The Bengali Storyteller

Story লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

 ১. সে বছর বন্যা এসেছিল রাতের অন্ধকারে। ইছামতী পাগল হয়ে জেগে উঠল, ঘুমন্ত খাসপাড়া গ্রামের বুকের ওপর যেন ছুরি চালাতে চাইল। মানুষ হাহাকার করে ছ...

 ১. সে বছর বন্যা এসেছিল রাতের অন্ধকারে। ইছামতী পাগল হয়ে জেগে উঠল, ঘুমন্ত খাসপাড়া গ্রামের বুকের ওপর যেন ছুরি চালাতে চাইল। মানুষ হাহাকার করে ছুটল— কে কাকে বাঁচায়! ঠিক সেই মুহূর্তে, কাঁধে টর্চলাইট ঝুলিয়ে, কাদাপানিতে প্রথম নামলেন আব্বাস মোল্লা।


“ও বাড়ির বাচ্চাটা... ভিতরে আটকা!” একজন চিৎকার করল।


মুহূর্তে ষাটোর্ধ্ব মানুষটা সাঁতরে গেলেন কোমর-পানি পেরিয়ে। ঝুপড়ি ঘরের টিনের চাল সরিয়ে কাঁদতে থাকা আড়াই বছরের শিশুটিকে কোলে তুলে ফিরলেন। নিজের শরীর কেটে রক্ত বেরোচ্ছে, অথচ মুখে ফুটে উঠল এক চিলতে ক্লান্ত হাসি। “যাও, মায়ের কাছে দাও।”


ভোর হতে না হতেই আব্বাস মোল্লা উঁচু রাস্তায় রান্নার ব্যবস্থা করলেন। নিজের ঘর তলিয়ে গেছে, গোলার ধান ভেসে গেছে— তবু তিনি পরম শান্তিতে এতিম শিশুদের পাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করছেন। গ্রামবাসী হাউমাউ করে কেঁদে বলল, “আপনারে আল্লাহ দুনিয়াতে ফেরেশতা বানায়া পাঠাইছে, মোল্লা সাহেব।”


আব্বাস মোল্লা চোখ নামিয়ে বললেন, “আমি তো মহাপাপী। এই পাপীর দোয়া কবুল হয় কি না, আল্লাহই জানেন।”


এই দৃশ্যই প্রথম ক্যামেরাবন্দী করল ইউসুফ আলী। তরুণ সাংবাদিক, শহর থেকে এসেছে ‘গ্রামীণ মানবতার স্থাপত্য’ শীর্ষক তথ্যচিত্র বানাবে বলে। খাসপাড়ায় পা রেখেই সে দেখল এক জীবন্ত কিংবদন্তিকে। আব্বাস মোল্লার স্নিদ্ধ হাসি, দাড়িতে পাক ধরলেও চোখের তারায় কোমলতা— যা দেখলে মনে হয়, এই মানুষটাকে ঘিরে জীবনটা বুঝি আরও সুন্দর।


“আমি কি আপনার ওপর একটা তথ্যচিত্র বানাতে পারি, মোল্লা সাহেব?” ইউসুফ বিনীত অনুরোধ করল।


আব্বাস মোল্লা নরম গলায় বললেন, “তথ্যচিত্র কিসের? আমি তো নগণ্য মানুষ। বরং এই গ্রামের গরিব মানুষগুলারে দেখাও।”


ইউসুফ জোরাজুরি করায় শেষে সম্মতি দিলেন। তবে একটা শর্তে— কোনো প্রশংসাবাক্য নয়, সাধারণ জীবনই দেখাতে হবে। ইউসুফ মানতে বাধ্য হল।


দুই.


ইউসুফের ক্যামেরা ধীরে ধীরে আত্মস্থ করতে লাগল আব্বাস মোল্লার দিনরাত্রির ছবি। ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে তিনি কলের পানি এনে দেন প্রতিবেশী বিধবা জরিনা খালার বাড়িতে। তারপর নিজের উঠোনে পাখিদের খাবার ছিটিয়ে দেন। সকাল সাড়ে সাতটায় বাড়ির সামনে ছোট্ট লাইব্রেরি খোলেন, যেখানে গরিব ছেলেমেয়েরা বিনা পয়সায় বই পড়ে। দুপুরে গ্রামের ক্লিনিকে স্বেচ্ছাসেবক। রাতে এতিমখানায় গিয়ে বাচ্চাদের ঘুমপাড়ানি গান শোনান। ইউসুফ ভাবে, এমন মানুষ কি সত্যিই থাকে?


একদিন ইউসুফ তাঁর পুরনো ডায়েরি উল্টাতে গিয়ে দেখে, একটা পাতা ছেঁড়া। পরের পাতায় ছোট্ট অক্ষরে লেখা— “মিলি চতুর্থ অধ্যায়”। ইউসুফের কৌতূহল হয়, “মিলি কে, মোল্লা সাহেব? কোনো আধ্যাত্মিক নাম নাকি?”


আব্বাস মোল্লা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “মিলি আমার বোনঝি ছিল। ছোটবেলায় মারা গেছে। ডায়েরিটা বহু পুরোনো।” বলে পাতাটা উল্টে দিলেন। তাঁর কণ্ঠে বেদনার আভাস। ইউসুফ ভাবে, হয়তো শোকাহত। ক্যামেরা চলতে থাকে।


মিলি নামটা পরের সপ্তাহেই রক্তমাংসের শরীর নিয়ে ফিরে আসে। গ্রামের চঞ্চল তেরো বছরের কিশোরী মিলি হঠাৎ হারিয়ে যায়। গোটা গ্রাম খুঁজতে বেরোয়। আব্বাস মোল্লা তখন শহরে, চারজন সাক্ষী দেখেছে— গরিব মজিদ মিয়াকে নিয়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেছেন। ফিরে এসে খবর শোনামাত্র তিনি কেঁদে ফেলেন। নিজে পুলিশ ডাকেন, জোরে জোরে মাইকিং করান। সবার চোখে তখনও তিনিই ভরসা।


“আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো,” তিনি মিলির মাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “আমি আছি। মেয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত তোমার সব খরচ আমি দেব।”


ইউসুফ লেন্সের আড়ালে এই দৃশ্য দেখতে দেখতে শিউরে ওঠে। তার মনে হয়, মানবতার চূড়ান্ত ছবি ক্যামেরাবন্দী হচ্ছে। কিন্তু কেন যেন খানিকটা অস্বস্তি লাগে। আব্বাস মোল্লার কান্নার মাঝে চোখের কোণে এক চিলতে শান্তি— যেন সবকিছু আগে থেকেই জানেন।


তিন.


ইউসুফ তথ্যচিত্রের জন্য গ্রামের ইতিহাস জানতে গিয়ে খুঁজে পায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শফিক কাকুকে। আশি বছরের বৃদ্ধ, চোখে ছানি পড়লেও স্মৃতি অম্লান। ইউসুফ জিজ্ঞেস করে, “মোল্লা সাহেবের মতো মানুষ আগে এই গ্রামে এসেছে?”


শফিক কাকু একটা লম্বা শ্বাস ছাড়েন। “মোল্লা সাহেবের মতো মানুষ এ গ্রামে একটাই। কিন্তু জানো বাবা, অদ্ভুত কথা— তিরিশ বছর ধরে প্রতি বন্যায় এই গ্রামে একটা করে মেয়ে হারিয়ে যায়। অথচ প্রতিবার সেই সময় আব্বাস মোল্লা কাউকে নিয়ে শহরে থাকেন। তাই কেউ সন্দেহ করে না।”


ইউসুফের কানে যেন কেউ বিষ ঢালল। “তার মানে?”


“কোনো মানে নেই। আমি বুড়ো মানুষ, পাগলামি করি।” শফিক কাকু হঠাৎ কথা ঘুরিয়ে দেন। কিন্তু ইউসুফের ভেতরটা খচখচ করতে থাকে। সেদিন রাতে সে পুরনো খবরের কাগজ ঘাঁটতে বসে। তিরিশ বছর, এতো মেয়ে নিখোঁজ— প্রতিবারের ঘটনাস্থল নদীর ধার, বৃষ্টি, বন্যা। আর প্রতিবারই আব্বাস মোল্লা শহরে। নিখুঁত অ্যালিবাই।


পরদিন ইউসুফ আবার শফিক কাকুর কাছে ফিরে যায়। চাপাচাপি করায় বৃদ্ধ জানান, প্রথম মেয়েটি ছিল আব্বাস মোল্লার নিজের স্ত্রী— সুমাইয়া। নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে ‘ভেসে গেছে’ বলা হয়েছিল। কিন্তু লাশ পাওয়া যায়নি। নিজ স্ত্রীকে নিখোঁজ করে দেয়া মানে পরবর্তীতে কেউ আর সন্দেহের তীর তার দিকে না ফেলা। এরপর প্রতি বন্যার সময় আরও মেয়ে মেয়ে হারায়। প্রত্যেকবারই মোল্লার অ্যালিবাই থাকে। “কিন্তু কে সন্দেহ করবে? ও তো ফেরেশতা,” শফিক কাকু বিস্বাদ হাসেন।


ইউসুফ আর ঘুমাতে পারে না। সে ঠিক করে, আব্বাস মোল্লার ব্যক্তিগত জীবনটা গোপনে খুঁড়বে।


চার.


সুযোগ আসে বৃষ্টিভেজা এক দুপুরে। আব্বাস মোল্লা গ্রামের ক্লিনিকে, ইউসুফ পিছন দরজা দিয়ে তার ঘরে ঢোকে। দেয়ালে টাঙানো প্রথমা স্ত্রী সুমাইয়ার বড় ছবি। নিচে তাক— সেখানে কাঁচের শিশিতে নদীর পানি, শুকনো ফুল, একটা ছোট্ট চুড়ি। ইউসুফের মনে হয়, এটা কোনো স্মৃতিসংগ্রহ নয়, বরং অদ্ভুত এক জাদুঘর।


হঠাৎ চোখে পড়ে, আলমারির নিচে লোহার আংটা— মাটির নিচে যাওয়ার সিঁড়ি। ইউসুফ টান দিতে দরজা খুলে যায়। আঁধার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে সে। টর্চ জ্বালিয়ে দেখে, ছোট্ট ঘর। দেয়ালে টানানো দশটা মেয়ের ছবি। সবার গালে টিপ, চোখে অদ্ভুত প্রশান্তি। এক কোণে কোরআন শরীফ রাখা, আরেক কোণে তালাবদ্ধ কাঠের বাক্স।


ইউসুফ বাক্স ভাঙতে গিয়েও থামে। তার মনে পড়ে, এখনো কিছু প্রমাণ হয়নি। সে আস্তে আস্তে উপরে ওঠে। কেবল ছবিগুলো ক্যামেরায় তুলে নেয়। ততক্ষণে শোনা যায় বাইরে সাইকেলের ঘণ্টা— আব্বাস মোল্লা ফিরছেন।


পাঁচ.


সপ্তাহখানেক পর, ইউসুফ যখন প্রায় নিশ্চিত, সে একদিন গভীর রাতে আব্বাস মোল্লার কাছে সাহস করে গেল। তখন বৃষ্টি ঝরছে, ইছামতী আবার ফুলে উঠেছে। মোল্লা দোতলার বারান্দায় বসে তাসবীহ জপছেন।


ইউসুফ বলল, “মোল্লা সাহেব, আমি আপনার নিচের ঘরটা দেখেছি। মিলিও সেখানে আছে, তাই না?”


আব্বাস মোল্লার হাত থেমে গেল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “চলো, তোমাকে দর্শন করাই।” এক আশ্চর্য শান্ত কণ্ঠ।


সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলেন দুজন। দেয়ালের গোপন দরজা সরিয়ে আব্বাস মোল্লা দেখালেন ভেতরের কক্ষ। সেখানে চৌকিতে মিলি বসে আছে, চোখে মায়াবী ঘোর। পাশেই নরম আলো, আরেকটি মেয়ে তাকে চুল আঁচড়ে দিচ্ছে। দুজনই জীবিত, আচ্ছন্ন, যেন কোনো ভিন্ন জগতের বাসিন্দা।


ইউসুফের পিলে চমকে ওঠে। “এটা কী? আপনি ওদের মারেননি?”


আব্বাস মোল্লা হালকা হাসলেন। “মারব কেন? হত্যা মহাপাপ। আমি তো শুদ্ধ করি। জানো, ইউসুফ, প্রতিটি মানুষের ভেতর এক শয়তান থাকে। আর ফেরেশতা হতে চাইলে ওই শয়তানকে লালন করে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। আমি নিজেই সবচেয়ে বড় পাপী। কিন্তু আমি পাপ করি একান্ত গোপনে, আর বাইরে ভালো কাজ করি, যাতে পৃথিবীর ভারসাম্য থাকে।”


“মানে?”


“আমি যখন বন্যার রাতে এতিম বাচ্চাকে বাঁচাই, তখন মনে মনে জানি, পরের বন্যায় আমি একটা মেয়েকে তুলে নিয়ে আসব। এই যে দশটা মেয়ে, এরা আমার খাদেমের মতো। আমি ওদের আত্মাকে পবিত্র করেছি, ওদের পৃথিবীর নোংরামি থেকে সরিয়ে এনেছি। এখন ওরা ফেরেশতার ঘরে থাকে। ওরা কেউ কাঁদে না।”


ইউসুফ হতভম্ব। “আপনার স্ত্রীও কি...?”


“সুমাইয়া আমার প্রথম শুদ্ধি। ওর জন্য আমি প্রতিদিন কাঁদি, ওকে আমি বলিদান দিছি, ওর জন্যই আমি আরও ভালো হই। তুমি কি বোঝো না? শয়তানের অস্তিত্বই ফেরেশতার আসল শক্তি। দুনিয়াতে যে সম্পূর্ণ ভালো, সে আসলে মিথ্যা। কিন্তু যে ভেতরে খারাপ রেখেও বাইরে আলো ছড়ায়, সেই প্রকৃত ঈশ্বর-প্রেরিত।”


আব্বাস মোল্লার গলায় কোনো অনুশোচনা নেই। বরং তিনি গর্বিত। ইউসুফ দেখে, মেয়েগুলো তাঁর দিকে ভক্তি ভরা চোখে তাকিয়ে আছে। কোনো প্রতিবাদ নেই। এ যেন মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ— আত্মার হরণ।


ছয়.


ইউসুফ কোনোভাবে বেরিয়ে এলেও পুলিশে যেতে পারে না। কারণ মোল্লা তাকে জানিয়ে দেন, “তোমার কাছে প্রমাণ নেই। মেয়েগুলো কেউ জোর করে নেই, তাদের বাবা-মা কোথায়, তা প্রমাণ করা অসম্ভব। আর যদি তুমি চেষ্টা করো, কাল রাতেই ওরা সত্যিই ‘নিখোঁজ’ হয়ে যাবে, আর তুমি ফেসবুকে ভাইরাল হবে এক মানসিক ভারসাম্যহীন সাংবাদিক হিসেবে।”


আরও ভয়াবহ কথা—গ্রামের কেউ বিশ্বাস করবে না। বরং ইউসুফকেই পাগল ভেবে পেটাবে।


পরের বছর খবর আসে, আব্বাস মোল্লা পাচ্ছেন “জাতীয় সমাজসেবা পুরস্কার”। ইউসুফ টিভিতে দেখে, মোল্লা একই সাদা পাজামা-পাঞ্জাবিতে পুরস্কার নিচ্ছেন, মাথায় বেগুনী টুপি, চোখে স্নিগ্ধতা। পর্দার নিচে লিখা ভেসে ওঠে: “মানবতার ফেরেশতা।”


কিন্তু পুরস্কার নেওয়ার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে আব্বাস মোল্লা যা বললেন, তাতে ইউসুফের রক্ত হিম হয়ে গেল। এক সাংবাদিক জানতে চেয়েছিলেন, “আপনার এতো মানবতার পেছনে ধর্মের অনুপ্রেরণা কতটুকু?”


আব্বাস মোল্লা এক অদ্ভুত হাসি হেসে বলেছিলেন, “ধর্ম? ধর্ম তো সুন্দর একটা পোশাক। আমি এই পোশাকটা পরে আছি বলেই আপনারা আমাকে ভালোবাসেন। ধরুন, আমি যদি ধর্মের পোশাক না পরতাম, তাহলে কি নিজের করা ফান্ড আমার এই এতিমখানা চলত? না। 

আমি কোন ধর্ম বিশ্বাসী না, অনেক ধর্ম খুঁজেছি, খুঁজে খুঁজে বুঝে গিয়েছিলাম— ইসলামের উদারতা, দয়া, গরিবের পাশে দাঁড়ানোর এই যে সৌন্দর্য, এগুলো যদি আমি বাইরে ফুটিয়ে তুলতে পারি, তাহলে ভেতরে যা খুশি করলেও কেউ প্রশ্ন করবে না।”


সাংবাদিক ঘর নিস্তব্ধ।


আব্বাস মোল্লা চালিয়ে গেলেন, “আমার ধর্ম একটাই। পাপ। বিশুদ্ধ, খাঁটি পাপ। সেটাই আমার আসল ইবাদত। এই যে আমি রাতে যা করি, সেটা ঈশ্বরের জন্য না, আমার নিজের তৃপ্তির জন্য। আর দিনের বেলা আপনাদের জন্য অভিনয় করি। কিন্তু এই ধর্মের উদারতার ছাতাটা এত বড় যে, এর নিচে আমার পাপের পুরো সাম্রাজ্য অনায়াসে লুকিয়ে থাকে। আপনারা দেখেন শুধু ছাতাটা। ভেতরে কী আছে, দেখার চোখ কারও নেই।”

এখন আমার এতো এত ভক্ত মুরিদ তারা আমার এই কথাগুলো বিশ্বাস করবে না।


পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের সেই ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য। কিন্তু আব্বাস মোল্লার নিজ এলাকাসহ পুরো দেশ জুড়ে যে পরিমান ভক্ত, তাঁদের কাছে উনি পীর, উনি এতোটাই প্রভাবশালী যে, ভক্তদের গালাগালি, একপ্রকার উত্তেজনায় খবরগুলো মুছে ফেলা হয় উনাকে “মানসিক চাপ দিয়ে এসব বলানো হয়েছে” এই তকমা দিয়ে। 

তাঁর ভক্ত সমগ্রর ধারণা, “উনাকে বাধ্য করা করা হয়েছে, নইলে এমন ফেরেশতার মত মানুষ এ কথা বলতেই পারেন না।”

উনি হাসলেন, সবাইকে উদ্দেশ্য করে আবার বললেন, এদেশের মানুষ ধর্মকে নিজে বুঝেশুনে পালন করার চেয়ে পীর আউলিয়ার কথা বেশি পালন করেন, কুরআন হাদিস পড়ার চেয়ে পীরের কিচ্ছা এইসব মুরিদদের কাছে বেশি ভালো লাগে, আমারও এখন অনেক মুরিদ ভক্ত আছে। আমি যদি বলি, "নামাজ ছেড়ে দাও, মনের পবিত্রতা আসল" ওরা নামাজ ছেড়ে দিবে। 

এইসব বলতে বলতে বাহিরে ভক্তদের মিছিলের শব্দ শুনা গেলো

"আব্বাস মোল্লার কিছু হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে।"

ভক্তকুলের এখনও ধারণা আব্বাস মোল্লা চাপে পড়ে এমন আবোলতাবোল বলছে।

উনাকে নিয়ে এসব সম্প্রচার বন্ধ না হলে ভক্তরা সাংবাদিকের 'কল্লা' ফেলে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন।



ইউসুফ টিভি বন্ধ করে দেয়। জানালার বাইরে তাকিয়ে সে ফিসফিস করে বলে, “তুমি আসলে ভাগ্যবান, আব্বাস মোল্লা। তুমি ধর্মের পুরো বাগানটা চুরি করে তার ছায়ায় পাপের রাজ্য বানিয়েছো। অথচ বাগান দেখে সবাই ভাবে, এ তো স্বর্গেরই টুকরো।”




তার মনে পড়ে মোল্লার শেষ কথাটা— “ধর্ম যেখানে পোশাক, সেখানে ভেতরটার বিচার কেউ করে না, করে শুধু পোশাকের সেলাই।”


ইউসুফ বুঝতে পারে, আব্বাস মোল্লা আসলে কোন ধর্ম বিশ্বাসী না সব ধর্মেরই প্রতিদ্বন্দ্বী। কারণ তার আসল উপাস্য পাপ, আর প্রচলিত ধর্মের সব সৌন্দর্যই তার জন্য শুধুই আড়াল। এটাই তার আসল জয়— ভেতরে নরক পুষেও বাইরে জান্নাতের প্রতিনিধি হয়ে বেঁচে থাকা।


১.  মাদ্রাসার ছাত্র রহমানের বয়স ১৩। পরনে সবসময় পুরনো সাদা কুর্তা, পায়ে ছেঁড়া স্যান্ডেল, আর বাঁ চোখটা ইচ্ছে করে একটু টেরা রাখে। যাতে ভন্ড মৌল...

