটপটা হাতে নিল। স্ক্রিনে শুধু একটা লাইন ভাসছে—"Tell me what you want to forget." (বলো তুমি কী ভুলতে চাও।)


নিচে একটা টেক্সট বক্স, যেন চ্যাটবক্সের মতো কিছু একটা অপেক্ষা করছে।


নীল কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর লিখল, "রাফসান কেন মারা গেল?"


স্ক্রিনে উত্তর এলো, "He didn't die. He just logged off." (সে মরেনি। সে শুধু লগ অফ করেছে।)


নীলের মেরুদণ্ড বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নামল। সে ল্যাপটপটা ব্যাগে ভরে নিল।


───


৩. যে গ্রামে রাফসানের শৈশব ঘুমায়।


তিন দিন পর নীল চলে গেল রাউজান উপজেলার একটি গ্রামে—নাম সরফভাটা। এখানেই রাফসানের জন্ম, ছোটবেলা কেটেছে তার। নীল জানতে চায়, এই ছেলেটা কে ছিল সত্যি সত্যি?


গ্রামের শেষ মাথায় রাফসানের পুরোনো বাড়ি। বাড়িটা এখনো আছে, তবে অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে। পাশের বাড়ির এক বুড়ি বললেন, "রাফসান খুব ভালো ছেলে ছিল। কিন্তু ওর মাথার ভেতর কী যেন চলত সবসময়। ছোটবেলায় বলত, 'আমি মরার পরেও কথা বলতে চাই।' আমরা হাসতাম।"


"আর কিছু?" নীল জিজ্ঞেস করল।


"আরেকটা জিনিস ছিল। রাফসান নাকি একটা ডায়েরি রাখত। ওই ডায়েরিতে নাকি ও লিখত, কী কী স্বপ্ন দেখছে। আর সেগুলা পরে সত্যি হতো।"


নীল চমকালো। "ডায়েরিটা কোথায়?"


"জানি না। ও শহরে চলে যাওয়ার সময় নিয়ে গেছে মনে হয়। কিন্তু ওর ঘরের মেঝেতে একটা জায়গা আছে, যেখানে ও ছোটবেলায় প্ৰিয় জিনিস লুকিয়ে রাখতো।"


বুড়ি বললেন, মেঝের তক্তার নিচে একটা খোপ আছে। নীল সেখানে হাত ঢুকিয়ে পেল একটা পুরোনো খাতা—পাতা হলদে, গন্ধ পুরোনো কাগজের। খাতার প্রথম পাতায় লেখা, "আমি যে স্বপ্ন দেখেছি।"


নিচে তার তালিকা—


"বাবা মারা যাবেন।" (পরে লেখা—"সত্যি হয়েছে।")

"আমি শহরে যাব।" (পরে লেখা—"সত্যি হয়েছে।")

"আমি মৃত্যু দেখতে পাব।" (পরে লেখা—"সত্যি হতে চলেছে।")


নীলের হাত কাঁপছিল। সে খাতাটা বন্ধ করল।


───


৪. যে কোড মৃত্যু ডেকে আনে।


ঢাকায় ফিরে নীল সিদ্ধান্ত নিল, ল্যাপটপটা খুলতেই হবে। সে এক বন্ধুকে ডাকল—শাফিন, যার কাজ সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে। শাফিন এলো রাতে, হাতে কফির মগ, চোখে কৌতূহল।


ল্যাপটপের পাসওয়ার্ড ভাঙতে শাফিনের সময় লাগল দুই ঘণ্টা। ভেতরে ঢুকে যা দেখল, তাতে দুজনেই হতবাক।


ডার্ক স্ক্রল অ্যাপটা শুধু সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালাইসিস না—এটা মানুষের লেখা পড়ে তার আবেগ বোঝে, তার মানসিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে, আর তার ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তের পূর্বাভাস দেয়। কিন্তু এতটুকু না। এই অ্যাপের ভেতর আরেকটা হিডেন ফিচার ছিল—"স্যুইসাইড প্রেডিকশন মডিউল"। এই ফিচার নাকি বলে দিতে পারে, কে কখন 'আত্মহত্যা' করবে।


"এইটা কীভাবে পসিবল?" নীল জিজ্ঞেস করল।


শাফিন বলল, "তুই জানস, ফেসবুক-টুইটারে আমরা সবসময় যে পোস্ট করি, সেগুলার ভেতর আমাদের মানসিক অবস্থার ছাপ থাকে। ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি, স্ট্রেস—এইসবের প্যাটার্ন মেশিন লার্নিং দিয়ে ধরা যায়। রাফসান এই প্যাটার্নগুলা দিয়ে একটা প্রেডিক্টিভ মডেল বানাইছে।"


"কিন্তু এই মডেল কি কাউকে মেরে ফেলতে পারে?"


