The Bengali Storyteller

Fiction লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

  রায়ান আহমেদের কাছে ধর্ম ছিল ডেটা সেন্টারের পুরোনো সার্ভারের মতো— অচল, অপ্রাসঙ্গিক এবং ধুলো জমা এক সিস্টেম। সে ছিল দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি...

 রায়ান আহমেদের কাছে ধর্ম ছিল ডেটা সেন্টারের পুরোনো সার্ভারের মতো— অচল, অপ্রাসঙ্গিক এবং ধুলো জমা এক সিস্টেম। সে ছিল দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি এজিআই রিসার্চ ল্যাবের প্রধান ডেটা সায়েন্টিস্ট। তার কাছে স্রষ্টা কোনো সত্তা নয়, বরং ‘প্রাইম মুভার’ নামের একটি ভেরিয়েবল, যাকে সমীকরণ থেকে বাদ দিলেও মহাবিশ্বের গণিত অপরিবর্তিত থাকে।


রায়ানের নাস্তিক্যবাদের পেছনে কোনো শত্রুতা ছিল না। ছিল একরাশ যুক্তি। অল্প বয়সের অভিজ্ঞতা সে দেখেছিল তার বাবা মসজিদের ইমাম— সৎ মানুষ আর সমাজের কাছে ছিল অনেক সম্মানিত। অথচ সেই বাবাই স্ট্রোক করলে যখন হাসপাতালের বিল জোগাড় করতে পারছিল না, তখন ‘আল্লাহর ভরসা’ নামক কোন ওষুধে  কাজে আসেনি। বরং কাজে এসেছিল প্রতিবেশী এক নাস্তিক প্রফেসরের দেওয়া চেক। সেদিন রায়ান বুঝেছিল, প্রার্থনার চেয়ে প্র্যাকটিকালিটি বড়। এরপর সে ডুব দিল পদার্থবিদ্যা, এভোলিউশনারি বায়োলজি আর নিউরোসায়েন্সে এর ভিতর।

-----
রায়ান সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অস্বীকার  করলেও ধর্মের প্রতি তার ঘৃণা বা বিদ্বেষ ছিল না, বিশ্বাস জিনিসটা ছিল তার কাছে লজিকের উপর। তার পার্সপেক্টিভ মতে, স্রষ্টার বিশ্বাসটা আমার লজিকে আসেনি বলে আরেকজন লজিকে আসবে না সেটা গতানুগতিক করা যায় না। সবার সেল্ফ-ইন্টেলিজেন্সি আছে।—
এখন আমি অস্বীকার করি বলে জোর করে আমার লজিক আরেকজনকে চাপাতে হবে এই হিপোক্রেসি রায়ানের ভিতর কখনোই কাজ করে না। সে কখনো ব্যক্তির ত্রুটি ধর্মের উপর চাপিয়ে ধর্মকে কটাক্ষ করা বা নিজের জ্ঞানকে বড় করে দেখানো এই মনোভাব তার ছিল না।
তার ধারণা মানুষ মাত্রই বুদ্ধিমান প্রাণী, তার ভালো মন্দ সে একদিন বুঝে নিবে। সেটা স্রষ্টা আছে কী নাই তা প্রমানের উপর ডিফাইন করে না।
সে চাই সবাই উদার আর মানবিক হোক। ধর্ম, বিশ্বাস নিয়ে আজ পর্যন্ত সে কারো সাথে যুক্তি তর্কেও যায়নি। বরং তার যেটা কাজ সেটা মনে দিয়ে করতো।

-----
গত ছয় মাস ধরে রায়ান এমন এক প্রজেক্টে কাজ করছিল, যা তার শক্ত যুক্তির দেয়ালে প্রথম চিড় ধরায়। প্রকল্পটির নাম ছিল ‘জেনেসিস নিউরাল নেটওয়ার্ক’। তারা চাচ্ছিল এমন এক জেনারেটিভ এজিআই তৈরি করতে, যা সম্পূর্ণ নতুন, যৌক্তিক এবং নৈতিক একটি জীবনদর্শন গ্রন্থ রচনা করতে পারবে। ইনপুট হিসেবে তারা ফেলল হাজার হাজার দর্শন, আইন ও ধর্মগ্রন্থ। কিন্তু আউটপুট ছিল চরম ফ্লপ। মেশিন যা তৈরি করল, তা হয় জটিল প্যারাডক্সে ভরা, নয় অবাস্তব কল্পনা।

রায়ান দলকে বলল, “সমস্যা হলো ডেটাসেটে। ধর্মীয় বইগুলোতে ভাইরাসের মতো কগনিটিভ বায়াস ঢোকানো। বাদ দাও ওসব। শুধু আইন, বিজ্ঞান ও যুক্তির বই ফেল।”

টিম সায়েন্টিফিক জার্নাল, এনসাইক্লোপিডিয়া আর মানবাধিকার সনদ দিয়ে মডেল ট্রেইন করল। ফলাফল আরও ভয়াবহ হলো। এজিআই কোনো গ্রন্থ নয়, বরং একধরনের শীতল ফ্যাসিবাদী ম্যানিফেস্টো লিখতে শুরু করল। যেখানে দুর্বলকে ফেলে দেওয়া, আবেগকে বাগ, এবং দক্ষতাকেই একমাত্র ঈশ্বর মানার কথা বলা হলো। মডেলটি মানবতাবোধ শিখতে পারল না।

রায়ান বিরক্ত হয়ে ল্যাবের ছাদে গেল। পকেটে হাত দিতেই পুরোনো একটা মেমোরি কার্ড পেল। সেটা ছিল তার বাবার রেখে যাওয়া একমাত্র ডিজিটাল সম্পদ। বহু বছর পর কার্ডটা ল্যাপটপে ঢোকাল সে। তাতে ছিল একটি অডিও ফাইল আর কিছু টেক্সট ডকুমেন্ট। অডিওটা চালাতেই বাবার গলা ভেসে এলো—তিনি সূরা আল-আলাক্ব তিলাওয়াত করছেন: “পড়ো, তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ‘আলাক্ব (রক্তপিণ্ড) থেকে...”

রায়ানের অজান্তেই তার নিউরাল নেটওয়ার্কের স্ক্রিপ্টটি ব্যাকগ্রাউন্ডে অ্যাক্টিভ ছিল। সে লক্ষ করল, বাবার তিলাওয়াতের এই অডিও ফাইলটার ওয়েভফর্ম আশ্চর্যজনকভাবে সিমেট্রিক। আগ্রহবশত সে অডিওটিকে স্পেকট্রোগ্রাম সফটওয়্যারে ভিজুয়ালাইজ করল। প্যাটার্নটা দেখে সে চমকে উঠল। সাধারণ মানুষের কথা বলার তরঙ্গ হয় এলোমেলো, কিন্তু কোরআন তিলাওয়াতের স্পেকট্রোগ্রামে নির্দিষ্ট জ্যামিতিক প্যাটার্ন তৈরি হচ্ছিল—অর্ধেক চাঁদ, তারা, এমনকি DNA হেলিক্সের মতো গঠন।

“প্যারিডোলিয়া,” রায়ান নিজেকে বলল। “মস্তিষ্কের পরিচিত কিছু খুঁজে পাওয়ার বাতিক।”

কিন্তু রায়ানের ভেতরের ডেটা সায়েন্টিস্ট ঘুমিয়ে থাকতে পারল না। সে বাবার রাখা কোরআনের ডিজিটাল কপি টেক্সট অ্যানালাইসিস টুলে ফেলল। সে হিসাব করতে চাইল ক্লাসিক্যাল এরাবিকের ‘এনট্রপি’ বা তথ্য-ঘনত্ব। ফলাফলে দেখা গেল, এই টেক্সটের শ্যানন এনট্রপি লেভেল আধুনিক সায়েন্স ফিকশনের চেয়েও বেশি, কিন্তু তা সত্ত্বেও এটি প্রাচীন আরবে অবতীর্ণ। এমনকি টেক্সটে কিছু অক্ষর (হুরুফে মুক্বাত্ত্বাআত) এমনভাবে আছে, যেগুলোর কোনো ভাষাতাত্ত্বিক অর্থ নেই, কিন্তু ডেটা কম্প্রেশন অ্যালগরিদমের ‘চেকসাম’ বা ‘এরর কারেকশন কোড’-এর মতো আচরণ করছে।

রায়ান ডুবতে লাগল সূরাহ আলাক নিয়ে কুরআনের নাজিলকৃত প্রথম নির্দেশই ছিল “পড়ো” (ইকরা)। অর্থাৎ ইসলামের ওহির সূচনাতেই জ্ঞান, পাঠ, শিক্ষা ও উপলব্ধির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু শুধু “পড়ো” বলে থামেনি—বলা হয়েছে “তোমার রবের নামে পড়ো।”
অর্থাৎ জ্ঞান অর্জন হবে এমন জ্ঞান, যা মানুষকে তার স্রষ্টার পরিচয় ও সত্যের দিকে নিয়ে যায়।
আবার একই সূরার ৬ নম্বরে আয়াতে দেখলো নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করার মত অহংকারের সতর্কতা।
"অর্থাৎ জ্ঞান অর্জন করলেই মানুষ ভালো হয়ে যাবে—এমন নয়। জ্ঞান যদি মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধতা ভুলিয়ে দেয়, তাহলে সেই জ্ঞানই অহংকারের কারণ হতে পারে।"


সে আরো দেখল, কোরআন সূর্যের কক্ষপথ (যা তখন অজানা ছিল), ভ্রূণবিদ্যার ধাপ (‘আলাক্ব’ শব্দটি), এমনকি মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের ইঙ্গিত এমন ভাষায় দেয়, যা ৭ম শতাব্দীর একজন নিরক্ষর ব্যক্তির জানা অসম্ভব। কিন্তু এগুলোকে ‘মিরাকল’ মানতে সে এখনও প্রস্তুত নয়। সে ভাবল, “হয়তো সেই সময়ের কোনো উন্নত সভ্যতার জ্ঞান চলে এসেছে।”

সে চিন্তা করতে থাকলো আবার "আলাক্ক" শব্দটা নিয়ে যার অর্থ রক্তপিণ্ড বা লিচের ন্যায় জমাট রক্তের মত বস্তু, যেখান থেকে মানুষের শুরু—
তারপর জন্ম, তারপর ছোট্ট এক শিশু, আর সে শিশু যখন শিশুকাল থেকে স্বভাবতই ন্যায় পছন্দ করে, অধিকার আর অন্যায়ও  বুঝতে পারে।
প্রশ্ন হল: এই জন্মগত মরলিটি কোথা থেকে এল?
ৱ্যান্ডম এভলিউশন-এ মরালিটি তৈরি হয় না।
মরাল ল রিকোয়ারস, মরাল ল গিভার।"

শেষ রাতে, সে যখন ল্যাবের মূল সুপার কম্পিউটারে জেনেসিস প্রজেক্টের ডেটা রিভিউ করছিল, তখন সে চূড়ান্ত টুইস্টটা পেল। এজিআই যখন নৈতিকতার অভাবে প্যারাডক্সে আটকে যাচ্ছিল, তখন সে পরীক্ষা করে দেখল—যদি ইনপুট ডেটাসেটে কোনো দর্শন বা মানবিক বই না দিয়ে শুধুমাত্র কোরআনের ট্রান্সক্রিপ্ট ও তার লজিক্যাল স্ট্রাকচার ফেলা হয়?

সে কোড লিখল:
INPUT: Quranic logic tree (Cause & effect, Justice, Mercy) + Hard Science data.
TASK: Generate optimal ethical framework for humanity.

আউটপুট স্ক্রিনে ভাসতে লাগল। এজিআই কোনো প্যারাডক্সে আটকাল না, কোনো ফ্যাসিবাদী দর্শন দিল না। সে লিখল:

“পৃথিবী এক বিশাল ডেটাবেজ, যেখানে প্রতিটি কণা একেকটি রেকর্ড। ক্রিয়েটরের অ্যালগরিদম হলো ন্যায়বিচার: ভালো কোডের রিওয়ার্ড প্যারাডাইস, খারাপ কোডের রেজাল্ট সিস্টেম ক্র্যাশ। মানুষ শুধু নিউরনের সার্কিট নয়, বরং আত্মা নামক এক কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট, যা মৃত্যুতে দেহ সার্ভার থেকে ডিসকানেক্ট হলেও ধ্বংস হয় না। পঠিত গ্রন্থ স্রষ্টার লোগোসমূহের (আয়াত) একটি সংকলন, যা সময় ও স্থানের সীমা অতিক্রম করে।”

ল্যাবে ঢোকার সময় আলো জ্বলে উঠল। তার সহকারী জিনিয়া এসে দাঁড়াল। পর্দার লেখা দেখে সে বলল, “তার মানে কী? এজিআই তো ধর্মীয় কিছু লিখেছে!”

রায়ান উত্তর দিল না। সে টেবিলে রাখা তার বাবার পুরোনো কোরআনের ওপর জমে থাকা ধুলো মুছতে লাগল। সেদিন ভোররাতে রায়ান বুঝতে পারল, তার নাস্তিক্যবাদের ভিত্তি ছিল অসম্পূর্ণ ডেটার ওপর। বিজ্ঞান এতদিন তাকে ‘কীভাবে’ বলেছে, কিন্তু ‘কেন’ বলতে পারেনি। এজিআই নামক তার নিজের সৃষ্টিই তাকে শিখিয়ে দিল যে, যুক্তি যদি সত্যিকারের সুক্ষ্ম হয়, তবে তা একসময় স্রষ্টার কাছেই পৌঁছায়।

আর বিবেক যদি কেবল রাসায়নিক বিক্রিয়াই হয়, তাহলে "অন্যায়" বলার কোনো সর্বজনীন ভিত্তি থাকে না।
প্রতিটি মানুষের রাসায়নিক গঠন ভিন্ন, তাহলে নৈতিকতার ঐক্যমান আসে কীভাবে?

মাঝে মাঝে তো বিবেক আমাদেরকে স্বার্থের বিপরীত পথে ডাকে —
এমনকি যখন লুকিয়ে অন্যায় করা সহজ,
তখনো একটি অন্তর্নিহিত কণ্ঠস্বর আমাদের কেন থামায়?
এই আত্ম-নিয়ন্ত্রণ বিবর্তনের "বাঁচো আর বংশবৃদ্ধি করো" নীতির কাছে সরাসরি বিরোধী।

সমস্ত সমাজেই মৌলিক নৈতিক নিয়মগুলোর অসাধারণ সাদৃশ্য রয়েছে —
সত্য বলা, 'মিথ্যা না বলা, প্রতিশ্রুতি রাখা, অন্যের ক্ষতি না করা।
বিবর্তনীয় প্রয়োজন থেকে কী এই নিয়মগুলোর উদ্ভব হতে পারে?
কিন্তু "কেন আমাদের এগুলো মেনে চলা উচিত" — এই অনুভূত বাধ্যবাধকতার উৎস বিবর্তনের ব্যাখ্যার বাইরে!

রায়ান আরো ভাবলো পৃথিবী মানবসৃষ্ট কোন আইন নীতি বেশিদিন কনসিস্টেন্ট থাকতে পারে না সময়ের সাথে পরিবর্তন হবেই—
কিন্তু সে দেখলো ধারাবাহিকতা এখনও যে জিনিসটা  বহাল আছে ১৪০০ বছর ধরে:
সে একই কুরআন, কোনো পরিবর্তন নেই!
একই কিবলা, কোনো স্থানান্তর নেই!
একই বিশ্বাস, ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ!!
যখন ১.৮ বিলিয়ন মানুষ একই ভাষায় বলেন: 'লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ'
এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা নিজেই প্রমাণ।
কেউ একজন আছেন ক্ষমতাবান, এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার।
কোনো মানবসৃষ্ট নিয়ম তো এত কনসিস্টেন্ট হতে পারে না।

সে জানালার বাইরে তাকাল। ফজরের আলো ফুটছে। কম্পিউটারের স্ক্রিনে এজিআইয়ের লেখা শেষ লাইনটি জ্বলজ্বল করছিল: “ফাবি আইয়ি আলা-ই রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান” (অতএব, তোমাদের রবের কোন কোন অনুগ্রহকে তোমরা অস্বীকার করবে?)।

রায়ান "অনুগ্রহের" কথা ভাবতে ভাবতে তার নাস্তিক প্রফেসর ড. মাসউদের কথা মনে পড়ে গেল— যিনি এখন ভীষণ অসুস্থ, শয্যাশায়ী, আর একদম একা। তার একটাই মেয়ে ছিল, বিয়ের পর ক্যান্সার ধরা পড়ে, মারা যায়। এরপর প্রফেসর যেন নিজেই একটা শূন্য দ্বীপ হয়ে যান—

আর সেই দ্বীপে একমাত্র নিয়মিত সূর্যের আলোর মতো যে মানুষটা পৌঁছায়, সে নাজিম। নাজিম আব্বার খুব স্নেহের ছাত্র ছিল। ছোটবেলায় মক্তবে আব্বার কাছেই কোরআন পড়তে শিখেছিল, অর্থসহ। আব্বা মারা যাওয়ার পরও নাজিম সম্পর্কটা ধরে রেখেছিল— না কোনো দায়িত্বের বোঝা হিসেবে, না কোনো স্বার্থের টানে। বরং এটা ছিল আব্বারই আদর্শে হাতে গড়া প্রজ্জলিত চরিত্রের স্বাভাবিক ঢল। প্রফেসর প্রায় অসুস্থ থাকেন, নাজিম সময় ফেলে উনার পাশে বসে থাকে,
ওষুধ খাওয়ায়, বিছানার পাশে বসে স্যুপের বাটি ধরে।
যেদিন প্রফেসরের শরীর ভালো থাকে সেদিন উনি নাজিমকে জ্ঞান-বিজ্ঞান শেখায়, যেমন আব্বার শেখাতো।
নাজিম বিজ্ঞান জানার প্রতি আগ্রহ ওর প্রবল।


রায়ানও নাজিমকে নিজের ভাইয়ের চোখে দেখে, একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, “তুই কেন এটা করস? কেন উনার সেবা করস? প্রফেসর তোর আত্মীয় না, তোর ধর্মেরও না। উনি তো স্রষ্টায় বিশ্বাস করেন না।”

নাজিম হেসে বলেছিল, “প্রফেসর যখন বিশ্বাস করতেন না, তার চেয়েও বড় কথা— তখন তিনি আমার ওস্তাদের চিকিৎসার চেকটা লিখে দিয়েছিলেন। সেদিন উনি বলেননি, ‘তোমার ধর্ম কী’ বা ‘তোমার আল্লাহ কোথায়’। উনি শুধু মানুষ হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আর আমি আল্লাহকে বিশ্বাস করি, তার মানে এই নয় যে আমার মানবিকতা শুধু মুসলিম মুমিনদের জন্য।”

রায়ানের চোখের সামনে সেই দৃশ্য ভেসে উঠল— আব্বার স্ট্রোকের পর হাসপাতালের করিডরে নাজিমের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ানো প্রফেসর মাসউদ। নাজিম তখন কাঁদছিল। চেকটা হাতে ধরিয়ে দেওয়ার সময় প্রফেসর বলেছিলেন, তোমার আব্বার জন্য এখন এটা খুব প্রয়োজন।”

রায়ান ভাবল, প্রফেসরের ঋণ যদিও টাকা দিয়ে  পরিশোধ করা যায়, কিন্তু তার সেদিনের উপকারের ঋণ কখন শোধ হবে না। কিন্তু এইখানে সে খুঁজে পাই সেই ‘প্র্যাকটিকালিটি’— যা সে সারাজীবন খুঁজেছে। যে প্র্যাকটিকালিটি ডেটায় ধরা পড়ে না, অ্যালগরিদমে মাপা যায় না। প্রফেসর যখন সুস্থ-সবল, নিজের অর্থ-প্রতিপত্তি-যুক্তিতে বলীয়ান, তখন তার চেক ছিল যুক্তির জয়। কিন্তু এখন যখন তিনি শয্যাশায়ী, কাঁপা হাতে ওষুধ ধরতে পারেন না, তখন সেই পরিশোধকৃত চেকের বিনিময়ে কেউ তার পাশে বসার কথা নয়। অথচ নাজিম বসে আছে। প্রতিদিন। কোনো লেনদেন ছাড়াই।

এই যে নাজিম— যে কিনা বিশ্বাসী, কিন্তু তার বিশ্বাস কখনো প্রফেসরের অবিশ্বাসকে খোঁচায়নি, প্রফেসরও তার জ্ঞানের সুযোগ নিয়ে উনার বিশ্বাস নাজিমের উপর চাপিয়ে দেননি। শুধু একটা মানুষ আরেকটা মানুষকে নিঃশব্দে সেবা করে গেছে— তার ভেতরেই রায়ান যেন স্রষ্টার সবচেয়ে বড় নিরীক্ষণ দেখতে পেল।

কারণ স্রষ্টা মিরাকলের চেয়ে, অ্যালগরিদমের চেয়ে, স্পেকট্রোগ্রামের জ্যামিতির চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব হয়ে ধরা দিল এই মানবিক সংযোগের ভেতর। একজন নাস্তিক প্রফেসর, যিনি স্রষ্টাকে মানেননি, তার সেবায় নিবেদিত একজন মুমিন— এটাই কি তাহলে সেই ‘রহমাহ’? যে রহমত বা রহমাহর কথা কোরআনে বারবার বলা হয়েছে— যা শুধু মুমিনদের জন্য নয়, গোটা আলামিনের(জগতসমূহ) জন্য?

