রায়ান আহমেদের কাছে ধর্ম ছিল ডেটা সেন্টারের পুরোনো সার্ভারের মতো— অচল, অপ্রাসঙ্গিক এবং ধুলো জমা এক সিস্টেম। সে ছিল দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি এজিআই রিসার্চ ল্যাবের প্রধান ডেটা সায়েন্টিস্ট। তার কাছে স্রষ্টা কোনো সত্তা নয়, বরং ‘প্রাইম মুভার’ নামের একটি ভেরিয়েবল, যাকে সমীকরণ থেকে বাদ দিলেও মহাবিশ্বের গণিত অপরিবর্তিত থাকে।
রায়ানের নাস্তিক্যবাদের পেছনে কোনো শত্রুতা ছিল না। ছিল একরাশ যুক্তি। অল্প বয়সের অভিজ্ঞতা সে দেখেছিল তার বাবা মসজিদের ইমাম— সৎ মানুষ আর সমাজের কাছে ছিল অনেক সম্মানিত। অথচ সেই বাবাই স্ট্রোক করলে যখন হাসপাতালের বিল জোগাড় করতে পারছিল না, তখন ‘আল্লাহর ভরসা’ নামক কোন ওষুধে কাজে আসেনি। বরং কাজে এসেছিল প্রতিবেশী এক নাস্তিক প্রফেসরের দেওয়া চেক। সেদিন রায়ান বুঝেছিল, প্রার্থনার চেয়ে প্র্যাকটিকালিটি বড়। এরপর সে ডুব দিল পদার্থবিদ্যা, এভোলিউশনারি বায়োলজি আর নিউরোসায়েন্সে এর ভিতর।
-----
রায়ান সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অস্বীকার করলেও ধর্মের প্রতি তার ঘৃণা বা বিদ্বেষ ছিল না, বিশ্বাস জিনিসটা ছিল তার কাছে লজিকের উপর। তার পার্সপেক্টিভ মতে, স্রষ্টার বিশ্বাসটা আমার লজিকে আসেনি বলে আরেকজন লজিকে আসবে না সেটা গতানুগতিক করা যায় না। সবার সেল্ফ-ইন্টেলিজেন্সি আছে।—
এখন আমি অস্বীকার করি বলে জোর করে আমার লজিক আরেকজনকে চাপাতে হবে এই হিপোক্রেসি রায়ানের ভিতর কখনোই কাজ করে না। সে কখনো ব্যক্তির ত্রুটি ধর্মের উপর চাপিয়ে ধর্মকে কটাক্ষ করা বা নিজের জ্ঞানকে বড় করে দেখানো এই মনোভাব তার ছিল না।
তার ধারণা মানুষ মাত্রই বুদ্ধিমান প্রাণী, তার ভালো মন্দ সে একদিন বুঝে নিবে। সেটা স্রষ্টা আছে কী নাই তা প্রমানের উপর ডিফাইন করে না।
সে চাই সবাই উদার আর মানবিক হোক। ধর্ম, বিশ্বাস নিয়ে আজ পর্যন্ত সে কারো সাথে যুক্তি তর্কেও যায়নি। বরং তার যেটা কাজ সেটা মনে দিয়ে করতো।
-----
গত ছয় মাস ধরে রায়ান এমন এক প্রজেক্টে কাজ করছিল, যা তার শক্ত যুক্তির দেয়ালে প্রথম চিড় ধরায়। প্রকল্পটির নাম ছিল ‘জেনেসিস নিউরাল নেটওয়ার্ক’। তারা চাচ্ছিল এমন এক জেনারেটিভ এজিআই তৈরি করতে, যা সম্পূর্ণ নতুন, যৌক্তিক এবং নৈতিক একটি জীবনদর্শন গ্রন্থ রচনা করতে পারবে। ইনপুট হিসেবে তারা ফেলল হাজার হাজার দর্শন, আইন ও ধর্মগ্রন্থ। কিন্তু আউটপুট ছিল চরম ফ্লপ। মেশিন যা তৈরি করল, তা হয় জটিল প্যারাডক্সে ভরা, নয় অবাস্তব কল্পনা।