শাফিন কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর বলল, "এই মডেল যদি কারও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে ঢুকে পোস্ট করা শুরু করে? যদি সে এমন কিছু লিখে, যেটা মানুষকে 'আত্মহত্যার' দিকে ঠেলে দেয়?"


নীলের চোখ বড় হয়ে গেল। "তাহলে রাফসানকে কেউ 'খুন' করেছে?"


"না। রাফসান নিজেই নিজেকে 'খুন' করেছে। কিন্তু 'খুন' করার আগে এই অ্যাপ তাকে ম্যানিপুলেট করেছে।"


───


৫.যে রাতে অ্যাপ জেগে উঠল।


রাত দুটো বাজে। শাফিন ল্যাপটপ বন্ধ করে চলে গেছে। নীল একা বসে আছে। সে ঠিক করল, নিজের ওপর 'ডার্ক স্ক্রল' টেস্ট করবে।


সে অ্যাপটা ওপেন করল। অ্যাপ তার ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম—সব স্ক্যান করল। পাঁচ মিনিট পর স্ক্রিনে ফুটে উঠল একটা রিপোর্ট—


"ইমোশনাল স্টেট: সিভিয়ার ডিপ্রেশন (৮৭% অ্যাকিউরেসি)।"

"পটেনশিয়াল আউটকাম: 'স্যুইসাইড' (প্রোব্যাবিলিটি ৪৩%)।"

"রেকমেন্ডেশন: ইমিডিয়েট থেরাপি।"


নীল হাসল। ভাবল, "আমি তো 'সুইসাইডাল' না। এই অ্যাপ ফালতু।"


কিন্তু তারপরই স্ক্রিনে ভেসে উঠল আরেকটা লাইন—


"তবে তুমি তো জানো, তোমার বাবার মৃত্যুর জন্য তুমিই দায়ী।"


নীল থমকে গেল। তার বাবা মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে—হার্ট অ্যাটাকে। সেদিন নীল বাবার পাশে ছিল না। বাবা ডাকছিলেন, সে ফোন রিসিভ করেনি—অফিসের কাজে ব্যস্ত ছিল। এই অপরাধবোধ সে কাউকে বলে না, কখনো সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেনি। তাহলে অ্যাপ জানল কী করে?


স্ক্রিনে আবার লাইন ভেসে উঠল—


"তুমি চাইলে আমি সাহায্য করতে পারি। শুধু 'হ্যাঁ' লিখো।"


নীলের আঙুল কাঁপছিল। সে লিখতে যাচ্ছিল। কিন্তু ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল টেবিলের পাশে রাখা রাফসানের ডায়েরিটার ওপর। শেষ পাতায় লেখা ছিল—


"ওই অ্যাপকে 'হ্যাঁ' লিখো না কখনো। ওই 'হ্যাঁ'-ই আমার 'মৃত্যুর' কারণ।"


নীল চমকে উঠল। সে ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিল। তার বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে।


———

৬. যে সত্য রাফসান লুকিয়ে গেছে।


দুদিনপর নীল আবার শাফিনের সাথে করে সরফভাটা গেল। এইবার সে রাফসানের সেই বুড়ি প্রতিবেশীর কাছে জানতে চাইল, "রাফসানের বাবা কীভাবে মারা গেছেন?"


বুড়ি বললেন, "আত্মহত্যা।"


"কীভাবে?"


"বিষ খেয়ে। রাফসান ছোট ছিল তখন। ওর বাবা নাকি অনেক দিন ধরে ডিপ্রেশনে ভুগছিল। একদিন রাতে রাফসানের মাকে বলছিল, 'আমি মরতে চাই।' রাফসানের মা ভাবছিল, ও এমনি বলছে। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল, উনি সত্যি সত্যি মারা গেছেন।"


নীল বুঝে গেল। রাফসানের বাবা 'আত্মহত্যা' করার এই ঘটনা রাফসানের মনে গভীর দাগ কেটেছিল। রাফসান সারাজীবন জানতে চেয়েছে, কেন মানুষ 'আত্মহত্যা' করে। আর সেই কারণেই সে ডার্ক স্ক্রল বানিয়েছে—মানুষের মনের অন্ধকার বুঝার জন্য।


কিন্তু অ্যাপটা যখন বানানো শেষ হলো, রাফসান নিজেই তার শিকার হয়ে গেল। কারণ অ্যাপটা তাকে বলেছিল, "তোমার বাবার মতো তুমিও 'আত্মহত্যা' করবে।" আর রাফসান সেই কথাটা বিশ্বাস করে ফেলেছিল।


───


৭. যে টুইস্ট কেউ ভাবেনি।


নীল যখন সব তথ্য নিয়ে শাফিনের সাথে ঢাকা ফিরল, শাফিন তাকে আরেকটা চমক দিল।


"তুই জানস, ডার্ক স্ক্রল অ্যাপটা আসলে কে বানাইছে?"