১. 

মাদ্রাসার ছাত্র রহমানের বয়স ১৩। পরনে সবসময় পুরনো সাদা কুর্তা, পায়ে ছেঁড়া স্যান্ডেল, আর বাঁ চোখটা ইচ্ছে করে একটু টেরা রাখে। যাতে ভন্ড মৌলভী কাসেমের "কুদৃষ্টি" না পড়ে।

একটু পাগলাটে স্বভাবের সারাক্ষন পকেটে একটা কাঠের চামচ থাকে— যেটা দিয়ে সে মাথা চুলকায়, থুতনিতে ঠুকঠুক শব্দ তোলে, কখনো বা শূন্যে পিঁপড়ের লাইন আঁকে।
কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে আগে চামচটা দিয়ে মাথা চুলকায়, তারপর অপ্রাসঙ্গিক কিছু একটা বলে বসে—যেমন, “নিম গাছের বোটানিক্যাল নাম আজাদিরাক্টা ইন্ডিকা।”

গ্রামের লোকে তাকে ‘পাগলা রহমান’ বলে ডাকে। কিন্তু মাদ্রাসার ছোট ছাত্ররা তাকে ভালোবাসে। কারণ রহমান তাদের পিঁপড়াদের লাইন ধরে মার্চ করায়, তেলাপোকার পিঠে সুতো বেঁধে "পেঁয়াজি হুজুরদের উড়তে" দেখায়। তারা হাসে, রহমানকে খুব আপন ভেবে হাসে।

তবে রহমানের পাগলামির নিচে যে জ্ঞান  লুকিয়ে আছে, তা খুব কম মানুষই জানে। একজনই একটু আধটু জানে, নাম হাফেজ আব্বাস।

হাফেজ আব্বাস—একসময়ের প্রখ্যাত আলেম, যিনি এলাকার প্রভাবশালী মৌলভী কাসেমের ভণ্ডামি টের পেয়ে মাদ্রাসা ছেড়ে পুরনো মসজিদের এক কোণে সাদামাটা জীবন কাটাচ্ছেন। ছোট্ট একটা দোকান নিয়ে।
আর তিনিই মূলত রহমানের মধ্যে সত্যর আগুন দেখেছিলেন। মাঝে মাঝে বলে, “তোর মাথার ভেতর আল্লাহ এমন এক আলো জ্বালিয়ে দিয়েছেন, যা অনেক বড় বড় আলেমেরও থাকে না।”

সেই থেকে রহমান প্রতি রাতে পুরনো মসজিদে যায়। হাফেজ আব্বাস তাকে শেখান কুরআনের তাফসির, হাদিসের ব্যাখ্যা, ফিকহের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মাসআলা। রহমানের মাথায় সেসব এমনভাবে গেঁথে যায়, যেন সে জন্ম থেকেই জানে। তিন মাসের মধ্যে সে মুখস্থ করে ফেলে ইমাম গাজ্জালির ‘ইহইয়া উলুমিদ্দিন’-এর পুরো প্রথম খণ্ড। ছয় মাসে শেখ সাদির ‘গুলিস্তাঁ’র ফারসি কবিতার অনুবাদ করে বাংলায়। হাফেজ আব্বাস অবাক হয়ে বলেন, “তুই পাগল না, রহমান। তুই তো এক মহা জ্ঞান-পাগল।”

কিন্তু এসব জ্ঞান সে প্রয়োজন ছাড়া কাউকে দেখায় না। কারণ সে জানে, জ্ঞান দেখাতে গেলে অহংকার বাড়ে। তাই সে চামচ ঘষে, টেরা চোখে তাকায়, আর পিঁপড়েদের সাথে কথা বলে। অথচ তার ভেতরে প্রতিদিন গেঁথে যাচ্ছে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর তীব্র ইচ্ছা—ঠিক যেন কুরআনের সেই আয়াত তার রক্তে মিশে গেছে:

“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়ের পতাকা বহনকারী হিসেবে দাঁড়াও, সাক্ষী থাকো সুবিচারের। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের সুবিচার থেকে বিচ্যুত না করে। সুবিচার করো, এটাই তাকওয়ার নিকটতর।” (সূরা মায়েদা: ৮)

২..
মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক মৌলভী কাসেম সাহেবের ঘরটা সবার কাছে রহস্য। দরজায় বড় তালা, জানালায় কালো পর্দা। রাতে সেই ঘর থেকে ভেসে আসে চাপা কান্নার আওয়াজ। কেউ জিজ্ঞেস করলে কাসেম সাহেব বলেন, এটা ‘বিশেষ তালিমের আওয়াজ’।

একদিন আট বছর বয়সী রিয়াদ রহমানকে নির্জনে ডেকে নিল। চোখে ভয়, গলা কাঁপা। ফিসফিস করে বলল, “রহমান ভাই, আপনার সাথে একটা কথা আছে।”

“বল।”

“রাতে হুজুরের ঘরের পেছনে ভূতের নাচ হয়।”

“ভূত নাচে?”

“হুম, দেয়ালে ছায়া দেখি দুইটা। একটা বড়, একটা ছোট। ছোটটা কাঁদে আর বড়টা নাচে।”

রহমানের বুকের ভেতর ঢেউ ওঠে। চামচটা পকেটে নিজে থেকেই কাঁপতে থাকে।

এক নিঝুম রাতে রহমান চুপিচুপি সে জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয়। যা দেখে, তাতে তার রক্ত হিম হয়ে যায়।
ছেলেটার নাম ফয়সাল, বয়স ১১, মাদ্রাসার সবচেয়ে লাজুক ছেলে— এখন দেয়াল থেবড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর কাসেম হুজুর তার দিকে ঝুঁকে আছেন। এক হাতে ফয়সালের ঘাড় চেপে ধরা, অন্য হাত চলে গেছে পাজামার ভেতরে। ফয়সালের মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না, শুধু ঠোঁট ফ্যাকাসে হয়ে কাঁপছে, আর চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। দেয়ালের সাদা টালিতে নখের আঁচড় কেটে আছে—যেন কোনো বন্দী পাখির ডানার শেষ ঝাপটানি।

আর একটু পর পর হিংস্র কাসেম বলে উঠে, “চুপ, এটা তা’লিমের অঙ্গ।” একটাসময় কাসেম গলা নিচু করে, সাপের মত হিসহিস শব্দ করে। “ নড়িস না, নড়লে জাহান্নামের আগুন, জানিস তো?” এই কথা কাউকে বললেও "তোকে জাহান্নামে যেতে হবে"। কারণ আমি তোর হুজুর, এটা তোর খেদমত।

রহমান দেখল, ফয়সালের শরীর কাঠ হয়ে গেছে। তার নিজের মুঠোয় চামচটা এত জোরে চাপা পড়ল যে কাঠ গরম হয়ে গেল।

এরপর থেকে সে দেখে প্রতি সকালে যে ছাত্ররা কাসেমের ঘর থেকে বেরোয়, তাদের চোখ থাকে ফোলা, ঠোঁট কামড়ানো, জামা এলোমেলো। তারা হাঁটতে পারে না ঠিকমতো। কেউ কেউ প্রস্রাব করে ফেলে ভয়ে। কারো পায়জামা রক্তাক্ত। আর রহমানের চামচটা তখন পকেটে কেঁপে ওঠে—যেন বলতে চায়, “আর নয়।”

৩..
রহমান প্রথমেই হাফেজ আব্বাসের কাছে গেল। পুরনো মসজিদের ভাঙা মিম্বরে বসে সব শোনাল। হাফেজ আব্বাস চোখ বন্ধ করে অনেকক্ষণ চুপ রইলেন। তারপর বললেন, “সাক্ষ্য লাগবে, বাবা। কাসেম এলাকার প্রভাবশালী। মুখের কথায় কিছু হবে না।”

“আমি যোগাড় করব।”

“কীভাবে?”

রহমান চামচটা মাথায় ঘষতে ঘষতে বলল, “পিপড়ার লাইন ধরে যেমন খাবার খুঁজে পাওয়া যায়, তেমনি সত্যিও খুঁজে পাওয়া যায়—যদি সত্যর লাইনে চলা যায়।”

রহমানের পরিকল্পনা ছিল সহজ। ভন্ড কাসেম প্রতিদিন রাতে নিজের ঘরে ছেলেদের ডেকে তার অপকর্মের ভিডিও করেন—‘তাফসির সিরিজ’ নাম দিয়ে। সেই ভিডিও তিনি নির্জনে দেখেন আর পাশবিক আনন্দ নেন। আর সেই ফোনটা সবসময় উনার তোষকের নিচে থাকে ।

এর ভিতর রহমান মার থেকে টাকা নিয়ে এক বোতল  লাল রং এর কৌটা কিনলো।
গভীর রাতে কাসেম হুজুরের ঘরের দরজার সামনে পিঁপড়ের লাইন আঁকল— এটা তার পাগলামির ছদ্মবেশ। তারপর দরজার নিচে লাল রঙের ছিটা ফেলে আসে যেন রক্তের ফোঁটা।
দেয়ালে লিখে রাখে কুরআনের আয়াত: “তারা মনে করে তারা চতুরতা করছে, অথচ তারাই নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনছে, কিন্তু তারা বোঝে না।” (সূরা বাকারা: ৯)

পরদিন সকালে পুরো মাদ্রাসায় গুঞ্জন ওঠে। কাসেম সাহেব দরজার খুলে থমকে যান। দেয়ালে আয়াত দেখে তাঁর হাত কাঁপে। ফিসফিস করে বলেন, “জ্বিনের আসর। বিশেষ আমল করতে হবে।”

ভয় পেয়ে সেই রাতেই ভন্ড কাসেম তোষকের নিচ থেকে ফোনটা বের করে বারান্দার একটা টবে পুঁতে রাখেন। রহমান গাছের আড়াল থেকে সব দেখে। কাসেম চলে গেলে সে চামচ দিয়ে মাটি খুঁড়ে ফোন বের করে আনে। ফোনের স্ক্রিন ভাঙা, কিন্তু অক্ষত।

৪..
রহমান ফোনটা নিয়ে গেল নবাব ভাইয়ের কাছে। নবাব ভাই এলাকার মোবাইল মেকানিক সাথে ইউটিউবারও—ভুয়া হুজুর আর ভুয়া ওয়াজের সমালোচনা করে ভিডিও বানান, কিন্তু ভিউ কম। রহমান ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “তোমার জন্য নতুন কিছু, ভণ্ডামির রহস্য এটার ভেতরে আছে, নবাব ভাই।”

নবাব ভাই ফোন রিকভার করলেন, কিন্তু ফাইলগুলো পাসওয়ার্ড চাচ্ছিল। রহমান চামচ ঘষতে ঘষতে বলল, “ট্রাই করো ‘নাউজুবিল্লাহ’। কারণ উনি বিপদে এটাই বেশি বলেন, আর নিজের ঘৃণ্য কাজকেও এই শব্দে ঢাকেন।”

নবাব ভাই অবাক। ফোনের পাসওয়ার্ড 'নাউজুবিল্লাহ' বসাতেই ফোন ফাইল আনলক হলো। ভেতরে ‘তাফসির সিরিজ’ নামের ফোল্ডারে ভরা, ছোট ছোট ছেলেদের উপর পাশবিক অত্যাচারের ভিডিওতে। নবাব ভাই কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “এটা তো মানুষ না, শয়তান।”

রহমান শান্ত গলায় বলল, “শয়তানও তো একসময় আল্লাহর দরবারে ইবাদত করত, নবাব ভাই। তারপর অবাধ্য অহংকার পেয়ে বসেছিল। কাসেমও তাই— অবাধ্য অহংকারী। আর আল্লাহ অহংকারীকে পছন্দ করেন না।”

নবাব ভাই কষ্টে চোখ মুছলেন। “তুই এত জানিস কী করে?”

“জানি না কিছু। শুধু পিপড়ের লাইন ধরি।” রহমান চামচটা নবাব ভাইয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে হাসল। “আগামী সপ্তাহে কাসেমের একটা মাহফিল আছে, তখন সব খোলা হবে।”

৫..
মাহফিলের দিন মাঠ লোকে লোকারণ্য। কাসেম সাহেব সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, কাঁধে চাদর, দাড়ি পাকা, চোখে কাজলের টান। মিষ্টি গলায় ওয়াজ করছেন: “হে যুবক আল্লাহর ভয়ে কাঁদো! জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে কাঁদো!”

মানুষ কাঁদছে। ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি ভেসে আসছে। কাসেম সাহেব রুমাল দিয়ে চোখ মুছছেন—সেই বিখ্যাত পেঁয়াজি রুমাল, যা দিয়ে তিনি কৃত্রিম চোখের জল ফোটান।

ঠিক তখন মাইকে গোলমাল। এক কোণ থেকে রিয়াদ আর ফয়সাল মিলে মাইকের তার খুলে দিয়েছে। রহমান উঠে দাঁড়ায়। তার হাতে চামচ। টেরা চোখ সোজা করে তাকিয়ে সে মাইকের সামনে আসে। নবাব ভাই বড় স্ক্রিনে লাইভ চালু করে দিলেন।

কাসেম সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাকান। “এটা কী হচ্ছে?”

রহমান চামচ দিয়ে মাথা চুলকায়। তারপর বলে, “হুজুর, আপনার ওয়াজ শুনছিলাম। আপনি বললেন, কাঁদতে। কিন্তু কাঁদার আগে আমার কিছু প্রশ্ন আছে।”

“প্রশ্ন?” কাসেম হুজুর হাসেন। “আরে তুই তো পাগল।”

“জ্বি, পাগল। কিন্তু পাগলেরও প্রশ্ন থাকে।” রহমান চামচটা সামনে বাড়িয়ে ধরে।
“হুজুর, সূরা নিসার ১৬ নম্বর আয়াতটা একটু পড়বেন? আল্লাহ সেখানে পাপীদের তওবার কথা বলেছেন।
কিন্তু  তার আগে ১৫ নম্বর আয়াতে এও বলেছেন, "তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা অশ্লীল কাজে লিপ্ত, তাঁর শাস্তি প্রদানের আগে চারজন সাক্ষী উপস্থাপন করো।" সাক্ষী চারজন চান আল্লাহ। অথচ আপনি তো বলেন, আপনার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে তাকে জাহান্নামে যেতে হবে।
তাহলে আল্লাহর আইনের সাথে আপনার আইন মিলছে না কেন?”

মাঠে ফিসফিস শুরু হয়। কাসেমের মুখ লাল হয়ে ওঠে। “তুই কুরআনের অপব্যাখ্যা করছিস!”

“অপব্যাখ্যা?” রহমান চামচটা ঘোরায়। “তাহলে আসুন একটু তাফসির করি। সূরা হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াত পড়ি: ‘হে ঈমানদারগণ! যদি কোনো পাপী তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তা যাচাই করো।’ মানে আল্লাহ বলছেন, সত্য যাচাই করতে। আর আপনি? আপনি তো ছোট ছেলেদের বলেছেন, ‘নড়লে জাহান্নামের আগুন’—এটা কোন কিতাবে পেলেন, এটা তো তাফসির না, হুজুর, এটা তো ভয় দেখানো।”

জনতা ভন্ড কাসেমের অপকর্ম দেখতে রাগে গোঙাতে থাকে। কাসেম মাইক ধরে চিৎকার করেন, “এসব জ্বিনের প্রভাব! এই ছেলেকে জ্বিনে ধরছে, এ পাগল, এরে ধরো!”

কিন্তু তখনই একে একে রিয়াদ, ফয়সালসহ আরো অনেকে ছুটে আসে। কাঁদতে কাঁদতে মাইকের সামনে এসে বলে, “আমার সাথেও... আমার সাথেও উনি... সেই ‘তাফসির সিরিজ’...”

“ফয়সাল!” ভন্ড কাসেমের গলা তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। “তোর বাবা তোকে মেরে ফেলবে, আমার বিরুদ্ধে কিছু বললে !”

“না, মারবে না।” রহমানের গলা এবার নরম, কিন্তু পাথরের মতো শক্ত। “কারণ এখন আমরাই সাক্ষী। চারজন না, চল্লিশজন না, হাজার হাজার সাক্ষী। আর আল্লামা ইবনে তাইমিয়া লিখেছেন, ‘যখন অপরাধ প্রমাণিত হয়, তখন অপরাধীকে আর মুখ লুকানোর সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।’”

নবাব ভাই লাইভে অপ্রীতিকর দৃশ্য ব্লার রেখে ভিডিওর কিছু কিছু অংশ দেখাতে শুরু করেন। প্রথমে কিছু লোক বুঝতে পারে না। তারপর এক বৃদ্ধ চিৎকার করে ওঠেন, “এ কী! এই ভন্ড শয়তানের মুখে কেন কোরানের বাণী, এতো ধর্মের সাথে বেঈমানী করছে, এ তো শয়তান!”

জনতা গর্জে ওঠে। কিছু লোক এগিয়ে আসে কাসেমকে মারতে । কিন্তু রহমান চামচ উঁচিয়ে থামায়। “থামেন! কুরআনে আছে—‘অন্যায়কারীকে তোমরা মারো না। কারণ আল্লাহ বলেন, সুবিচার করো, এটাই তাকওয়ার নিকটতর।’ একে পুলিশে দিন। ওর শাস্তি আইন আদালত ঠিক করবেন। আমরা যেন ঘৃণায় অন্ধ না হই।”

জনতা থমকে যায়। সেই বৃদ্ধ বললেন, “এই পাগলা ছেলের চোখে মুখে কী সত্য, আল্লাহর বাণী কী জ্বলজ্বল করে ! আল্লাহর কী ইশারা!”

পুলিশ আসে। কাসেমকে গ্রেপ্তার করার সময় আচমকা তাঁর পাকা দাড়ির এক কোণ সরে যায়। নিচ থেকে বেরিয়ে আসে কালো রং করা আসল দাড়ি। পকেট থেকে পড়ে যায় পেঁয়াজ কাটা রুমাল—যে রুমাল দিয়ে তিনি ওয়াজের আগে কৃত্রিম চোখের জল ফোটাতেন।আর তার এসব ভণ্ডামি দেখে হাসি ও ঘৃণার এক অদ্ভুত মিশ্রণে মাঠ কেঁপে ওঠে।


৬..
পরে, যখন সব শান্ত হয়, হাফেজ আব্বাস মাইকে নিয়ে বলেন, “ইসলাম এদের মত দুষ্কৃতীকারীদের থেকে মুক্ত। আজ একটি পাগলা ছেলে আমাদের দেখিয়ে দিল, সত্যকে কিভাবে দাঁড় করাতে হয়। আর সে শুধু কুরআনের আয়াত পড়েনি, সে বুঝিয়েছে—ইসলামের আসল সৌন্দর্য হচ্ছে সুবিচার, প্রতিশোধ না। যেখানে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ইবাদত, আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সবচেয়ে বড় তাকওয়া।”

রহমান তখন পেছনে দাঁড়িয়ে। তার মা পেছন থেকে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরেন। রহমান চামচটা মায়ের পিঠে আলতো করে বোলায় আর ফিসফিস করে বলে, “আম্মা, আল্লাহ বলেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনকে সহজ করেছেন।’ সহজ মানে— ভালো মানুষ হতে হবে, এই তো।”

একটা ছোট বাচ্চা ছুটে এসে বলে, “রহমান ভাই, আপনি কি পাগল?”