রায়ান দলকে বলল, “সমস্যা হলো ডেটাসেটে। ধর্মীয় বইগুলোতে ভাইরাসের মতো কগনিটিভ বায়াস ঢোকানো। বাদ দাও ওসব। শুধু আইন, বিজ্ঞান ও যুক্তির বই ফেল।”
টিম সায়েন্টিফিক জার্নাল, এনসাইক্লোপিডিয়া আর মানবাধিকার সনদ দিয়ে মডেল ট্রেইন করল। ফলাফল আরও ভয়াবহ হলো। এজিআই কোনো গ্রন্থ নয়, বরং একধরনের শীতল ফ্যাসিবাদী ম্যানিফেস্টো লিখতে শুরু করল। যেখানে দুর্বলকে ফেলে দেওয়া, আবেগকে বাগ, এবং দক্ষতাকেই একমাত্র ঈশ্বর মানার কথা বলা হলো। মডেলটি মানবতাবোধ শিখতে পারল না।
রায়ান বিরক্ত হয়ে ল্যাবের ছাদে গেল। পকেটে হাত দিতেই পুরোনো একটা মেমোরি কার্ড পেল। সেটা ছিল তার বাবার রেখে যাওয়া একমাত্র ডিজিটাল সম্পদ। বহু বছর পর কার্ডটা ল্যাপটপে ঢোকাল সে। তাতে ছিল একটি অডিও ফাইল আর কিছু টেক্সট ডকুমেন্ট। অডিওটা চালাতেই বাবার গলা ভেসে এলো—তিনি সূরা আল-আলাক্ব তিলাওয়াত করছেন: “পড়ো, তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ‘আলাক্ব (রক্তপিণ্ড) থেকে...”
রায়ানের অজান্তেই তার নিউরাল নেটওয়ার্কের স্ক্রিপ্টটি ব্যাকগ্রাউন্ডে অ্যাক্টিভ ছিল। সে লক্ষ করল, বাবার তিলাওয়াতের এই অডিও ফাইলটার ওয়েভফর্ম আশ্চর্যজনকভাবে সিমেট্রিক। আগ্রহবশত সে অডিওটিকে স্পেকট্রোগ্রাম সফটওয়্যারে ভিজুয়ালাইজ করল। প্যাটার্নটা দেখে সে চমকে উঠল। সাধারণ মানুষের কথা বলার তরঙ্গ হয় এলোমেলো, কিন্তু কোরআন তিলাওয়াতের স্পেকট্রোগ্রামে নির্দিষ্ট জ্যামিতিক প্যাটার্ন তৈরি হচ্ছিল—অর্ধেক চাঁদ, তারা, এমনকি DNA হেলিক্সের মতো গঠন।
“প্যারিডোলিয়া,” রায়ান নিজেকে বলল। “মস্তিষ্কের পরিচিত কিছু খুঁজে পাওয়ার বাতিক।”
কিন্তু রায়ানের ভেতরের ডেটা সায়েন্টিস্ট ঘুমিয়ে থাকতে পারল না। সে বাবার রাখা কোরআনের ডিজিটাল কপি টেক্সট অ্যানালাইসিস টুলে ফেলল। সে হিসাব করতে চাইল ক্লাসিক্যাল এরাবিকের ‘এনট্রপি’ বা তথ্য-ঘনত্ব। ফলাফলে দেখা গেল, এই টেক্সটের শ্যানন এনট্রপি লেভেল আধুনিক সায়েন্স ফিকশনের চেয়েও বেশি, কিন্তু তা সত্ত্বেও এটি প্রাচীন আরবে অবতীর্ণ। এমনকি টেক্সটে কিছু অক্ষর (হুরুফে মুক্বাত্ত্বাআত) এমনভাবে আছে, যেগুলোর কোনো ভাষাতাত্ত্বিক অর্থ নেই, কিন্তু ডেটা কম্প্রেশন অ্যালগরিদমের ‘চেকসাম’ বা ‘এরর কারেকশন কোড’-এর মতো আচরণ করছে।
