১.
আমার নাম মায়া বেগম (প্রিতু), নামটা নিজের পছন্দের না; মানুষের ভিড়ে মিশতে গেলে একটা পরিচয় লাগে, তাই নমিনেশন পেপারে এই নাম দিয়েছি। এককালে যারা আমাকে চিনত, তারা নাম দিয়েছিল "বনের বিবি"। এখন তারা কেউ বেঁচে নেই! যারা আছে, তারা ভাবে আমি বুড়িগঙ্গার ওপারের কোনো পতিত জমির দাবিদার।
সময়ের পরিবর্তন আর রূপান্তরিত বিশ্বাস ও ভয়ের ভিতর আমি মায়া আজো বেঁচে আছি; মানুষ আগে মৃত্যুকে যেমন ভয় পেত; আমাদেরই পেত, সেকালে তাদের সাথে যা ইচ্ছা তাই করতে পারতাম— জঙ্গল ঘন করা, পথ হারানো, গা ছমছম করা, একলা হলে পিছু নেয়া, গলা শুকিয়ে দেওয়া– হয়তো তাদের কাছে আমি মায়া! অলীক!
যা আছে কিন্তু নেই।
আমি বসে আছি মতিঝিলের এক পুরনো ভবনের সিঁড়ির নিচে, পরনে বেনারসী। হাতে একটা ফাইল, ফাইলের ভেতর দরখাস্ত। দরখাস্তের ভাষা বাংলা, কিন্তু ইংরেজি শব্দ আছে—"লিগ্যাল নোটিস", "রিট পিটিশন", "এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট"। এই শব্দগুলো আমার কাছে নতুন; সাতশো বছরের জীবনে কখনো এই ভাষায় কথা বলিনি।
যে জায়গাটার জন্য এই দরখাস্ত, তার নাম ছিল শালবন। মধুপুর গড়ের ভেতরে, শাল আর গজারি গাছের আড়ালে একটা টিলা, সেই টিলার নিচে একটা গুহা ছিল। গুহার ভেতর আমরা থাকতাম— আমি, আমার মা, আর আমার দাদি। আমরা জ্বিন না, মানুষও না; মানুষ আমাদের কী বলে তারাও নিজেরাও জানে না— কেউ বলে "পরি", কেউ বলে "ভূত", কেউ বলে "বনের খেচর অথবা ডাকিনী, প্রেত, ব্রহ্মদত্যি’’ ।
আমার দাদি বলতেন, "আমরা হলাম ‘পুরনো হাওয়া’। যে হাওয়া এখনো বইছে, কিন্তু মানুষ আর টের পায় না।"
সেই গুহাটার ওপর এখন রিসোর্ট হচ্ছে! নাম "শালবন ইকো রিট্রিট"; মালিক ঢাকার এক নামকরা ব্যবসায়ী, যার ছবি পত্রিকায় আসে, যাকে মানুষ "স্যার" বলে ডাকে। তার কোম্পানি বলছে, এটা হবে "দেশের সেরা ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন"। সুইমিং পুল থাকবে, ঝুলন্ত ব্রিজ থাকবে, বারবিকিউ কর্নার থাকবে; মানুষ কুড়মুড় করে বারবিকিউ খাবে।
তাও আমার মায়ের কবরের ওপর।
২.
আমাদের জাত কমতে কমতে এখন আটজনে ঠেকেছে। আটজন পুরনো হাওয়া; সবার অবস্থা খারাপ।
আমার চাচাতো বোন মালতি থাকে কমলাপুর রেলস্টেশনের পেছনে, আগে ওর কাজ ছিল পথিকদের পথ ভুলিয়ে দেওয়া; এখন ও স্টেশনের ফুটপাথে ভিক্ষা করে! বলে, মানুষ এখন গুগল ম্যাপ দেখে পথ চেনে; ওর ভুলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা ব্যর্থ হয় স্যাটেলাইটের কাছে!
আরেকজন আছে, নাম গাবু, ও নাকি এককালে গোটা গ্রামের মাঝরাতে ঘুম ভাঙিয়ে দিত শুধু একটা শিস দিয়ে; এখন ও গাজীপুরের পোশাক কারখানায় নাইট শিফটে কাজ করে। বলে, কারখানার সাইরেন ওর শিসের চেয়েও জোরে বাজে।
তার চেয়েও করুন অবস্থা রইসউদ্দিনের, ও মানুষের স্বপ্নে ঢুকে ভয় দেখাত! এখন ওর বাসা পুরান ঢাকার এক মেসে। ও বলে, মানুষ এখন নিজের স্বপ্নেই ভয় পায়— স্বপ্ন দেখে চাকরি হারানোর, কাউকে বিশ্বাস করে ধোঁকা খাওয়ার, ঋণের বোঝায় ডুবে যাওয়ার, মেয়ের জামাইয়ের দেনমোহরের, ছেলের ড্রাগস নেওয়ার। ওর আর কিছু করার থাকে না; মানুষ নিজেই নিজের যমদূত হয়ে গেছে।
আমি একমাত্র লেখাপড়া শিখেছি, কীভাবে শিখলাম? আমারা কিন্তু চাইলেও মানুষের মতো জেন্ডার বদলিয়ে “ট্রান্সজেন্ডা’র’’ হতে পারি না, কিন্তু ছোট হওয়া যায়; তাই আমি ছোট্ট শিশু সেজে এক মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে গেলাম, তিনি খুব বৃদ্ধ ছিলেন, চোখে কম দেখতেন। আমাকে মানুষ ভেবে কিতাব পড়াতেন। এতো ভালো মানুষ ছিলেন বলার বাহিরে, যদি মানুষ হবার সৌভাগ্য হত উনার মেয়ে হয়ে জন্মাতে চাইতাম!