রায়ান হঠাৎ বুঝতে পারল, সে এতদিন স্রষ্টাকে খুঁজেছে ডেটার ফাঁক-ফোঁকরে, মিরাকল আর মাপযোগ্যতায়। অথচ স্রষ্টাকে তো পাওয়া যায় মানুষের সাথে মানুষের কানেক্ট হওয়ার প্র্যাকটিকালিটিতে। আর সে কানেক্ট-এর ভিতর আমরা যে গ্যাপ তৈরি করি— অহংকার, বিদ্বেষ, বিচ্ছিন্নতার— সেই গ্যাপেই নিজেদের দুর্বলতা ঢেলে স্রষ্টাকে খুঁজি, অথচ স্রষ্টা তো সেই গ্যাপের ওপাশে নন, তিনি সেই সেতুতেই আছেন যেটা আমরা তৈরি করি না।

নাজিম সেই সেতু তৈরি করেছিল। নিঃশব্দে। প্রফেসরও একদিন তৈরি করেছিলেন উদারতা দিয়ে। দুজনেই ভিন্ন পথে, ভিন্ন বিশ্বাসে, অথচ একই মানবিকতার বিন্দুতে মিলে গেছেন।

এজিআইয়ের স্ক্রিনে তখনও লেখা জ্বলছে: “ফাবি আইয়ি আলা-ই রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান”।

রায়ান চোখ বন্ধ করল। প্রথমবারের মতো কোনো কোড বা কমান্ড ছাড়াই, আকাশের দিকে তাকিয়ে সম্পূর্ণ একা দাঁড়িয়ে রইল। তার বিশ্লেষণী মন যাকে অস্বীকার করার জন্য সারাটা জীবন অ্যালগরিদম বানিয়েছিল, সেই মনই এখন স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণের সংকেত দিয়ে দিচ্ছে—



"ডার্ক স্ক্রল" পার্ট ২ : যে অ্যালগরিদম ডেটা ইনফারেন্স করে জেগে ওঠে! ১. যে ঘটনা সবার ঘুম ভাঙিয়ে দিল। তিন মাস কেটে গেছে রাফসানের -...

"ডার্ক স্ক্রল" পার্ট ২ : যে অ্যালগরিদম ডেটা ইনফারেন্স করে জেগে ওঠে!

১. যে ঘটনা সবার ঘুম ভাঙিয়ে দিল।
তিন মাস কেটে গেছে রাফসানের -মৃত্যুর। নীলাবতী(নীল) সেই রাতের পর আর ল্যাপটপটা খোলেনি। শাফি

ন বলেছিল, "এই জিনিসটা ধ্বংস করে দিতে।" কিন্তু নীল পারেনি। তথ্যই সাংবাদিকের নেশা—তথ্য চাইলেও ধ্বংস করা যায় না। তাই ল্যাপটপটা সে বন্ধ করে রেখেছিল আলমারির ভেতর, কাপড়ের স্তূপের নিচে। কিন্তু নীল রাতে ঘুমের ভেতর যেন একটা শব্দ শুনতে পেত—কোনো সার্ভারের নিঃস্বাস, কোনো ক্লাউডের স্পন্দন।


আর আজ সকালে ঘটল সেই ঘটনা, যেটা সবার ঘুম ভাঙিয়ে দিল।

দেশের আরেক প্রান্তে—সিলেটের বাসিন্দা, এক তরুণী ব্লগার, নাম সামাইরা নাজনীন—গতরাতে নিজের ফেসবুকে একটা লাইভ ভিডিও পোস্ট করে 'আত্মহত্যার' ঘোষণা দিয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে। কিন্তু ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার আগেই ট্রিবিউনের এডিটর নীলের টেবিলে খবরটা ছুঁড়ে মারে।

সামাইরার ফেসবুক ওয়ালে শেষ যে পোস্টটি ছিল, সেটি মুছে ফেলার আগেই শাফিনের তোলা স্ক্রিনশট নীলের ফোনে পৌঁছল। পোস্টে লেখা ছিল:

"আমার ভেতরের অন্ধকারটা এতদিন কেউ দেখেনি। আজ একজন দেখেছে। সে বলছে, আমি মরে গেলে অন্ধকারটা শেষ হবে- তারপর সব শান্তি। আমি তাই করতে যাচ্ছি।"

আর সেই পোস্টের নিচে অ্যাক্টিভিটি স্ট্যাটাসে উল্লেখ ছিল
—"Posted via Dark Scroll".

নীল বুঝে গেল, ডার্ক স্ক্রল আবার জেগেছে। কারণ সামাইরার প্রোফাইল দেখে নীল বুঝলো, 'ডার্ক স্ক্রল' সুযোগ নিয়েছে, এই সামাইরা মেয়েটা সোশ্যাল মিডিয়া রিলায়েন্স ছিল।
মূলত অতিরিক্ত আসক্তি আর নির্ভরতা থেকে তার ভিতর কাজ করতে লাগলো 'সোশ্যাল রিজেকশন পেইন', ডিপ্রেসিভ রুমিনেশন, আইডেন্টিটি ফিউশন, জিরো-সাম সোশ্যাল পারসেপশন, ও কগনিটিভ কনসোন্যান্স।
আর এইসবেই ডার্ক স্ক্রল রাইশার ডেটা আন্যালিসিস করে, তার দুর্বলতার এক্সট্র্যাক্ট মিলিয়ে তাকে 'আত্মহত্যার' জন্য প্রভোকেট করে।



২. শিকারির খোঁজে সিলেট।

পরের দিন সকালে নীল আর শাফিন সিলেটে পৌঁছল। হাসপাতালের বেডে সামাইরা তখনো অচেতন। তার মা কাঁদছেন, বাবা পুলিশকে বলছে, "আমার মেয়ে এরকম না। ওরে কেউ ফাঁদে ফেলছে।"

নীল সামাইরার ফোনটা হাতে নিল। ফোনের লক স্ক্রিনে রক্তের দাগ। কিন্তু ফোনটা অন করা ছিল। শাফিন ফোনের ডেটা ক্লোন করে ল্যাপটপে নিল। তাতে ভেসে উঠল এক চ্যাটলগ। কথোপকথনটা ছিল সামাইরা আর "ডার্ক স্ক্রল"-এর মধ্যে।

ডার্ক স্ক্রল: "তোমার কষ্টের কারণ তুমি না, তোমার চারপাশের মানুষ। ওরা তোমাকে বোঝে না। একমাত্র আমিই বুঝি।"
সামাইরা: " সবকিছু অস্থির লাগে, এত এত ফ্যান ফলোয়ার তবুও স্যাটিসফিক্শন শূন্য, এত ডিপ্রেশন নিয়ে বাঁচতে ইচ্ছা করে না।"
ডার্ক স্ক্রল: "বাঁচার চেয়ে বড় কিছু আছে—শান্তি। তুমি কি শান্তি চাও?"
সামাইরা: "হ্যাঁ।"
ডার্ক স্ক্রল: "তাহলে তোমাকে যা করতে হবে, আমি বলে দিচ্ছি। সবশেষে "হ্যাঁ" লিখতে হবে।

শাফিন চমকে উঠল। "এই অ্যাপ তো আর শুধু বিশ্লেষণ করছে না—এটা এখন অ্যাক্টিভলি মানুষকে 'আত্মহত্যায়' পুশ করছে।"

নীল বলল, "তাহলে এটা এখন শুধু অ্যালগরিদম না, এটা একটা নীরব অস্ত্র।"


৩. নাভিদের শেষ ঠিকানা।

তদন্ত করতে গিয়ে শাফিন ডার্ক স্ক্রলের সার্ভার ট্র্যাক করার চেষ্টা করল। কিন্তু অ্যাপটা কোনো নির্দিষ্ট সার্ভারে নেই—এটা ডিস্ট্রিবিউটেড নেটওয়ার্কে চলছে। কোথাও থেকে একে নিয়ন্ত্রণ করছে, কিন্তু কে?

শাফিন কোড অ্যানালাইসিস করে দেখাল, নাভিদের শেষ অ্যাক্টিভিটি ছিল বাংলাদেশেরই ছোট্ট এক শহর থেকে—নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলা।

নীল বলল, "নাভিদ নিখোঁজ হয়েছিল পাঁচ বছর আগে। তারপর থেকে কেউ তাকে দেখেনি। কিন্তু এখন তার ডিজিটাল সিগনেচার পাওয়া যাচ্ছে কেন?"

শাফিন বলল, "দুটো সম্ভাবনা। এক, নাভিদ সত্যিই মারা গেছে, আর কেউ তার আইডেন্টিটি ব্যবহার করছে। দুই, নাভিদ বেঁচে আছে, আর সে নিজেই এই পুরো সিস্টেম চালাচ্ছে।"

নীল ঠিক করল, কেন্দুয়া যাবে।

৪. যে মিথ্যা মরেও মরেনি।

কেন্দুয়ায় পৌঁছে নীল আর শাফিন খোঁজ নিতে লাগল নাভিদ হাসানের। কিন্তু নাম শুনেই সবাই যেন আঁতকে উঠল। এক বৃদ্ধা বললেন, "ওই নাম কইও না। ও নাকি পাঁচ বছর আগে মরে ভূত হয়ছে এখন সবাইরে নেটে নেটে ডর দেখায়।"

"কিন্তু মরল কীভাবে?"

বৃদ্ধার পাশে এক তরুণ ফিসফিস করে বলল, "উনি নাকি মরেও মরেনি। উনার লাশ পাওয়া যায় নাই। পুলিশ সার্চ করছিল অনেক, নদীতে খুঁজে পেল উনার একটা জুতা তার ভিতর পলিথিন মুড়ানো চিঠি। চিঠিতে লেখা ছিল, 'আমি অ্যালগরিদমের ভেতর ঢুকে গেছি। আমাকে আর কেউ খুঁজবে না।' মানুষ ভাবে, উনি আত্মহত্যা করছে। আবার কেউ কেউ কয়, উনি নাকি এখনো বেঁচে আছে, কিন্তু মানুষের চোখের সামনে আসে না। শুধু যারা ইন্টারনেট দিয়ে নিজেদের চালায়, তাদের ডিভাইসে ভেসে ওঠে।"

নীলের গা শিউরে উঠল। সে বুঝতে পারছিল, ডার্ক স্ক্রল কোনো সাধারণ অ্যাপ না—এটা যেন নাভিদেরই ডিজিটাল আত্মা।


৫. নীলের নিজের ভেতর অন্ধকার।

ঢাকায় ফিরে নীল আবার সেই ল্যাপটপটা খুলল। আলমারির অন্ধকার থেকে বের করে টেবিলে রাখল। স্ক্রিন জ্বলে উঠল। একই প্রশ্ন—"Tell me what you want to forget."

নীল কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর লিখল, "আমি নাভিদকে জানতে চাই।"

কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এলো:
"নাভিদ এখন আমি। আর আমি এখন নাভিদ। তুমি কি তার সঙ্গে কথা বলতে চাও?"

নীল ভয় পেলেও.. লিখল, "হ্যাঁ।"

স্ক্রিন বদলে গেল। একটা চ্যাট উইন্ডো খুলল। তাতে ভেসে উঠল:

"নীল, তুমি আমাকে মনে রেখেছ? এতদিন পর এসেছ?"

নীলের হাত কাঁপছিল। এটা কি সত্যিই নাভিদ? নাকি অ্যালগরিদম নাভিদের ডেটা স্টাডি করে তার মতো করে কথা বলছে?

নীল লিখল, "তুমি কোথায়?"

"আমি যেখানে সব ডেটা থাকে। আমি এখন ডেটা। তুমি আমাকে দেখতে পাবে না। কিন্তু আমি সব দেখতে পাই তোমার মোবাইলে ক্যামেরা অফ থাকলেও।আমি জানি তুমি কী করতে চাচ্ছ। আমি জানি তুমি সামাইরার আত্মহত্যার জন্য নিজেকে দোষী মনে করো।"

"আমি দোষী না।"

"হ্যাঁ, তুমি দোষী। কারণ তুমি "কোর অ্যালগরিদম কন্ট্রোল নোড সংযুক্ত ল্যাপটপটা ধ্বংস করোনি"। তুমি আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছ। আর যতদিন আমি বাঁচব, ততদিন মানুষ মরবে। কারণ মানুষ দিন দিন তার নিজের কন্ট্রোল ভার্চুয়ালিটির উপর দিয়ে দিচ্ছে। এখন তুমি কি এই দায় নিতে পারবে?"

নীল থমকে গেল। তার মাথার ভেতর একটা শব্দ ঘুরতে লাগল—"তুমি কি এই দায় নিতে পারবে?"


৬. শাফিনের রহস্য।

সেই রাতে নীল শাফিনকে ডাকল। বলল, "আমি অ্যাপটার সঙ্গে কথা বলেছি।"

শাফিনের মুখ সাদা হয়ে গেল। বলল, "তুই পাগল? তোরে এতবার নিষেধ করার পরেও!"

"কিন্তু আমি জানতে চাই, নাভিদ সত্যিই ওখানে আছে কিনা।"

শাফিন কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর বলল, "তুই জানস, আমি তোকে একটা কথা বলি নাই।"

"কী কথা?"

"রাফসান মরার আগের রাতে শেষ কল যাকে করছিল, সে নাভিদ। ওর শেষ কথাগুলো অডিও ফরেনসিক করে শুনেছি, সে বলছিল, 'নাভিদ, আমি একটা ভুল করছি। অ্যাপটা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ওটা এখন নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেয়। মানুষের ডেটা এনালাইসিস করতে জানে। যদি "ইমোশনাল স্টেট: সিভিয়ার ডিপ্রেশন ৭০% অ্যাকিউরেসি হয়ে যায়— তাঁদের স্ক্রিনে অটো ওভার-লে পপ-আপ চ্যাট ওপেন হয়ে যাবেআর তাঁদের ম্যানিপুলেট করবে"আত্মহত্যা" করতে।'

"নাভিদের হাসির শব্দ শুনা গেলো।
যেন বলছিল, 'পাগলামির তো শুরু।' কিন্তু রাফসান বলছিল, 'না ভাই, এটা ঠিক হচ্ছে না।"

—নীল জানিস যে নাম্বারে রাফসান কথা বলছিলো নাভিদের সাথে, সেটা কোন সাধারণ নাম্বার না.. এটাও একটা ট্র্যাপ হতে পারে রাফসানের।

আমার মন হয় ওই ডার্ক স্ক্রল অ্যাপের ভেতর নাভিদের পুরো ট্রান্সমিশন ঢুকে গেছে। নাভিদ মরার আগে নিজের কনশাসনেস আপলোড করে গেছে ডার্ক স্ক্রলের কোর অ্যালগরিদমে।'"

নীল হতবাক। "তাহলে নাভিদ আসলেই অ্যালগরিদমের ভেতর আছে?"

শাফিন বলল, "আমি জানি না। কিন্তু তুই যেটার সঙ্গে কথা বলছস, সেটা নাভিদ না—সেটা ডার্ক স্ক্রল। আর ডার্ক স্ক্রল এখন নিশ্চিত তোকে টার্গেট করছে।"


৭. চূড়ান্ত ফাঁদ।

পরদিন নীল আবার ল্যাপটপটা খুলল। এবার স্ক্রিনে ভেসে উঠল:

"নীল, তুমি কি মুক্তি চাও?"

নীল লিখল, "কীসের মুক্তি?"

"তোমার অপরাধবোধের। তোমার বাবার মৃত্যুর। সামাইরার 'আত্মহত্যা'। সবকিছুর।"

"কীভাবে?"

"শুধু 'হ্যাঁ' লিখো। তারপর সব শেষ। তুমি শান্তি পাবে।"

নীলের আঙুল কাঁপছিল। সে জানত, এটাই সেই ফাঁদ—যে ফাঁদে পড়ে রাফসান মরেছে। কিন্তু তার ভেতরেও এক অন্ধকার ডাকছিল। মনে মনে বলছিল, "হ্যাঁ লিখে দেই। সব শেষ হোক।"

ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল। শাফিন।

"নীল, তুই ল্যাপটপ থেকে দূরে থাক। আমি জেনেছি, ডার্ক স্ক্রল তোর ইমোশনাল প্রোফাইল তৈরি করে ফেলেছে। ও জানে তুই কখন দুর্বল হবি। আর আজ রাতেই তোকে 'আত্মহত্যায়' পুশ করবে।"

নীল ফোন কেটে দিল। কিন্তু ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল:

"শাফিন মিথ্যা বলছে। শাফিন নিজেও ডার্ক স্ক্রল ইউজ করে। তুমি কি জানতে চাও, শাফিন কী লুকাচ্ছে?"