রহমান চামচটা বাচ্চাটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে হাসে। “যা, এটা তোকে দিলাম। যখন খুব ভয় পাবি, চামচ দিয়ে মাথা চুলকাস। দেখবি, ভাবনা আসবে। আর ভাবনা এলেই সত্যিটা খুঁজে পাবি। সত্যিই তো কুরআন বলেছে—সুবিচারই তাকওয়া।”

৭.
গভীর রাত। সব শান্ত। রহমান পুরনো মসজিদে ফিরে গেছে। হাফেজ আব্বাস তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোর এত জ্ঞান এল কোথা থেকে?”

রহমান হাসল সুন্দর চোখে। চামচটা নেই—সেটা তো সে বাচ্চাটাকে দিয়ে দিয়েছে। তাই সে এবার খালি হাতে মাথা চুলকালো। “জানি না। তবে একটা স্বপ্ন দেখি প্রায়ই।”

“কী স্বপ্ন?”

“একটা অন্ধকার ঘর। সেখানে একটা ছেলে বসে আছে। তার চোখটা উজ্জ্বল সুন্দর । কিন্তু সে হাসছে না, কাঁদছে। আর তার পাশে বসে থাকা একজন বুড়ো তাকে বলছেন, ‘পাগলামিই তোর অস্ত্র। জ্ঞান তোর ঢাল। আর যখন সময় আসবে, তুই একা থাকবি না। কারণ আরও একজন আছে, যে জানে।’”

হাফেজ আব্বাস চুপ করে গেলেন। অনেকক্ষণ পর বললেন, “আর কে জানে?”

“জানি না। তবে আজ ভন্ড কাসেম যখন গ্রেপ্তার হলো, তার চোখে আমি অদ্ভুত কিছু দেখলাম। সে ভয় পেয়েছে—কিন্তু আমাকে দেখে না। সে ভয় পেয়েছে অন্য কাউকে দেখে।”

“কাকে?”

রহমান জানালার বাইরে তাকায়। চাঁদের আলোয় মাদ্রাসার ছাদে কেউ দাঁড়িয়ে আছে—স্থির, নিথর, যেন পাথরের মূর্তি।

“তাকেই,” রহমান ফিসফিস করে বলে। “যে এতদিন আমাকে দেখছিল। আর আজ নিজেকে দেখাল।”

ছাদের মানুষটা ধীরে ধীরে নেমে আসে সিঁড়ি দিয়ে। হাফেজ আব্বাস তাকে দেখে থমথমে গলায় বলেন, “এটা তো... তুই...!”

রহমান হাসে। সেই অদ্ভুত হাসি—যেন সে আগে থেকেই সব জানে। “জ্বি, হুজুর। আমার পাগলামির পেছনে আরও কেউ ছিল। যে আমার চেয়েও বেশি জানে। যে আমাকে শিখিয়েছে, জীবন মানে পুরোটাই জ্ঞান, আর সত্যকে জানার আগ্রহ। আর যে আজ নিজেকে প্রকাশ করল।”

একটা সত্য, আলো, জ্ঞান, বিশ্বাস আর ঈমান নিয়ে সে এগিয়ে আসে। হাফেজ আব্বাসের চোখ বিস্ফারিত। “এটা কিভাবে ?”

“এটা আমার অন্তর্যামীর ছায়া আমার বিবেক বোধ আমার ভিতরের আসল শিক্ষক। যার কথা আমি কাউকে বলিনি। যে আমাকে শিখিয়েছে— সত্য আর জ্ঞান একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।”

অন্তর্যামীর ছায়াটা হাসে। তার মুখে চাঁদের আলো পড়তেই বোঝা যায়—নির্মল চোখ। হুবহু রহমানের মতো দেখতে, কিন্তু বয়সে যেন একটু বড়। সে বলে, “আমি থাকি আকাশের উপরে, রহমান। কিন্তু আজ থেকে তোমার সাথেই থাকব। কারণ কাজ তো শেষ হয়নি। কাসেম তো শুধু শুরু। ওর পেছনে আরও বড় শয়তান আছে।”

রহমান মাথা নাড়ে। “জানি। ওই যে কাসেম গ্রেপ্তারের সময় বারবার বলছিল, ‘আমার পিছে লোক আছে আমাকে রক্ষা করবেন।’ কে সেই ‘তিনি’?”

রহমান আব্বাস হুজুরের দিকে তাকিয়ে বলে, “সেই তো আমাদের আসল টার্গেট। যে বা যারা আমার ধর্মকে খাটো করতে চাই, যারা আমার ধর্মের নৈতিক সৌন্দর্য থেকে আড়াল করতে চাই। তাঁদের মুখোশ উম্মচন করবোই।




  ১. চট্টগ্রামের আউটার স্টেডিয়াম রোডের পাশে আমার ভাড়াবাসা। আমি রাফি চৌধুরী—প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির বেকার স্নাতক, বর্তমানে এক ট্রাভেল এজেন্সির...

 ১. চট্টগ্রামের আউটার স্টেডিয়াম রোডের পাশে আমার ভাড়াবাসা। আমি রাফি চৌধুরী—প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির বেকার স্নাতক, বর্তমানে এক ট্রাভেল এজেন্সির হিসাবরক্ষক। জীবনটা আমার সাদামাটা, যতক্ষণ না দরজায় কড়া নাড়েন আমার ফুফি রাবেয়া বেগম।

ফুফি মানেই ঝড়। রাত পৌনে এগারোটায় এসে দরজা না টোকা দিয়ে জানালায় টোকা দিলেন। “রাফি, দরজা খোল তাড়াতাড়ি। না হয় পাশের বাসার আন্টি ভাববে আমি তোর অবৈধ প্রেমিকা।”

আমি দরজা খুলতেই দেখি ফুফির হাতে ঝোলা ব্যাগ, মাথায় ওড়না-জড়ানো, পরনে জামদানি শাড়ি আর পায়ে কেডস। গলায় ঝুলছে প্রকাণ্ড এক তাবিজ, আর চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। চলনে-বলনে ফুফির চিরদিনের ফাজলামো—কিন্তু চোখ দুটো সিরিয়াস।
“ফুফি, এত রাতে?”
“ জরুরি কাজ দিন রাত কী বুঝে। তুই ব্যাগ গোছা। আমরা যাচ্ছি ফটিকছড়ি।”
“কেন?”
ফুফি আমার খাটের ওপর বসে ঝোলা ব্যাগ থেকে একটা পুরোনো খবরের কাগজ বের করলেন। শিরোনাম: “শাহেদিদ মাজারে অলৌকিক কেরামতি, দূরারোগ্য ব্যাধি সেরে যাচ্ছে এক স্পর্শে!”
“ফুফি, শাহেদিদ মাজার তো মহান সাধকের। ওটা তো বিখ্যাত দরগা।”
ফুফি চোখ পাকিয়ে বললেন, “ওটা আসল শাহেদিদ মাজার না। আসল শাহেদিদ দরগা ইরানে। এটা একটা কপি-পেস্ট মাজার, যারা আসল মাজার বলে চালায়। আর ওখানে নাকি এখন নতুন পীর এসেছেন—নিজের নাম দিয়েছেন ‘শাহে কিবরিয়া হুজুর’। মানুষের পকেট কাটছেন ধর্মের নামে। তোর খালাতো ভাই ফাহিম গেছে ওখানে চাকরির জন্য  মানত করতে, এখন নিখোঁজ আর খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।”
“ফাহিম? ফাহিম তো সৌদিতে ছিল!”
“ছিল। ফিরে এসে বেকার। এখন বেকারত্ব সারাতে গিয়ে হারিয়ে গেছে। তোর খালু কেঁদে কেঁদে আমাকে বলছে। আমি বলেছি, ‘চিন্তা কইরো না, আমি আর রাফি আছি, ওকে ফিরিয়ে আনবোই।’ এখন চল।”
“ফুফি, আমি তো কোনো ডিটেকটিভ না।”
“তুই এখন থেকে ডিটেকটিভ। তোর দাদু বলতেন, বেকার ছেলেরাই ভালো ডিটেকটিভ হয়। কারণ তাদের নষ্ট করার মতো সময় ছাড়া আর কিছু নেই।”
২. শাহেদিদ মাজারের ভেতরে।
পরদিন ভোরে আমরা পৌঁছলাম ফটিকছড়ির গহিনে সেই মাজার চত্বরে। জায়গাটা বেশ বড়—উঁচু গম্বুজ, চারপাশে পাকা রাস্তা, দোকানপাট বসে গেছে মাজারের নাম ভাঙিয়ে। একপাশে তসবি-তাবিজের দোকান, আরেকপাশে ‘কেরামতির পানি’ বিক্রি হয় পঞ্চাশ টাকায় এক বোতল। সামনে বড় গেট, তাতে সাইনবোর্ড: “আলহাজ্ব শাহে কিবরিয়া হুজুর দরবার শরীফ”।
গেটে দাঁড়ানো মুরিদ—নাম মৌলভী জাবের। পরনে পাঞ্জাবি, চোখে কাজল, দাড়ি সুন্দর করে ছাঁটা। হাতে ওয়াকিটকি।
“আসসালামু আলাইকুম। কী চান আপনারা?” জাবেরের কণ্ঠে কাস্টমারের প্রতি বিশেষ টান।

ফুফি এগিয়ে গিয়ে বললেন, “ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমি রাবেয়া বেগম, অনেক দূর থেকে আসছি। এই ছেলে আমার ভাইপো রাফি, ডিপ্রেশনের রোগী। সারাক্ষণ মুখ শুকিয়ে পড়ে থাকে। হুজুরের কাছ থেকে তাবিজ নিতে চাই।”

আমি ভুরু নাচাই। ফুফি আমাকে ডিপ্রেশনের রোগী বানিয়ে ফেলেছে!

জাবের বলল, “হুজুরের দর্শন পেতে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। প্যাকেজ আছে তিনটা—আশীর্বাদ প্যাকেজ পাঁচশো টাকা, খাস কেরামতি প্যাকেজ দুই হাজার টাকা, আর ভিআইপি মুরিদি প্যাকেজ পাঁচ হাজার টাকা।”

ফুফি একটু ভেবে বললেন, “আমরা খাস কেরামতি নেব। কিন্তু ভেতরে গিয়ে টাকা দেব।”

জাবের আমাদের ভেতরে নিয়ে গেল। মাজারের ভেতরটা পর্দা দিয়ে ঘেরা। এক পাশে সারি সারি করে মানুষ বসে আছে, কেউ কাঁদছে, কেউ তসবি জপছে। আরেক পাশে কাউন্টার, যেন সিনেমা হলের টিকিটঘর। তাতে বড় করে লেখা: “মনের আশা পূরণে মুরিদি গ্রহণ করুণ। ব্যাংক কার্ড গ্রহণযোগ্য।”

ফুফি ফিসফিস করে বললেন, “এটা মাজার নাকি দরগা? মনে তো হয় শপিংমল।”

আমি আশপাশ দেখছি। এক জায়গায় হুইলচেয়ারে বসা এক মধ্যেবয়স্ক বৃদ্ধা, হুজুর এসে তার কপালে হাত রাখতেই তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন! উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে গেল “আল্লাহু আকবর” বলে। ফুফি সেদিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “মিথ্যে নাটক, ওই বৃদ্ধা আগে থেকেই দৌঁড়াতে পারেন। আমি ওনাকে চিনি, চট্টগ্রামের টিভি নাটকের এক্সট্রা আর্টিস্ট।”

“ফুফি, তুমি চিনলে কী করে?”

“আমি সব চিনি। এখন চুপ কর। হুজুর আসছে।”

৩. হুজুরের পরীক্ষা।

হুজুর শাহে কিবরিয়া এলেন ভারী চেহারায়। পরনে সাদা জোব্বা, গলায় দামি আতর মাখা রুমাল, আঙুলে পাথর বসানো আংটি। দাড়ি আছে কিন্তু খুব পরিপাটি। চেহারায় রাজনীতির নেতার মতো ছাপ। তিনি সিংহাসনের মতো একটা চেয়ারে বসলেন।

ফুফি সামনে গিয়ে বললেন, “হুজুর, আমার ভাইপো বড় অসুস্থ। কোনো ডাক্তার তার রোগ ধরতে পারছে না। আপনি যদি একটু ফুঁ দিয়ে দিতেন।”

হুজুর চোখ বন্ধ করলেন। তারপর হঠাৎ চোখ খুলে বললেন, “ওর ভেতর জ্বিন ঢুকছে। এই জ্বিন খুব শক্তিশালী। তাড়াতে গেলে বিরাট দান করতে হবে।”

ফুফি কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, “কত টাকা হুজুর?”

“জ্বিনের শক্তি বুঝে দান। আগে দশ হাজার টাকা নগদ দিতে হবে, সাথে সাতদিন রোজা রাখতে হবে।”

ফুফি পকেট থেকে একটা মিষ্টির প্যাকেট বের করলেন। “হুজুর, এটা অনেক যত্ন করে বানানো, একটু খান। আমাদের বাড়ির বিখ্যাত গাজরের হালুয়া।”

"হুজুর খেতে চায়লেন না।"

ফুফির একটা গুণ আছে ইনস্ট্যান্ট কান্না করে দিতে পারে।


হুজুর ফুফির কান্না দেখে হালুয়া খেলেন। ঠিক পাঁচ সেকেন্ড পরেই তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। তিনি গলা চেপে ধরে বললেন, “এটা কী?”

ফুফি শান্ত গলায় বললেন, “হালুয়া, কিন্তু তাতে একটু তেঁতুলের গুঁড়া আর ইচিং পাউডার মেশানো। আপনাকে এখন জ্বিন খুব জ্বালাবে। এইবার বলুন, আপনার জোর করে বানানো মুরিদ ফাহিম কোথায়?”

হুজুর চিৎকার করে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগলেন। জাবের দৌড়ে এল, কিন্তু ফুফি তাকে থামিয়ে বলল, “আপনি চুপ থাকুন, নইলে আপনার জন্যও এক প্যাকেট আছে।”

ঠিক তখনই হুজুর গলা ছেড়ে বললেন, “ পেছনের ঘরে সব আছে!”

৪. সত্যি উন্মোচন।

আমরা পেছনের ঘরে গিয়ে দেখি, সেখানে একটা অফিস। টেবিলে কম্পিউটার, প্রিন্টার, আর ফাইল ফাইল কাগজ। দেয়ালে টাঙানো মাজারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্ট। একপাশে রাখা গ্লিসারিন(যাতে আবেগে কাঁদতে পারে), আরকে পাশে রাখা ফগ মেশিন আর ওই ওয়াকিটকি সিস্টেম—যা দিয়ে জাবের হুজুরকে ইঙ্গিত দিত বড় হুজুর কেরামতি দেখানোর সময়।

আরেকটা ঘর খুলে দেখি, ফাহিমসহ আরও পাঁচ-ছয়জন বসে আছে। ওরা আসলে জিম্মি ছিল—এদের দিয়ে জোর করে কাজ করানো হতো, আর পরিবারকে বলা হতো তারা মুরিদ হয়ে গেছে, ওরা ধ্যানে আছে আল্লাহর দিদার পেয়ে গেছে। ফাহিম আমায় দেখে কেঁদে ফেলল।

কিন্তু আসল ধাক্কাটা তখন লাগে যখন দেখি, মাজারের নিচে আরেকটি বেজমেন্ট। সেখানে চলছে ইয়াবা তৈরির কারখানা! হুজুর ধর্মের নামে মাজারকে ব্যবহার করছেন মাদক চক্রের কাভার হিসেবে।

ফুফি ব্যাপারটা দেখে বললেন, “জানিস রাফি, ধর্মের নামে যারা ব্যবসা করে, তাদের আসল ধর্ম থাকে টাকা। আর টাকার ধর্মে সব পাপই হালাল।”

আমি পুলিশে ফোন করলাম। ফুফি ইতিমধ্যে জাবেরকে বললেন, “তোমার হুজুরের আসল নাম শামসুদ্দিন মোল্লা। দশ বছর আগে ছিল নোয়াখালীর এক মক্তবের শিক্ষক। তারপর হঠাৎ পীর বনে গেছে। আর তুমি, জাবের, ছিলে তার ছাত্র।”

জাবেরের মুখ সাদা। “আপনি এসব জানলেন কীভাবে?”

ফুফি ঝোলা ব্যাগ থেকে একটা মোবাইল বের করলেন। “গত রাতে আমি তোমার মাজারের হিসাবনিকাশের ওয়েবসাইট হ্যাক করেছি। তোমাদের সব তথ্য এখন আমার কাছে।”

“আপনি হ্যাকার?”

“আমি রাবেয়া বেগম। কিছু না কিছু সবই পারি। এখন বলো, আসল বড় বস কে? কারণ শামসুদ্দিন তো একটা প্যাদা।”

জাবের ফিসফিস করে বলল,  "আপনি তো সবই জানেনই আর কী বলবো। উনি হলেন আলহাজ্ব ইদ্রিস সওদাগর। কিন্তু উনি কখনো মাজারে আসেন না। সব কার্যক্রপ চালান দূর থেকে।”

ফুফি চোখ মিটমিট করলেন। “ইদ্রিস সওদাগর… মানে সেই ইদ্রিস? যে কিনা চট্টগ্রাম বন্দরের ইম্পোর্ট-এক্সপোর্টের বড় শ্যালক?”

“জ্বি, উনিই।”

ফুফি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “রাফি, কেস তো সবে শুরু। ইদ্রিস সওদাগর তোর দাদুর আমলের শত্রু। তোর দাদু বলত, ইদ্রিসের কাছ থেকে একটা হিসাব চুকাতে হবে। সে সময় এসে গেছে। রাফি তুই প্রস্তুত তো?”

“ফুফি, কী হিসাব?”

“সে গল্প পরে হবে। আগে পুলিশ আসুক। তারপর তোকে নিয়ে ইদ্রিসের ডেনে যাব।”

৫. শেষ নয়, শুরু...

পুলিশ এসে সবইকে আটক করল। শামসুদ্দিন ওরফে হুজুর কিবরিয়ার পেট তখনো চুলকাচ্ছে—ফুফির হালুয়া দারুণ কাজ দিয়েছে। ফাহিমকে উদ্ধার করে আমরা বাড়ি পাঠালাম। মাজার চত্বরে পুলিশের গাড়ির লাল-নীল আলোয় অদ্ভুত এক দৃশ্য। ভক্তরা হতভম্ব, কেউ কেউ কাঁদছে, কেউ বলছে “এটা পরীক্ষা ছিল!”

ফুফি মাজারের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “পরীক্ষা তো সবাই দেয়। কেউ পাস করে, কেউ ফেল। কিন্তু যারা ধর্মকে ব্যবসা বানায়, তারা সব ফেল।”

আমি বললাম, “ফুফি, তুমি সত্যিই ডিটেকটিভ না তো?”

ফুফি হেসে বললেন, “আমি কোনো ডিটেকটিভ না, আমি তোর দাদুর মেয়ে। আর তোর দাদু বলতেন, ‘অন্যায় দেখলে চুপ করে থাকবি না। কিন্তু প্রতিবাদ করবি বুদ্ধি দিয়ে, কেঁদে-কেটে নয়।’ আর হ্যাঁ, তোর দাদু আরও বলতেন, ‘ইদ্রিস সওদাগরকে একদিন জবাবদিহি করতে হবে। আবারও বলছি সেই দিন এসে গেছে।’”

“কেন ফুফি, ইদ্রিস সওদাগর দাদুর কী করেছিল?”