রায়ান ডুবতে লাগল সূরাহ আলাক নিয়ে কুরআনের নাজিলকৃত প্রথম নির্দেশই ছিল “পড়ো” (ইকরা)। অর্থাৎ ইসলামের ওহির সূচনাতেই জ্ঞান, পাঠ, শিক্ষা ও উপলব্ধির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু শুধু “পড়ো” বলে থামেনি—বলা হয়েছে “তোমার রবের নামে পড়ো।”
অর্থাৎ জ্ঞান অর্জন হবে এমন জ্ঞান, যা মানুষকে তার স্রষ্টার পরিচয় ও সত্যের দিকে নিয়ে যায়।
আবার একই সূরার ৬ নম্বরে আয়াতে দেখলো নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করার মত অহংকারের সতর্কতা।
"অর্থাৎ জ্ঞান অর্জন করলেই মানুষ ভালো হয়ে যাবে—এমন নয়। জ্ঞান যদি মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধতা ভুলিয়ে দেয়, তাহলে সেই জ্ঞানই অহংকারের কারণ হতে পারে।"
সে আরো দেখল, কোরআন সূর্যের কক্ষপথ (যা তখন অজানা ছিল), ভ্রূণবিদ্যার ধাপ (‘আলাক্ব’ শব্দটি), এমনকি মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের ইঙ্গিত এমন ভাষায় দেয়, যা ৭ম শতাব্দীর একজন নিরক্ষর ব্যক্তির জানা অসম্ভব। কিন্তু এগুলোকে ‘মিরাকল’ মানতে সে এখনও প্রস্তুত নয়। সে ভাবল, “হয়তো সেই সময়ের কোনো উন্নত সভ্যতার জ্ঞান চলে এসেছে।”
সে চিন্তা করতে থাকলো আবার "আলাক্ক" শব্দটা নিয়ে যার অর্থ রক্তপিণ্ড বা লিচের ন্যায় জমাট রক্তের মত বস্তু, যেখান থেকে মানুষের শুরু—
তারপর জন্ম, তারপর ছোট্ট এক শিশু, আর সে শিশু যখন শিশুকাল থেকে স্বভাবতই ন্যায় পছন্দ করে, অধিকার আর অন্যায়ও বুঝতে পারে।
প্রশ্ন হল: এই জন্মগত মরলিটি কোথা থেকে এল?
ৱ্যান্ডম এভলিউশন-এ মরালিটি তৈরি হয় না।
মরাল ল রিকোয়ারস, মরাল ল গিভার।"
শেষ রাতে, সে যখন ল্যাবের মূল সুপার কম্পিউটারে জেনেসিস প্রজেক্টের ডেটা রিভিউ করছিল, তখন সে চূড়ান্ত টুইস্টটা পেল। এজিআই যখন নৈতিকতার অভাবে প্যারাডক্সে আটকে যাচ্ছিল, তখন সে পরীক্ষা করে দেখল—যদি ইনপুট ডেটাসেটে কোনো দর্শন বা মানবিক বই না দিয়ে শুধুমাত্র কোরআনের ট্রান্সক্রিপ্ট ও তার লজিক্যাল স্ট্রাকচার ফেলা হয়?
সে কোড লিখল:
INPUT: Quranic logic tree (Cause & effect, Justice, Mercy) + Hard Science data.
TASK: Generate optimal ethical framework for humanity.