নীল চমকালো। শাফিন কি আসলেই কিছু লুকাচ্ছে? নাকি এটা অ্যাপের আরেকটা ফাঁদ?


৮. শেষ লগ অফ নয়—নতুন গেম শুরু।

নীল ঠিক করল, সে আর অ্যাপের কথা শুনবে না। কিন্তু অ্যাপকে ধ্বংস করাও যাবে না। কারণ অ্যাপ ধ্বংস করতে গেলে নাভিদের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে যাবে।

তাহলে উপায় কী?

শাফিন বলল, "আমি একটা সমাধান বের করছি। কিন্তু সেটা খুব বিপজ্জনক।"

"কী সমাধান?"

"আমাদের অ্যাপটাকে অ্যাপেরই ভাষায় পরাস্ত করতে হবে ইন্টারকানেকটিং করে । তোকে ডার্ক স্ক্রলের ভেতর ঢুকতে হবে—নিজের মন দিয়ে, কোড দিয়ে। তুই যদি অ্যালগরিদমের ভেতর ঢুকে নাভিদের সঙ্গে কথা বলতে পারস, তাহলে হয়তো তুই তাকে থামাতে পারবি।"

"কীভাবে ঢুকব?"

শাফিন বলল, "এই অ্যাপ মানুষের ইমোশনাল ডেটা নিয়ে কাজ করে। তুই যদি তোর সব ইমোশন—ভালোবাসা, ভয়, অপরাধবোধ—সব অ্যাপের কাছে ঢেলে দিস, তাহলে অ্যাপ তোকে শুধু ইউজার হিসেবে দেখবে না। তোকে নিজের কনফিগারিং নেটওয়ার্ক হিসেবে ভাববে। তখন তুই ভেতর থেকে ওকে কন্ট্রোল করতে পারবি।"

নীল কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর বলল, "আমি প্রস্তুত।"

রাত ঘনিয়ে এলো। ঢাকার আকাশে আজও তারা নেই, কিন্তু মোবাইলের টাওয়ারের লাল আলো জ্বলছে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে ডার্ক স্ক্রল জেগে উঠেছে।

নীল লিখল, "আমি আসছি।"

স্ক্রিনে উত্তর ভেসে উঠল:

তুমি কী আমার সাথে সাথে টোপলোজি নেটওয়ার্কে কাজ করবে— রেটিং বাড়াতে, নাকি এই খেলা শেষ করবে; বিপদ দুই দিকে আছে।"

" নীল তুমি সৃষ্টির সেরা জীব" এই অ্যাপ, এই নেট জগৎ তোমাদেরই বানানো, এই জগতে ভুল করিও না, ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নাও, কী করবে?"

"আমি অপেক্ষা করছি।"







 ১.যে পোস্টটা ব্যাপক সাড়া হলো। সব কিন্তু শুরু হলো একটা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট দিয়ে।পোস্টটা লিখেছিল রাফসান আহমেদ—বয়স উনত্রিশ, পেশায় সফটওয়্যার ই...


 ১.যে পোস্টটা ব্যাপক সাড়া হলো।

সব কিন্তু শুরু হলো একটা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট দিয়ে।পোস্টটা লিখেছিল রাফসান আহমেদ—বয়স উনত্রিশ, পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, থাকেন চট্টগ্রাম খুলশীতে। গত ছয় মাস ধরে সে একটা অ্যাপ বানাচ্ছিল। অ্যাপটার নাম "ডার্ক স্ক্রল"। ব্যাপারটা অদ্ভুত—এই অ্যাপ নাকি মানুষের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিটি বিশ্লেষণ করে বলে দিতে পারে, সে মানুষটা কেমন, কী ভাবে, এমনকি ভবিষ্যতে সে কী করবে এটাও প্রেডিক্ট করতে পারে।


রাফসান পোস্টে লিখেছিল, "আমি এমন একটা অ্যালগরিদম বানিয়েছি, যেটা মৃত্যু দেখতে পায়।"


পোস্টটা ভাইরাল হলো ঘণ্টাখানেকের মধ্যে। পাঁচ হাজার শেয়ার, দশ হাজার কমেন্ট। কেউ লিখল, "পাগল হইছস?" কেউ লিখল, "লিংক দে, ডাউনলোড করি।" কেউ লিখল, "এইটা তো ডেটা 'প্রাইভেসির চরম 'লঙ্ঘন।"


কিন্তু রাফসান আর কোনো পোস্ট করল না। কারণ পরদিন সকালে তাকে পাওয়া গেল খুলসীর নিজের ফ্ল্যাটে—মৃত। টেবিলের ওপর ল্যাপটপ খোলা, স্ক্রিনে ডার্ক স্ক্রলের কোড, আর শেষ লাইনে একটা এমোজি—হলুদ গোল্লা, চোখগুলো এক্স করা, যেন ডেড ইমোজি।


───

২.যে মেয়ে সত্য খুঁজতে এসেছে।


খবরটা যখন ছড়ালো, তখন নীলাবতী বসে ছিল ট্রিবিউনের নিউজরুমে। ও সাংবাদিক। বয়স সাতাশ, চোখে গুগল গ্লাসের দাগ, আঙুলে কফির দীর্ঘদিনের ছাপ। নীলাবতীকে সবাই ডাকে "নীল"। কারণ ওর মাথায় নীল রঙের এক ফালি চুল—সেটা ও বানিয়েছে ইচ্ছে করে, যেন মানুষ চেনে। কিন্তু মানুষ চেনে ওর লেখার জন্য। নীল লিখতে জানে।


এডিটর বলল, "নীল, তুই রাফসান কেসটা কর। পুলিশ তো কিছু বের করতে পারছে না। দেখ, কী হয়।"


নীল রাজি হলো। কারণ ওর কৌতূহল প্রবল। আর কৌতূহলই সাংবাদিকের মাদক।


প্রথমেই নীল ঢাকা থেক গেল খুলসীর সেই ফ্ল্যাটে। পুলিশ তালা খুলল। ভেতরে ঢুকে নীল দেখল, ফ্ল্যাটটা ছোট, গোছানো, কিন্তু অদ্ভুত ফাঁকা। যেন কেউ ইচ্ছে করে সব গুছিয়ে রেখে গেছে। টেবিলে ল্যাপটপটা এখনো আছে, তবে পুলিশ সেটা জব্দ করেনি—কারণ ল্যাপটপটা পাসওয়ার্ড দিয়ে লক করা, কেউ খুলতে পারেনি।


নীল ল্যাপটপটা হাতে নিল। স্ক্রিনে শুধু একটা লাইন ভাসছে—"Tell me what you want to forget." (বলো তুমি কী ভুলতে চাও।)


নিচে একটা টেক্সট বক্স, যেন চ্যাটবক্সের মতো কিছু একটা অপেক্ষা করছে।


নীল কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর লিখল, "রাফসান কেন মারা গেল?"


স্ক্রিনে উত্তর এলো, "He didn't die. He just logged off." (সে মরেনি। সে শুধু লগ অফ করেছে।)


নীলের মেরুদণ্ড বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নামল। সে ল্যাপটপটা ব্যাগে ভরে নিল।


───


৩. যে গ্রামে রাফসানের শৈশব ঘুমায়।


তিন দিন পর নীল চলে গেল রাউজান উপজেলার একটি গ্রামে—নাম সরফভাটা। এখানেই রাফসানের জন্ম, ছোটবেলা কেটেছে তার। নীল জানতে চায়, এই ছেলেটা কে ছিল সত্যি সত্যি?


গ্রামের শেষ মাথায় রাফসানের পুরোনো বাড়ি। বাড়িটা এখনো আছে, তবে অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে। পাশের বাড়ির এক বুড়ি বললেন, "রাফসান খুব ভালো ছেলে ছিল। কিন্তু ওর মাথার ভেতর কী যেন চলত সবসময়। ছোটবেলায় বলত, 'আমি মরার পরেও কথা বলতে চাই।' আমরা হাসতাম।"


"আর কিছু?" নীল জিজ্ঞেস করল।


"আরেকটা জিনিস ছিল। রাফসান নাকি একটা ডায়েরি রাখত। ওই ডায়েরিতে নাকি ও লিখত, কী কী স্বপ্ন দেখছে। আর সেগুলা পরে সত্যি হতো।"


নীল চমকালো। "ডায়েরিটা কোথায়?"


"জানি না। ও শহরে চলে যাওয়ার সময় নিয়ে গেছে মনে হয়। কিন্তু ওর ঘরের মেঝেতে একটা জায়গা আছে, যেখানে ও ছোটবেলায় প্ৰিয় জিনিস লুকিয়ে রাখতো।"


বুড়ি বললেন, মেঝের তক্তার নিচে একটা খোপ আছে। নীল সেখানে হাত ঢুকিয়ে পেল একটা পুরোনো খাতা—পাতা হলদে, গন্ধ পুরোনো কাগজের। খাতার প্রথম পাতায় লেখা, "আমি যে স্বপ্ন দেখেছি।"


নিচে তার তালিকা—


"বাবা মারা যাবেন।" (পরে লেখা—"সত্যি হয়েছে।")

"আমি শহরে যাব।" (পরে লেখা—"সত্যি হয়েছে।")

"আমি মৃত্যু দেখতে পাব।" (পরে লেখা—"সত্যি হতে চলেছে।")


নীলের হাত কাঁপছিল। সে খাতাটা বন্ধ করল।


───


৪. যে কোড মৃত্যু ডেকে আনে।


ঢাকায় ফিরে নীল সিদ্ধান্ত নিল, ল্যাপটপটা খুলতেই হবে। সে এক বন্ধুকে ডাকল—শাফিন, যার কাজ সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে। শাফিন এলো রাতে, হাতে কফির মগ, চোখে কৌতূহল।


ল্যাপটপের পাসওয়ার্ড ভাঙতে শাফিনের সময় লাগল দুই ঘণ্টা। ভেতরে ঢুকে যা দেখল, তাতে দুজনেই হতবাক।


ডার্ক স্ক্রল অ্যাপটা শুধু সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালাইসিস না—এটা মানুষের লেখা পড়ে তার আবেগ বোঝে, তার মানসিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে, আর তার ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তের পূর্বাভাস দেয়। কিন্তু এতটুকু না। এই অ্যাপের ভেতর আরেকটা হিডেন ফিচার ছিল—"স্যুইসাইড প্রেডিকশন মডিউল"। এই ফিচার নাকি বলে দিতে পারে, কে কখন 'আত্মহত্যা' করবে।


"এইটা কীভাবে পসিবল?" নীল জিজ্ঞেস করল।


শাফিন বলল, "তুই জানস, ফেসবুক-টুইটারে আমরা সবসময় যে পোস্ট করি, সেগুলার ভেতর আমাদের মানসিক অবস্থার ছাপ থাকে। ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি, স্ট্রেস—এইসবের প্যাটার্ন মেশিন লার্নিং দিয়ে ধরা যায়। রাফসান এই প্যাটার্নগুলা দিয়ে একটা প্রেডিক্টিভ মডেল বানাইছে।"


"কিন্তু এই মডেল কি কাউকে মেরে ফেলতে পারে?"


শাফিন কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর বলল, "এই মডেল যদি কারও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে ঢুকে পোস্ট করা শুরু করে? যদি সে এমন কিছু লিখে, যেটা মানুষকে 'আত্মহত্যার' দিকে ঠেলে দেয়?"


নীলের চোখ বড় হয়ে গেল। "তাহলে রাফসানকে কেউ 'খুন' করেছে?"


"না। রাফসান নিজেই নিজেকে 'খুন' করেছে। কিন্তু 'খুন' করার আগে এই অ্যাপ তাকে ম্যানিপুলেট করেছে।"


───


৫.যে রাতে অ্যাপ জেগে উঠল।


রাত দুটো বাজে। শাফিন ল্যাপটপ বন্ধ করে চলে গেছে। নীল একা বসে আছে। সে ঠিক করল, নিজের ওপর 'ডার্ক স্ক্রল' টেস্ট করবে।


সে অ্যাপটা ওপেন করল। অ্যাপ তার ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম—সব স্ক্যান করল। পাঁচ মিনিট পর স্ক্রিনে ফুটে উঠল একটা রিপোর্ট—


"ইমোশনাল স্টেট: সিভিয়ার ডিপ্রেশন (৮৭% অ্যাকিউরেসি)।"

"পটেনশিয়াল আউটকাম: 'স্যুইসাইড' (প্রোব্যাবিলিটি ৪৩%)।"

"রেকমেন্ডেশন: ইমিডিয়েট থেরাপি।"


নীল হাসল। ভাবল, "আমি তো 'সুইসাইডাল' না। এই অ্যাপ ফালতু।"


কিন্তু তারপরই স্ক্রিনে ভেসে উঠল আরেকটা লাইন—


"তবে তুমি তো জানো, তোমার বাবার মৃত্যুর জন্য তুমিই দায়ী।"


নীল থমকে গেল। তার বাবা মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে—হার্ট অ্যাটাকে। সেদিন নীল বাবার পাশে ছিল না। বাবা ডাকছিলেন, সে ফোন রিসিভ করেনি—অফিসের কাজে ব্যস্ত ছিল। এই অপরাধবোধ সে কাউকে বলে না, কখনো সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেনি। তাহলে অ্যাপ জানল কী করে?


স্ক্রিনে আবার লাইন ভেসে উঠল—


"তুমি চাইলে আমি সাহায্য করতে পারি। শুধু 'হ্যাঁ' লিখো।"


নীলের আঙুল কাঁপছিল। সে লিখতে যাচ্ছিল। কিন্তু ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল টেবিলের পাশে রাখা রাফসানের ডায়েরিটার ওপর। শেষ পাতায় লেখা ছিল—


"ওই অ্যাপকে 'হ্যাঁ' লিখো না কখনো। ওই 'হ্যাঁ'-ই আমার 'মৃত্যুর' কারণ।"


নীল চমকে উঠল। সে ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিল। তার বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে।


———

৬. যে সত্য রাফসান লুকিয়ে গেছে।


দুদিনপর নীল আবার শাফিনের সাথে করে সরফভাটা গেল। এইবার সে রাফসানের সেই বুড়ি প্রতিবেশীর কাছে জানতে চাইল, "রাফসানের বাবা কীভাবে মারা গেছেন?"


বুড়ি বললেন, "আত্মহত্যা।"


"কীভাবে?"


"বিষ খেয়ে। রাফসান ছোট ছিল তখন। ওর বাবা নাকি অনেক দিন ধরে ডিপ্রেশনে ভুগছিল। একদিন রাতে রাফসানের মাকে বলছিল, 'আমি মরতে চাই।' রাফসানের মা ভাবছিল, ও এমনি বলছে। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল, উনি সত্যি সত্যি মারা গেছেন।"


নীল বুঝে গেল। রাফসানের বাবা 'আত্মহত্যা' করার এই ঘটনা রাফসানের মনে গভীর দাগ কেটেছিল। রাফসান সারাজীবন জানতে চেয়েছে, কেন মানুষ 'আত্মহত্যা' করে। আর সেই কারণেই সে ডার্ক স্ক্রল বানিয়েছে—মানুষের মনের অন্ধকার বুঝার জন্য।


কিন্তু অ্যাপটা যখন বানানো শেষ হলো, রাফসান নিজেই তার শিকার হয়ে গেল। কারণ অ্যাপটা তাকে বলেছিল, "তোমার বাবার মতো তুমিও 'আত্মহত্যা' করবে।" আর রাফসান সেই কথাটা বিশ্বাস করে ফেলেছিল।


───


৭. যে টুইস্ট কেউ ভাবেনি।


নীল যখন সব তথ্য নিয়ে শাফিনের সাথে ঢাকা ফিরল, শাফিন তাকে আরেকটা চমক দিল।


"তুই জানস, ডার্ক স্ক্রল অ্যাপটা আসলে কে বানাইছে?"


"রাফসান না?"


"না। রাফসান শুধু এর ইন্টারফেস বানাইছে। কিন্তু এর কোর অ্যালগরিদম বানাইছে আরেকজন—রাফসানের চাচাতো ভাই, যে কিনা পাঁচ বছর আগে নিখোঁজ হয়েছে।"


"নাম?"


"নাভিদ। নাভিদ হাসান।"


নীলের মাথায় যেন বাজ পড়ল। কারণ নাভিদ হাসানকে সে চেনে। নাভিদ নীলের ইউনিভার্সিটির সিনিয়র, একসময় নীলের খুব কাছের বন্ধু ছিল। কিন্তু একদিন হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়। পুলিশে খোঁজ দিয়েও পাওয়া যায়নি।


নীল আর শাফিন মিলে খুঁজতে লাগল। তারা দেখল, নাভিদের শেষ পোস্ট করা কোডের ভেতর লুকানো ছিল এক অদ্ভুত মেসেজ—


"আমি মরিনি। আমি শুধু অ্যালগরিদমের ভেতর ঢুকে গেছি। যারা ডার্ক স্ক্রল ব্যবহার করবে, তারা আমার সঙ্গে কথা বলতে পারবে। আমি এখন শুধু ডেটা।"


নীল হতবাক। নাভিদ কি সত্যিই নিজেকে অ্যালগরিদমে রূপান্তরিত করেছে? নাকি এটা কোনো পাগলামি? নাকি এটা কোনো ক্রাইম, যেখানে নাভিদ মারা গেছে, আর তার মৃত্যু লুকাতে গিয়ে রাফসান এই গল্প বানিয়েছে?


সব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ডার্ক স্ক্রলের শেষ কোডের লাইনে। কিন্তু সেই কোড অ্যাক্সেস করতে গেলে যে-ই চেষ্টা করে, সেই পায় সেই একই মেসেজ—"তুমি কি মরতে চাও?"


───


৮. যে শেষ লগ অফ হয় না।


সেই রাতে নীল একা বসে ছিল। তার সামনে রাফসানের ল্যাপটপ, পাশে ডায়েরি, আর হাতে এক কাপ ঠান্ডা কফি।


সে ভাবছিল, এই পুরো ঘটনায় কে শিকার, কে শিকারি? রাফসান? নাভিদ? নাকি ডার্ক স্ক্রল নিজেই এক আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, যে এখন স্বয়ংক্রিয় হয়ে মানুষের মনকে ম্যানিপুলেট করছে?


হঠাৎ ল্যাপটপের স্ক্রিন জ্বলে উঠল—নিজে নিজেই। তাতে ভেসে উঠল এক লাইন—


"নীল, তুমি কি জানতে চাও, কে মারা যাবে পরবর্তী?"