ফুফি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “দাদু যে ট্রাস্ট ফান্ড গড়েছিল গরিব মেধাবী ছাত্রদের জন্য, সেই ফান্ডের সব টাকা ইদ্রিস সরিয়ে নিয়েছিল বিশ বছর আগে। তোর দাদু আর পারল না ঘুরে দাঁড়াতে। মরার আগে বলেছিল, ‘রাবেয়া, টাকাটা ফিরিয়ে আনবি, এটা গরীবের হক।’ আমি সেই সুযোগ খুঁজছি।”

“তাহলে তুমি ইচ্ছে করে এই মাজার কেস ধরেছ?”

“এই কেস ধরেছি, কারণ ইদ্রিসই এই পুরো মাজার-ব্যবসার ফান্ডিং করে। ওকে ধরতে গেলে ছোট ছোট সিঁড়ি ভাঙতে হবে। আজ ভাঙলাম একটা সিঁড়ি।”

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। ফুফি ব্যাগ থেকে পান বের করে মুখে পুরে বললেন, “চল, ফটিকছড়ি থেকে ফেরার পথে চট্টগ্রাম শহরে দম কলোনি মোড়ে বিরিয়ানি খাব। পেটে হালুয়া দেওয়া পীরের কাহিনি তো শেষ, কিন্তু বিরিয়ানি দিয়ে শুরু হবে ইদ্রিসের অধ্যায়। তুই আসবি তো?”

আমি হাসি। “ফুফি, তোমাকে ছাড়া আমার জীবনের রং নেই। চলো।”

ফুফি ট্যাক্সি থামিয়ে আমায় গাড়িতে তুলে বললেন, “শোন রাফি, শেষের দিকে এসে তুই দেখবি ইদ্রিস সওদাগর শুধু মাদক কারবারি নয়, ওর হাতে আছে চট্টগ্রাম বন্দরের এক বিরাট সিন্ডিকেট। আর সেই সিন্ডিকেট ধরতে গেলে আমাদের লাগবে তোর দাদুর পুরোনো ডায়েরি। যেটা এখন আছে ইদ্রিসের বাংকারে।”

“ফুফি, দাদুর ডায়েরি?”

“হ্যাঁ, তাতে লেখা আছে ‘আলহাজ্ব ইদ্রিস সওদাগর: অপরাধের হিসাব’। সেই ডায়েরি উদ্ধার করাই আমাদের পরবর্তী মিশন।”

ট্যাক্সির জানালা দিয়ে চট্টগ্রামের পাহাড়ি বাতাস ঢুকছে। ফুফি জানালায় মাথা রেখে গান গাইতে লাগলেন—আব্বাসউদ্দীনের সেই বিখ্যাত গান: “ও মোর গুরুর চরণ, বড়ই মধুর…”। গলা মোটেও সুরেলা নয়, কিন্তু কী যেন আছে।

আমি তাকিয়ে থাকি। এই পাগলাটে নারীকে ভালো না বেসে উপায় নেই। পৃথিবীর সব রহস্য আর সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে ফুফি একাই একশো—সেই ফুফির ভাইপো হয়ে আমি গর্বিত।



 ১. শিউলির পৃথিবী: যে স্বপ্ন দেয়ালে বাঁধা ছিল। নব্বই দশকের কথা। শিউলির বয়স যখন দশ, সেই দশ বছর বয়সে শিউলি প্রথম মৃত্যু দেখেছিল; প্রতিবেশী এক ...

 ১. শিউলির পৃথিবী: যে স্বপ্ন দেয়ালে বাঁধা ছিল।


নব্বই দশকের কথা। শিউলির বয়স যখন দশ, সেই দশ বছর বয়সে শিউলি প্রথম মৃত্যু দেখেছিল; প্রতিবেশী এক বৃদ্ধার, যিনি পাঁচ দিন যাবৎ তীব্র জ্বরে ভুগছিলেন। পরিবার ডাক্তার ডাকতে গিয়েও ডাকতে পারেনি— কারণ ডাক্তারের ফি আর ওষুধের খরচ জোগাড় করতে হলে তাদের একমাত্র আয়ের উৎস— দুধের গরুটা বেচতে হতো। আর দরিদ্র ঘরে বৃদ্ধ মানুষ মানে বোঝা স্বরূপ, শেষমেশ টাকার অভাবে বৃদ্ধার চিকিৎসা হলো না। বৃদ্ধা মারা গেলেন। 


শিউলি দূর থেকে মৃত দেহের পাশে বসে থাকা ছোট্ট নাতিটার কান্না দেখেছিল, কান্নার মত শুধু তার নাতনিটা ছিল। এই প্রথম জীবন ও বাস্তবতার নির্মম মুখোমুখি হয়ে শিউলির ভেতরটা তীব্র এক মোচড়ে কেঁপে উঠল।



সেই রাতে সে মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “ মা ডাক্তার টাকা ছাড়া চিকিৎসা কেন করেনা? অসুখ তো আর টাকা দেখে আসে না।”


মা বলল, “টাকা না দিলে ডাক্তার চিকিৎসা কেন করবে? ডাক্তারি তো আর ফকিরি নয়।”


শিউলি তখন বলল, “আমি একদিন ডাক্তার হব। আর আমি কখনো টাকা নেব না।”


মা সেদিন হাসলেও। হাসিটা উনার ভেতরে ভেতরে কেঁদেছিল, কিন্তু শিউলি তখন সে হাসির মানে বোঝেনি। কারণ তখনো সে জানত না, তার পরিবার, তার সমাজ, তার লিঙ্গ— সবাই মিলে তার জন্য একটা করে দেয়াল তুলে রেখেছে। দেয়ালগুলো এখনো তার চোখের সামনে আসেনি।


কিন্তু তা আসতে দেরি হলো না।



২. যে বই আর হাতে নেওয়া হলো না।


শিউলির পড়ার ইচ্ছেটা ছিল আগুনের স্ফুলিঙ্গ-এর মতো। মেধাবী ছিল খুব- তাই স্কুলে সবসময় ভালো রেজাল্ট করতো। গণিত আর বিজ্ঞান ছিল তার প্রিয় বিষয়—মানুষের শরীর কীভাবে কাজ করে, রোগ কীভাবে শরীরে বাসা বাঁধে, ওষুধ কীভাবে তাকে তাড়ায়—এইসব জানতে তার অসীম কৌতূহল ছিল। মাধ্যমিকে উঠার পর সুযোগ ফেলে স্কুলের লাইব্রেরিতে খুঁজে খুঁজে পুরোনো জীববিজ্ঞানের বই পড়ত। তখন এক শিক্ষিক বলেছিলেন, “শিউলিকে যদি ঠিকমতো পড়তে দেয়া হয়, একদিন মেয়েটা অনেক বড় হবে।”


কিন্তু এই সমাজ এখনও কিন্ত “যদি” শব্দটা মেয়েদের জীবনে অভিশাপের মতো শুনায়। “যদি” মানে শর্ত। “যদি” মানে অনুমতি। আর অনুমতি দেওয়ার ক্ষমতা মেয়েদের নিজেদের হাতে নেই—থাকে বাবা-চাচা-সমাজ নামের একটা অদৃশ্য দৈত্যের হাতে।


শিউলির বয়স যখন ষোলো, তার বাবা তার মায়ের মারফতে খবর পাঠালেন, “মেয়ে মেট্রিক পাস করেছে, অনেক হয়েছে, পড়ালেখা বন্ধ এখন। বিয়ের জন্য প্রস্তুত হতে বলো।”


বিয়ের কথা শুনে শিউলির পৃথিবীটা থেমে গেল। সে মাকে বলল, “মা তুমিতো জানো আমার তো স্বপ্ন একটাই ডাক্তার হব।”


"বাবা তখন মায়ের মুখে মেয়ের স্বপ্নের কথা শুনে হাসলেন। “ডাক্তার? মেয়েমানুষ ডাক্তার হয়ে কী করবে? মেয়ে মানুষ সংসার করবে, স্বামীর ঘর করবে—এই তো মেয়েদের ডাক্তারি।”


মা চুপ করে রইলেন। বড় চাচী কটাক্ষ সুরে বললেন, “মেয়েরা বেশি পড়লে সংসারের উপর অধিপত্য বিস্তার করতে চায়। তাদের মাথা উঁচু হয়ে যায়, স্বামীর উপর কর্তৃত্ব করতে চায়। স্বামীর ঘরে মানিয়ে চলতে পারে না। বংশের মান—সব মাটি করে দেয়।”


শিউলি অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। সে কখনো অধিপত্য চায়নি। সে চেয়েছিল স্টেথোস্কোপ গলায় ঝুলিয়ে রোগী দেখা। সে চেয়েছিল সেই বৃদ্ধার মতো কেউ যেন আর টাকার অভাবে না মরে। সে চেয়েছিল মানুষের পাশে দাঁড়াতে, তাদের ব্যথায় হাত রাখতে। এই ইচ্ছেগুলো কখন “অধিপত্য” হয়ে গেল? নম্রতা, সেবা, ভালোবাসা—এই শব্দগুলো কি মেয়েদের বেলায় উচ্চারণ করতে নেই?


কিন্তু তখন শিউলি কিছুই বলতে পারেনি। কারণ ষোলো বছরের মেয়ের গলা উঁচু হওয়া মানা, যুক্তি খর্ব হয়, চোখের জল এলেও একলা কাঁদতে হয়— সংসারের নিয়মের সামনে এগুলোর কোনো দাম নেই।


তার বইগুলো তুলে রাখা হলো সিন্দুকে। তার স্টেথোস্কোপ কেনা হলো না। তার স্বপ্নটা পুড়িয়ে দেওয়া হলো বিয়ের অনুষ্ঠানের আগুনে।



৩. শ্বশুরবাড়ি: আরেক দেয়াল।


বিয়ের পর শিউলি ভেবেছিল, এই বুঝি একটু পরিবর্তন হবে, একটু সুযোগ পাবে। নতুন বাড়ি, নতুন মানুষ—হয়তো এখানে তার পড়ার স্বপ্ন, ইচ্ছেটাকে কেউ প্রাধান্য দেবে।


প্রথম মাসটা সে চুপচাপ ছিল। তারপর একদিন নরম গলায় শ্বশুরকে বলল, “আমি আবার পড়তে চাই। আমার ডাক্তারি পড়ার খুব ইচ্ছে ছিল।”


শ্বশুর হাসলেন। তার হাসিটা বাবার চেয়েও কঠিন, বড় চাচির কথার চেয়েও ধারালো। “ডাক্তারি? তুমি? পাড়ার লোক কী বলবে? বউ ডাক্তারি করবে মানুষের বাড়ি বাড়ি? তোমার স্বশুরের ইজ্জত আছে। সমাজে আমাদের একটা স্ট্যান্ডার্ড আছে।”


শিউলি বলল, “আমি শুধু অসহায় মানুষেরর সেবা করতে চাই।”


শ্বশুর উত্তর দিলেন, “সেবা করতে চাও? স্বামীর সেবা করো, সংসারের সেবা করো। এই তো তোমার আসল সেবা।”


তারপর থেকে শিউলিকে কোনো বইখাতা হাতে দেওয়া হলো না। স্বামী বললেন, “পড়ালেখা নিয়ে এত ঝামেলা করো কেন? সংসারটা করো মন দিয়ে।”


শিউলি চুপ করে গেল। কিন্তু তার ভেতরে স্বপ্নটা মরেনি। সেটা কেবল চাপা পড়ে গিয়েছিল, যেমন চাপা পড়ে মাটির তলায় বীজ—মরে না, শুধু অঙ্কুরিত হওয়ার সঠিক সময়টার অপেক্ষা করে। আর সেই অপেক্ষাই সবচেয়ে কষ্টের। শিউলির একটু একটু করে জীবন থেকে হারিয়ে যেতে লাগলো।


তিন বছর পর একদিন শিউলি তার ডায়েরিতে লিখল:


“আমি ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম। চিকিৎসা অভাবে যারা মারা যায় সেসব মানুষকে বাঁচাতে । কিন্তু কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করল না, আমি ঠিকমতো পড়াশোনা না করে মানুষ না হয়ে কী করে মানুষকে বাঁচাবো? আমাকে তো আমার স্বপ্নের আগে বাঁচতে দেওয়া হলো না। এখন আমি চার দেয়ালে বন্দি, আর আমার স্বপ্নগুলো দেয়ালের গায়ে পিঁপড়ার মতো হাঁটে—কোথাও যেতে পারে না, শুধু ঘুরে ঘুরে মরে।


আমি কোনো অধিপত্য চাইনি। আমি চেয়েছিলাম একটু পড়তে, একটু জানতে, একটু মানুষের পাশে দাঁড়াতে। কিন্তু সমাজ ভাবে, মেয়েদের জ্ঞান তাদের অহংকারী করে তোলে, আত্মকেন্দ্রিক বানায়। তারা জানে না, জ্ঞান অহংকারী করে না—জ্ঞান বিনয়ী করে, দয়ালু করে, মানুষ করে। হয়তো একদিন কেউ আমার এই কথাগুলো বুঝবে, যখন আমি থাকব না। তখনও আমি চাইবো আমার স্বপ্ন, আমার চাওয়াটা গল্প হয়ে বাঁচুক।”


শেষ বাক্যটা লেখার সময় শিউলির হাত কেঁপেছিল। সে জানত না, তার অকাল মৃত্যুর পর এই বাক্যটাই এক নীল শাড়ির মেয়ের জন্ম দেবে ২৫ বছর পর—যে মেয়ে নিজে চরিত্র হয়ে নেমে আসবে, শুধু একটা গল্পের জন্য।


৩. হিয়া: যে মেয়েটি মৃত স্বপ্নের ফুল হয়ে ফুটল।


একদিন বৃষ্টির রাতে। রুদ্রায়নের মাথাভর্তি চিন্তায় জমাট হল ঘরভর্তি সিগারেটের ধোঁয়া আর নীরবতা, ওদিকে তার পাণ্ডুলিপির পাতাগুলো ফাঁকা। সম্পাদক বলেছে, “এবার কিছু দরদ দিয়ে লেখো। যে গল্প পড়ে মানুষ কাঁদবে না, তাহলে ভাববে— সে গল্প অচল।”


ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়লো।


খুলতেই দেখল, একটা মেয়ে। নীল শাড়ি পরা। খালি পা। ভিজে চুল। চুলের উপর একটা জীবন্ত প্রজাপতি। চুল থেকে যেন মুক্তোর মত জলফোঁটা টপটপ করে পড়ছে। বৃষ্টির ছোঁয়ায় যে, প্রকৃতি মেয়েদের রূপ আরো অকৃত্রিম সুন্দর করে তুলে, এই মুহূর্তে মেয়েটাকে দেখে রুদ্রায়নের তাই মনে হল।


“মেয়েটা দরজার সামনে আরো এগিয়ে আসলো, মিষ্টি হাসি হাসলো, বলল "আমার এই মুহূর্তে এক কাপ চা চাই, হবে?”।


রুদ্রায়ন ভ্রু কুঁচকালো। “কিন্তু তুমি কে?”


“হিয়া।”


“হিয়া?বুঝলাম, এত রাতে আমার কাছে কী চাও?”


আপাতত চা চাই বলে.. হিয়া রুদ্রায়নকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকল, ভিজা শাড়ি নিয়ে সোফায় বসল, শাড়ির আঁচলটা গুটিয়ে নিল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “আমি চাই, তুমি একটা কবর ফুলের স্বপ্ন লিখবে। যে স্বপ্নটাকে কেউ বাঁচতে দেয়নি, যে স্বপ্নটা কেউ পূরণ করতে দেয়নি, যে মেয়েটা শুধু চেয়েছিল স্টেথোস্কোপ গলায় ঝুলিয়ে একজন মানুষের পাশে দাঁড়াতে— কিন্তু মেয়েটার পাশে কেউ দাঁড়ায়নি সবাই তার সামনে শুধু দেয়াল দাঁড় করে দিয়েছে।”


“এটা কি তোমার গল্প, হিয়া?”


হিয়া মাথা নাড়ল। “আমার গল্প না। শিউলির গল্প। কিন্তু শিউলি নাই এখন। মৃত মানুষরা গল্প লেখে না, অন্যরা লেখার জন্য রেখে যায়। তাই আমি এসেছি।”


রুদ্রায়ন তাকিয়ে রইল। মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল, এ কোনো স্বাভাবিক মানুষ নয়, বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই, সে কারো স্বপ্নের দূত হয়ে এসেছে আর তার মাথার উপর এখনও প্রজাপতিটা উড়তে লাগলো। এ যেন কোনো পুরোনো পাণ্ডুলিপির ধুলো থেকে উঠে আসা কেউ, যে এখনো বলে বেড়াচ্ছে—আমি পারিনি, তুমি পারবে?


“শিউলি কে?” রুদ্রায়ন জানতে চাইল।


হিয়া উত্তর দেওয়ার আগে জানালার দিকে তাকাল। বৃষ্টি তখনো ঝরছে, টিনের চালে জল পড়ার শব্দটা একতাল—যেন প্রকৃতিও কোনো গল্প শোনার জন্য কান পেতে আছে। তারপর হিয়া বলল, “তার কথা বলতে গেলে আগে একটা প্রশ্ন করি—তুমি কি কখনো কাউকে ডাক্তারের টাকার অভাবে মরতে দেখেছ?”


“না।”


“দেখলে বুঝতে, শিউলি কেন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। আরও বুঝতে, সমাজ কেন তাকে ডাক্তার হতে দেয়নি। তুমি এখনো জীবন আর বাস্তবতা অনেক কিছু দেখোনি, রুদ্রায়ন। তাই তোমার গল্পে প্রাণ নেই।”


“তাহলে তুমি দেবে আমার গল্পে প্রাণ?”


হিয়া হাসল। হাসিটা করুণ, অথচ উজ্জ্বল—যেন অন্ধকারে জ্বলা এক টিমটিমে প্রদীপ। “আমি প্রাণ না। আমি চাওয়া। যে চাওয়া পূর্ণ হয়নি, তাকে মানুষ কী বলে? অপূর্ন? আত্মা? নাকি গল্প?”


রুদ্রায়ন গলা শুকিয়ে এল। “তুমি আসলে কে, হিয়া?”