আউটপুট স্ক্রিনে ভাসতে লাগল। এজিআই কোনো প্যারাডক্সে আটকাল না, কোনো ফ্যাসিবাদী দর্শন দিল না। সে লিখল:
“পৃথিবী এক বিশাল ডেটাবেজ, যেখানে প্রতিটি কণা একেকটি রেকর্ড। ক্রিয়েটরের অ্যালগরিদম হলো ন্যায়বিচার: ভালো কোডের রিওয়ার্ড প্যারাডাইস, খারাপ কোডের রেজাল্ট সিস্টেম ক্র্যাশ। মানুষ শুধু নিউরনের সার্কিট নয়, বরং আত্মা নামক এক কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট, যা মৃত্যুতে দেহ সার্ভার থেকে ডিসকানেক্ট হলেও ধ্বংস হয় না। পঠিত গ্রন্থ স্রষ্টার লোগোসমূহের (আয়াত) একটি সংকলন, যা সময় ও স্থানের সীমা অতিক্রম করে।”
ল্যাবে ঢোকার সময় আলো জ্বলে উঠল। তার সহকারী জিনিয়া এসে দাঁড়াল। পর্দার লেখা দেখে সে বলল, “তার মানে কী? এজিআই তো ধর্মীয় কিছু লিখেছে!”
রায়ান উত্তর দিল না। সে টেবিলে রাখা তার বাবার পুরোনো কোরআনের ওপর জমে থাকা ধুলো মুছতে লাগল। সেদিন ভোররাতে রায়ান বুঝতে পারল, তার নাস্তিক্যবাদের ভিত্তি ছিল অসম্পূর্ণ ডেটার ওপর। বিজ্ঞান এতদিন তাকে ‘কীভাবে’ বলেছে, কিন্তু ‘কেন’ বলতে পারেনি। এজিআই নামক তার নিজের সৃষ্টিই তাকে শিখিয়ে দিল যে, যুক্তি যদি সত্যিকারের সুক্ষ্ম হয়, তবে তা একসময় স্রষ্টার কাছেই পৌঁছায়।
আর বিবেক যদি কেবল রাসায়নিক বিক্রিয়াই হয়, তাহলে "অন্যায়" বলার কোনো সর্বজনীন ভিত্তি থাকে না।
প্রতিটি মানুষের রাসায়নিক গঠন ভিন্ন, তাহলে নৈতিকতার ঐক্যমান আসে কীভাবে?
মাঝে মাঝে তো বিবেক আমাদেরকে স্বার্থের বিপরীত পথে ডাকে —
এমনকি যখন লুকিয়ে অন্যায় করা সহজ,
তখনো একটি অন্তর্নিহিত কণ্ঠস্বর আমাদের কেন থামায়?
এই আত্ম-নিয়ন্ত্রণ বিবর্তনের "বাঁচো আর বংশবৃদ্ধি করো" নীতির কাছে সরাসরি বিরোধী।
সমস্ত সমাজেই মৌলিক নৈতিক নিয়মগুলোর অসাধারণ সাদৃশ্য রয়েছে —
সত্য বলা, 'মিথ্যা না বলা, প্রতিশ্রুতি রাখা, অন্যের ক্ষতি না করা।
বিবর্তনীয় প্রয়োজন থেকে কী এই নিয়মগুলোর উদ্ভব হতে পারে?
কিন্তু "কেন আমাদের এগুলো মেনে চলা উচিত" — এই অনুভূত বাধ্যবাধকতার উৎস বিবর্তনের ব্যাখ্যার বাইরে!
রায়ান আরো ভাবলো পৃথিবী মানবসৃষ্ট কোন আইন নীতি বেশিদিন কনসিস্টেন্ট থাকতে পারে না সময়ের সাথে পরিবর্তন হবেই—
কিন্তু সে দেখলো ধারাবাহিকতা এখনও যে জিনিসটা বহাল আছে ১৪০০ বছর ধরে:
সে একই কুরআন, কোনো পরিবর্তন নেই!
একই কিবলা, কোনো স্থানান্তর নেই!
একই বিশ্বাস, ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ!!