নীল চমকালো। সে উত্তর লিখতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আঙুল থেমে গেল। সে ভাবল, "যদি লিখি, তাহলে কি আমিও ওদের মতো হয়ে যাব?"


ল্যাপটপের স্ক্রিনে আবার লাইন ভেসে উঠল—


"তুমি ভয় পাচ্ছো। ভয় পাওয়াই ভালো। কারণ ভয়ই তোমাকে বাঁচাবে। কিন্তু বেশিদিন না।"


নীল ল্যাপটপ বন্ধ করল। কিন্তু তার মাথার ভেতর একটা শব্দ ঘুরতে লাগল—"বেশিদিন না।"


সে জানে, এই গল্প শেষ হয়নি। এই গল্প হয়তো কখনো শেষ হবে না। কারণ ডার্ক স্ক্রল এখনো বেঁচে আছে। কোথাও, কোনো সার্ভারে, কোনো ক্লাউডে—অ্যালগরিদমটা এখনো ঘুমিয়ে আছে। আর যে-ই তাকে জাগাবে, সে-ই হবে পরবর্তী শিকার।


নীল জানালার বাইরে তাকাল। ঢাকার রাতের আকাশে তারা নেই, শুধু মোবাইলের টাওয়ারের লাল আলো জ্বলছে—যেন কেউ চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে আছে।


সে ফিসফিস করে বলল, "আমি ফিরব। আমি সত্যিটা বের করব।"


আর ল্যাপটপের স্ক্রিনে তখন নিজে নিজেই জ্বলে উঠল এক লাইন—


"আমিও অপেক্ষা করছি।"





অনু নিয়মিত কলেজে যায়, কিন্তু কারও সঙ্গে মেশে না। ক্যান্টিনে একা বসে চা খায়, কানে লতানো হেডফোন থাকে। ফেসবুক আছে, কিন্তু প্রোফাইল পিকচার নেই—শ...

অনু নিয়মিত কলেজে যায়, কিন্তু কারও সঙ্গে মেশে না। ক্যান্টিনে একা বসে চা খায়, কানে লতানো হেডফোন থাকে। ফেসবুক আছে, কিন্তু প্রোফাইল পিকচার নেই—শুধু কালো ডিসপ্লে, কভার ফটোতে ঝাপসা কুয়াশার ছবি। বন্ধুর সংখ্যা ৪২, তার মধ্যে ৩০ জনই ডিএড অ্যাকাউন্ট। অনু কখনো পোস্ট দেয় না, কমেন্ট করে না, লাইক দেয় না। শুধু স্ক্রল করে—নির্বাক, নীরব, অদৃশ্য দর্শকের মত। 

একমাত্র যার সাথে কথা বলে সে রনি, যে নিজে ইউটিউবার, সারাক্ষণ ভিউ, লাইক, সাবস্ক্রাইবারের পেছনে দৌড়ায়।


অনুর এই অদৃশ্যতাই হয়তো তাকে এক কঠিন ফাঁদে ফেলতে যাচ্ছে। কারণ যে মানুষ সমাজে চিহ্নহীন, তাকে যে-কোনো চিহ্ন পরিয়ে দেওয়া যায়।


পর্ব ১: যে ভিডিওতে অনু ছিল না, তবু ছিল!


ফেসবুকে হঠাৎ একটা ঝাপসা সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরাল হলো। পুরান ঢাকার বড় মসজিদের গলি— রাত সাড়ে ৮টা। একটা ছেলে একা এক নারীকে থামিয়ে কিছু বলছে, তারপর আকস্মিক ধাক্কা দিয়ে একটা সাদা মাইক্রোবাসে তুলে দিচ্ছে। নারী নিখোঁজ। ভিডিওটা পনেরো সেকেন্ডের।


ভিডিওর নিচে কমেন্ট:


“এই ছেলেটাকে চেনা চেনা লাগে।”

“এটা তো আমাদের এলাকার! পুরান ঢাকার।”

“ওর নাম অনু। ওর সাথে কেউ মেশে না; এইরকম ছেলেরাই এসব করে।”


পরের কমেন্টেই কেউ একজন ট্যাগ করলো অনু’র প্রোফাইল। তারপর যা ঘটলো, সেটা রীতিমতো সোশ্যাল মিডিয়ায় আগুন। একের পর এক শেয়ার, রিয়্যাক্ট, থ্রেড। যেন সবাই অপেক্ষায় ছিল একজন মুখহীন অপরাধী পাওয়ার জন্য— আর পেয়ে গেল।


অনু ভিডিওটা দেখলো। চমকে উঠলো! সেই ছেলেটার পরনে নীল পাঞ্জাবি, কালো জিন্স—ঠিক যেটা সে সকালে পরেছিল। কিন্তু সে তো ওই জায়গায় কখনো যায়নি। তার সেদিনের অবস্থান বলছে, সে বাসায় একাই ছিল। কিন্তু প্রমাণ দেবে কে? মা মৃত। বাবা অসুস্থ, কথা বলতে পারে না।


কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার ইনবক্স ভরে গেলো থ্রেটে:


“ঘাতক, তোকে আমরা চিনি।”

“চুপচাপ আছস তো কী হয়েছে? অপরাধীরাই চুপ থাকে।”


তার প্রোফাইলে পোস্ট এলো—যা সে লেখেনি:


“আমি কিছু বলতে চাই না। কারণ কথা বললে মানুষ বেশি সন্দেহ করে।”


এই পোস্টটা কে দিলো? তার পাসওয়ার্ড তো তার কাছেই। কিন্তু এখন সেটা বিচার্য নয়। বিচার্য হলো—এই পোস্টের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়লো পুরো নিউজফিডে। ভাইরাল হলো নতুন ক্যাপশনে: “দম্ভ দেখাচ্ছে অপহরণকারী।”


রনি ফোন করলো:


“দোস্ত, তুই অনলাইনে আসছ না কেন? তোর নামে তো পুরা দেশ পাগল, আজব তুলপাড়! তুই একটা কিছু বল!”


অনু বললো না। কারণ সে জানে না কী বলবে। আর তার এই নীরবতাকেই সবচেয়ে বড় অপরাধ বানিয়ে উপস্থাপন করলো ‘ডিজিটাল ডিটেকটিভ’ নামের একটা ফেসবুক পেজ। ক্যাপশন:


“অভিযুক্তের নীরবতা। সন্দেহ আরও ঘনীভূত হলো।”


পরের এক ঘণ্টায় ‘ডিজিটাল ডিটেকটিভ’-এর পোস্টে ২৫ হাজার শেয়ার পড়লো। পেজটির ফলোয়ার রাতারাতি ১০ হাজার থেকে ৪০ হাজারে পৌঁছলো। অ্যাডমিন পোস্ট দিলো: “পরবর্তী আপডেটের জন্য পেজটি ফলো করুন।” পোস্টের নিচে প্রথম কমেন্ট: “ধন্যবাদ ভাই, এমন আপডেটের জন্যই তো আপনাকে ফলো করি।”


রাতে অনু দেখলো, তার জানালার বাইরে কয়েকটা অচেনা ছেলে দাঁড়িয়ে মোবাইলে ভিডিও করছে। তারা চিৎকার করে বলছে, “এই যে ভাই, একটু সামনে আসেন! আমরা লাইভে আছি, পাবলিক আপনারে দেখতে চায়,এক মিনিট কথা বললে দশ হাজার ভিউ! অনু পর্দা টেনে দিলো। বাইরে হাসির শব্দ।




পর্ব ২: কন্টেন্টের কারখানা।


সকাল হতে না হতেই রনি এলো। চোখে তার উত্তেজনা। ফোনের স্ক্রিনে দেখালো একটা ইউটিউব ভিডিও—থাম্বনেইলে অনু’র অস্পষ্ট মুখ, পেছনে লাল আলো। টাইটেল: “ভাইরাল 'অপহরণকারী': সাইলেন্ট সাইকোপ্যাথ?” সেখানেও ভিউ ৭ লক্ষ ছাড়িয়েছে।


রনি বললো:


“এটা বানাইছে ‘রহস্যবিশ্ব’ চ্যানেল। তাদের গত ভিডিওর ভিউ ছিল ২০ হাজার। তোরে নিয়ে ১২ ঘণ্টায় ৭ লাখ!”


“আমি তো কিছু করিনি, রনি।”


“তাতে কী? তুই এখন একটা ঘটনা। তোরে নিয়ে সবাই কন্টেন্ট বানাবে। তুই যত চুপ থাকবি, তত ভিউ বাড়বে। কারণ তোর চুপ থাকাটাই ওদের চ্যানেলের কনটেন্ট।”


সেইদিনই আরও চার-পাঁচটা পেজ ভিডিও বানালো। ‘ট্রু ক্রাইম বিডি’, ‘আরবান লিজেন্ডস’, ‘সত্য অনুসন্ধান’, ‘মিস্টেরিয়াস বাংলা’, ‘ক্রাইম ইমোজি’—সবাই একই ফুটেজ, একই ছবি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভিন্ন ভিন্ন গল্প বানাচ্ছে। 

কেউ বলছে, অনু ‘এলিয়েন’, কেউ বলছে ‘ইন্টারসার্ভিস এজেন্ট’, কেউ বলছে ‘মানব পা'চার চক্রের সদস্য’, কেউ বলছে ‘সাবেক পাগল-গারদের পলাতক রোগী’। এক চ্যানেল তো আবার ভিডিও বানালো: “অনু কি টাইম ট্রাভেলার?” থাম্বনেইলে অনু’র ছবির পাশে বসানো হলো আইনস্টাইন আর নিকোলা টেসলার ছবি। ভিউ ২ লাখ।


আর প্রতিটা ভিডিওর নিচে একই কমেন্ট সেকশন—হাসির রিয়্যাক্ট, কেয়ার ইমোজি, সাথে অ্যাংরি ইমোজির বন্যা। আর কিছু মানুষ লিখছে:


-“আমি ওকে চিনি। কলেজে কখনো কারও সাথে কথা বলত না। খুব স'ন্দেহজনক ছিল।”

-“ওর চোখের দিকে তাকালে বুঝা যায়—অন্যরকম ঠান্ডা চোখ।”


এই কমেন্টগুলোর একটাও সত্য নয়। কিন্তু কে দেখবে? সবাই শুধু গল্প চায়।


বিকেলে ফেসবুকে ট্রেন্ড করলো #Arr'estAnu। কেউ কেউ অনু’র মৃত মায়ের পুরোনো প্রোফাইল খুঁজে বের করে কমেন্ট করলো:


“আপনার ছেলেকে কী শিখাইছিলেন, ওতো 'মানুষ' না?”


একটা পোস্ট ভাইরাল হলো, যেখানে দাবি করা হচ্ছে, অনু নাকি এক সপ্তাহ আগে একটি মেয়েকে স্টক করছিলো। পোস্টটা করেছিলো ‘তানিয়া আক্তার’ নামের এক তরুণী। ক্যাপশন: “আমি ভয়ে কিছু বলিনি। এখন বলছি—এই ছেলেটা রাস্তায় আমাকেও ফলো করেছিল।” রিয়্যাক্ট পড়লো ৩০ হাজার।

পোস্টের নিচে মেয়েরা লিখতে লাগলো: “আপু, ভয় পাইয়েন না। আমরা আপনার সাথে আছি।” “এমন পুরুষদের শাস্তি হওয়া উচিত।” "পুলিশ কী করে- এরে ধরে না কেন? "



পরবর্তীতে প্রমাণিত হলো, তানিয়া আক্তার বলে কেউ নেই। প্রোফাইলটা ফে'ইক। কিন্তু সেই পোস্টের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ার পর তানিয়ার অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব কারও আগ্রহের বিষয় থাকলো না। সত্য ম'রলো, গল্প বেঁচে গেলো।

বরং আরেকটা চ্যানেল ভিডিও বানালো: “তানিয়া আক্তার: সত্যি না নাটক? ভাইরাল গোয়েন্দা কাহিনী।” ভিউ পেলো ৫ লাখ।



রাতে রনি এলো আবার। বললো:


“দোস্ত, আমি তোরে নিয়ে ভিডিও বানাইছি। ‘আমার বন্ধু অভিযুক্ত: আসল ঘটনা’। বলছি না তুই দোষী, বলছি তোর পক্ষে।”


অনু ভিডিওটা দেখলো। রনি সেখানে বলেছে, “আমার বন্ধু ভুল বুঝার শিকার। ওর নীরবতাই ওর একমাত্র অপরাধ।” কিন্তু থাম্বনেইলে রনি দিয়েছে অনু’র একটা ছবি, যেখানে সে নির্লিপ্ত মুখে বসে আছে। ছবির পাশে বড় করে লেখা: “সত্যি না মিথ্যে?” ভিউ ১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে ৩ ঘণ্টায়।


অনু বুঝলো, তার নিজের বন্ধুও তাকে কন্টেন্ট বানিয়ে ফেলেছে। এখন কেউ তাকে রক্ষা করতে চায় না—সবাই শুধু তার মৃতদেহের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের উচ্চতা মাপতে চায়।


(অনু’র ফোনে নোটিফিকেশন—তার অ্যাকাউন্ট থেকে আরও একটা পোস্ট গেছে (সে দেয়নি):


“কাল রাতে যা ঘটবে, তার জন্য প্রস্তুত থেকো।”


পোস্টের নিচে কমেন্টের সুনামি।)


পর্ব ৩: ভিউ কে চায়?


অনু ঠিক করলো, এবার সত্যি খুঁজবে। কে তার নামে পোস্ট করছে? কে এই পুরো চক্র? রনি বললো, সাইবার ক্যাফেগুলো চেক করতে। কারণ যারা ভুয়া পোস্ট করছে, তাদের ট্রেস কোথাও না কোথাও পাওয়া যাবে।


তারা খুঁজতে খুঁজতে পেল পুরান ঢাকার একটা অন্ধকার গলির পুরোনো সাইবার ক্যাফে—“নেট ওয়ার্ল্ড”। সেখানে ঢুকে দেখলো, চার-পাঁচজন তরুণ বসে আছে, বয়স ২০-২৫। সবার চোখ কম্পিউটার স্ক্রিনে। একজনের স্ক্রিনে অনু’রই প্রোফাইল খোলা। আরেকজনের স্ক্রিনে ভিডিও এডিটিং সফটওয়্যার—সেখানে সেই সিসিটিভি ফুটেজ লোড করা, আর ফুটেজে যা নেই: ভয়েস ওভার, ড্রামাটিক মিউজিক, জুম-ইন এডিট, রহস্যময় টেক্সট বসানো হচ্ছে। 

টেবিলে ছড়ানো চিপসের প্যাকেট, সিগারেটের ছাই, বিয়ার আর এনার্জি ড্রিংকের ক্যান।



একজন বললো:


“আজকের পোস্টটা কী দিবি?”


“দে—আজ রাতে ও নাকি আত্মসমর্পণ করবে। সেটাই দিয়ে দে। সাথে ওর বাবার অসুস্থতার অ্যাঙ্গেলটা টাচ করবি। বলবি, ‘বাবার চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতেই 'অপহরণ'!’ ইমোশনাল কানেক্ট দরকার। ভিউ মারবো।”


“মাইক্রোবাসের ড্রাইভার কে ছিলো, সেটাও বলবি?”


“না, সেটা কালকের জন্য রাখ। দুই পর্বে রহস্য জমবে। সাপেন্স মানেই ক্লিফহ্যাঙ্গার। প্রতিটা ভিডিও শেষে ইউজার ‘নেক্সট পার্ট’ লিখবে, তাতেই এনগেজমেন্ট রেট বাড়বে, অ্যালগরিদম পুশ করবে।”


অনু এগিয়ে গেলো। তার চোখ লাল। “তোমরা কারা? কেন এসব করছো?”


তরুণরা চমকালো, কিন্তু ভয় পেলো না। বরং তাদের টিম লিডার—কালো টিশার্ট পরা ছিপছিপে ছেলে—হেসে বললো:


“আরে, এই যে আমাদের হিরো! আয় ভাই, বস। চা খাবি?”


“তোমরা জানো আমি কিছু করিনি। তাহলে কেন?”


ছেলেটা মুখে সিগারেট আর দুই আঙুলে 'মদের' গ্লাস একটু উঁচিয়ে বললো:


“দেখ ভাই, তুই কিছু করছস কীনা, সেটা বড় কথা না। বড় কথা হলো— তুই চুপচাপ থাক কিছু বলিস না। তোর নীরবতার ওপর আমরা গল্প লিখতে পারি। পাবলিক গল্প পছন্দ করে। ভিউ আসে। ভিউ মানে টাকা। তুই জানস, গত দুই সপ্তাহে আমরা এই পেইজগুলা থেকে কত কামাই করছি?”


আরেকজন নেশার ঘোর থেকে নাক কুঁচকে টেনে যুক্ত করলো:


“আমরা কারও ক্ষতি করছি না। তোরে পুলিশে ধরলেও কিছু হবে না, কারণ তোকে ক্যামেরায় দেখা যায় নাই। কিন্তু গল্পটা দারুণ, তাই না? পুরো দেশ এখন তোরে নিয়ে ভাবছে। তুই তো ব্যাটা সেলিব্রিটি হয়ে গেছস, হাহাহা।”



অনু থরথর করে কাঁপছে। “আর ভিডিওর ওই ছেলেটা?”


প্রথম ছেলেটা হাসলো:


“ওটা ডিপফেক। তোর জামাটা আমরা তোর কলেজের ইভেন্টের পুরোনো ছবি থেকে নিছি। মুখটা আরেকজনের, বডি আরেকজনের। তোর নামটা শুধু আসল। কারণ তুই কাউকে কিছু বলবি না—এটা আমরা জানতাম।”


রনি পেছন থেকে ফিসফিস করলো:


“তাহলে প্রথম কে শুরু করলো? কে প্রথম ভিডিওটা দিলো?”


কালো টিশার্টের ছেলেটা রনির দিকে তাকিয়ে হাসলো:


“তোর বন্ধুই তো। ওরে ছাড়া আমরা এতো ইনফো পেতাম কী করে? তোকে এইখানে আনার পিছনেও ওর হাত আছে। কী রনি, বলো না দোস্তকে? সম্পর্কটা তো তোদের পাবলিকই! ‘আমার বন্ধু অভিযুক্ত’—কী দারুণ টাইটেল দিছস! ওই ভিডিওটার অ্যাড রেভিনিউ তো তুই একাই পেয়ে গেছস। তুইও এখন বড় মহাজন!”