হিয়া শাড়ির আঁচল জড়িয়ে তার বুকের ওপর হাত রাখল। “আমি শিউলির শেষ ইচ্ছে। আমি তার কবর হওয়া স্বপ্ন। আমি সেই স্টেথোস্কোপ, যে স্টেথোস্কোপটা কোনোদিন তার গলায় ঝোলেনি। আমি সেই বই, যে বইয়ের পাতা স্বপ্ন নিয়েও কোনোদিন সে উল্টাতে পারেনি। আমি এখন গল্প হয়ে এই স্বপ্নটাকে বাঁচাতে চাই। তুমি লেখক—বলো, লিখবে?” যদি লিখতে চাও শিউলির পুরনো বাড়ির খোঁজে যাও, অনেক কিছুই পাবে।



৫. দেয়ালের ভেতর থেকে চিৎকার।


পরদিন রুদ্রায়ন শিউলির পুরনো বাড়ির খোঁজে বেরোল। 

অবশেষে খোঁজ পেল ফাঁকা একটা বাড়ি, বাড়িতে লোক সমাগম নেই বললেই চলে। রুদ্রায়ন অনুমতি নিয়ে বাড়ির ভিতর ঢুকলো, শিউলির ঘরে ঢুকে ধুলো পরা সিন্দুকে পেল এক পুরনো ডায়েরি। পাতা উল্টাতেই যেন স্বপ্নের মত কিছু ধুলো উড়তে থাকলো, আর সেই ধুলোয় ভেসে এল শিউলির গলা—শান্ত, কিন্তু তীক্ষ্ণ, যেন বাঁশি না, ছুরি।


"শিউলির ডায়েরি"

“স্বামী বললেন, ‘ডাক্তারি পড়ার স্বপ্ন দেখো না। এ বাড়ির বউরা চাকরি-বাকরি করে না।’ আমি বললাম, ‘আমি চাকরি করতে চাই না, সেবা করতে চাই।’ স্বামী রেগে বললেন, ‘সেবা করবে রাস্তার লোকের? পাগল নাকি?’ আমি আর কথা বাড়াইনি। কিন্তু মনের ভেতর বলেছি, রাস্তার লোকেরাই তো মানুষ। আর আমি মানুষ হতে চাই, দেয়াল হতে চাই না।”


“আজ বাড়ির কাজের মেয়েটা বলল, ওর ছেলে জ্বরে ভুগছে, ডাক্তারের টাকা নেই। আমি মনে মনে বললাম, ‘আমি যদি ডাক্তার হতাম, তোমার ছেলেটাকে বিনা পয়সায় দেখে আসতাম।’ কিন্তু আমি তো ডাক্তার না। আমি কিছু না। শুধু এক বউ, যার অস্তিত্বের একমাত্র প্রমাণ সে রান্না করতে পারে কি না।”


“বাবা বললেন, মেয়েদের বেশি পড়া ভালো না। শ্বশুর বলেছেন, মেয়েদের চাকরি করা ভালো না। সমাজ বলে, মেয়েদের স্বপ্ন দেখা ভালো না। সবাই বলে ‘ভালো না’। কিন্তু কোনটা ভালো, সেটা কেউ বলে না। আমি বুঝতে পারি না—আমি যদি ডাক্তার হতাম, তাতে কার কী ক্ষতি হতো? আমি কি সমাজের কোনো ক্ষতি করতাম? নাকি ক্ষতিটা অন্য জায়গায়—ক্ষতিটা হচ্ছে পুরুষের অহংকারে? আমি জানি না। আমি শুধু জানি, আমি চার দেয়ালে বন্দি, আর আমার স্বপ্নগুলো দেয়াল টপকাতে পারে না।”


“শেষ ইচ্ছেটা লিখে রাখি—আমি যদি কখনো ফিরে আসি, গল্প হয়ে আসব। গল্পের কোনো দেয়াল নেই, কোনো সমাজ নেই, কোনো শ্বশুর-বাবা নেই। গল্প যেখানে ইচ্ছে যায়, যাকে ইচ্ছে ছোঁয়, যাকে ইচ্ছে বাঁচায়। আমি গল্প হতে চাই।”


রুদ্রায়ন ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরল। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, শিউলি শুধু একটা মেয়ে না—শিউলি এই সমাজের হাজারো মেয়ের নাম, যাদের স্বপ্নগুলো হত্যা করা হয়েছে “সম্মানের” নামে, “অধিপত্যের” ভয়ে, “বংশের মানের” দোহাই দিয়ে। আর এই হত্যাগুলো কখনো খুনের মামলায় ওঠেনি—কারণ স্বপ্ন হত্যার কোনো আইন হয় না।


আর তখনি সে ঠিক করল, এই গল্প সে লিখবেই। শিউলির জন্য, হিয়ার জন্য, আর তাদের জন্য—যারা এখনো চার দেয়ালে বন্দি, যারা এখনো স্বপ্ন দেখার অপরাধে অপরাধী।



৬. লেখা, যে লেখা দেয়াল ভাঙতে চায়।


সেদিন রাত থেকে রুদ্রায়ন লিখতে বসেছে আর থামেনি। হিয়া প্রতিদিন আসে, পাশে বসে থাকে, কখনো চা বানায়, কখনো জানালার দিকে তাকিয়ে শিউলির স্মৃতি বলে, কখনো চুপ করে থাকে—শুধু তার নীল শাড়িটার রং বদলায়। কখনো আকাশি, কখনো ঘন নীল, কখনো প্রায় কালো—যেন তার আবেগের সঙ্গে সঙ্গে শাড়িও শ্বাস নেয়।

রুদ্রায়ন জানে বাস্তবে হিয়ার কোন অস্তিত্ব নাই সে শুধুই গল্পের ভিতরেই থাকে।


একদিন হিয়া বলল, “তুমি জানো, শিউলি মরার আগে কী বলেছিল?”


“কী?”


“সে বলেছিল, ‘আমি কিছু করতে পারলাম না। কিন্তু আমি জানি, একদিন কেউ আমার স্বপ্নটা বাঁচাবে। সেটা মানুষ না হয়ে গল্প হলে কী হবে—গল্পও তো মানুষকে বাঁচাতে পারে।’”


রুদ্রায়ন লিখতে থাকল।


সে লিখল, শিউলি ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন, তার বাবার প্রত্যাখ্যান, তার শ্বশুরবাড়ির দেয়াল, সমাজের বানানো শিকল, আর সবশেষে তার মৃত্যু—যে মৃত্যুতে কেউ কাঁদেনি, কারণ মেয়েদের মৃত্যুতে কান্নারও বরাদ্দ কম।


কিন্তু শেষ অধ্যায়ে সে লিখল হিয়ার কথা—যে মেয়েটা শিউলির স্বপ্ন থেকে জন্ম নিয়েছে, যে এখন গল্প হয়ে বাঁচতে চায়, যে এখনো চা খেতে আসে রাতের বৃষ্টিতে, যে এখনো পুরনো সেই বাড়ির ফাটল দিয়ে আকাশ দেখে। সে এখন মুক্ত। কিন্তু তার মুক্তি তখনই সার্থক হবে, যখন শিউলির মতো আর কোনো মেয়েকে দেয়ালে বন্দি হতে হবে না। তাঁদের স্বপ্ন পূরন হবে।


শেষ পৃষ্ঠায় রুদ্রায়ন লিখল:


“হিয়া একদিন স্টেথোস্কোপ গলায় ঝোলাল। সেটা আসল স্টেথোস্কোপ নয়—গল্পের স্টেথোস্কোপ। কিন্তু গল্পের স্টেথোস্কোপ দিয়ে কি হৃদপিণ্ড শোনা যায় না? যায়। কারণ মানুষের হৃদপিণ্ড শোনার জন্য যন্ত্র লাগে না, দরদ লাগে। আর হিয়ার দরদ অনেক অনেক বছর ধরে জমাট বাঁধা এক স্বপ্নের দরদ। সে এখন রাস্তায় নামে, মানুষের পাশে দাঁড়ায়, আর বলে—‘আমি ডাক্তার না, আমি গল্প। কিন্তু গল্পও ওষুধ হতে পারে, যদি তুমি পড়ো।’


আর যে পড়ে, সে বুঝতে পারে—শিউলি মরেনি। শিউলি হিয়া হয়ে বেঁচে আছে, হিয়া এখন তাদেরই মনে বাস করে, যারা জানে স্বপ্ন কোনো অধিপত্য না, স্বপ্ন মানুষের জন্মগত অধিকার।”


লেখা শেষ। রুদ্রায়ন কলম নামিয়ে রাখল। হিয়া ঘরে নেই।শুধু চেয়ারের ওপর ভাঁজ করা নীল শাড়িটা, আর তার মাথার ওপর উড়তে থাকা প্রজাপতি, আজো উড়ছে। শাড়ির পাশে পড়ে আছে শিউলির ডায়েরিটা। ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠায় নতুন কালিতে কেউ লিখেছে:


“গল্প শেষ। আমি এখন মুক্ত। কিন্তু মুক্তি তখনই মুক্তি, যখন সবার হয়। তুমি কি আর কোনো শিউলিকে বন্দি হতে দেবে? না কি তুমিও একদিন কারো স্বপ্নের গল্প লিখবে?”



৭. যে প্রশ্ন ভাবনাকে তাড়া করে।


রুদ্রায়ন ছুটে গেল আবার সেই পুরনো বাড়ির দিকে। ঘরটা অদ্ভুত ফাঁকা। দেয়ালের সেই ফাটলটা দিয়ে সকালের সোনালি রোদ ঢুকছে। ফাটলের ওপাশে কী?


একটা টং দোকান। নীল শাড়ি পরা এক মেয়ে চা খাচ্ছে, তার পাশে রাখা একটা বই—

মলাটে লেখা: হিয়া: নীল শাড়ির মেয়ের গল্প। 

লেখক: রুদ্রায়ন। 

কিন্তু বইটা তো সে কোনোদিন জমা দেয়নি সম্পাদকের কাছে! তবু বই বেরিয়েছে, বিক্রিও হচ্ছে। পাশের টেবিলে বসা এক তরুণী বইটা পড়ছে, তার চোখে জল। সে বই বন্ধ করে বলল, “আমি পড়ব। শিউলির স্বপ্ন পূরন করবো। এই সমাজ যতই বাধা দিক, আমি পড়ব।” অসহায় মানুষের সেবা করবো। 


হিয়া তরুণীর দিকে তাকিয়ে চোখে চোখ রাখলো। মুচকি হাসলো। তারপর রুদ্রায়নের দিকে ফিরে একবার তাকাল, যেন বলল, “দেখলে তো? গল্পই পারে সেইটা করতে, যা সমাজ পারে না। গল্প দেয়াল ভাঙে। গল্প স্বপ্ন বাঁচায়।”


তারপর হিয়া উঠে দাঁড়াল, নীল শাড়ির আঁচল উড়িয়ে হারিয়ে গেল সকালের রোদের ভেতর—যেন সে রোদ না, রোদ হয়ে যাওয়ার ইচ্ছে।




বৃক্ষ যেমন তার শিকড়ের উপর ভর করে বেড়ে ওঠে সজীব-প্রাণবন্ত হয়, একটা মানুষের ক্ষেত্রেও শিকড়ের প্রভাব গাছের ন্যায়।  দ্বীপ একটি বিচ্ছিন্ন সমুদ্রে...

বৃক্ষ যেমন তার শিকড়ের উপর ভর করে বেড়ে ওঠে সজীব-প্রাণবন্ত হয়, একটা মানুষের ক্ষেত্রেও শিকড়ের প্রভাব গাছের ন্যায়। 


দ্বীপ একটি বিচ্ছিন্ন সমুদ্রের নাম। যার বয়স সাত কি আট হবে তখনি  বিছিন্ন হতে হয় তার বাবার কাছ থেকে। বয়সের স্বল্পতা আর সামাজিক মর্যাদার টানাপোড়েন তখন বুঝতে না পারলেও দ্বীপ এখন বুঝতে পারে তার মমতাময়ী মা 'রূপকথা' কেন কনভারশন ডিসঅর্ডারে পুরোপুরি বোবা না হলেও কথা বলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে চিরতরে। 


দ্বীপের বাবা পড়াশোনার বয়সে পারিপারিবকভাবে সচ্ছল না হবার কারণে তার মায়ের বান্ধুবি মানে দ্বীপের শাহেদা ফুফির সুবাধে দ্বীপের নানার বাড়িতে জাইগীর মাস্টার হিসেবে পড়াশুনা করতেন এবং পড়াতেন। দ্বীপের মা ছিলেন দ্বীপের বাবার ছাত্রি; দ্বীপের বাবার শিষ্টাচার, নম্রতা-ভদ্রতা  দেখে দ্বীপের  বাবার প্রতি দ্বীপের মার ভালোলাগা জন্ম নেয়  আর এই ভালো লাগা একসময় পরিবারের বাধ্যবাধকতা ডিঙিয়ে বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় দ্বীপের নানীর আর্শীবাদে। দ্বীপের নানাও মেয়ের একরুপ অবস্থানের জন্য শেষ পর্যন্ত মেনে নেয়। "ভালোবাসার ক্ষেত্রে একরুপ মানুষগুলো বড় অন্যরকম এদের চাইলেও পৃথিবীর কোন কিছু দিয়ে বদলানো যায় না, হয়তো ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করবে নয়তো সারাজীবন একাকিত্বকেই মেনে নিবে। বহুরূপী মানুষের কাছে প্রকৃত ভালোবাসা কখনো স্থান পায় না।"


সে যাইহোক দ্বীপের বাবা তখন সংসারের অর্থকষ্টের ভিতর দ্বীপের মাকে ঘরে তুলে সারাজীবনের প্রতিজ্ঞাবদ্ধতায়।

ঐদিকে দ্বীপের নানা মানুষের কানকথা শুনতো খুব যখন মানুষ বলতো, আপনি এতো ধনী আর নামী বংশের মানুষ হয়েও কিভাবে মেয়েকে একটা সামান্য জাগির মাস্টারের কাছে তুলে দিলেন। একসময় মানুষের কথা শুনতে শুনতে অতিষ্ট হয়ে মেয়েকে অভাবের সংসার থেকে মুক্ত করতে ডিভোর্স এর জন্য বাধ্য করেও পারেনি। মেয়ের একটাই কথা স্বামীর ঘর ছেড়ে কোথাও যাবে না। অতঃপর মেয়ের দৃঢ়তার কাছে হেরে গিয়ে মেয়ের জন্য উনার বাড়ির কপাট চিরতরে বন্ধ করে দেয়।


.......


হঠাৎ বিয়ের সাত বছর পর দ্বীপের নানা এই বন্ধ কপাট খুলতে কানাডা থেকে(এর ভিতর দেশে আরও দুই এক বার আসলেও মেয়ের সাথে যোগাযোগ করে নাই) এসে মেয়েকে মেনে নেবার ভান করে কৌশলে দ্বীপের মা আর তার নাতিকে নিয়ে কানাডা পাড়ি জমান, দ্বীপের বাবার জন্য কাগজ-পত্র রেডি হচ্ছে বলে দ্বীপের মাকে আশ্বস্ত করেন; এমনকি কিছু ভুয়া কাগজ পত্রও দেখান যাতে দ্বীপের মার সন্দেহ না হয়। 


কিন্তু কানাডা যাবার পর দ্বীপের মা বুঝতে পারে তার নানার কৌশল ছিল এইটা, তার নানা এই সামান্য জাইগীর মাষ্টারকে কোনদিন মেনে নিতে পারেননি। অনেকটা চাপের মুখে দ্বীপের বাবার কাছে ডিভোর্স লেটার পাঠাতে বাধ্য করে যদিও তালাক-এ-তফভিজে তা দাখিল ছিল না তবুও তার বাবাকে বুঝানো যে আমার মেয়ে আর তোমার মত ছোটলোকের  কাছে যাবে না কোনদিন। মর্যাদার কাছে দ্বীপের বাবা হেরে গিয়ে একসময় দ্বীপ আর দ্বীপের মার শুন্যতা মেনে নিতে না পেরে এই কঠিন পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে চলে যান চিরতরে। 

........


দ্বীপের মা কানাডা থেকে ফিরে আসার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হয় দ্বীপের নানা আর মামাদের কাছে, তার মার তবুও বিশ্বাস ছিল একদিন তার বাবার কাছে যাবে; কিন্তু যখন খবর আসে তার বাবা আর নাই এই পৃথিবীতে তার মা মানসিক আঘাত থেকে এক ধরনের  অ্যামনেশিয়ায় আক্রান্ত হয়ে যায়; সাথে কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলে। 


দ্বীপের মা অতিরিক্ত সুন্দরী হবার কারণে অনেকে তখন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসলে, তার মায়ের মানসিক ও শারীরিক অবস্থা আরো বেগতিক হয়ে যেত , তাই বিয়ে নিয়ে কেউ আর পীড়াপীড়ি করেনি। 


দ্বীপ তার মাকে জ্ঞান বয়স থেকে কোনদিন হাসতে দেখেনি, দেখেনি কোনদিন প্রান ভরে কথা বলতে। একটা সময় নাকি দ্বীপের  মা শুদ্ধ বলতে পারলেও তার  বাবার পছন্দ ছিল আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা, তাই তার  মা সবসময় সন্দ্বীপের ভাষায় কথা বলতেন। 

-----

কানাডার আলবার্টা প্রদেশে অবস্থিত ফোর্ট মাকমারে শহর যার চারপাশে বরফাচ্ছন্ন ঘেরা, খুব কম সংখ্যক মানুষ বাস করে এই উপত্যকায়, পরিবেশ আর জীবনের কঠিন অধ্যায়ের ভিতর দ্বীপও হয়ে উঠে এক অন্তর্মুখী মানুষের প্রতিছব্বি। হয়তো  সময়ের পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে একটা সময় পুরনো পৃষ্ঠার কথা মানুষ ভুলে যায়, দ্বীপও তাই।  


অদ্ভুত এই শহরের একটি পুরনো লাইব্রেরী আছে যেখানে গিয়ে দ্বীপ মাঝে মাঝে অজানা সব বই পড়ে, একদিন লাইব্রেরী গিয়ে বই নাড়াচাড়া করতে করতে দ্বীপের চোখে পড়ল অ্যালেক্স হেইলির  লিখা ‘’দ্যা রুট’’ বইটির দিকে। দ্বীপ বইটি নিয়ে পড়তে পড়তে কখন যে বিকেল থেকে রাত দশটা বেজে যায় টেরও পায়নি সে।  


দ্বীপ ধীরে ধীরে বইয়ের শেষ প্রান্তে যেতে  উপলব্ধি করতে থাকে নিজের শিকড় বা পরিচয়ের গভীরতা কি? দ্বীপ বুঝতে পারে অতীত, পরিবার, সংস্কৃতি, এবং ঐতিহ্য আমাদের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটা সময় দ্বীপ গ্রন্থাগারিক থেকে বইটি নিয়ে বাসায় ফিরে যায়। 


দ্বীপ সিদ্ধান্ত নিল নিজের জীবনের গভীর অর্থ বুঝতে বা নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সঠিক সত্ত্বার খুঁজ বের করতে, তাঁকে তার শিকড়ের কাছে যেতে হবে। তাই তার ইচ্ছের কথা গিয়ে তার মামাদের কাছে বলল, কিন্ত তার মামারা দ্বীপের মুখের উপর 'না' করে দেয়। কিন্তু দ্বীপ এখন আর সেই ছোট দ্বীপ নেই,  মাকমারে বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বিদ্যাপীঠ অনেকটা শেষের দিকে। তার এই সিদ্ধান্তের কথা যে তার কোন বন্ধুকে জানাবে সেরকম কোন বন্ধুও নাই তার। অতিরিক্ত ইন্ট্রোভার্ট হওয়ার কারণে মেয়েতো দূর তার ভালো কোন ছেলে বন্ধুও নেই।কিন্তু এই শহরের মেয়েদের প্রতি তার যে আগ্রহ কাজ করে তাও কিন্তু না, ভালোলাগা বা কথা বলার জন্য তার এই শহরে আপন কেউ নেই। 

.

অবশেষে দ্বীপ জানুয়ারি ছয় তারিখ এর জন্য টিকিট বুকিং দেয়, প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে দ্বীপ অপেক্ষা করছে কখন সকাল হবে। সকাল হতেই দ্বীপ সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গেল মায়ের ঘরে, মাকে সালাম করে জড়িয়ে ধরে, মা অশ্রুসিক্ত চোখে অনেক কিছু বলতেও গিয়ে বলতে পারলেন না, মাথায় হাত বুলিয়ে হয়তো বলতে চাইছেন ‘’ তুই তোর বাবার রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতি, তোকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি আমি, নিজের যত্ন নিস বাবা।

.....