যখন ১.৮ বিলিয়ন মানুষ একই ভাষায় বলেন: 'লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ'
এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা নিজেই প্রমাণ।
কেউ একজন আছেন ক্ষমতাবান, এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার।
কোনো মানবসৃষ্ট নিয়ম তো এত কনসিস্টেন্ট হতে পারে না।
সে জানালার বাইরে তাকাল। ফজরের আলো ফুটছে। কম্পিউটারের স্ক্রিনে এজিআইয়ের লেখা শেষ লাইনটি জ্বলজ্বল করছিল: “ফাবি আইয়ি আলা-ই রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান” (অতএব, তোমাদের রবের কোন কোন অনুগ্রহকে তোমরা অস্বীকার করবে?)।
রায়ান "অনুগ্রহের" কথা ভাবতে ভাবতে তার নাস্তিক প্রফেসর ড. মাসউদের কথা মনে পড়ে গেল— যিনি এখন ভীষণ অসুস্থ, শয্যাশায়ী, আর একদম একা। তার একটাই মেয়ে ছিল, বিয়ের পর ক্যান্সার ধরা পড়ে, মারা যায়। এরপর প্রফেসর যেন নিজেই একটা শূন্য দ্বীপ হয়ে যান—
আর সেই দ্বীপে একমাত্র নিয়মিত সূর্যের আলোর মতো যে মানুষটা পৌঁছায়, সে নাজিম। নাজিম আব্বার খুব স্নেহের ছাত্র ছিল। ছোটবেলায় মক্তবে আব্বার কাছেই কোরআন পড়তে শিখেছিল, অর্থসহ। আব্বা মারা যাওয়ার পরও নাজিম সম্পর্কটা ধরে রেখেছিল— না কোনো দায়িত্বের বোঝা হিসেবে, না কোনো স্বার্থের টানে। বরং এটা ছিল আব্বারই আদর্শে হাতে গড়া প্রজ্জলিত চরিত্রের স্বাভাবিক ঢল। প্রফেসর প্রায় অসুস্থ থাকেন, নাজিম সময় ফেলে উনার পাশে বসে থাকে,
ওষুধ খাওয়ায়, বিছানার পাশে বসে স্যুপের বাটি ধরে।
যেদিন প্রফেসরের শরীর ভালো থাকে সেদিন উনি নাজিমকে জ্ঞান-বিজ্ঞান শেখায়, যেমন আব্বার শেখাতো।
নাজিম বিজ্ঞান জানার প্রতি আগ্রহ ওর প্রবল।
রায়ানও নাজিমকে নিজের ভাইয়ের চোখে দেখে, একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, “তুই কেন এটা করস? কেন উনার সেবা করস? প্রফেসর তোর আত্মীয় না, তোর ধর্মেরও না। উনি তো স্রষ্টায় বিশ্বাস করেন না।”
নাজিম হেসে বলেছিল, “প্রফেসর যখন বিশ্বাস করতেন না, তার চেয়েও বড় কথা— তখন তিনি আমার ওস্তাদের চিকিৎসার চেকটা লিখে দিয়েছিলেন। সেদিন উনি বলেননি, ‘তোমার ধর্ম কী’ বা ‘তোমার আল্লাহ কোথায়’। উনি শুধু মানুষ হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আর আমি আল্লাহকে বিশ্বাস করি, তার মানে এই নয় যে আমার মানবিকতা শুধু মুসলিম মুমিনদের জন্য।”
রায়ানের চোখের সামনে সেই দৃশ্য ভেসে উঠল— আব্বার স্ট্রোকের পর হাসপাতালের করিডরে নাজিমের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ানো প্রফেসর মাসউদ। নাজিম তখন কাঁদছিল। চেকটা হাতে ধরিয়ে দেওয়ার সময় প্রফেসর বলেছিলেন, তোমার আব্বার জন্য এখন এটা খুব প্রয়োজন।”