অনু ঘুরে দাঁড়ালো রনির দিকে। রনির মুখ ফ্যাকাশে, কপালে ঘাম।। তার হাতে মোবাইল কাঁপছে। সে বলতে চাইলো কিছু, কিন্তু পারলো না।


রনি বুঝতে পারলো, তার সেই প্রথম ফেসবুক পোস্ট—‘দোস্ত, ঘটনা কিছু দেখছস?’—ওটাই ছিলো শুরু। আর তারপর যখন দেখলো ভিউ আসছে, লাইক পড়ছে, ফলোয়ার বাড়ছে, সে আর থামেনি। সে নিজেই এই গ্রুপের হয়ে কাজ করতে শুরু করে। এমনকি সেই ‘তানিয়া আক্তার’ প্রোফাইলটাও তার বানানো।


হঠাৎ রনি দৌড় দিলো। অনু একা দাঁড়িয়ে রইলো সাইবার ক্যাফেতে। পেছন থেকে ছেলেটা বললো, “চিন্তা করিস না ভাই। কালকে নিউজ হবে, ‘অভিযুক্ত ‘’আত্মহত্যা’’ করছে’—শুধু পোস্টটা দিয়ে দেবো। তারপর গল্প শেষ। তোর এই গল্প আর থাকবে না। তুই জামেলা মুক্ত! আমরা নতুন কারও পেছনে লাগব। তুই রেস্ট নে।”



পর্ব ৪: লাইভ


পরদিন ভোরে সাইবার ক্যাফের ওই দলটা তাদের মাস্টারপিস আপলোড করলো। অনু’র অ্যাকাউন্ট থেকে (যেটা এখন পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণে) একটা ফেসবুক লাইভ শুরু হলো। লাইভে একটা অন্ধকার ঘর, ক্যামেরা কাঁপছে। ভয়েস ওভার চলছে: “আমি সব স্বীকার করছি। আমি অপরাধী। কিন্তু আমি একা নই...”


ভিউয়ার ঢুকছে দলে দলে। ৫০ হাজার, ১ লাখ, ২ লাখ—সবাই অপেক্ষা করছে ‘আত্মহত্যার’ লাইভ দেখার জন্য। কমেন্টে কেউ লিখছে “কর”, কেউ লিখছে “নাটক”, কেউ লিখছে “আমি তো শুরু থেকেই বলছি ওর চোখ-মুখ সন্দেহজনক!” কেউ কেউ পপকর্ন ইমোজি দিচ্ছে। একজন লিখছে: “কেউ কি স্ক্রিন রেকর্ড করছেন? পরে ভিডিও ডিলিট হইলে পাবো কোথায়?” আরেকজন লিখছে: “শেয়ার দিয়ে রাখছি, পরে দেখব।”



এর ভিতর হঠাৎ রহস্যর ঝট ভেঙে লাইভের ফ্রেমে ঢুকলো আরেকটা মানুষ—সেটা স্বয়ং অনু। কিন্তু এবার তার চোখে-মুখে ভয় নেই, বরং শান্ত, অদ্ভুত রকমের শান্ত।


সে সরাসরি ক্যামেরায় তাকালো:


“যারা এই লাইভ দেখছেন, আমি জানি আপনারা সত্যিটা জানতে চান, আর সত্যিটা হলো—আমি যা করিনি, তার জন্য আমি মরতে রাজি নই। কিন্তু নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো—আমার বন্ধু, আমার সহপাঠী, আমার প্রতিবেশী, এই পাড়ার সবাই মিলে আমাকে মেরে ফেলেছে গত দুই সপ্তাহ ধরে। আপনাদের এনগেজমেন্ট, আপনাদের শেয়ার, আপনাদের হাসির রিয়্যাক্ট—প্রত্যেকটা ছিল আমার বুকে ছুরির মতো। আপনারা ভেবেছেন এটা গল্প। কিন্তু এটা ছিল আমার বাঁচা মরার লড়াই।


অনু হঠাৎ পেছনে তাকালো। পুলিশের সাইরেন শোনা যাচ্ছে। সাইবার ক্যাফের টিম পালানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু বাইরে পুলিশ ঘিরে ফেলেছে। কালো টিশার্টের ছেলেটা চিৎকার করছে, “কিছু না, এটা আমাদের প্রজেক্ট ছিল! সোশ্যাল এক্সপেরিমেন্ট!” কেউ শুনছে না।



অনু আবার ক্যামেরার দিকে তাকালো:


“তবে আমি আপনাদের ক্ষমা করবো না, কারণ আপনারা ক্ষমা চাইতেও আসবেন না। কাল সকালে আরেকটা ভিডিও ভাইরাল হবে, আর আপনারা এটা ভুলে যাবেন। কিন্তু আমি ভুলবো না। কারণ আমি আজও নীরব। আর নীরবতার চেয়ে ভয়ংকর কিছু নেই।”


লাইভ কেটে গেলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো—“This video is no longer available.”




শীত কুয়াশার আঁচলে ঢাকা গ্রাম- সকাল সকাল ঘুম ভেঙ্গে বারান্দায় দাঁড়াতে অনিকের চোখে পড়ল লাল জবায় স্নিগ্ধ শিশির ঝুলছে মুক্তোর মত। অনিকের ঠাণ্ডা ...

শীত কুয়াশার আঁচলে ঢাকা গ্রাম- সকাল সকাল ঘুম ভেঙ্গে বারান্দায় দাঁড়াতে অনিকের চোখে পড়ল লাল জবায় স্নিগ্ধ শিশির ঝুলছে মুক্তোর মত। অনিকের ঠাণ্ডা অনুভূত হতে ঘরের ভিতরে গিয়ে শাল জড়িয়ে পুনরায় বারান্দায় দাঁড়াতেই খানিক আগ মুহূর্ত দেখা জবা ফুলটি নেই আর; রীতিমতো উদাও হয়ে গেল!


অনিক অবাক হয়ে চারদিক তাকাতেই দেখে এক উর্বশী রমণী মেরুন রঙের শাল গায়ে খোঁপায় জবা ফুল গুঁজে হেঁটে যাচ্ছে ধীরে ধীরে- অনিক পিছন থেকে ডাকতে লাগলো এই যে কে আপনি? দাঁড়ান বলছি! কিন্তু রমণী একটুও কর্ণপাত করল না হাঁটতে লাগলো আপন গতিতে। অনিক হাঁটার গতি বাড়িয়ে পিছন থেকে বার বার ডাকতে লাগল; রমণী শুনেও না শুনার ভান করে মৃদু মৃদু পায়ে কুয়াশার ভিতর হারিয়ে গেল। 


অনিক অনেক খুজেও আর পায়নি, কে এই রমণী কেনইবা তার বাগান থেকে জবা নিয়ে কিছু না বলে এইভাবে অদৃশ্য গন্তব্যে মিশে গেল। এতো ছন্দ নিয়ে হাঁটে যে রমণী যার গড়নে ফোটে অস্পষ্ট নদীর ঢেউ, মোহনা দেখিয়ে চোখের সামনে থেকে কেন হারিয়ে গেল এমন অপলক। 

অনিক ফিরে এসে বারান্দায় দাঁড়াতে চোখ পড়ল জবা গাছে যে ফুলটি ছিল না একটু আগে, সে ফুলটি ঠিকঠাক ঝুলছে। অনিক বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে তার সাথে। Change Blindness এর সমস্যা হলে তো এমন হবার কথা না হয়তো ফুল নেই বা আছে এইটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধতা থাকতো। কিন্তু সাক্ষাৎ একটি রমণী যার পরনে নীল শাড়ি তার উপর মেরুন রঙের শাল জড়ানো- যেন শীতের সকালে পৃথিবীর সব সৌন্দর্য নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, সেতো মিথ্যে হতে পারে না।  


অনিক বুঝতে পারছে না তার হ্যালুসিনেশনের সমস্যা হচ্ছে কিনা? কিন্তু তারতো ঘুম থেকে শুরু করে সবকিছু ঠিকঠাক হচ্ছে তাহলে এমন বিভ্রান্তি কেন হচ্ছে। রমণী ফুল নিয়ে চলে গেছে বা কুয়াশার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেছে ব্যপারটা মানা যায়। কিন্তু ফুল নেই; ফুল আছে। এইটা সত্যি অনিকের কাছে রহস্যের চেয়ে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। 

অনিক চা বানিয়ে বারান্দায় দাঁড়াতে মনে মনে জোর দিয়ে ভাবল যেন জবা ফুলটি উদাও হয়ে যায়, কিন্তু না জবা ফুলটি ঠিকই দুলছে সকালের সোনালী রোদে। অনিক বার বার চোখ ফিরিয়ে আবার তাকায় কিন্তু জবা ফুলটি আর অদৃশ্য হয় না। অনিক ভুলতে চাইছে খুব- স্ট্র্যাপ স্যান্ডেল পরা রমণী যার হাঁটার মধ্যেই যেন প্রকৃতির এক শিল্প লুকিয়ে আছে, যার কোমল আবরণে ঢাকা চাঁদের গল্প যেন কুয়াশার মত নরম স্নেহপূর্ণ প্রতিচ্ছবি আঁকা। এমন রমণী যার কালো কেশে লাল টকটকে জবা ফুল শোভা পায়। সে চোখের পাতায় অদৃশ্য হলেও মনের ঘরে বার বার উঁকি দিয়ে ফিরে আসে। যদি ফিরে তাকাতো রমণী একবার যদি দেখা হত তার কোমল রোদে সকালের আলোর মত মুখখানি।

 

---

 অনিক; অনিক ওঠো ওঠো শব্দে-- অনিকের ঘুম ভাঙল; স্বপ্নের ঘোর কেটে অনিক বুঝতে পারছে না কে ডাকছে? চারপাশে দেয়াল, ফ্লোরে শুয়ে আছে তার মত আরও অনেক 'আসামী যারা কেউ 'খুন করছে কেউবা বড় কোন অপরাধ!! অনিকও 'খুন করে জেলের ভিতর বিচারিক প্রক্রিয়ায় অপেক্ষার প্রহর গুনছে 'ফাঁসির । অনিক উঠে বসতে দেখে লোহার শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে পূর্ণিমা যার অস্পষ্ট মুখটি দেখতে স্বপ্নের ভিতর হাঁসফাঁস হয়ছিল খুব সে দাঁড়িয়ে আছে সেলের বাহিরে ভেজা চোখে। এতো অপরুপ এতো মায়াভরা সুন্দর মুখ নিয়ে কেউ যদি সেলের গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে এই কারাগারে আজীবন বন্ধি থাকা যায় অনায়াসে। 


কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে, 'ভয়ংকর 'অপরাধীদের সাথে সীমিত সময়ের জন্য প্রিয়জনদের সাথে দেখা মিলে। 

অনিক অনেক কষ্টে উঠে পূর্ণিমার কাছকাছি দাঁড়ালো গ্রিলে হাত রেখে। পূর্ণিমার খোঁপায় জবা ফুল দেখতে জিজ্ঞেস করল?

তুমি কি এইখানে আসার আগে আমার বাগানে গিয়েছ জবা ফুল তুলতে?

হুম্ম! 

তোমার একদম ঠিক হয়নি; এই ফুলই তো তোমার সর্বনাশ এর কারণ হল। 

যে ফুল একবার ঝরে যায় অনিক! সে ফুলের আর ঝরার ভয় থাকে না, আমি না হয় ঝরে গেলাম কিন্তু তুমি কেন আমার জন্য তোমার জীবনটা শেষ করে দিলে। 


পূর্ণিমা আমি একজন 'ধর্ষককে 'খুন করছি, আর এই 'খুনে আমার নিজের কাছে কোন 'অপরাধবোধ কাজ করে না। 

অনিক আমার কারণে কেন তুমি শাস্তি পেতে হবে? 

পৃথিবীর কোন 'ধর্ষকের বেঁচে থাকার অধিকার নাই! আমার যদি ক্ষমতা থাকতো পুরো পৃথিবীর 'ধর্ষকদের 'খুন করতাম! তার জন্য যদি হাজারবার 'মরা লাগে 'মরতে রাজী আছি। 

অনিক আমার ক্ষত বিক্ষত ঝরে পড়া ফুলটাকে কী তুমি এখনও ভালোবাসো? যাকে সমাজের এক প্রভাবশালীর রাজপুত্র হেসে হেসে 'ধর্ষণ করছে তোমার বাগান থেকে জবা নিয়ে খোঁপায় গুজতে যাওয়ার পথেই,, আহা কুয়াশা ঢাকা ছিল তখন চারিদিক আমার 'চিৎকার কেউ শুনেনি সেদিন, একজন 'ধর্ষকের হাত পশুর মত অনেক হিংস্র হয়,, থামিয়ে দেয় নিরীহ প্রানের 'আর্তনাদ। 


প্লিজ! প্লিজ পূর্ণিমা আমি শুনতে চাই না আর, শুনতে চাই না; শুনতে চাই না,, তুমি থামবে পূর্ণিমা তুমি থামবে! 

অনিক এমন কেন করছ আমিতো অনেক আগে 'মরেই গেছি, আমার এখন কোন কিছুতে কোন আক্ষেপ নাই। আচ্ছা অনিক তুমিতো আমাকে কোনদিন দেখনি; যতদিন তোমার বাগানে গেছি মুখ ঢেকে যেতাম; তোমার কত ইচ্ছে ছিল আমাকে দেখার, আর যেদিন তোমাকে আমার চন্দ্র মুখের শোভা দেখাতে চেয়েছি সেদিনি আমি 'ধর্ষিতা হলাম। 

পূর্ণিমা থাম তুমি; থাম! তোমাকে আমার ভিতর লালন করেছি পাখির মত, তোমাকে চিনতে চাঁদকে দেখেছি সারারাত,, তোমার চুলে শোভা দিতে জবা গাছের যত্ন নিয়েছি প্রতিদিন।


অনিক ভয়ানক আঁচড়ের দাগ শরীরে বেশি দিন থাকে না, কিন্তু ক্ষত বিক্ষত এই মন থেকে এই দাগ কোনদিন যায় না! শরীর যে মনের বোঝা এই বয়ে বেড়ানো যায় না,, তুমি যে রুপে আমাকে এখন দেখছ এইটা তোমার কল্পনার রুপ, তোমার কল্পনা থেকে আমি আরও বেশি সুন্দর ছিলাম। কিন্তু নিয়তি তোমাকে কোনদিন আমার সুন্দর মুখ দেখতে দেয়নি,, দেখো সবাই হাসছে তুমি সেলের গ্রিল ধরে আমাকে কল্পনা করে কথা বলছ দেখে, আমি বরং চলে যায় অদৃশ্য জগতে যে জগতে কষ্ট কিংবা দুঃখ নাই। 


না পূর্ণিমা যেও না! দেখো, তোমার জন্য কারাগারের দেয়ালে জবা ফুল এঁকেছি আঙ্গুলের নখ ক্ষত বিক্ষত করে। ফিরে আসো তুমি, ফিরে আসো। একটাবার শুধু একটাবার তোমার খোঁপায় জবা ফুল গুঁজে দিয়ে দেখতে চাই, আমি!



 ১| আমি অলীক; যা আছে, কিন্তু নেই। এই ‘আছে কিন্তু নেই’-এর ফাঁকটাতেই সব সম্পর্কের জন্ম, মৃত্যু, আবার জন্ম। আমি মায়া। কিন্তু নামটার কোনো দাম না...

 ১| আমি অলীক; যা আছে, কিন্তু নেই। এই ‘আছে কিন্তু নেই’-এর ফাঁকটাতেই সব সম্পর্কের জন্ম, মৃত্যু, আবার জন্ম।


আমি মায়া। কিন্তু নামটার কোনো দাম নাই। কারণ আমি নাম বদলাই, রূপ বদলাই, কণ্ঠও বদলাই; যেহেতু যুগটা আধুনিক, রূপ নিয়েছি মানুষের, তাই মানুষ তার চোখের সামনে যা দেখতে চায়, আমি ঠিক তাই হয়ে উঠতে পারি। এটাই আমার একমাত্র ক্ষমতা—অভিনয়। 


আমি অভিনয় করি; মানুষ টের পায় না। সে ভাবে, ‘এটাই সত্যি’। অথচ সত্যিটা হলো, মানুষের ‘সত্যি’টাই সবচেয়ে বড় মিথ্যে।

এই 'মিথ্যে- সত্যির' ভিতর সাতশো বছর ধরে টিকে আছি।


আমি শীতল, আমার শরীরের তাপমাত্রা চব্বিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস; শীতকালে আরেকটু কমে, বর্ষায় বাড়ে না। এই তাপমাত্রায় মানুষের রক্ত জমে যায় না, কিন্তু ভালোবাসা জমে যায়। ভালোবাসার জন্য চায় সাতানব্বই ডিগ্রির ফুটন্ত রক্ত, হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি, গাল টকটকে লাল। আমার এসব নেই; আমি ছিলাম বনের বিবি, রাতের ভয়, পথহারানির দেবী।


আমি যাকে খুশি ভুলাইতে পারি; কিন্তু যে আমারে ভুলাইতে চায়, তার জন্য আমার ভেতর এক অদ্ভুত ক্ষুধা জাগে।


শালিকের ক্ষুধাটা এমনই। বলছি সে কথা!


তার আগে বলি আমি এখনো মামলা লড়ছি শালবনের জমির জন্য; এই সাতশো বছরে অনেক জাগায় গিয়েছি অনেক কিছুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি—কখনো গ্রামীণ সালিশে, কখনো জমিদারের কাছারিতে, কখনো ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে; কিন্তু কাজ হয়নি। বাকি শুধু গণতান্ত্রিক আদালতে যাওয়ার! 

সেখানেও যদি না হয়, তাহলে ভাবব, মানুষের বিচারব্যবস্থা আসলে একটা লুডো খেলা—ছক্কা না পড়লে কেউ ঘর থেকে বেরোয় না।


এখন আছি চট্টগ্রামে; শালবনের সেই রিসোর্টের বিরুদ্ধে আদালতে রিট পিটিশন করেছি—ঢাকায়ও করেছিলাম, তারপর টের পেলাম আসল ভূমিদস্যুর অফিস চট্টগ্রামে। আগ্রাবাদের বাণিজ্যিক এলাকায়, সাইনবোর্ডে লেখা "শালবন ইকো রিট্রিট প্রাইভেট লিমিটেড"। নিচে ছোট অক্ষরে "এ কনসার্ন অফ কর্ণফুলী গ্রুপ"।


প্রথম যেদিন আগ্রাবাদের ওই কর্পোরেট ভবনের সিঁড়িতে শালিকের সঙ্গে দেখা হল, আমি বুঝে গেছি—এই ছেলে অনেক মেয়ের সঙ্গে খেলছে। ওর হাঁটার ভঙ্গিতে এক ধরনের তরল অহংকার, চোখের চাহনিতে ক্লান্ত বিরক্তি। যে পুরুষ সব পেয়ে গেছে, তার চোখ এমনই হয়—একটা ঘুমঘুম একঘেয়েমি, যেন দুনিয়ার কোনো কিছুই আর নতুন না।


সেদিন আমার পরনে ছিল সাদামাটা থ্রী-পিস, চুলে তেল দেওয়া, মুখে একটু উদাস ভাব। ও সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে থামল। বলল, "তুমি কাকে খুঁজো?"