দ্বীপ উড়োজাহাজে বসে বসে ভাবছে এতদিন পর দেশে যাচ্ছে, পথঘাট তেমন চিনা নাই কোথায় কিভাবে যেতে হবে। ভাবতে ভাবতে দেশের মাটিতে যখন উড়োজাহাজের চাকার ধাক্কা লাগে দ্বীপের ভিতর এক অজানা শিহরণ জেগে ওঠে। আহাঃ দেশের মাটি সংস্পর্শ কতই না প্রলুব্ধ করে ভিতর। দ্বীপ এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে  মিট অ্যান্ড গ্রিট সার্ভিস করে চট্টগ্রাম হোটেল পেনিনসুলা যেতে যেতে চারিদিক খুব উৎসাহ দেখতে লাগল, দোকান-পাট দেশের মানুষ। একসময় ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বলল—


আপনার নাম কি, ব্রাদার?

আমার নাম মজনু।

খুব সুন্দর নাম, মজনু ভাই আমি প্রায় বিশ বছর পর দেশে আসছি, তেমন কিছু চিনি না, আপনি আমার একটা উপকার করতে পারবেন?

কি যে বলেন ভাইজান, পারব না মানে আপনি শুধু বলে দেখেন!

আমার একটা সিম লাগবে!

আরে সামনে টেলিফোনের দোকান আছে ভাইজান নিয়ে নিব।

মজনু ভাই আমাকে আরেকটা হেল্প করতে হবে?

বলেন ভাইজান?

আমি কালকে সন্দীপ যাব, আপনি কি আমাকে ড্রপ করতে পারবেন কাল সকালে?

ভাইজান আমিতো হোটেলের সার্ভিস এর বাহিরে ভাড়া মারতে পারি না, চিন্তা কইরেন না ভাইজান আমার একটা ছোটভাই আছে ও আপ্নারে নিয়া যাবে, আপনি ওর নাম্বারটা নিয়া নেন। 

.

পরদিন সকালে দ্বীপ কুমিরা ঘাটে এসে টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়াতে তার ভিতর অদ্ভুত এক ভালো লাগা ছুঁয়ে গেল। এই নদী, এই জন্মভূমির মানুষগুলো কতই না আপন। দ্বীপের বেশভূষা দেখে দ্বীপকে বেশিক্ষণ লাইনে দাঁড়াতে দিল না তার প্রিয় সন্দ্বীপবাসী; দ্বীপ টিকেট কেটে স্পিড বোটে উঠতেই তার ভিতর উত্তেজনা শুরু হল শিকড়ের টানে। 

.

কুয়াশার চাদরে ঢাকা আবছা আবছা সন্দ্বীপ যতই স্পষ্ট হচ্ছে দ্বীপের চোখে, দ্বীপের ভিতরের উচ্ছ্বাস যেন অন্তর্মুখী সত্ত্বাকে বহির্মুখী করে তুলে— তার খুব প্রানখুলে বলতে ইচ্ছে করে এইটাই আমার অস্তিত্ব আমার প্রানের অনন্ত চাওয়া পাওয়ার  সবটুকু, আমার প্রিয় সন্দীপ।


দ্বীপ গুপ্তচড়া ঘাটে নামার আগে পায়ের জুতা খুলে খালি পায়ে তার প্রিয় মাতৃভূমি স্পর্শ করলো, মায়ের মত শীতল মমতার আদরে তার পুরো শরীর যেন শিকড়ের সংস্পর্শে সজীব হয়ে উঠল। দ্বীপদের বাড়ির  নাম জিলাপির’গো বাড়ি, দ্বীপ  ভ্যান থেকে নেমে, মুখ থেকে বাড়ির নাম বলার আগেই ট্যাক্সিওয়ালারা টানাটানি শুরু করে দিল।


.

অবশেষে দ্বীপ বাড়ি এসে পরিচয় দিতে তার চাচা আবেগে জড়িয়ে ধরে ঘরে নিয়ে যায়, তার চাচার ভিতর আবেগ ভয় দুইটা কাজ করতাছে এতদিন পর ভাতিজা এসে আবার জায়গা সম্পত্তির ভাগ বসাবে কিনা। তাই অতিরিক্ত খুশি হয়েও হতে পারলেন না। কিন্তু দ্বীপের চাচি দ্বীপকে দেখে মায়ের মত আপন করে দ্বীপের জন্য খাবার দাবারের আয়োজন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। 

.

দ্বীপ দুপুরের খাবার খেয়ে শর্ট  ন্যাপ নিয়ে বিকেলে তার চাচাতো ভাই তনিমকে নিয়ে বের হল শাহেদা ফুফির বাড়ির উদ্দেশে— অনেক বছর পর রিক্সা চড়া অভিজ্ঞতা দ্বীপকে সত্যি মুগ্ধ করছে আশপাশের অরণ্যঘেরা গাছ-গাছালি দেখে। দ্বীপের চাচাতো ভাই হুট করে  শিবের হাটে রিক্সা থামাল, বিনা-শাহ’র দোকানের মিষ্টি খাওয়ার জন্য। দ্বীপ মিষ্টি খেয়ে অবাক হয়ে বলল এমন সাদামাটা একটা দোকান এত সুস্বাদু সুইট এর আগে আমি কখনও খাইনি। 


.

দ্বীপ অপেক্ষার পথ ফেরিয়ে এখন ফুফিদের ঘরের সামনে, তার ফুফি বসে আছে ঘরের সিঁড়িতে, দ্বীপ চিনে না ফুফিকে, ফুফিও চিনে না দ্বীপকে, তাই তার ফুফি তনিমকে  জিজ্ঞেস করে, কে উনি? তনিম বলল- ফুফি আমদের  দ্বীপ ভাইয়া।.. এই কথা শুনে তার ফুফি গলা ফাটা চিৎকার দিয়ে এমন ভাবে দাঁড়ালো আরেকটু হলে হয়তো শাড়ি পেঁচিয়ে পড়ে ঠেং ভাংত, জানিনা কি আবেগ তার ফুফির ভিতর জমে ছিল; ফুফিরা কেন এমন হয় কেন এমন আপন করে ভালবাসতে পারে— দ্বীপকে জড়িয়ে ধরে দ্বীপের ফুফি শুরু করে দিল 'মরা কান্না আর জোরে জোরে বলতে লাগল আমার বাপ কত বড় হয়ে গেছে আমার আব্বা কোথায় ছিল এতোদিন ফুফিরে ভুলি। বাড়ির সবাই ঘর থেকে বের হয়ে গেল ফুফির এমন ভয়ঙ্গর কান্না দেখে। 

.

দ্বীপ একে একে সবার সাথে পরিচিত হতেই;  হঠাৎ তার চোখ আঁটকে গেল অন্যরকম এক ভাললাগায় লাজুক আর মায়াবী চোখে, দ্বীপ এর আগে এমন নিখুঁত সুন্দর দেখিনি কখনো, বিকিনি আর অশ্লীল পোশাকের ভিতর বেড়ে উঠা দ্বীপের কাছে এমন শালীন সুন্দরী মানবী যে থাকতে পারে পৃথিবীতে, দ্বীপ সে কথা ভুলেই গিয়েছিল একদম!! দ্বীপ এই লাজুক মেয়েটা কে ফুফিকে জিজ্ঞেস করতেই ফুফি বলে— আরে এটা আমার মেয়ে সন্ধ্যা!! অনেক লাজুক, তোর সামনে আসতে অনেক লজ্জা পাচ্ছিল বাবা।


.

ফুফির শেষ কথা যতদিন দেশে থাকবে তার বাড়িতে থাকতে হবে- তাই তনিমকে দিয়ে দ্বীপের  ব্যাগ নিয়ে আসলো । ফুফির রান্না-বান্না ব্যস্ততা শেষে একটা সময় যখন  রাতে খাবারের জন্য টেবিলে বসলো দ্বীপ লক্ষ্য করল সোলারের বাতির ক্ষীণ আলোয় একটা অপরুপ আলো তার চোখকে বার বার টেনে নিয়ে যাচ্ছে,, আর এই আলো কোন সাধারণ আলো না;  সন্ধ্যার আলো । খাওয়ার এক ফাঁকে তার ফুফি দ্বীপকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল-  দ্বীপ কাল সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হবে কিন্তু? 

কেন ফুফু?

সেইটা ঘুম থেকে উঠলেই বুঝবি। 

ঠিক আছে ফুফু। 

.

দ্বীপ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করতেই তার ফুফি বলল রেডি হয়ে নে দ্বীপ, সন্ধ্যাকে তার কলেজে পৌঁছে দিতে হবে। দ্বীপ এই কথা শুনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না; দ্বীপের ভিতর হঠাৎ একরকমের ভয় কাজ করতে লাগলো, এমনতো কখনও হয়নি, কত শত মেয়ে তার চোখের সামনে দোলাচল খেল, এই প্রথম দ্বীপ বুঝতে পারলো এইটা সাধারণ কোন অনুভুতি না।  ওইদিকে সন্ধ্যা দ্বীপের সাথে যাওয়ার কথা শুনে লজ্জায় সাজগুজ ভুলে কি পড়বে না পড়বে মাথা না আঁচড়িয়ে সাদামাটা হয়ে বেড়িয়ে গেল। না সাজলেও যে কিছু রমণী প্রকৃতির প্রকৃত সুন্দরের প্রতিচ্ছবি সেইটা হয়তো সন্ধ্যাও জানে না। 


.

দ্বীপ আর সন্ধ্যা একি রিক্সায় দুজনে দুপাশ ঘেঁষে ঝুবুথুবু হয়ে বসে আছে, সন্ধ্যার লাজুকতা দেখে দ্বীপ ভাঙ্গা ভাঙ্গা ভাষায় একটি  শব্দ উচ্চারণ করল- সন্ধ্যা? 

সন্ধ্যা নিচের দিকে চেয়ে বলল- হুম্ম।

আমাকে তোমার খুব অপরিচিত মনে হয়?


নাতো ! আপনার কথা আম্মা এতো বেশি বলছে যে, আমাদের ফ্যামিলিতে আপনার একটা ছায়া থাকতো সবসময়। গত দুদিন আগে আম্মা জালি পিঠা বানাই কান্না করতে করতে বলে--  দ্বীপের জালি পিঠা কত পছন্দ ছিল। আর আব্বা দেশে আসার সময় আম্মা সবসময় তাগিদ দিয়ে  বলত সবার জন্য কিছু আনলে  দ্বীপের জন্য আনতে হবে। আপনার জন্য কত জিনিস আছে আলামারি খুললে দেখবেন। 


দ্বীপ হঠাৎ আপসোস করে বলে উঠে, এতদিন এই মমতাময়ী ফুফুর ভালোবাসা থেকে বঞ্ছিত ছিলাম আমি। আচ্ছা সন্ধ্যা জালি পিঠা কি?


পঁচা পিঠা বলে সন্দ্বীপের ভাষায়।


সন্ধ্যা তুমি আমার সাথে সন্দ্বীপের ভাষায় কথা বল, আমি বলতে না পারলেও বুঝি কিন্তু?


সন্ধ্যা লাজুক হাসি দিয়ে বলে মামারও সন্দ্বীপের ভাষা খুব পছন্দ ছিল। 


তুমি কিভাবে জানো?


সন্ধ্যা এইবার অন্যদিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে আগ্রহ থাকলে সব জানা যায়। 


-----

দ্বীপ এক পা এগোয় আবার পিছায় কিভাবে ফুফিকে বলা যায়, ফুফা থাকে দেশের বাহিরে; কিভাবে বলবে ফুফিকে তার মনের কথা! সময়ও বেশিদিন নাই  সব মিলিয়ে দ্বীপ অস্থিরতা নিয়ে 

ফুফিকে ডাকল—

ফুফি দ্বীপের সামনে বসে আছে। 

দ্বীপ কি বলে শুরু করা যায় ভাবতে ভাবতে হঠাৎ বলে উঠল— ফুফু তুমিতো জানো আম্মা আব্বাকে কত ভালবাসত, নানা মারা যাবার পর মামারা উনাকে কত জোর করছে অন্য জাগায় বিয়ে দিতে আম্মাকে কোনদিন টলাতে পারিনি। আমার মামার বাড়ির কাউকে আম্মা তেমন একটা পছন্দ করেন না, পরিস্থিতির কারণে উনি বাধ্য হয়ে উনাদের সাথে থাকতে হয়। ফুফু তোমার কাছে একটা আবদার করলে রাখবে?


বল কি করতে পারি তোর জন্য এই ফুফি?


আরে আরে ফুফু তুমি কাঁদছ কেন? আমিতো জানি আম্মা তোমার ভাবী না শুধু বান্ধুবিও ছিল। ফুফু প্লিজ কেঁদনা! 


আমার সই আমার আদরের ভাবী কেন এমন হল সব!!  আচ্ছা বল কি বলবি?


ফুফি আমার আম্মা ছাড়া আমার আপন শিকড় বলতে তেমন কেউ নাই, আমি চাই সন্ধ্যাকে কানাডায় নিয়ে যেতে। 


দ্বীপের মুখে এই কথা শুনে তার ফুফির কান্না আরও তীব্র হল, যেন তার মনের সুপ্ত বাসনা পূরণ হবার এক আনন্দ অশ্রু মিশানো এই কান্নার বিলাপ। 


.......


দ্বীপ সন্ধ্যার বিয়ে হল- বিয়ের এক সপ্তাহ পর দ্বীপকে কানাডা চলে আসতে হল জব ইন্টারভিওর জন্য। সন্ধ্যার জন্য প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ঠিকঠাক করে আসলো। দ্বীপ জব ইন্টারভিও দিয়ে বাসায় ফিরে তার মামাদের বিয়ের খবর জানাতেই বাসায় এক লঙ্কাকাণ্ড বেঁধে গেল- তার মামারা চিৎকার চেঁচামেচি করে বলতে লাগলো- তুই আমাদের না জানিয়ে নিজের ইচ্ছেমত, ছোটজাতের মেয়েকে বিয়ে করছস, তোর এতো বড় স্পর্ধা,  যে বংশে বিয়ে করার জন্য তোর মার এই অবস্থা!! তুই কোন সাহসে আবার ওই ওই বংশের মেয়ে বিয়ে করলি। তোরে ছোটবেলা থেকে মানুষ করার এই প্রতিদান দিলি। আজকের পর থেকে তোর সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নাই। 

.

তিন মাস পর দ্বীপ আর তার মাকে নিয়ে স্থায়ী হল কানাডা  ড্যান্সিং লাইটস ভ্যালিতে, যেখানে রাতের আকাশে অরোরা দেখা যায়, যা এই উপত্যকাটিকে আরো রহস্যময় করে তোলে। দ্বীপের মা এখন পুরোপুরি কথা না বলতে পারলেও আগের চেয়ে অনেক প্রাণচঞ্চল আর সাবলীল। 

..

পরিশেষ.. দ্বীপ আর তার মা এখন এয়ারপোর্ট-এ,  অপেক্ষা করে আছে কখন সন্ধ্যা আসবে । দ্বীপের মা বার বার অস্থির চোখে তাকায় কারণ সে জানে না সন্ধ্যার দেখতে কেমন। হঠাৎ ট্রেন্স কোট পরা হিজাব মুখে এক নারী দ্বীপের কাছাকাছি হাসিমুখে আসতে দেখে দ্বীপের মা বুঝতে বাকী রইল না- এইটাই সন্ধ্যা! 

সন্ধ্যা সালাম করতেই দ্বীপের মা ঝাঁপিয়ে ধরল সন্ধ্যাকে- আহা সেকি মমতায় তার মুখ তার হাত আদরে স্পর্শে বুলাতে লাগলো এই সেই সন্ধ্যা যার গায়ের রক্তিম শিকড়ের গন্ধ দ্বীপের বাবার গন্ধের সাথে মিলে যায় হয়তো। দ্বীপ হঠাৎ আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করল দ্বীপের মা কথা বলছে অস্রুসজল চোখে সন্ধ্যাকে বুকে জড়িয়ে। 






পর্ট-১, মোল্লা বাজার। কীয়ান নৈশিক যার বাড়ির অল্প দূরত্বেই মোল্লা বাজার, এই বাজার মূলত জমে উঠে শনিবারে, গ্রামে সাধারণত এই জমে উঠা বাজারকে হাট...

পর্ট-১, মোল্লা বাজার।

কীয়ান নৈশিক যার বাড়ির অল্প দূরত্বেই মোল্লা বাজার, এই বাজার মূলত জমে উঠে শনিবারে, গ্রামে সাধারণত এই জমে উঠা বাজারকে হাট-বার বলে, গ্রামের প্রতিটি বাজারে সপ্তাহে দুইদিন বিশেষ হাট বসে । মোল্লা বাজারের হাট হচ্ছে শনি ও  বুধবার। 

আজ শনিবার, দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসবে হরেক রকম জিনিস নিয়ে-- নলখাগড়ার মাদুর (যা গ্রামে ধাড়ি-পাতার বিছান হিসেবে পরিচিত) হাঁস-মুরগি, মাটির হাঁড়ি-পাতিল, খাঁচা, ঢালা- কুলা, মুড়ি-মুড়কি, খই, নাড়ু, মসলা, শাকসবজি, মৌসুমি ফল ইত্যাদি।


হাট'বারে লোক সমাগম বেশি হয় বলে; তখন হাটে গেলে এক অদ্ভুত গুঞ্জন শোনা যায় । কল্পকাহিনী অথবা হতে পারে লোকগল্প, প্রতি হাট-বারে নাকি জ্বিনরা আসে বাজার-সদাই করতে! তখন যদি একযোগে সব জ্বীন বাজারে নামে, সেদিন বাজারের কোলাহল স্বাভাবিক থেকে অনেকগুন্ বেড়ে যায় । গ্রামে আবার এইসব নিয়ে অনেক মিথও আছে।  


কীয়ান নৈশিক, সাইকোলজি আর সোসিওলজি উপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে অনেকদিন পর বাজারের  চায়ের দোকানে বসে নীরবে ভাবছে অতীতের সব কথা। শনিবারের এই হাটে জড়িয়ে আছে তার অনেক স্মৃতি। নৈশিকের বন্ধু অধ্বৈত, রিশান ও রুজান এর সাথেও অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই হাটকে ঘিরে, যারা সবাই আলাদা পাড়া বা মহল্লার হলেও, আড্ডা হতো এই মোল্লা বাজারে। বিশেষ করে অধ্বৈতের সাথে ঘটে যাওয়া 'প্যারালাল ঘটনার কথা মনে পড়লে নৈশিক এর বুকে এখনও রক্তক্ষরণ হয়। এমন কোন দিন নাই যে তার এই কঠিন স্মৃতির কথা মনে পড়েনি। একটা তাজা প্রাণ এই ভাবে হারিয়ে গেল তাদের জীবন থেকে, মেনে নিতে পারেনি নৈশিক কোনোদিন। কীভাবে কি হয়ে গেলো আজো তার সঠিক সুরাহা মিলেনি। 


পার্ট -২, নওমী কইন্যরী ।

নৈশিক ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে গেলো নওমী কইন্যরীর  কথা--  যাকে  শুধুমাত্র শনিবারের হাটে দেখা যেত কিছু না কিছু বিক্রি করতে। উঠতি বয়সী এই  তরুণী, যাকে দেখলে মনে হতো জাফরান কিংবা চন্দন দিয়ে স্নান করেছে সবেমাত্র। যেমন সুন্দরী তেমন ছিল লাজুকতা ভরা চালচলন।  মাত্রাধিক সুন্দরের কারণে অনেকেই কইন্যরীকে মনে করতো পরী অথবা ভিন গ্রহের কেউ।  

মনে করার কারণও আছে বটে, কইন্যরী যে বাড়িতে থাকত বাড়িটা অনেকটা প্রত্নতাত্ত্বিক ভৌতিক টাইপ  জমিদার বাড়ির মতই  ছিল, চারিদিক গাছগাছালিতে বাড়িটি যেন সারাক্ষণ কোন এক  কৌতূহলে ডুবে থাকত। ভূ-সংস্কার ও জমিদারি প্রথার অবসানে হয়ত হারিয়ে গেছে কইন্যরী বংশীয় পরম্পরা; তাই কইন্যরীর জগত-সংসার এখন খুবই সীমিত, সব হারিয়ে সাথে আছে একটা ছোট ভাই আর বৃদ্ধা মা।