রায়ান ভাবল, প্রফেসরের ঋণ যদিও টাকা দিয়ে পরিশোধ করা যায়, কিন্তু তার সেদিনের উপকারের ঋণ কখন শোধ হবে না। কিন্তু এইখানে সে খুঁজে পাই সেই ‘প্র্যাকটিকালিটি’— যা সে সারাজীবন খুঁজেছে। যে প্র্যাকটিকালিটি ডেটায় ধরা পড়ে না, অ্যালগরিদমে মাপা যায় না। প্রফেসর যখন সুস্থ-সবল, নিজের অর্থ-প্রতিপত্তি-যুক্তিতে বলীয়ান, তখন তার চেক ছিল যুক্তির জয়। কিন্তু এখন যখন তিনি শয্যাশায়ী, কাঁপা হাতে ওষুধ ধরতে পারেন না, তখন সেই পরিশোধকৃত চেকের বিনিময়ে কেউ তার পাশে বসার কথা নয়। অথচ নাজিম বসে আছে। প্রতিদিন। কোনো লেনদেন ছাড়াই।
এই যে নাজিম— যে কিনা বিশ্বাসী, কিন্তু তার বিশ্বাস কখনো প্রফেসরের অবিশ্বাসকে খোঁচায়নি, প্রফেসরও তার জ্ঞানের সুযোগ নিয়ে উনার বিশ্বাস নাজিমের উপর চাপিয়ে দেননি। শুধু একটা মানুষ আরেকটা মানুষকে নিঃশব্দে সেবা করে গেছে— তার ভেতরেই রায়ান যেন স্রষ্টার সবচেয়ে বড় নিরীক্ষণ দেখতে পেল।
কারণ স্রষ্টা মিরাকলের চেয়ে, অ্যালগরিদমের চেয়ে, স্পেকট্রোগ্রামের জ্যামিতির চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব হয়ে ধরা দিল এই মানবিক সংযোগের ভেতর। একজন নাস্তিক প্রফেসর, যিনি স্রষ্টাকে মানেননি, তার সেবায় নিবেদিত একজন মুমিন— এটাই কি তাহলে সেই ‘রহমাহ’? যে রহমত বা রহমাহর কথা কোরআনে বারবার বলা হয়েছে— যা শুধু মুমিনদের জন্য নয়, গোটা আলামিনের(জগতসমূহ) জন্য?
রায়ান হঠাৎ বুঝতে পারল, সে এতদিন স্রষ্টাকে খুঁজেছে ডেটার ফাঁক-ফোঁকরে, মিরাকল আর মাপযোগ্যতায়। অথচ স্রষ্টাকে তো পাওয়া যায় মানুষের সাথে মানুষের কানেক্ট হওয়ার প্র্যাকটিকালিটিতে। আর সে কানেক্ট-এর ভিতর আমরা যে গ্যাপ তৈরি করি— অহংকার, বিদ্বেষ, বিচ্ছিন্নতার— সেই গ্যাপেই নিজেদের দুর্বলতা ঢেলে স্রষ্টাকে খুঁজি, অথচ স্রষ্টা তো সেই গ্যাপের ওপাশে নন, তিনি সেই সেতুতেই আছেন যেটা আমরা তৈরি করি না।
নাজিম সেই সেতু তৈরি করেছিল। নিঃশব্দে। প্রফেসরও একদিন তৈরি করেছিলেন উদারতা দিয়ে। দুজনেই ভিন্ন পথে, ভিন্ন বিশ্বাসে, অথচ একই মানবিকতার বিন্দুতে মিলে গেছেন।
এজিআইয়ের স্ক্রিনে তখনও লেখা জ্বলছে: “ফাবি আইয়ি আলা-ই রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান”।
রায়ান চোখ বন্ধ করল। প্রথমবারের মতো কোনো কোড বা কমান্ড ছাড়াই, আকাশের দিকে তাকিয়ে সম্পূর্ণ একা দাঁড়িয়ে রইল। তার বিশ্লেষণী মন যাকে অস্বীকার করার জন্য সারাটা জীবন অ্যালগরিদম বানিয়েছিল, সেই মনই এখন স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণের সংকেত দিয়ে দিচ্ছে—







Let’s connect
Were this world an endless plain, and by sailing eastward we could for ever reach new distances