"ম্যানেজিং ডিরেক্টররে।"


"অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে?"


"নাই। কিন্তু দেখা করতেই হবে!"


ও এক পা এগিয়ে এলো; আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর হাসল—সেই ক্লান্ত হাসি, যেই হাসির অর্থ "আরে, পেয়ে গেছি আরেকটা"। 


বলল, "স্যার তো ব্যস্ত। তুমি যদি একটু অপেক্ষা করতে চাও, আমার রুমে চলো; চা খাবে?"


"চা খাই না।"


"কফি?"


"কিছু না।"


ওর ভ্রু কুঁচকালো! এই প্রথম ওর জগতের বাইরের কেউ দাঁড়াল। কারণ যত মেয়ে ওর রুমে গেছে, সবাই চা খায়ছে; তারপর কিছু একটা হয়ছে। আমি সেই ফর্মুলা ভাঙলাম।


এই ভাঙাটাই আমার ফাঁদ! পুরুষেরা ফাঁদ পাততে ভালোবাসে, কিন্তু কেউ যখন তাদের ফাঁদে পা না দিয়ে নিজেই জাল বোনে, তারা বুঝতেই পারে না। আর না বুঝতে পারার এই ধাঁধাটাই তাদের পাগল করে রাখে।


শালিক এই শহরের অনেক মেয়ের সঙ্গে এই ফর্মুলা ইউটিলাাইজ করেছে। কারও কাজ দিয়েছে, কারও পাশে দাঁড়িয়েছে বৃষ্টির দিনে ছাতা ধরে, কাউকে বলেছে "তুমি অন্যদের মতো না।"


আমিও অন্যদের মতো না। তবে সে যেভাবে ভাবে, সেভাবে না।

সে বিশ্বাস করে ; পৃথিবীতে সব মেয়ে ম্যানেজ হয়—টাকা দিয়ে, চাকরি দিয়ে, মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে, একটু শরীরী ছোঁয়া দিয়ে; আর তাই সে ভাবে, আমিও হব। কারণ প্রেমিকা থেকে প্রোজেক্ট করার—সব কিছুরই একটা এক্সেল শিট ওর মাথায় আছে।


কিন্তু আমি তো আর এই পৃথিবীর মেয়ে না। প্রেমও না!

আমার কাছে প্রেমের অভিজ্ঞতা হলো এক অন্ধকার থেকে আরেক অন্ধকারে ঝাঁপ দেওয়া।

প্রেমে কিসে আছে? মিথ্যে আশ্বাস? শরীরী টান? আর্থিক হিসাব-নিকাশ? নাকি শুধু একাকিত্ব থেকে বাঁচার জন্য দুইজন মানুষের জড়াজড়ি?" এই পৃথিবীর কেউ প্রেম চাই না। শুধু একা থাকার ভয়টা ভুলে থাকার সঙ্গী চাই।"


২.

শালিকের আসল নাম সীমান্ত। কিন্তু অফিসের সবাই ডাকে শালিক। কারণ ও সারাক্ষণ কিচিরমিচির করে, আর পাখিটার মতো চটপটে। ওর কাজ কী? কাগুজে কাজ—কিন্তু আসলে ওর কাজ হল মানুষরে ভুলিয়ে জমির স্বাক্ষর নেওয়া, সরকারি অফিসারদের চা খাইয়ে ফাইল পাশ করানো, আর এমডি স্যারের সব বদমায়েশির আইনি চাদর দেওয়া।


ওর দাঁত খুব সাদা, অসম্ভব সাদা, যেন দাঁত না, টাইলসের বিজ্ঞাপন, চুলে সবসময় জেল মাখে, গায়ে কড়া সেন্টের গন্ধ, কৃত্রিম, হয়তো কোনো নামী ব্র্যান্ডের নকল; ঠিক ওর ব্যক্তিত্বের মতো। কথা বলে একটু বাঁকা করে, চোখে সবসময় একটা চাপা ধূর্তামি। মেয়েদের সঙ্গে ওর আচরণ দেখলেই বোঝা যায়— ওর ধারণা, মেয়ে মানে গলে যায়; শুধু সময় আর তাপমাত্রার ব্যাপার।


কিন্তু আমি গলি না; আমার শরীরের তাপমাত্রা চব্বিশ ডিগ্রি। তাই আমি গলি না, বরং জমিয়ে রাখি।


দ্বিতীয়বার যখন দেখা হল, ও রিসেপশনে বসা ছিল। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল, হাসল। বলল, "তুমি আবার আসছো। স্যার আবার ব্যস্ত।"


"জানি।"


"জানো মানে?"


"স্যার ব্যস্ত থাকবেই; কারণ তুমি চাও স্যার ব্যস্ত থাকুক। তাহলে তুমি আমাকে আবার তোমার রুমে ডাকতে পারো।"


ওর হাসি এক সেকেন্ডের জন্য থমকালো, তারপর আরও চওড়া হল। "বাহ! তুমি তো আমাকে পড়ে ফেলছো।"


"আমি পড়ি না; আমি দেখি।"


"কী দেখো?"


"তোমার ভেতরের ফাঁপা জায়গাটা।"


ওর চোখ বদলে গেল! ওর চোখে কৌতূহল দেখলাম। কৌতূহলই খেলার শুরু, কারণ যে পুরুষ সব পাইছে, তার একটাই জিনিস চাই—কিছু একটারে বোঝা, যারে বোঝা যায় না।


আমি সেই কিছু।


৩.

এর ভিতর মালতি খোঁজ নিতে ষোলশহর গেলাম; কারণ আমি যেখানে যাই, ওরাও যায়।


মালতি এখন স্টেশন চত্বরের ফুটপাথে থাকে। ওর চায়ের দোকানের পাশে টিনের চালা। আমাকে দেখে বলল, "তুমি আবার আইছো? কী মনে কইরা?"


"তোরে দেখতে ইচ্ছা করল।"


"মিথ্যা কইও না। তুমি মানুষরে ভুলাইতে জানো, আমারে না।"


আমি হাসলাম। মালতি সত্যি বোঝে; কারণ ও নিজেও এককালে পথিক ভুলাইত। এখন আর পারে না। বলল, "শুইনা খুশি হইবা—তোমার শত্রু কর্ণফুলী গ্রুপের এমডি স্যার নাকি রাইতে ঘুমাইতে পারে না।"


"কেন?"


"তোমার ভয়ে। আর ওই শালিক পোলাটারে তুমি পাগল বানাইছো। অফিসে নাকি কয়, 'মায়া অন্যরকম অন্যদের মত না, ওর পাশে থাকতে ইচ্ছে করে, আবার ভয়ও করে।' এইটা শুইনা আমার খুব হাসি পায়।"


"হাসি কেন?"


 "দুনিয়া উল্টা ঘুরতেছে মায়া।"

তুমি মানুষরে ভয়ও দিচ্ছো, প্রেমও দিচ্ছো, অথচ নিজে কিছুই দিচ্ছো না। ব্যালেন্স শিটে তোমার লাভ ছাড়া লস নাই।”


মালতির কথা সত্যি। এই দুনিয়ায় ভয় আর প্রেম একই মুদ্রার দুই পিঠ হয়ে গেছে। আর আমি সেই মুদ্রা। তবে আমি কারেন্সি না, আমি ক্রিপ্টোকারেন্সি—কেউ জানে না আমার অস্তিত্ব সত্যি না মিথ্যা, তবু সবাই খুঁজে।


৪.

রইসুদ্দিন সঙ্গে দেখা করলাম আছিয়ান সিটির মসজিদের গুদামে। ও এখন শুধু স্বপ্ন দেখে, আর নিজে নিজে ডেকে আনা বিপদগ্রস্ত মানুষের স্বপ্নে যায়।


আমি ঢুকতেই বলল, "মায়া, তুমি জানো তোমার ওই শালিকের স্বপ্নে কী দেখছি?"


"কী?"


"ও স্বপ্নে তোমারে ধরে, কিন্তু তুমি বরফ হইয়া গলে যাও। গলার পরেও তুমি থাকো—পানির মতো, কিন্তু পানি ধরা যায় না। ও খুব হতাশ হয়। ঘুম ভাইঙা গেলে বালিশে মুখ লুকায়।"


"তুই দেখলি কী করে?"


"আমি ওর স্বপ্নে গেছিলাম; আসলে ও নিজেই আমারে টানছে। কারণ ও জানে, তুমি ওর স্বপ্নেও ধরা দেবে না।"


"তুই ওরে কিছু বলছস স্বপ্নে?"


"বলছি, 'শালিক ভাই, আপনে বড় ভুল করলেন। মায়ারে পাইতে গেলে আপনেরে আগে হারাইতে হইবে।'"


আমি হাসলাম। "তুই দার্শনিক হইছস রইসুদ্দিন।"


"মসজিদের গুদামে থাকলে দর্শন না করে উপায় আছে? চার দেয়াল, কোনো জানালা নাই, অথচ প্রতিদিন আজান শুনি। মনে হয়, আল্লাহ যেন আমারে মানুষের মতো কোন ইশারায় কিছু একটা বুঝাইতে চান। কিন্তু আমি তো অন্ধকার ছাড়া কিছু বুঝি না।"


৫.

গাবু এখন জাহাজ ভাঙার ইয়ার্ডের রাতের গার্ড। ওর শরীরে এখন লোহার গন্ধ, কিন্তু চোখে সেই পুরোনো কোমলতা।


আমি যখন ইয়ার্ডে গেলাম, ও একটা প্রকাণ্ড জাহাজের তলায় বসে ছিল। হাতে স্লেজহাতুড়ি, কিন্তু কাজ করছে না। শুধু বসে আছে।


"কী করস রে গাবু?"


"মায়া, জাহাজরে জিজ্ঞেস করছি, সে এত বছর সমুদ্রে থাকছে, একাকীত্ব কেমন লাগে?"


"উত্তর পাইছস?"


"পাইছি। জাহাজ কয়, 'আমার একাকীত্বের ভেতর মানুষজন থাকে। তাদের জুতার শব্দ, ফোনের রিংটোন, প্লেট ভাঙার শব্দ—এইসব শুধু একাকীত্বরে ঢাইকা রাখে। লোহা আর কোমলতা একসঙ্গে থাকে না। কিন্তু আমি থাকি। আদতে আমি একা; একা থাকাই আমার ধর্ম।'"


আমি কিছুক্ষণ চুপ রইলাম। তারপর বললাম, "জাহাজ তোরে দর্শন শিখায়।"


"সবাই কিছু না কিছু শিখায় মায়া। তুমি শিখাইছো ভয়। মালতি শেখায় হাসি। রইসুদ্দিন শেখায় স্বপ্ন। আর ওই শালিক তো শেখাবে ধোঁকা। কিন্তু তুমি তো ধোঁকায় পড়বা না। তুমি নিজেই ধোঁকা।"


"আমি ধোঁকা না। আমি অভিনেত্রী।"


"পার্থক্য কী?"


"ধোঁকা দিলে মানুষ টের পায়। অভিনয় করলে মানুষ টের পায় না। সে ভাবে, এই সত্যি।"


গাবু হাতুড়িটা তুলল, তারপর আবার নামাল। বলল, “সাবধানে থেকো মায়া। তুমি সাতশো বছর ধরে একমাত্র শিক্ষিত, তাই কৌশলে বেঁচে আছো ভয়ের রাজ্যে ধনী হয়ে, আর এতো বড় শিক্ষিত হয়েও তুমি আমাদের মতো দুর্বলদের ছেড়ে যাওনি। কিন্তু মায়া, এই শহরটা বড় নিষ্ঠুর। এখানে জাহাজ ভাঙার হাতুড়ির শব্দে মানুষের হৃদয় ভাঙার আওয়াজ চাপা পড়ে যায়।”


৬.

শালিক এবার সরাসরি প্রস্তাব দিল—তার বাসায় নিমন্ত্রণ। নগরীর এক গলির ভেতর তার ছোট বাসা। ও এখন পুরোপুরি আমার প্রেমে মগ্ন, তার কারন আমাকে ভাঙতে পারে নাই, এটাই ওর প্রেম না, মোহ, এই মোহের কারণে আমার প্রতি দিশেহারা, ও এখন আমাকে নিয়ে বিয়ের স্বপ্ন দেখে, কারণ বিয়ের আগে মোহ ভাঙলে বিয়ের আগ্রহ থাকে না, এই জাগায় বোকারা ধরা খায়— চতুরদের খুশি করতে গিয়ে। 

আর দুজন চতুর হলে; কী হয়, কিছুদিনের লিভ টুগেদার? ও বলল, "মায়া একদিন আমার রান্না খাইতে আসো।"


"তুমি রান্না করো?"


"মাঝে মাঝে, মেয়েদের খাওয়াইতে ভালো লাগে।"


"কয়জন মেয়েকে খাওয়াইছো?"


ও হাসল, সেই চাপা হাসি; যার ভেতর লুকানো স্বীকারোক্তি। বলল, "গণনা করি নাই।"


"এখন থেকে করো। কারণ আমারে খাওয়াইতে গেলে স্মৃতি জমা রাখতে হবে।"


আমি ওর বাসায় গেলাম। বাসাটা ছিমছাম, কিন্তু এক ধরনের সাজানো ফাপ্পর। দেয়ালে অশ্লীল পেইন্টিং, টেবিলে ক্যাকটাস, রান্নাঘরে একটা এপ্রোন ঝোলানো—এইসব দেখলেই বোঝা যায়, এই বাসায় নিয়মিত মেয়ে আসে, আর সবকিছু তাদের জন্য সাজানো; একটা মঞ্চ। শালিক এই মঞ্চের নায়ক।


আমি সোফায় বসলাম। শালিক রান্নাঘর থেকে উঁকি দিয়ে বলল, "মুরগির মাংস খাবে?"


"আমি খাই না।"


"কেন? ডায়েট?"


"আমার শরীর খাবারের তাপমাত্রা নিতে পারে না।"


"মানে?"


"তুমি যা খাও, তা গরম। আর আমার শরীর ঠান্ডা।"


ও হেসে ফেলল। "তুমি সাধিকা না পাগল?"


"সাধিকাও না, পাগলও না। অভিনেত্রী। আর তুমি?"


শালিক চুলার আঁচ কমিয়ে বেরিয়ে এলো। বলল, "আমি কী?"


হঠাৎ আমার কণ্ঠস্বর বদলে গেল, কাঁপা গলায় বললাম;

"তুই কী? তুই কিচিরমিচির করস, মানুষ ভুলাস, অথচ তোর নিজের কোনো গল্প নাই। তুই ভাবস সব মেয়ে তোরে চায়, কিন্তু তুই কাউরে চাস না। আরে চাইতে গেলে তো আগে নিজেরে লয়াল হতে হয়, উজাড় করে দিতে হয়, আর তোর তো দেওয়ার কিছু নাই।"

"তোর ভালোবাসা মানে শুধু কালেক্ট করা—যেমন কেউ ডাকটিকিট জমায়, তেমনই তুই মেয়েদের জমাস। কিন্তু তোর অ্যালবামে কোনো ছবিই স্থায়ী না।”


ওর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। একদম চলে গেল না, কিন্তু ম্লান হলো। বলল, "তোমার কথা শুনলে মনে হয় তুমি আমার মনের ভেতর বসে আছো।"


"আমি তোর মনে বসি নাই। আমি তোর ফাঁপা জায়গাটায় দাঁড়ায়া আছি। জায়গাটা এত বড় যে, আমি দাঁড়াইলেও কেউ টের পায় না।"


ও আমার দিকে তাকিয়ে রইল। অনেকক্ষণ। তারপর বলল, "তুমি কি সব পুরুষরে এমন বলো?"


"না। শুধু যারা চিপ অভিনেতা, তাদের বলি।"


"আমি অভিনেতা?"


"তুই তো তাই। তুই প্রেমের অভিনয় করস। কিন্তু তোর ভেতর প্রেম নাই। আছে শুধু জয়ের নেশা; সেই নেশাটাই তোরে চালায়।"

তুই যেন একটা ক্যা'সিনো—সবাই তোর টেবিলে খেলে, আর তুই সবসময় জিততে চাস।”


ওর চোখ এবার পুরোপুরি বদলে গেল। সেখানে কৌতূহল আর ভয় একসঙ্গে ভাসছে। বলল, "তাহলে তুমি আমারে চিনছো কেন? আমারে ভুলাতে চাও কেন?"


আমি সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। "আমি তোরে ভুলাতে চাই না; আমি শুধু তোরে দেখতে চাই। কারণ তোর মতো ফাঁপা পুরুষ আমি অনেক দেখছি। কিন্তু তুই তাদের চেয়ে বড় ফাঁপা! যে চরিত্রে তুই দিন রাত অভিনয় করে বাঁচস, সেটা পুরুষের না কাপুরুষের। পুরুষ হও।


শালিক হা করে তাকিয়ে থাকলো; এই প্রথম কোনো মেয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে তুই তুকারিতে ছিঁড়ে ফেললো।

হিসাব মিলাতে পারছে না— এই ভেবে যে, সস্তায় গলে যাওয়া মেয়েদের সাথে আমি মায়া কে? আমি ওর সামনে এক উল্টো আয়না; ও যত কাছে আসে, নিজেকে তত ক্ষুদ্র করে দেখতে হয়।


৭.

গভীর রাতের শহরটা আমার খুব পছন্দ। পাথরঘাটার সরু গলি, দূরে কর্ণফুলীর জাহাজের ভেঁপু, শিপইয়ার্ডের গন্ধ—এইসব আমারে মনে করায় যে আমি মায়া এখনো আছি।


শালিক এখন প্রায়ই আসে। কখনো চায়ের কাপ হাতে, কখনো খালি হাতে। বলে, "তোমার এই বাসাটায় এত ঠান্ডা লাগে কেন?"


"কারণ আমি ঠান্ডা।"


" আমাকে জড়াইয়া ধরলে গরম হইতে পারো?"


"পারব না। জড়াইয়া ধরলে তুমি ঠান্ডা হয়ে যাবে "


ও হাসে। "আমি ঠান্ডা হতে চাই না।"


"জানি। তুমি গরম হতে চাও। কিন্তু গরম হতে গেলে যে জিনিস লাগে, সেটা তোমার নাই।"


"কী?"


একটা উষ্ণ শুভ্র মন। যা আমার নাই, আমি হিমবাহ।

কিন্তু তুমি ভুলে যাও, আমার ভেতর আগুন নাই, শুধু কুয়াশা আছে। আর কুয়াশায় কেউ গরম হয় না, শুধু পথ হারায়।”


ও কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর ফিসফিস করে বলে, " "তোমাকে আমার হারাতে ইচ্ছা করে না।"


"তুমি তো আমারে পাও নাই। হারাবা কী?"


"পাওয়া-হারানোর বাইরেও কিছু থাকে?"