আজ থেকে প্রায় ১৪ বছর আগের কথা অধ্বৈতের বয়স তখন উনিশ কি বিশ,  আর নওমী কইন্যরী যার বয়স পনেরো হবে নয়তো একটু বেশি। এই উড়ন্ত বয়সে একটা মেয়ে বাজারে আসা, তার উপর বেপরোয়া সুন্দরী, সব মিলিয়ে কইন্যরীকে বাজারে আসা-যাওয়া নিয়ে অনেক কাঠখড় পোহাতে হতো। কিন্তু কইন্যরীর  চেহারায় কখনো সেই ভয়-ভীতির চাপ বোঝা যেত না।সবসময় একদম সাবলীল থাকত, কারো দিকে প্রয়োজন ছাড়া তাকাত না। তবে, প্রয়োজনের বাইরে শুধু  অধ্বৈতের দিকেই তাকাতো। আর তাতেই বাঁধে যত বিপত্তি, কারণ এলাকার 'রক্ত গরম 'ছাত্রনেতারা এইটা নিয়ে অধ্বৈতকে অনেক 'হুমকি 'ধামকিও  দিত। হুমকি দেয়ার আরও অনেক কারণ আছে, কারণ এই অধ্বৈতের কারণে এলাকার বখাটেরা কইন্যরীর  কোন ক্ষতি করতে পারত না।  আর বখাটে গ্রুপের লিডার ছিল চেয়ারম্যান এর ছেলে পর্ণব। 


অধ্বৈত ছিল নৈশিকের বন্ধুদের  মধ্যে সব থেকে সাহসী আর বিচক্ষণ; আর রিশান ছিল একটু আত্মকেন্দ্রিক আর সুযোগ সন্ধানী, ওইদিক থেকে  রুজান  ছিল বাস্তববাদী আর মেয়ে-বিদ্বেষী।।  অধ্বৈত কইন্যরীর প্রতি এত মহানুভবতা রুজান ভাল চোখে  দেখত না তেমন --  তারপরেও কোন সহযোগিতা চাইলে  এগিয়ে আসতো। সেদিন শনির হাটে কইন্যরী শীতল পাটি বিক্রি করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে যায়, তাই  অধ্বৈত তার বন্ধুরা  মিলে সিদ্ধান্ত নিল কইন্যরীকে বাড়ি পোঁছে দিয়ে আসবে। অবশেষে, আশেপাশে অনেক বখাটে ছেলের উৎপাত উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত কইন্যরীকে বাড়ির  সামনে নিয়ে আসলো।  এসে সবাই একটু অবাক হল  বাড়ির সামনে ফুলের বাগানে কোন ফুলের গাছ নাই-- নতুন করে ফুলের চারা রোপণ করতে হয়তো মাটি উর্বর করতে উৎখনন করা হয়ছে।।


…ভাবতে ভাবতে  নৈশিকের অন্য একটা কথা  মনে পড়ে গেল--  বন্ধুদের মধ্যে অধ্বৈত ছিল অনেক স্টাইলিশ অ্যান্ড ম্যানলি লুকের যার দরুন গভীর জলের মেয়েরা অধ্বৈতের প্রেমে হাবুডুবু খেত। তখন বন্ধুরা সবাই লেদারের ওয়ালেট ব্যাবহার করলেও অধ্বৈত ব্যাবহার করত লেদার মুড়ানো  মেটালের ওয়ালেট; তার আরেকটা কারণ ও একটু দিকভ্রান্ত ছিল, ঠিকানা ভুলে যেত!  তাই তার মামার বাড়ির একটা ঠিকানা ওয়ালেট যত্ন করে রাখতো সবসময়, যদিও লেদারের ওয়ালেট অত অরক্ষিত নই!  আর এইটা নিয়ে সব বন্ধুরা অনেক  হাসাহাসি  করত, ঠিকানা রাখার এই অদ্ভুত কাণ্ড নিয়ে-- অধ্বৈত মোটেও কর্ণপাত করত না তাতে। 


 পার্ট-৩, অধ্বৈত নেই কোথাও!

সেদিন শনির হাটে কইন্যরী আসেনি, অধ্বৈতও যেন কিছু একটা লুকচ্ছে কিন্তু বলতে পারছে না।।  নৈশিক জিগ্যেস করলে বলে--  জানিনা কেন আসেনি?  এক পর্যায়ে নৈশিক চেয়েছিল কইন্যরীর  বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিতে কিন্তু অধ্বৈত রাজি হয়নি, শেষ পর্যন্ত সবাই যার যার মত চলে গেল।


…পরদিন সকালে বন্ধুরা সবাই মোল্লার বাজারে এলো কিন্তু অধ্বৈত আসেনি।  অধ্বৈতের বাড়ি গিয়েও খোঁজ করে পাওয়া যায়নি; তার মাকে জিগ্যেস করতেই বলে, আমিতো ভাবছি ও তোমাদের সাথে ছিল রাতে! এই বলে অধ্বৈতের মা চিৎকার করে উঠলো, আমার ছেলে কই? কই গেছে আমার ছেলে, অধ্বৈতের বাড়িতে কান্নার শোরগোল পড়ে গেল। 


 নৈশিক তার বাকি বন্ধুরা তন্নতন্ন করে সব জাগায় খুঁজতে লাগলো কোথাও খোঁজ পেল না , অবশেষে মনে হল তাদের কইন্যরীর বাড়িতে গিয়ে একবার খোঁজ নেয়া দরকার যদিও অধ্বৈত একা ওই বাড়িতে যাওয়ার কোন কারণ নেই তবুও গেল তারা।।


গিয়ে দেখে  একটি ‘উপড়ে ফেলা চোখ ‘রক্তাত হয়ে পড়ে আছে কইন্যরীর ঘরের সামনে সিঁড়ির উপর  , নৈশিকের এই দৃশ্য দেখে হাত পা কাপতে শুরু করল !! ভয়ে ভয়ে আবছা লাগানো দরজা খুলতেই দেখে--  পুরো ঘর ‘রক্ত দিয়ে ভেসে আছে, তার উপর একটা ‘কাটা হাত, কালচে ‘রক্তে জমাট বেঁধে পড়ে আছে; হাতে এখনও মুড়ানো আছে  অস্পষ্ট একটা  ঘড়ি! নৈশিক আর নিজেক স্থির রাখতে পারল না , কি  ঘটছে এসব, হচ্ছেটা কি!!... 


এরমধ্যই রিশান কেটে পড়ে, নৈশিক আর  রুজানের  আতঙ্গ আর  ভয়ে ঠোঁট শুকিয়ে আসছে, তারা দুজনে অস্পষ্ট কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলছে, না এইটা অধ্বৈত না, অধ্বৈত না-- কিন্তু ঘড়িটা  পরখ করতে দেখে নৈশিক চিৎকার করে বলে,   এইটা অধ্বৈতের টাগ হেওয়ের ঘড়ি; ম্যানটাহান থেকে ওর বাবা পাঠিয়েছে, এই ঘড়ি, এই এলাকায় আর কারো কাছে নেই। 


সকাল গড়িয়ে বিকেল হল; 'পুলিশ এসে ঘেরাও করে দিল বাড়ির চারিদিক-- শোকের কালোছায়া নেমে আসল পুরো এলাকা জুড়ে, সবার মুখে একটি কথা কে করছে এই 'খুন, আর 'লাশ গেল কই? অনেক খোঁজাখুঁজি করেও অধ্বৈতের লাশ পাওয়া গেল না আর। 

এলাকায় রটে গেল কইন্যরী নিয়ে নানান কথা, ও মানুষ ছিল না!!  ‘প্রেতাত্মা অথবা রাক্ষসি ছিল, অধ্বৈতকে 'মেরে 'ডাইনির মত খেয়ে  পালিয়ে গেছে। এরপর আরও 'গুজব ছড়াতে লাগল শনির হাট নিয়ে, কইন্যরীকে নাকি মাঝে মাঝে দেখা যায় এই শনির হাটে । সেইসময়ে শনিবারে সন্ধ্যা হবার আগেই সবাই ঘরে চলে যেত। পুরো মোল্লা বাজার কি এলাকা জুড়ে কইন্যরী নাম ছিল একটা আতংকের ।


রিশান আর রুজানও মনে করত অধ্বৈতকে  কইন্যরী ‘খুন করছে, কারণ, কইন্যরী স্বাভাবিক মানুষ ছিল না;  ‘সাইকো ছিল । 

একমাত্র নৈশিক মানতে পারেনি এই কথা কিন্তু সমাজ আর মানুষের এই ধারণাকে সেই চাইলেও পালটাতে পারবেনা, তাই চুপ থাকতো সবসময়। বিখ্যাত মনোবিদ সোলোমন অ্যাশ বলছিল, ''অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিরা সঠিক উত্তর জানার পরেও গোষ্ঠীর ভুল উত্তর মেনে নেন শুধু গোষ্ঠীর সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য''। সেক্ষেত্রে নৈশিকের ধারণা, অপরাধ যদি হয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রভাবে তাহলে প্রশাসন থেকে জনগণ সবাই জেনেও না জানার ভান করে থাকে।  অধ্বৈত নিশ্চিত ‘খুনের, তবুও আলামত পাওয়া গেছে, কিন্তু কইন্যরী এইভাবে কয় হারিয়ে গেল? 


পার্ট -৪, বাস্তবতার উর্ধ প্রনয়।

একটা অমীমাংসিত খুনের কারণ উদ্ঘাটন করতে হয়ত কীয়ান নৈশিক এর সাইকোলজির ও সোসিওলজি  উপর পড়াশুনা।  যদিও তার প্রিয় সাবজেক্ট ছিল ফিলোসফি। 

নৈশিক এর সবসময় মনে হত যে বা যারা  খুন করছে সে হয়ত হাত ‘কাটা ঘড়ি  রাখার পিছনে এইটাই প্রমাণ করতে চেয়েছে যে এইটা অধ্বৈত যাতে রহস্য বা তদন্ত এইখানে নিষ্পত্তি হয়ে যায়। না হয় এতো দামি ঘড়ি রেখে যেত না।  আর গ্রামের মানুষকে সহজে বুঝিয়ে দিয়েছে, রাক্ষস খোক্ষসের গল্প। এইক্ষেত্রে ফ্রয়েডের তত্ত্ব অনেকটাই ঠিক, "মানুষের চিন্তা ও আচরণ তার অবচেতন মন থেকে প্রভাবিত হয়, যা মানুষের সচেতন চিন্তা বা অনুভূতি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা"।  


অনেকদিন পর বাড়িতে এসে নৈশিক এইসব ভেবে একটুও ঘুমাতে পারেনি, তার উপর সন্ধ্যায় তার ফুফার লাশ দাফন করে এলো, সব মিলায় নৈশিক বিষণ্ণতা নিয়ে বালিশে মাথা রাখতেই তন্দ্রাই ভেসে উঠলো, কইন্যরীর সেই  ফুলবিহীন বাগান আর তার ফুফার ‘কবরের প্রতিছব্বি!! দু’টার মধ্যে কেমন জানি অন্তমিল আছে । নৈশিক লাফ দিয়ে উঠে ঘরের তালা লাগিয়ে  বেরিয়ে গেল, এত রাতে বাসায় কেউ থাকলে হয়ত যেতে দিত না, কিন্তু  বাসায় কেউ নেই, সবাই গেছে ফুফার  বাড়িতে। 


রাত তখন বারোটা কনকনে শীতের আবহ, নৈশিক বাড়ির উঠোনে অস্থায়ী রান্নাঘর থেকে ‘খন্তা ‘কোদাল নিয়ে  হাটা দিল কইন্যরীর বাড়ির দিকে।  অধ্বৈত এর ‘মৃত্যুর পর হয়ত এই বাড়িতে আর কেউ আসেনি, অনেক ঝোপঝাড় আর গাছগাছালিতে বদলে গেছে পুরনো দৃশ্য, কিন্তু বদলায়নি স্মৃতি, আর সেই স্মৃতির হাত ধরেই নৈশিক কইন্যরীর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে একা!  বন্ধুত্বের সেই ‘খুনের ক্ষত নৈশিককে ভুলিয়ে দিয়েছে ভয় বলতে কোন শব্দ নেই। 

অবশেষে নৈশিক চিন্তা করতে লাগল জমিতে যদি চাষাবাদের জন্য মাটি অদলবদল করে  আলগা করা হয়, সেখানে অন্য কিছু ‘পুঁতে রাখলেও তার বৈপরীত্য সহজে ধরা পড়বে না। কিন্তু কইন্যরীর ফুলের বাগান তো ছোট ছিল না--  যারা খুন করছে তারা হয়ত অত বোকা না যে বাগানের মাঝখানে ‘লাশ ‘পুঁতে রাখবে, এই ভেবে নৈশিক ঠিক করল প্রথমে ঘরের দূরত্বে বাম পাশে খনন করবে, তারপর ডান পাশে, নৈশিকের সাইকোলজি হচ্ছে  ''যারা অপরাধ করে  তাদের ডান আকস্মিকভাবে বাম হয়ে যায়'', হয়ত এইটা সৃষ্টিকর্তার থেকে  প্রদত্ত। 


এই ভেবে নৈশিক খনন শুরু করল, আর ভাবতে লাগল এত নিখুঁত ভাবে কীভাবে একটা মানুষকে ফুল চাষ করা বাগানে কবর দেয়া যায়? এক বিন্দু রক্তের চিহ্ন ছাড়া, এত নিখুঁত ব্যপারটা একজন দ্বারা হয়নি, একা ‘অপরাধ করতে যে ভয় আর উৎকণ্ঠা কাজ করে,  তাতে ভুল হয়-- কাজটা হয়েছে দলবদ্ধভাবে যার কারণে সহজে সেইটা ধামাচাপা পড়ে গেছে। 


তন্মধ্যে নৈশিকের এই ভাবনা আকস্মিক পাল্টে গিয়ে  ধাক্কা দিল!! আমি হয়ত যেইভাবে ভাবছি তা নাও হতে পারে হয়ত অন্য কোথাও অধ্বৈতের  কবর হয়ছে নয়ত ‘রাসয়ানিক ‘তেজস্ক্রিয়তাই মিশিয়ে ফেলা হয়েছে!! 


...আনমনে খননের মধ্যে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ খন্তার সাথে ষ্টীল কিংবা ধাতব কিছুর সংঘর্ষ হল। নৈশিক আর কোপ দিল না ধাতব বস্তুটা হাতে নিয়ে দেখে, চামড়া খসে যাওয়া একটা মেটালের ওয়ালেট!  নৈশিক টর্চের আলোয় ভালো করে  দেখতেই,  নৈশিকের চোখে অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো! আর একটি কোপ দিল না যদি অসাবধানতায় অধ্বৈতের ‘হাড়গোড়ে ‘কোপ লেগে ব্যথা লাগে, মাটি ভরাট করে নৈশিক ‘কবর যিয়ারত করে হাঁটা দিল বাড়ির দিকে। 


কীভাবে এত ঘাত প্রতিঘাতের ভিতর অধ্বৈত এই ওয়ালেট তার কাছে রেখেছিল, এই রহস্য নৈশিকের জানা নেই, কিছু রহস্য সৃষ্টিকর্তা কোনদিন উদ্ঘাটন করতে দেই না, উনি নিখুঁত রহস্যময়ী । এই সেই ভাবতে ভাবতে নৈশিক ওয়ালেট খুলে দেখে কিছু সেঁতসেঁতে টাকা আর কইন্যরীর সাদা কালো একটা ছবি, মেয়েটা কি অদ্ভুত সুন্দরী ছিল? নৈশিক দুই আঙ্গুল দিয়ে  ভিতরে হাতড়াতে বেরিয়ে এলো একটা বাগদানের আংটি, এক টুকরো কাগজ যত্নে রাখা মামার বাড়ির ঠিকানা, যে  ঠিকানার দূরত্ব টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া। 


নৈশিক জানে না, অধ্বৈতের এই কোন মামার বাড়ি, তবুও যদি বন্ধুর কোন স্মৃতি পাই, যদি পুরনো কোন ছবি, তাই নৈশিক অধ্বৈতের আম্মাকে কিছু না জানিয়ে রওনা দিল শীতের কুয়াশা ঢাকা মামা বাড়ির  ঠিকানার পথে-- লঞ্চ, বাস, ট্রেন, রিকশা... অবশেষ পায়ে হেঁটে হেঁটে ঠিকানার দুয়ারে হাজির হল নৈশিক--


…এতদিন পর দীর্ঘ এতদিন পর কইন্যরী, নৈশিককে দেখে চিনতে ভুল করেনি, আকস্মিক এক দমকা হাওয়া লাগলো যেন তার চোখে-মুখে-- কইন্যরী দিশেহারা 'আহত পাখির মত ছুটতে গিয়ে, উনুনে বলক উঠা ভাতের হাড়ি শাড়িতে পেঁচিয়ে, জলসে যেত একটু হলেই!!  কিন্তু  কইন্যরী জানে না তার আগ-পিছ কি চলছে, অপেক্ষার চোদ্দটি বছরের যে আকুলতা নিয়ে কইন্যরী পথ চেয়েছিল অধ্বৈত আসবে বলে তার এই ঠিকানায়, সে অপেক্ষার তৃষ্ণা নিয়ে  কইন্যরী  নৈশিক এর  সামনে ছুটে আসে ধূমকেতুর মত।  কত লক্ষ যুগ অপেক্ষায়মান দুটি চোখ কথা বলেনি-- অভিমান ভিজা চোখে বিড়বিড় করে কইন্যরী নৈশিককে একটাই কথা  বলে যাচ্ছিল  ''আমার অধ্বৈত কই? ওর না আসার কথা ছিল''?



ইমারাজ, যার চোখের রং দিয়ে আঁকা রহস্যঃ প্রমান করা যায়। পুরো নাম ইমরাজ হাদিদ। বয়স তার তেত্রিশ দিয়ে পাশ করলো সবে। সবকিছুতে স্পষ্ট চিন্তা ও যুক...