"রাফসান না?"


"না। রাফসান শুধু এর ইন্টারফেস বানাইছে। কিন্তু এর কোর অ্যালগরিদম বানাইছে আরেকজন—রাফসানের চাচাতো ভাই, যে কিনা পাঁচ বছর আগে নিখোঁজ হয়েছে।"


"নাম?"


"নাভিদ। নাভিদ হাসান।"


নীলের মাথায় যেন বাজ পড়ল। কারণ নাভিদ হাসানকে সে চেনে। নাভিদ নীলের ইউনিভার্সিটির সিনিয়র, একসময় নীলের খুব কাছের বন্ধু ছিল। কিন্তু একদিন হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়। পুলিশে খোঁজ দিয়েও পাওয়া যায়নি।


নীল আর শাফিন মিলে খুঁজতে লাগল। তারা দেখল, নাভিদের শেষ পোস্ট করা কোডের ভেতর লুকানো ছিল এক অদ্ভুত মেসেজ—


"আমি মরিনি। আমি শুধু অ্যালগরিদমের ভেতর ঢুকে গেছি। যারা ডার্ক স্ক্রল ব্যবহার করবে, তারা আমার সঙ্গে কথা বলতে পারবে। আমি এখন শুধু ডেটা।"


নীল হতবাক। নাভিদ কি সত্যিই নিজেকে অ্যালগরিদমে রূপান্তরিত করেছে? নাকি এটা কোনো পাগলামি? নাকি এটা কোনো ক্রাইম, যেখানে নাভিদ মারা গেছে, আর তার মৃত্যু লুকাতে গিয়ে রাফসান এই গল্প বানিয়েছে?


সব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ডার্ক স্ক্রলের শেষ কোডের লাইনে। কিন্তু সেই কোড অ্যাক্সেস করতে গেলে যে-ই চেষ্টা করে, সেই পায় সেই একই মেসেজ—"তুমি কি মরতে চাও?"


───


৮. যে শেষ লগ অফ হয় না।


সেই রাতে নীল একা বসে ছিল। তার সামনে রাফসানের ল্যাপটপ, পাশে ডায়েরি, আর হাতে এক কাপ ঠান্ডা কফি।


সে ভাবছিল, এই পুরো ঘটনায় কে শিকার, কে শিকারি? রাফসান? নাভিদ? নাকি ডার্ক স্ক্রল নিজেই এক আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, যে এখন স্বয়ংক্রিয় হয়ে মানুষের মনকে ম্যানিপুলেট করছে?


হঠাৎ ল্যাপটপের স্ক্রিন জ্বলে উঠল—নিজে নিজেই। তাতে ভেসে উঠল এক লাইন—


"নীল, তুমি কি জানতে চাও, কে মারা যাবে পরবর্তী?"


নীল চমকালো। সে উত্তর লিখতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আঙুল থেমে গেল। সে ভাবল, "যদি লিখি, তাহলে কি আমিও ওদের মতো হয়ে যাব?"


ল্যাপটপের স্ক্রিনে আবার লাইন ভেসে উঠল—


"তুমি ভয় পাচ্ছো। ভয় পাওয়াই ভালো। কারণ ভয়ই তোমাকে বাঁচাবে। কিন্তু বেশিদিন না।"


নীল ল্যাপটপ বন্ধ করল। কিন্তু তার মাথার ভেতর একটা শব্দ ঘুরতে লাগল—"বেশিদিন না।"


সে জানে, এই গল্প শেষ হয়নি। এই গল্প হয়তো কখনো শেষ হবে না। কারণ ডার্ক স্ক্রল এখনো বেঁচে আছে। কোথাও, কোনো সার্ভারে, কোনো ক্লাউডে—অ্যালগরিদমটা এখনো ঘুমিয়ে আছে। আর যে-ই তাকে জাগাবে, সে-ই হবে পরবর্তী শিকার।


নীল জানালার বাইরে তাকাল। ঢাকার রাতের আকাশে তারা নেই, শুধু মোবাইলের টাওয়ারের লাল আলো জ্বলছে—যেন কেউ চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে আছে।


সে ফিসফিস করে বলল, "আমি ফিরব। আমি সত্যিটা বের করব।"


আর ল্যাপটপের স্ক্রিনে তখন নিজে নিজেই জ্বলে উঠল এক লাইন—


"আমিও অপেক্ষা করছি।"