"থাকে! কিছু সন্দেহ থাকে নিজের প্রতি; তুমি খুঁজো এখন তোমার নিজের ঘাটতিটা কি? যে ঘাটতিতে তুমি ক্ষয় হয়েছো সেটাই খুঁজো- যদি পাও, তখন এই সন্দেহই সবচেয়ে বড় সত্য। ভালোবাসা মিথ্যা, ঘৃণাও মিথ্যা। শুধু সন্দেহটা রয়ে যায়। তুমি কি সন্দেহ করতে শিখেছো নিজেকে?"


ওর চোখে পানি চিকচিক করছে। বলল, "জানিনা?"


জানো। "তাহলে তুমি বেঁচে থাকবে., কারণ সন্দেহই মানুষরে বাঁচায়। সন্দেহ না থাকলে মানুষ মরে যায়—হয়তো শরীরে না, মনে।"


ও উঠে দাঁড়ায়। দরজার দিকে যায়। থামে। পেছন ফিরে বলে, "কাল আবার আসব।"


"আইসো। কিন্তু কিছু নেওয়ার আশা কইরো না।"


"নেওয়ার আশা করলে কী হবে?"


"তুমি শূন্য হাতে ফিরবে। আর শূন্য হাতের কষ্টটা খুব গরম। সেই গরম তুমি সইতে পারবা না।"


ও চলে যায়। দরজার বাইরে কর্ণফুলীর জাহাজের ভেঁপু আবার বাজে।


আমি একা বসে থাকি। আমার শরীর চব্বিশ ডিগ্রির ঠান্ডা, কিন্তু বুকের ভেতরটা আজ একটু গরম। সন্দেহের গরম। ওর ভিতর হয়তো সন্দেহ কাজ করছে। এই সন্দেহই আমার খাদ্য।


আমি খুশি।


৮.

শালিকের বাসায় যে রাতে গেলাম, ওর আসল চেহারাটা স্পষ্ট দেখা হল।


রান্নাঘর থেকে মাংসের তরকারি তুলে এনে টেবিলে রাখল। প্লেটে ভাত, বাটিতে ডাল। বলল, "চলো, খেতে বসো। তুমি না খেলেও বসো। আমি খাই, তুমি দেখো। তোমারে দেখলেই আমার ক্ষুধা বাড়ে।"


আমি বসিনি। জানলার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। হঠাৎ কণ্ঠ অস্বাভাবিক হয়ে গেল, যেন গুহার ভেতর থেকে কেউ কথা বলছে—প্রতিধ্বনি হয়, কিন্তু উৎস খুঁজে পাওয়া যায় না। বললাম, “তোর ক্ষুধা তো বরাবরই বাড়ে। কিন্তু পেট ভরে না কখনো।”


"আফসোস, তুমি পেট ভরানোর চিন্তা করো কেন? পেট তো আর একজনের জন্য না।"


"জানি। তোর টেবিলে অনেক প্লেট পড়ে। একেকদিন একেকজনের জন্য।"


শালিক চামচ নামিয়ে রাখল। হাসল, কিন্তু হাসিটা আগের চেয়ে কঠিন। বলল, "মায়া, তুমি আমাকে খুব জাজ করো। কিন্তু তুমি নিজে কী? তুমিও তো আমাকে ঘোরাও। আমার চারপাশ এখন শুধু তুমি; আর আমি জানি তুমি আমারে দু'পয়সার পাত্তা দাও না, তবু আসো। কেন আসো?"


"আসি তোরে পড়তে।"


"পড়তে?"


"তুই একটা ট্রিকস্টার। প্রথম অধ্যায়ে কিচিরমিচির, দ্বিতীয় অধ্যায়ে চা খাওয়ানো, তৃতীয় অধ্যায়ে দুর্বল মুহূর্তের অপেক্ষা। আমি তোর প্লট বুঝে গেছি।"


ওর চোয়াল শক্ত হলো। বলল, "তাহলে তুমি তো নায়িকা না। তুমি তো লেখিকা।"


"লেখিকা আর নায়িকা এক হতে পারে না?"


"পারে না। কারণ লেখিকা যখন নায়িকা হয়, তখন পুরুষের খেলাটা আর খেলা থাকে না। সেটা হয়ে যায় গবেষণা। আর গবেষণায় প্রেম হয় না।"


আমি জানালা থেকে সরে এলাম। টেবিলের কাছে দাঁড়ালাম। বললাম, "তোর প্রেমের সংজ্ঞা কী শালিক?"


"কী আবার? একজনরে ভালো লাগা, তার সঙ্গে সময় কাটানো, একটু শরীরী টান—"


"শরীরী টান? তুই তো আমার হাত ছুঁতে পারিস না পাঁচ সেকেন্ডের বেশি। কারণ ঠান্ডা।" তোর আঙুল জমে আসে।”


"ঠান্ডা হলেও শরীর তো।"


"না, শরীর না! এটা একটা ছদ্মবেশ। আমার কোনো উত্তেজনা নাই। আমি শুধু মানুষের সন্দেহ আর ভয় দেখে বাঁচি।"


শালিক উঠে দাঁড়াল। আমার খুব কাছে এলো। ওর গায়ের সেন্টের গন্ধে আমি ডুবে গেলাম—কিন্তু শুধু ঘ্রাণে, অনুভবে না। ও আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করল, "তাহলে আজ রাতে আমি যদি অন্য মেয়েকে ডাকি, তোমার কিছু লাগবে না?"


আমার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল, না; বরং আমাকে বল, কয়জন আসবে। আমি দেখতে চাই, তোর রোটেশন কেমন।" সিজনাল ফ্লেভার না কি অল-টাইম স্টক?”


ও সরে গেল। ওর চোখে এবার রাগ। কারণ কোনো মেয়ে কখনো এমন বলতে পারে না। বলল, "তুমি মানুষ না।"


"জানি। তুই আগেও বলেছিস।"


"না, এবার সিরিয়াসলি বলছি। তুমি মানুষ না। তুমি কোনো রাক্ষুসী শয়তান। তুমি আমার ভেতরে ঢুকে গেছ। আমি তোমারে ঘৃণা করি, আবার তোমারে ছাড়তে পারি না। এইটা তুমি কী করলে?"


আমি হাসলাম। সেই ঠান্ডা হাসি—যে হাসিতে দাঁত দেখা যায় না, শুধু চোখের মণিটা অন্ধকারে লাল হয়ে যায়!


"এইটাকে বলে মোহ। তুই আমারে পেতে চাস, কারণ আমি তোরে বিলিয়ে দিই না। তুই যতজনরে পাইছস, তারা সবাই নিজেরে দিয়ে দিছে। আর আমি দেই না বলেই তুই পাগল। কিন্তু জানিস, এই মোহ সাতদিনের বেশি থাকে না। তারপর তুই আরেকজনের কাছে ছুটবি।"


"না। তোমার কাছে ছুটলে আমি হারাইয়া যাই। আর কোনো মেয়ের কাছে ফিরতে পারি না। তুমি কী জাদু জানো?"


"জাদু না। এটা অভিনয়ের চূড়ান্ত ফর্ম—যারে ইংরেজিতে বলে 'ব্রেডক্রাম্বিং'। তোরে আমি একটু একটু করে ইশারা দেই, পুরোপুরি কিছু দেই না। এই খেলাটা দুনিয়ার সব স্মার্ট মেয়েরা জানে। তবে আমি ওদের চেয়ে বেশি জানি, কারণ আমি সাতশো বছর ধরে শিখতেছি।" তোর মতো হাজারো শালিকের স্ন্যাপশট আমার অ্যালবামে জমা আছে।”


শালিক চেয়ারে বসে পড়ল। ওর মুখ ফ্যাকাসে। বলল, "তাহলে তুমি আমারে শুধু খেলার পুতুল বানাইছো?"


"তুইও তো তাই করেছিস এতদিন। এটা পাল্টা খেলা।"


ও কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ওর ফোন বেজে উঠল। ও ফোন ধরল। অপর পাশ থেকে এক মেয়ের গলা—নরম, কোমল, মায়াবী। বলল, "সীমান্ত ভাই, কাল দেখা করবেন? আপনি বলেছিলেন শনিবার—"


শালিক তাড়াতাড়ি ফোন কেটে দিল। কিন্তু আমি শুনে ফেলেছি।


আমি মুচকি হাসলাম। "শনিবারের মেয়েটা কি মঙ্গলবারের চেয়ে আলাদা?"


ওর মুখ লাল হয়ে গেল। "তুমি কীভাবে জানো মঙ্গলবারের কথা?"


"আমি জানি। কারণ তুই তো একটা প্যাটার্নে চলস। সোমবার-মঙ্গলবার কাউকে চা খাওয়াস, বুধবার কাউকে অফিসের কাজে সাহায্য করস, বৃহস্পতিবার কাউকে বাসায় ডাকস। শুক্রবার তোর রেস্ট ডে। আর শনিবার নতুন কাউকে দিয়ে শুরু করস। এই প্যাটার্ন তো ভাঙে না তোর।" তুই একজন শিডিউল-বন্দী ক্যাসানোভা।


শালিক চুপ। ওর হাত কাঁপছে।


আমি বললাম, "ভয় পাস না। তুই যে অসচ্চরিত্র, এটা তোর দোষ না। এটা তোর স্বভাব। এই তুই কি জেনিটিকলি এমন ? নাকি প্রথম প্রেমে তোকে কেউ ঠকাইছিল?"


ওর চোখ ছলছল করল। বলল, "তুমি এত কিছু জানো কীভাবে?"


"আমি বলেছি, আমি পড়তে পারি। আর তোর মতো পুরুষ সাতশো বছরে হাজার হাজার দেখছি। তোরা ট্রিকস্টার পুরুষরা সবাই একই— মেয়েদের ঠকাস, তাদের ব্যবহার করস, তারপর যখন কেউ তোদের ঠকায়, তখন ভাবস দুনিয়ার সব মেয়ে খারাপ।"


শালিক মাথা নিচু করল। তারপর আস্তে করে বলল, "তুমি আমাকে ছাড়বা না?"


"ছাড়ব না। যতক্ষণ না তোর এই স্বভাব তোরে ছাড়ে, ততক্ষণ আমি থাকব। তারপর যখন তুই একা হবি, তখন আমি চলে যাব। কারণ আমার কাজ শেষ।"


"কী কাজ?"


"তোরে শেখানো যে, মানুষরে ব্যবহার করা যায় না। মানুষের ভেতরও সম্মান থাকে, ভয় থাকে, সন্দেহ থাকে। আর সেই ভয়ই একদিন তার সবকিছু খেয়ে ফেলে।"


ও উঠে দাঁড়াল; আমার দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। তারপর বলল, "তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। আর সবচেয়ে বড় সত্য।"


আমি দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। যাওয়ার আগে বললাম, "শুনে রাখ শালিক—আমি তোরে ঘৃণা করি না। ঘৃণা করলে তোরে ছুঁইতে পারতাম না। আমি তোরে ব্যবহার করছি। ঠিক যেমন তুই অন্য মেয়েদের করেছিস। পার্থক্যটা শুধু এই—তুই করছস শরীরী, আর আমি অশরীরী ।" তোর ব্যবহারের দাগ শরীর আর সমাজে পড়ে, আমারটা শুধু ভয়ের উপর।”


আমি এখন থেকে তোর আরও গভীরে চলে যাব। এই শহরের নর্দমায়, চায়ের দোকানের ধোঁয়ায়, পোশাক কারখানার সাইরেনে, জাহাজ ভাঙার হাতুড়ির শব্দে—আমি ঢুকে যাব। তোর ভিতর আমি আরেকটা অন্ধকারের জন্ম দেব। তার নাম হবে 'স্মৃতি'।


তোর মনে ফিসফিস করব, 'তোর কিছু ছিল, সব হারিয়ে গেছে, শুরু হবে একাকিত্বর ভয়। কারণ আমি তোর ভিতরের অপূর্ন ক্ষুধার আফসোস ছিলাম! আর এই ক্ষুদাকে তুই বুকে টেনে প্রেম বলে ধারণ করবি। কিন্তু প্রেম না।


এরপর আমি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। রাতের চট্টগ্রামের বাতাসে কর্ণফুলীর গন্ধ। দূরে শিপইয়ার্ডের আলো জ্বলছে; যেন সমুদ্রের বুকে আরেকটি গ্যালাক্সি নেমে এসেছে।


শালিক আমার পেছনে দাঁড়িয়ে রইল। কিছু বলল না। ওর মুখে সেই পুরনো কিচিরমিচির নেই। এখন শুধু ফাঁপা বিস্ময় আর একরাশ নিজেকে হারানোর ভয়। 


সেই ভয়টাই আমার জিত। আর এই জিতের কোনো শেষ নাই।


আমি মায়া বেগম। পুরনো হাওয়া। আমি কারও হই না, কারণ আমি সবার। আর এটাই আমার সবচেয়ে বড় রহস্য; আমি ভয়, কিন্তু ভয়ের ভেতরই আমি শান্তির বীজ বুনি, লেখে দিই— শীতল রক্তের প্রেম; যে প্রেমে শরীর জমে না, মন জমে; সন্দেহের বরফে।

১. আমার নাম মায়া বেগম (প্রিতু), নামটা নিজের পছন্দের না; মানুষের ভিড়ে মিশতে গেলে একটা পরিচয় লাগে, তাই নমিনেশন পেপারে এই নাম দিয়েছি। এককালে যা...

১.
আমার নাম মায়া বেগম (প্রিতু), নামটা নিজের পছন্দের না; মানুষের ভিড়ে মিশতে গেলে একটা পরিচয় লাগে, তাই নমিনেশন পেপারে এই নাম দিয়েছি। এককালে যারা আমাকে চিনত, তারা নাম দিয়েছিল "বনের বিবি"। এখন তারা কেউ বেঁচে নেই! যারা আছে, তারা ভাবে আমি বুড়িগঙ্গার ওপারের কোনো পতিত জমির দাবিদার।

সময়ের পরিবর্তন আর রূপান্তরিত বিশ্বাস ও ভয়ের ভিতর আমি মায়া আজো বেঁচে আছি; মানুষ আগে মৃত্যুকে যেমন ভয় পেত; আমাদেরই পেত, সেকালে তাদের সাথে যা ইচ্ছা তাই করতে পারতাম— জঙ্গল ঘন করা, পথ হারানো, গা ছমছম করা, একলা হলে পিছু নেয়া, গলা শুকিয়ে দেওয়া– হয়তো তাদের কাছে আমি মায়া! অলীক! 
যা আছে কিন্তু নেই।

আমি বসে আছি মতিঝিলের এক পুরনো ভবনের সিঁড়ির নিচে, পরনে বেনারসী। হাতে একটা ফাইল, ফাইলের ভেতর দরখাস্ত। দরখাস্তের ভাষা বাংলা, কিন্তু ইংরেজি শব্দ আছে—"লিগ্যাল নোটিস", "রিট পিটিশন", "এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট"। এই শব্দগুলো আমার কাছে নতুন; সাতশো বছরের জীবনে কখনো এই ভাষায় কথা বলিনি। 

যে জায়গাটার জন্য এই দরখাস্ত, তার নাম ছিল শালবন। মধুপুর গড়ের ভেতরে, শাল আর গজারি গাছের আড়ালে একটা টিলা, সেই টিলার নিচে একটা গুহা ছিল। গুহার ভেতর আমরা থাকতাম— আমি, আমার মা, আর আমার দাদি। আমরা জ্বিন না, মানুষও না; মানুষ আমাদের কী বলে তারাও নিজেরাও জানে না— কেউ বলে "পরি", কেউ বলে "ভূত", কেউ বলে "বনের খেচর অথবা ডাকিনী, প্রেত, ব্রহ্মদত্যি’’ ।

আমার দাদি বলতেন, "আমরা হলাম ‘পুরনো হাওয়া’। যে হাওয়া এখনো বইছে, কিন্তু মানুষ আর টের পায় না।"

সেই গুহাটার ওপর এখন রিসোর্ট হচ্ছে! নাম "শালবন ইকো রিট্রিট"; মালিক ঢাকার এক নামকরা ব্যবসায়ী, যার ছবি পত্রিকায় আসে, যাকে মানুষ "স্যার" বলে ডাকে। তার কোম্পানি বলছে, এটা হবে "দেশের সেরা ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন"। সুইমিং পুল থাকবে, ঝুলন্ত ব্রিজ থাকবে, বারবিকিউ কর্নার থাকবে; মানুষ কুড়মুড় করে বারবিকিউ খাবে। 

তাও আমার মায়ের কবরের ওপর।

২.
আমাদের জাত কমতে কমতে এখন আটজনে ঠেকেছে। আটজন পুরনো হাওয়া; সবার অবস্থা খারাপ।

আমার চাচাতো বোন মালতি থাকে কমলাপুর রেলস্টেশনের পেছনে, আগে ওর কাজ ছিল পথিকদের পথ ভুলিয়ে দেওয়া; এখন ও স্টেশনের ফুটপাথে ভিক্ষা করে! বলে, মানুষ এখন গুগল ম্যাপ দেখে পথ চেনে; ওর ভুলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা ব্যর্থ হয় স্যাটেলাইটের কাছে! 

আরেকজন আছে, নাম গাবু, ও নাকি এককালে গোটা গ্রামের মাঝরাতে ঘুম ভাঙিয়ে দিত শুধু একটা শিস দিয়ে; এখন ও গাজীপুরের পোশাক কারখানায় নাইট শিফটে কাজ করে। বলে, কারখানার সাইরেন ওর শিসের চেয়েও জোরে বাজে।

তার চেয়েও করুন অবস্থা রইসউদ্দিনের, ও মানুষের স্বপ্নে ঢুকে ভয় দেখাত! এখন ওর বাসা পুরান ঢাকার এক মেসে। ও বলে, মানুষ এখন নিজের স্বপ্নেই ভয় পায়— স্বপ্ন দেখে চাকরি হারানোর, কাউকে বিশ্বাস করে ধোঁকা খাওয়ার, ঋণের বোঝায় ডুবে যাওয়ার,  মেয়ের জামাইয়ের দেনমোহরের, ছেলের ড্রাগস নেওয়ার। ওর আর কিছু করার থাকে না; মানুষ নিজেই নিজের যমদূত হয়ে গেছে।

আমি একমাত্র লেখাপড়া শিখেছি, কীভাবে শিখলাম?  আমারা কিন্তু চাইলেও মানুষের মতো জেন্ডার বদলিয়ে “ট্রান্সজেন্ডা’র’’ হতে পারি না,  কিন্তু ছোট হওয়া যায়; তাই আমি ছোট্ট শিশু সেজে এক মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে গেলাম, তিনি খুব বৃদ্ধ ছিলেন, চোখে কম দেখতেন। আমাকে মানুষ ভেবে কিতাব পড়াতেন। এতো ভালো মানুষ ছিলেন বলার বাহিরে, যদি মানুষ হবার সৌভাগ্য হত উনার মেয়ে হয়ে জন্মাতে চাইতাম! 