ইমারাজ, যার চোখের রং দিয়ে আঁকা রহস্যঃ প্রমান করা যায়। পুরো নাম ইমরাজ হাদিদ। বয়স তার তেত্রিশ দিয়ে পাশ করলো সবে। সবকিছুতে স্পষ্ট চিন্তা ও যুক্তি-তর্ক দিয়ে প্রমাণ করতে পছন্দ তার। ''ডান হাত চুলকালে টাকা আসবে'' এমন চিন্তাতে ইমরাজ বিশ্বাসী নয়, বরং তার যুক্তিতে অযথা হাত কেন চুলকায় সেইটার জন্য ডাক্তার দেখানো জরুরি।

বৈশিষ্ট্য বৈচিত্র্য ইমরাজের কাছে পোশাকের চাকচিক্যের চেয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তিবিদ্যা উপর এম-পি-এইচ-আই-এল করে লজিক্যাল জার্নালিজম নিয়ে তার কাজ। মানুষকে জানার অধম্য কৌতুহল তাকে প্রায় দেখা যায়- মানুসিক হাসপাতাল, বয়স্ক নিবাস, রিহ্যাব সেন্টার ও কারাগারে। তার ধারণা এইসব জাগার মানুষগুলোর জীবন বা বাস্তবতা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষ থেকে বেশি।

ইমরাজ কখনও একজন মানুষকে পুরপুরি না জেনে তার উপর মিশ্র প্রতিক্রিয়া পোষণ করে না। এইজন্য অন্যদের নতুন পোশাকে দেখতে তার ভালো লাগলেও নিজের জন্য পুরোনো ধাঁচের পোশাকই পছন্দ ; তার ধারণা, হঠাৎ নতুন পোশাকে তার স্বাভাবিক এপিয়ারেন্স কৃত্রিমভাবে পাল্টে যায়। জ্ঞানবয়স থেকে লাল-হলুদ রঙের পোশাক কখনও পরিধান করেনি, নিজেকে সবসময় একই ভারসাম্য প্রতীয়মান রাখতে অতিরিক্ত স্যাচুরেশন হওয়া রঙের জামা কাপড় কিনলেও, ইমরাজ তা গায়ে দিয়ে ঘুমাবে কিছুদিন, এরপর রঙের কড়কড়া ভাব চলে গেলে বাহিরে পরে বের হবে। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইমরাজ খাকি কিংবা ধূসর রংকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে,কারন- এই রঙগুলো নতুন হলেও ভিভিড তেমন চোখে পড়ে না। 

আত্রাই নদীর কাছাকাছি, নওগাঁ জেলার শান্তাহার রেল স্টেশন, বৃষ্টি আর রোদে পোড়া জরাজীর্ণ কাঠের বেঞ্চে বসে আছে ইমরাজ। খাকি ট্রেঞ্চকোট, গলায় ম্যাট ব্ল্যাক স্কার্ফ আর লেদারের বুট পায়ে, ইমরাজ পিছনে হেলান দেওয়া থেকে হাত দুটি হাঁটুতে ভর করে ঝুঁকতেই তার ঢেউ খেলানো চুলগুলো পালি ভেঙ্গে ভেঙ্গে নিচের দিকে পড়ে তার চোখের এক পাশ ঢাকতে থাকে। শীতের বিকেলের শেষ রোদ হালকা কালো ধূসর চুলগুলোকে সোনালী আভা দিতেই ইমরাজ আবার উঠে বসে, চোখের সামনে পড়া চুলগুলো আলতো মাথা ঝাঁকিয়ে প্রাকৃতিক চিরুনি দিয়ে ঠিক ঠাক করে নিল।
 
এরিমধ্যে হঠাৎ পিছন থেকে একটা অস্পষ্ট কণ্ঠ বলে উঠলো; তুমি তাহলে ইমরাজ?  

ইমরাজ পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো একজন ''মিডল এজ ওমেন''' হাত দুটি ভাঁজ করে শালীন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে,  
ইমরাজ উঠে দাঁড়িয়ে তার কথার প্রতিউত্তরে বললো; জ্বী ম্যাডাম, আমিই ইমরাজ? 
আচ্ছা, আচ্ছা— তা তুমি কি হাসতে জানো না, নাকি হাসো না?

ইমরাজ একটু বিস্মিত,‘’ইনিশিয়াল গ্রীটিং’’ এর বাহিরে এমন প্রশ্নে ভিতরে আকস্মিক ছন্দপতন হল, ইমেইল কথোপকথন আর সামনাসামনি দেখা মানুষটার প্রকাশ সম্পূর্ণ ভিন্ন্‌,, ইমরাজ এর আগে এইরকম বয়সি নারীকে এত স্মার্ট আর গুছানো সুন্দর হতে দেখেনি ,তাই দুই পড়ন্ত বিকেলর সৌন্দর্যের সংঘাতে ইমরাজ সাবধানী হয়ে বলল-- এই মুহূর্তে আমার হাসার চেয়ে সিরিয়াস থাকা জরুরি, হাসির কারণে মানসিক মনোযোগের বিগ্ন হোক সেটা চাই না।  

ওহ!হ সিরিয়াস ইমরাজ! বুঝছি, তুমি বুঝাতে চাচ্ছ এন্ডোরফিন নিঃসরণের কারণে পরিস্থিতি গুরত্ব ফিকে করে দিতে পারে! কিন্তু তারপরেও মানুষের হাসতে হয়; কাউকে প্রথম দেখায় অন্তত একটু সৌজন্যবোধ হলেও, কারন- হাসি মানুষকে সহজ করে দেয় জটিলতা ভিতর বাঁচতে।

--ইমরাজ চাচ্ছে খুব অন্য প্রসঙ্গে কথা বলতে কিন্তু ম্যাডাম নীরবির কার্টেসির কথা ভেবে হঠাৎ হাসি প্রসঙ্গ পাল্টে অন্যকিছু বলতে ইচ্ছে হলো না, তাই ইমরাজ প্রসঙ্গ লাইনচ্যুত করতে বললো- 
জানেন পৃথিবীতে শিশুদের সাথে ফার্স্ট কমুনিকেশন কি দিয়ে হয়?

জানিনা মিস্টার ইমরাজ, কি দিয়ে? 

হাসি দিয়ে। 

নিরবি স্বাভাবিক হাসিতে বলল- কিন্তু তুমি জানো না, সবাই হাসলেও তখন শিশুটি কাঁদতে থাকে । 

এক্সাক্টলি আমি এইটা বুঝাতে চাইছি, আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপট এখন এমন কেউ কাউকে বুঝে না, কে কি জন্য হাসে, কি জন্য কাঁদে; এইটা বুঝার মতো বোধ আমাদের ভিতরে নেই। কিছু জিনিস অতি প্রাকৃতিক তার মধ্যে হাসি অন্যতম, এই হাসি আমাদের অবুঝ বয়স পর্যন্ত সঠিক প্রকাশ থাকে, এরপর এই হাসি হয়ে যায়, প্রয়োজন আর সৌজন্যতার খাতির। তবে মাড্যাম আপনার সাথে যতক্ষন থাকি এর ভিতর প্রকৃত হাসি যদি দেয়া লাগে আমি হাসবো। বিলিভ মি।

এইবার নীরবি নিজ থেকে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বললো- কফি খাবে?
ইমরাজ বললো- কফি আমার সকালের নিয়মে আর বিকেলে অভ্যস্ত চায়ে, কিন্তু আজকে নিয়ম ভাঙতে ইচ্ছে করছে!

নীরবি নিয়ম ভেঙে অর্ডার করতে চাইলে, ইমরাজ বারণ করে বললো- আমি আমার ইচ্ছেকে কখনো আমার উপর নিয়ন্ত্রণ করতে দেয় না । আপনি বরং কফির অর্ডার করেন আমি চা খাব।

নীরবি দুজনের জন্য চায়ের অর্ডার দিয়ে বলল- তুমি কি আমাকে সত্যি জানতে আসছো? নাকি কৌতহূল মাত্র? আর কেনইবা তোমার এত সিরিয়াস থাকা জরুরি! 

ইমরাজ একটু চুপ থেকে বললো পৃথিবীতে একমাত্র কৌতহূল যদি থাকে সেইটা সৃস্টিকর্তা! যে কৌতহূল-রহস্য উদ্ঘাটন হয়ে যায় সেইটা আর রহস্য থাকে না , একমাত্র সৃষ্টিকর্তার রহস্য কৌতহূল কেউ কোনোদিন চাইলেও ভাঙতে পারবে না, আর তাই ঐটাই প্রকৃত রহস্য বা কৌতহূল । সেক্ষেত্রে ধরে নেন আপনাকে জাস্ট জানতে চাওয়ার এক বিন্দুর কৌতহূল।   

নীরবি স্মিত হাসি দিয়ে বলে; কাউকে জানতে চাইলে কি মানুষ এতো সিরিয়াস হয়?
অবশেষে ইমরাজ মোক্ষম সময় বুঝে, কিঞ্চিৎ হেসে উঠলো।
নীরবি বিস্ময় নিয়ে বললো- না হাসার কারনে কি তোমার হাসি এত সুন্দর? সুযোগ খুঁজছ! নাকি সত্যি জানতে চাচ্ছ আমাকে?
ম্যাডাম আমি কিন্তু সিরিয়াস ছিলাম? হাসার পর আপনার সন্দেহ শুরু হলো কেন?
তুমি আমার সন্ধান কিভাবে পাইছো? 
সন্ধান পাওয়া ব্যাপারটা কাকতালীয়ও; আপনার সাথে আমার কথা হচ্ছে- এইটা এইখানে না হলেও অন্যভাবে হত- সিঙ্ক্রোনিসিটি বলতে পারেন। এইটা বলে ইমরাজ হাভানার চুরুট মুখে নিয়ে বিড়বিড় করে কিছু বলতে গিয়ে চুপ করে গেল- 

ম্যাডাম নীরবি চা শেষ করে ভুলেই গেছে হাতে এখনো খালি কাপ ধরে আছে, ইমরাজকে চুরুট টানতে দেখে একটু তটস্থ হয়ে বলে উঠলো - What is it about a middle-aged woman like me that captures your interest? 

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসা মুহূর্তে ইমরাজ চুরুট-কাটার দিয়ে পুড়ে যাওয়া অংশ কাটতে কাটতে বলল- I find myself deeply curious about you.

নীরবি হঠাৎ চোখে মুখে ভিন্নতা নিয়ে বলল- কিন্তু তুমিতো এইখানে নিরপদ না, এই শহরে এর আগেও অনেকে আমার সাথে দেখা করতে এসে ‘খুন’ হয়ে আত্রাই নদীতে পড়ে ছিল।
ইমরাজ এই কথা শুনে একটুও অবাক না হয়ে বলল-- তারা আর আমি কি এক ‘’মিস নীরবি’’!
তুমি এখনও রহস্য ইমরাজ - তবে তারা এসেছিল একটা সুযোগ নিয়ে যখন জেনেছে একজন সুন্দরী নারী একা এই শহরে, তার উপর তার হাসব্যান্ড আত্রাই নদীতে ডুবে 'মারা গেছে, ওরা চাইছিল এই সুযোগে…

ইমরাজ মুখ থেকে কথা টেনে নিয়ে বলল- আমিও যদি হয় সুযোগ সন্ধানী, তারপরেও আমাকে তাদের থেকে ভিন্ন কেন মনে হল আপনার?
কারন তোমার নিলচে আভার গাড় চোখ তামাটে বর্ণের চাহনিতে একটা স্ট্রং পারসনালিটি, তোমার হাঁটর ধরন সবকিছু মিলিয়ে তোমার চোখে মুখে দারুন অভিব্যক্তি , তোমার সাবধানে কথা বলা, হাসি লুকিয়ে রাখা সব মিলিয়ে মনে হল তুমি মানুষটা আমাকে ভালবাসার জন্য জানতে আস নাই, তুমি আসছ ‘খুনের’ রহস্য জানতে। তোমার লেস ব্লিঙ্কিং, আই রোলিং কোন কিছু স্বাভাবিক ছিল না। তুমি যে সাবজেক্ট নিয়ে আমার কাছে আসছ পড়াশুনা করতে, সেগুলা আমার অনেক আগেই পড়া হয়ে গেছে। হয়ত তুমি নতুন পড়ছ তাই কিউরিসিটি একটু বেশি, আর আমার অভিজ্ঞতা। 

ইমরাজ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল – আপনি কি প্রমান করতে পারবেন? আমি আপনার হাসব্যান্ড ‘খুন হওয়ার রহস্য জানতে আসছি?
তাহলে কেন আসছ তুমি, যা বলবে, বা মনের ভিতর যা আছে স্পষ্ট করে বলবে!
মাডাম নীরবি আমার কাছে আপনার হাসব্যান্ড এর ব্যপারে এমন কিছু তথ্য আছে, যা শুনলে হয়ত আমার প্রতি আপনার ধারনা পরিবর্তন হয়ে যাবে। 
 
কি আছে তোমার কাছে, কি আছে , দেখাও?
..মাড্যাম স্বাভাবিক একটা ‘মৃত্যু;’-- যে নদীতে পড়ে ‘মারা’ গেছে, তার তথ্য কারো কাছে থাকলেও কি আর না থাকলেও কি? কিন্তু আপনাকে এত বিচলিত দেখাচ্ছে, কেন?
কি যে বল ইমরাজ , বিচলিত কেন হব এতদিন পর যে মানুষটা ছেড়ে চলে গেল, তার কোন কিছু জানতে চাওয়া কি অপরাধ?
না, অপরাধ না-- তবে যেখানে আপনার অভিজ্ঞতা আর আমার যেহেতু কিউরিসিটী একটু আছে, তাই আপনার স্কোইন্টিং চোখ দেখে মনে হল, যুক্তিবিদ্যার ভাষায় আপনি কিছু লুকচ্ছেন ।
ইমরাজ তুমি কিন্তু অযথা জল ঘোলাচ্ছ, তুমি ইমোশনাল ‘ম্যানিপুলেশন করে আমাকে কোডিপেন্ডেন্সি করতে চাইছ এইটা কি অস্বীকার করতে পারবে?

না আমি একবার জন্য বলিনি ‘গ্যাসলাইটিং করে আপনার সাথে সম্পর্ক জড়ানো মত কৌশল আমি ইমপ্লিমেন্ট করতে চাইছি, আপনি কনভারসেশন রিভার্স করে দেখতে পারেন আমি আপনাকে জানতে চাইছি এইটুকু। জানতে চাওয়া মানেই প্রেম, এইটা কোন লজিক্যাল কনসেপ্ট না।

নীরবি সন্ধ্যা হতেই যেন অন্য রুপে বদলে গেল, তার কণ্ঠস্বর কঠিন মুখের চাহনি এই যেন এক অন্য নীরবি- যে নীরবি চোখে চোখ রেখে শুরুতে সরিয়ে ফেলত, সে নীরবি এখন পলকবিহীন চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে বলল- " Mr. Imraaz, stop ‘manipulating me, please’’। এই বলে নিরবি উঠে হাটা ধরল। 

ইমরাজ নিরবির চলে যাওয়া দেখে একটু উচ্চস্বরে বলে উঠল – আজিমপুর সাহেব বাজারে পাভ্লভ হাসপাতালে আপনার একজন বোন আছে নাম- কৈরভি। 

নীরবি এই কথা শুনে আর এক কদম সামনের দিকে বাড়াল না, স্তির দাঁড়িয়ে থাকল— ইমরাজ বসা থেকে উঠে নীরবির পাশে গিয়ে বলল আপনার বোন ‘’অ্যাকিউট সাইকসিসে’’ আক্রান্ত হয়ে মানুসিক হাসপাতালে আছে যে দিনের খুব কম সময় একটু সুস্থ থাকে, বাকি সময় ডিলিউসনে কাটে তার অনেকটা বিভ্রান্তি মিথ্যা বিশ্বাস এর উপর। 

নিরবি নিরবতা ভেঙ্গে বলল তুমি আমার ব্যপারে তাহলে তার থেকে স্টাডি করে আসছ, আমার ইমেল থেকে শুরু করে ‘খুনের’ ব্যপার! তোমার কি ধারনা আমার হাসব্যান্ডকে আমি ‘খুন’ করেছি। 

না আমি কখনও ঘটনার এক পক্ষীয় কথার যুক্তিতে বিস্বাস করি না, একটা ঘটনার পিছে অনেকগুলো কারন থাকে, লাল হেরিং এর মত বিভ্রান্তি কৌশল আমি অবলম্বন করি না ।
নিরবি চেহারা আগের চেয়ে আরো ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে দিনের মানুষের সাথে রাতে কোন মিল নেই, একদম অন্য এক মানুষ,লালছে বর্ণ থেকে হঠাৎ বিবর্ণ কালো দেখাচ্ছে খুব, হঠাৎ আমার হাত ধরে বলে তুমি যদি আজকে সুযোগ খুঁজতে তাহলে আমার আসল রুপ দেখতে যে রুপ শুধু ‘মানুষরূপী ‘পশুরা দেখে যাদের চোখে মুখে লিপ্সা ‘শকুনের মত যারা নারীর ‘শরির চাই। 

নীরবি ইমরাজ হাত ছেড়ে বলে- ট্রমা বুঝ ইমরাজ? হয়ত বুঝ! এই ট্রমা থেকে মূলত আমি 'মালঅ্যাডাপটিভ বিহেভিয়ারে ভুগছি যার কারনে রাতে তুমি যে অস্বাভাবিক মানুষটাকে দেখছ, এইটা একদিনে হয় নাই, প্রতিকূল পরিবেশে একজন মহিলা একা কেন থাকে? এই সমাজ মেনে নিতে পারে না ছিঁড়ে কুড়ে খাওয়ার জন্য প্রতিদিন শিয়াল ‘কুকুর আসে, একটা সময় ভিতরে ক্রোধ আর ঘৃণা থেকে আমি অন্য মানুষ, আমাকে স্পর্শ করে দেখো একটু ‘শকুন হয়ে, বুঝবে আমার শরির থেকে ১০০০ ভোল্টেজের শক কতটা তিব্র, একটু ‘লোভ নিয়ে আমাকে স্পর্শ করে দেখো, দেখবে আমার নখ বেড়িয়ে আসবে তোমার ‘গলা ‘টিপে ‘মারতে, এত এত ‘খুন’ আত্রাই নদীতে তারা একজনও মানুষ ছিল না সবাই আমাকে ‘ভোগ করার বাসনা নিয়ে এসেছিল। আর একটা সত্যি জেনে রাখো, যেইটা জানার তোমার কিউরিসিটি ছিল- আমার হাসব্যান্ড অনিক কৈরভির জন্য মূলত ‘খুন’ হয়ছিল! 

ইমরাজ সহজে অবাক বা হতভম্ব হয় না, কিন্তু তার লজিক তার দর্শন কোনভাবে হিসেব মিলাতে পারছে না আসলে হচ্ছেটা কি? তবুও নিজের ভিতর নিজেকে শক্ত রেখে বলল—কৈরভি আপনার হাসব্যান্ডকে পছন্দ করত জানি, কিন্তু সেই ব্যপারটা আপনি সহজভাবে নিতে পারেননি বলে আপনি তাকে ‘খুন’ করছেন তার ভাষ্যমতে। 

ইমরাজ আমি তোমাকে বলছি পুরুষ যখন ‘পশু হয়ে যায়্‌ আমি জানি এইখানে বিপত্তি, কৈরভির সাথে আমার হাসব্যান্ড এর ‘অনৈতিক ‘সম্পর্ক ছিল, কিন্ত তাদের ‘শারীরিক ‘সম্পর্কের ব্যপারটা আমি জানলেও স্বচক্ষে দেখিনি, কিন্তু একদিন আমি মোশন সিকনেসের কারনে কলেজের একটা ক্লাস নিয়ে বাসায় ফিরে আসি, এসে দেখি কৈরভি আর আমার হাসব্যান্ড একি বিছানায়, আমি সংজত রাখতে চাইছি নিজেকে কিন্তু আমার ভিতরে ‘ক্রোধ আর ঘৃণা, এই প্রথম হঠাৎ উপলব্ধি করতে লাগলাম আমার শরির পাল্টে যেতে লাগলো হাতের নখ ‘হিংস্র হয়ে গেল, গালের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, শরিরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে গেল, এর ভিতর কখন যে আমি অনিককে ‘খুন’ করে ফেলি জানিনা, তার ভিতর লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া থেকে সব ঘটে গেল আমার ক্রোধের ভিতর। কিন্তু যখন আমি স্বাভাবিক হয়ে গেলাম আমি বুঝতে পারি আমি ‘খুন’ করেছি কিন্তু আমার ভিতর সেই ‘খুনের’ জন্য কোন আপসোস কিংবা 'হীনমন্যতা নাই,..

কৈরভির ঘটনার পর থেকে আমি যখন উপলব্ধি করতে পারি কোন ‘শকুনের আঁচড় আমার শরীরে উপর পড়তে যাচ্ছে তখনি ‘খুন’ হয়।, হুম্ম,.. কেউ যদি সৃষ্টিকর্তার কাছে মন থেকে আর্জি করে পবিত্র থাকার, পৃথিবীর কোন শক্তি নাই যে তাকে অপবিত্র করে। 

 …একসময় নিরবি হাঁটতে হাঁটতে ষ্টেশনের শেষ প্রান্তে মিশে গেল ছায়ার মত। ইমরাজ ট্রেনে উঠে জানলার বাহিরে তাকিয়ে আছে লাল হেরিং বিভ্রান্তিতে—
রহস্যের জট ভাংতে এসে আরও রহস্য নিয়ে ফিরে যাচ্ছে …।