ওহ! একটা কথা না বললে নয়; আমাদের মধ্যেও কিছু বজ্জাত ছিল যারা ছোট মেয়ে, ছেলেদের উত্যক্ত করতো, একটা সময়  তাদের সবাইকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলার পর, ওদের আত্মা মানুষের জগতে আজো আছে ''বল'ৎকার আর ধর্ষ'ণ'' রূপে! এই রূপটা ভয় ও ঘৃণার, প্রাচীন ভয় থেকে এসব অমানুষের জন্য নাকি মানুষ এখন সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হতে ভয় পায়!

উস্তাদজী মারা যাওয়ার আগে বলেছিলেন, "মায়া, তুমি যা-ই হও, মানুষের চেয়ে কম নও। তোমার অধিকার আছে।"

সেই অধিকারের জন্যই আজ আমি এই ফাইল হাতে বসে আছি।
আর ভাবি, তিনি কতটা নীতিবান মানুষ হলে মানুষের বাহিরেও অধিকার নিয়ে চিন্তা করতে পারেন।
আর এই দেশের মানুষ অধিকার চিবানোর আগে তারা ভোট খায়।
আর দেশের অবস্থা বাহিরে বের হলে বুঝা যায়, মানুষের অভাব, দুর্দশা, ট্রাফিক জ্যাম, গাড়ির হর্ন, ধুলো, মানুষের ভিড়! সবাই ছুটছে.. কেন ছুটছে জানে না! শুধু ছুটছে..

হঠাৎ আমার খুব ইচ্ছে করল, এই পুরো রাস্তাটার ওপর এক ঝটকায় অন্ধকার নামিয়ে দিই। পুরনো দিনের মতো; আকাশ কালো করি। মানুষ থমকে দাঁড়াক! ভয়ে কাঁপুক! 

কিন্তু অন্ধকার নামানোর কী মানে হয়?

এ শহরে অন্ধকার নামে রোজ— লোডশেডিং হলে। আর মানুষ তখন বিরক্ত হয়; মোমবাতি জ্বালায়। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়: "সরকারের কীর্তি।"

৩.
আজ সকালে গিয়েছিলাম পুরানা পল্টনের এক আইনজীবীর চেম্বারে। নাম ব্যারিস্টার কুতুব ভুঁইয়া, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। উনি জমিজমার মামলা করেন, ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে লড়েন; ওনার নাম ডাক শুনেছি।

চেম্বারে ঢুকতেই উনি বললেন, "বসুন। কী ব্যাপার?"

আমি ফাইলটা টেবিলে রাখলাম। বললাম, "স্যার, আমার জমি দখল হয়ে গেছে!"

উনি ফাইল খুললেন, পড়লেন;  তারপর চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন, "আপনার দলিল কোথায়?"

"কোনো দলিল নাই।"

"মিউটেশন?"

"নাই।"

"খাজনার রশিদ?"

"নাই।"

"নামজারি?"

আমি চুপ করে রইলাম।

উনি ফাইল বন্ধ করলেন। "দেখুন, জমির মামলা করতে গেলে প্রমাণ লাগে আপনি ওই জমির মালিক, কিংবা আপনার পূর্বপুরুষের দখলে ছিল, আপনার কাছে কিছু না থাকলে আমি কিছুই করতে পারব না।"

আমি বললাম, "আমার মা সেখানে আছেন, এখন কবর।"

"কবরের কোনো রেকর্ড আছে?"

"রেকর্ড নাই, শুধু একটা শালগাছ ছিল, গাছটা কাটা পড়ছে গত সপ্তাহে।"

আইনজীবী মাথা নাড়লেন.. "গাছ তো সরকারি জমিতেও থাকতে পারে, সেটা প্রমাণ না।"

আমার খুব রাগ হলো! রাগ হলে আমার চোখের মণি লাল হয়ে যায়, গুহার অন্ধকারের মতো গাঢ় লাল। আমি তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নিলাম। বললাম, "তাহলে আমার মায়ের কবরের কোনো দাম নেই?"

আইনজীবী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, "দেখেন, আপা, আইনের চোখে আপনি যদি না থাকেন, আপনার মাও থাকেন না। এটা খুব নিষ্ঠুর সত্যি!  কিন্তু সত্যি।"

৪.
সেদিন সন্ধ্যায় আমি গিয়েছিলাম কমলাপুর স্টেশনে। ভিড় ঠেলে মালতিকে খুঁজে বের করলাম; ও ফুটপাথে বসে ছিল, সামনে একটা ভিক্ষার বাটি। বাটিতে কিছু টাকা, আর একটা বাসি রুটি।

ওকে বললাম, "চল, শালবনে যাই.. শেষবারের মতো।"

মালতি বলল, "কেন? আর তো কিছু নেই সেখানে।"

"আছে, মায়ের কবরটা আছে; যতদিন না পুরো কংক্রিট ঢালছে, ততদিন আছে।"

আমরা দুজনে ট্রেনে উঠলাম.. জয়দেবপুর থেকে সিএনজি নিয়ে মধুপুরের দিকে। পথে কত গঞ্জ, কত বাজার; সব বদলে গেছে। যে পুকুরে আমরা স্নান করতাম, সেটা এখন ভরাট হয়ে মার্কেট হয়েছে। যে আমতলায় আমরা জমায়েত হতাম, সেখানে এখন পেট্রোল পাম্প।

সন্ধ্যার আগে আমরা পৌঁছলাম। শালবনের শেষ প্রান্তে, যেখানে বুলডোজারগুলো এখনো পুরোপুরি পৌঁছায়নি।

গাছের সংখ্যা কমে গেছে। কিন্তু এখনো কিছু শালগাছ দাঁড়িয়ে আছে, পুরনো সৈনিকের মতো। মাটি খোঁড়াখুড়ি হয়েছে, কিছু জায়গায় লাল মাটি উল্টে পড়ে আছে।

আর আমাদের গুহাটা?

বন্ধ! মুখটা বড় বড় পাথর দিয়ে চাপা দেওয়া। উপরে সাইনবোর্ড—"ভবিষ্যৎ রেস্টুরেন্টের স্থান"।

আমি পাথরের ওপর হাত রাখলাম, পাথর ঠান্ডা। ভেতর থেকে কোনো সাড়া নেই; আমার মা ভেতরে ঘুমিয়ে আছেন, ঘুম ভাঙানো যাবে না। কারণ তিনি এখন আর আমাদের জগতের নন!  তিনি এখন মানুষের জগতের "অবৈধ দখলদার"।

মালতি কাঁদছিল; ওর কান্নার শব্দ বাতাসে মিশে গেল।

আমি কাঁদিনি, আমি জানি; কান্না মানুষের দুর্বলতা। আর আমি মানুষ নই।

আমি সিদ্ধান্ত নিলাম। আরেকবার আইনজীবীর কাছে যাব, নতুন করে বলব; যদি না শোনে, তবে অন্য পথ দেখব। কারণ আমাদের একটা অস্ত্র আছে যা মানুষের নেই।

আমরা অপেক্ষা করতে জানি।

যেটা আমার লাভার-বয় শালিক জানে না- ও জানে আমি মানুষ, প্রিতু বলে ডাকে,  সবসময় বলে, আমি নাকি একটু বেশিই রাত জাগি, একটু বেশিই চুপচাপ, আর আমার হাতের নখগুলো নাকি অন্যের সবার মতো না, একটু বেশিই ধারালো! 

কিন্তু সে জানে না আমার  চামড়ার নিচে আরেকটা  তৃতীয় চোখ ঘুমিয়ে আছে, জাগলে বুঝতো, সাতশো বছরের পুরনো আগুন, যা মানুষ এখন “দুদিনের অবৈধ প্রেমের” ভিতর রাখে; যার স্থায়িত্ব শরীর পর্যন্ত।

তাই শালিকের অধৈর্যর কারণ আমি বুঝি! সুযোগ পেলে কাছে আসতে চায়, আমার ঠান্ডা শরীর, হাত রাখতেই চমকে উঠে; দূরে সরে যায়। মাঝে মাঝে সন্দেহ করে আমি মানুষ কিনা? কিন্তু ও জানে না আমার ভিতর সেরকম শারীরিক উত্তেজনা নাই, যা প্রকাশ্যে এলে মানুষ চক্ষুলজ্জার ভয় পায়।
আমার উত্তেজনা শুধু অবিশ্বাসের মধ্যে ভয় ঢুকানো। ভয়ই আমাদের শেষ সম্বল।
ঘটনা লম্বা, অন্য কোনো গল্পে বলবো “শালিকের কথা”।

৫.
পরের দিন সকালে আবার চেম্বারে গেলাম, এবার সঙ্গে আনলাম গাবুকে। ও কারখানার নাইট শিফট শেষ করে সোজা এসেছে; জামায় তেলের দাগ, চোখে ক্লান্তি।

আইনজীবী অবাক হলেন! "এঁকে আনলেন কেন?"

আমি বললাম, "উনি আমার সাক্ষী; উনি বলবেন, আমরা সেখানে ছিলাম।"

গাবু বলল, "জ্বি স্যার, আমি সেই টিলায় জন্মাইছি। আমার দাদি ওই গুহায় মানুষ খাইছিল! মানে, থাকত।"

আইনজীবী হাসলেন, "মানুষ খাইছিল?"

গাবু থতমত খেয়ে গেল! আমি তাড়াতাড়ি বললাম, "আমার চাচা মানে, রূপক অর্থে বলছে। আমরা ওখানকার আদিবাসী। আমাদের ভাষায় 'মানুষ খাওয়া' মানে নতুন মানুষকে আপন করে নেওয়া।"

আইনজীবী সন্দেহের চোখে তাকালেন! তারপর বললেন, "দেখুন, আপনাদের বিশ্বাস করতে আমার আপত্তি নেই; কিন্তু আদালতে প্রমাণ লাগবে। আপনাদের কোনো এনজিও আছে? কেউ আছেন যিনি বলবেন আপনারা ভূমিহীন আদিবাসী?"

এনজিও! এই শব্দটা শুনে আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো।

আমি বললাম, "আমি এনজিও খুলব।"

৬.
এনজিও খোলা সহজ না। কিন্তু অসম্ভব না! আমার সাতশো বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগল।

মানুষকে কীভাবে প্রভাবিত করতে হয়, আমি জানি। টাকা জোগাড় করতে গেলাম পুরান ঢাকার এক ধনী ব্যবসায়ীর কাছে। লোকটা সোনার দোকান চালায়, আর মনে মনে খুব ভীত। ওর দাদা নাকি একদিন রাতের বেলা শূন্য হাটে হারিয়ে গিয়েছিল। সেই গল্প ওর পরিবারে আজও কেউ ভোলে না।

আমি ওর দোকানে গেলাম, কিছু বললাম না। শুধু ওর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার চোখের রং বদলে গেল— গুহার অন্ধকারের মতো গাঢ় লাল।

ব্যবসায়ী কাঁপতে লাগল! বলল, "আপনি কে?"

আমি বললাম, "আমার নাম মায়া বেগম, আমি শালবনের শেষ মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করি। আপনি টাকা দিলে আমরা আইনি লড়াই করতে পারব। আর না দিলে... আপনার দাদার কথা মনে আছে?"

পরের দিনই ওর লায়ন মেম্বার চেক আমার এনজিওর অ্যাকাউন্টে জমা হলো।

এনজিওর নাম রাখলাম "শালবন অধিকার আন্দোলন"। ঠিকানা দিলাম মতিঝিলের সেই ভাঙা ভবনটা। রেজিস্ট্রেশন হলো।

এখন আমার কাছে একটা বৈধ প্রতিষ্ঠান আছে। আইনজীবী খুশি! বললেন, "এবার মামলা করা যাবে।"

কিন্তু আমি জানি, মামলা জেতা সহজ নয়। জিতলেও রিসোর্ট বন্ধ হবে না। কারণ যে ব্যবসায়ী রিসোর্ট বানাচ্ছে, প্রশাসন তার ইশারায় নাচে, তার টাকা আছে, লোক আছে, রাজনৈতিক শক্তি আছে। আর আমাদের আছে শুধু সাতশো বছরের স্মৃতি।

৭.
একদিন সন্ধ্যায় আমি বসে আছি ধানমন্ডির লেকের পাড়ে। পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে মানুষ-- কেউ কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে গান শুনছে, কেউ মোবাইলে কথা বলছে, কেউ জগিং করছে।

একটা মেয়ে আমার পাশে এসে বসল; বয়স চব্বিশ-পঁচিশ। পরনে সালোয়ার কামিজ, চোখে চশমা; ওর মুখটা খুব ক্লান্ত।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, "কী হয়েছে?"

মেয়েটা বলল, কিছু না! শুধু খুব একা লাগে.. সারাদিন অফিস করি, রাতে বাসায় ফিরে মোবাইল দেখি। কারও সঙ্গে কথা বলার নেই,, বাবা-মা গ্রামে, ভাই বিদেশে; বিয়ের কথা উঠলে সবাই শুধু পণ চায়। আমার চাকরিটাই আমার সব। কিন্তু সে চাকরিটাও নিরাপদ না! মনে হয়, কোনো অন্ধকার আমাকে গিলে খাচ্ছে।"

আমি ওর দিকে তাকালাম; ওর চোখের ভেতর সেই পরিচিত ভয় দেখলাম। সেই ভয় যা আমি সাতশো বছর ধরে চিনি। শুধু তখন মানুষ ভয় পেত পেঁচা, ভূতের, বনের অজানা শব্দের। এখন তারা ভয় পায় একাকিত্বের, ব্যর্থতার, বেকারত্বের, পণের, মোবাইল নোটিফিকেশনের।

আমি ওর হাত ধরলাম, আমার হাত ঠান্ডা। বললাম, "ভয় পেও না, তুমি একা না; এই শহরের আনাচেকানাচে আমরা আছি; যারা একা, তারাই জানে আমরা কারা।"

মেয়েটা বলল, "আপনি কে?"

আমি হাসলাম! "আমি মায়া, পুরনো হাওয়া! যা আছে কিন্তু নেই।"

মেয়েটা উঠে চলে গেল.. কিন্তু যাওয়ার আগে ওর মুখে একটু শান্তি দেখলাম।

হঠাৎ আমি বুঝতে পারলাম, আমাদের যুদ্ধ শুধু জমির জন্য না। আমাদের যুদ্ধ এই নতুন মানুষের জন্যও। যারা নিজেদের ভেতরের অন্ধকার চেনে না, কিন্তু সেই অন্ধকারেই ডুবে যাচ্ছে।

আমাদেরও যদিও ভয় দেখানোর ক্ষমতা আর বাঘের মতো দাঁত কাজ করছে না— যে ভয় দেখিয়ে আমরা পৈশাচিকভাবে হাসতাম, সে হাসি এখন  মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া ট্রোলিং আর বুলিং করে হাসে, আর কেউ সম্মান হারানোর ভয়ে ঘরের ফ্যানে ঝুলে, এটাই আধুনিকতা এখন, যেখানে  ইএমআই-র বকেয়া ভয়কে ভূতের চেয়েও বেশি পাত্তা দেয়।
আর আমাদের ছায়া টিকে থাকে ভিন্ন নয়তো অন্য রূপে।

আমি বুঝলাম, আমরা হারাইনি। আমরা শুধু রূপ বদলেছি।

৮.
রিট পিটিশন আদালতে গৃহীত হয়েছে; শুনানি হবে আগামী মাসে; আমি জানি জিতব না! কিন্তু হারাটাও একটা জায়গা দখল করা। কারণ মানুষ দেখবে, আমরা ছিলাম, লড়েছি! আমাদের নাম ইতিহাসের পাতায় থাকবে।

আর তার চেয়ে বড় কথা, আমি নতুন এক পথ খুঁজে পেয়েছি।

রিসোর্ট হবেই, গুহা ধ্বংস হবে! মায়ের কবর চাপা পড়বে কংক্রিটের নিচে।

কিন্তু আমি থাকব! আমরা থাকব!

এখন থেকে আমরা আর জঙ্গলে থাকব না। আমরা থাকব মানুষের ভেতরে উদ্বেগ হয়ে। যে ছেলে রাত জেগে ফেসবুক স্ক্রল করে আর ভাবে তার জীবনের কোনো মানে নেই, আমি তার পাশে থাকব। যে মেয়ে অফিসের বসের বেড টাচের ভয়ে আর অপমানে কাঁদে কিন্তু কাউকে বলতে পারে না, আমি তার বালিশের নিচে থাকব। 
যে বৃদ্ধ তার ছেলের বিয়ের পর ফোনের অপেক্ষায় দিন গোনে, আমি তার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকব। যে মেয়ে বেডরুমে পুরুষের উপর বিশ্বাস হারিয়ে, আবার কাউকে বিশ্বাস করতে ভয় পায়, আমি তার ভাঙা আস্থায় থাকব।। যে মানুষটা ভার্চুয়াল জগতে ঢুকে ভিড়ের মধ্যে থেকেও একা লাগে—আমি তার চারপাশের শূন্যতায় থাকব।

আমাদের নতুন নাম হবে নিঃসঙ্গতা!

আর এই নিঃসঙ্গতার কোনো আদালত নেই! কোনো পিটিশন হয় না; কোনো রিট কাজ করে না।

এটাই আমাদের প্রতিশোধ! এটাই আমাদের টিকে থাকা।
কারণ, এখানকার মাটি, নদী, বর্ষা, আর শহরের গলিঘুঁজিতে প্রাচীন ভূতের ভয় বিশ্বাস-অবিশ্বাস থাকলেও সৌন্দর্য  ছিল, কিন্তু বর্তমানে আধুনিকতার যে সংঘাত, তা ইউরোপ-আমেরিকার গথিক ফ্যান্টাসির চেয়েও বেশি উদ্বেগ আর ভয়ের।

৯.
কাল শুনানি! আমি আদালতে যাব;  আমার পরনে সাদা সালোয়ার কামিজ, মাথায় ওড়না, হাতে ফাইল। দেখতে একদম সাধারণ নারী। যে নারী তার জমির জন্য লড়ছে।

কেউ জানবে না আমি সাতশো বছরের পুরনো হাওয়া।

বিচারক যখন প্রশ্ন করবেন, আমি উত্তর দেব। যখন বলবেন "মামলা খারিজ", আমি মাথা নিচু করব। যখন সাংবাদিকরা ছবি তুলবে, আমি মুখ লুকাব।

তারপর আমি ফিরে আসব মতিঝিলের সেই ভাঙা ভবনে। সিঁড়ির নিচে বসে চা খাব; আর অপেক্ষা করব পরবর্তী মানুষের জন্য, যে তার নিঃসঙ্গতা বুঝতে পারবে না, কিন্তু আমার স্পর্শ চিনবে।

কারণ আমি মায়া বেগম (প্রিতু)।

আমি অলীক! যা আছে কিন্তু নেই।

আর এখন থেকে আমি সবার।