ওহ! একটা কথা না বললে নয়; আমাদের মধ্যেও কিছু বজ্জাত ছিল যারা ছোট মেয়ে, ছেলেদের উত্যক্ত করতো, একটা সময় তাদের সবাইকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলার পর, ওদের আত্মা মানুষের জগতে আজো আছে ''বল'ৎকার আর ধর্ষ'ণ'' রূপে! এই রূপটা ভয় ও ঘৃণার, প্রাচীন ভয় থেকে এসব অমানুষের জন্য নাকি মানুষ এখন সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হতে ভয় পায়!
উস্তাদজী মারা যাওয়ার আগে বলেছিলেন, "মায়া, তুমি যা-ই হও, মানুষের চেয়ে কম নও। তোমার অধিকার আছে।"
সেই অধিকারের জন্যই আজ আমি এই ফাইল হাতে বসে আছি।
আর ভাবি, তিনি কতটা নীতিবান মানুষ হলে মানুষের বাহিরেও অধিকার নিয়ে চিন্তা করতে পারেন।
আর এই দেশের মানুষ অধিকার চিবানোর আগে তারা ভোট খায়।
আর দেশের অবস্থা বাহিরে বের হলে বুঝা যায়, মানুষের অভাব, দুর্দশা, ট্রাফিক জ্যাম, গাড়ির হর্ন, ধুলো, মানুষের ভিড়! সবাই ছুটছে.. কেন ছুটছে জানে না! শুধু ছুটছে..
হঠাৎ আমার খুব ইচ্ছে করল, এই পুরো রাস্তাটার ওপর এক ঝটকায় অন্ধকার নামিয়ে দিই। পুরনো দিনের মতো; আকাশ কালো করি। মানুষ থমকে দাঁড়াক! ভয়ে কাঁপুক!
কিন্তু অন্ধকার নামানোর কী মানে হয়?
এ শহরে অন্ধকার নামে রোজ— লোডশেডিং হলে। আর মানুষ তখন বিরক্ত হয়; মোমবাতি জ্বালায়। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়: "সরকারের কীর্তি।"
৩.
আজ সকালে গিয়েছিলাম পুরানা পল্টনের এক আইনজীবীর চেম্বারে। নাম ব্যারিস্টার কুতুব ভুঁইয়া, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। উনি জমিজমার মামলা করেন, ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে লড়েন; ওনার নাম ডাক শুনেছি।
চেম্বারে ঢুকতেই উনি বললেন, "বসুন। কী ব্যাপার?"
আমি ফাইলটা টেবিলে রাখলাম। বললাম, "স্যার, আমার জমি দখল হয়ে গেছে!"
উনি ফাইল খুললেন, পড়লেন; তারপর চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন, "আপনার দলিল কোথায়?"
"কোনো দলিল নাই।"
"মিউটেশন?"
"নাই।"
"খাজনার রশিদ?"
"নাই।"
"নামজারি?"
আমি চুপ করে রইলাম।
উনি ফাইল বন্ধ করলেন। "দেখুন, জমির মামলা করতে গেলে প্রমাণ লাগে আপনি ওই জমির মালিক, কিংবা আপনার পূর্বপুরুষের দখলে ছিল, আপনার কাছে কিছু না থাকলে আমি কিছুই করতে পারব না।"
আমি বললাম, "আমার মা সেখানে আছেন, এখন কবর।"
"কবরের কোনো রেকর্ড আছে?"
"রেকর্ড নাই, শুধু একটা শালগাছ ছিল, গাছটা কাটা পড়ছে গত সপ্তাহে।"
আইনজীবী মাথা নাড়লেন.. "গাছ তো সরকারি জমিতেও থাকতে পারে, সেটা প্রমাণ না।"
আমার খুব রাগ হলো! রাগ হলে আমার চোখের মণি লাল হয়ে যায়, গুহার অন্ধকারের মতো গাঢ় লাল। আমি তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নিলাম। বললাম, "তাহলে আমার মায়ের কবরের কোনো দাম নেই?"
আইনজীবী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, "দেখেন, আপা, আইনের চোখে আপনি যদি না থাকেন, আপনার মাও থাকেন না। এটা খুব নিষ্ঠুর সত্যি! কিন্তু সত্যি।"
৪.
সেদিন সন্ধ্যায় আমি গিয়েছিলাম কমলাপুর স্টেশনে। ভিড় ঠেলে মালতিকে খুঁজে বের করলাম; ও ফুটপাথে বসে ছিল, সামনে একটা ভিক্ষার বাটি। বাটিতে কিছু টাকা, আর একটা বাসি রুটি।
ওকে বললাম, "চল, শালবনে যাই.. শেষবারের মতো।"
মালতি বলল, "কেন? আর তো কিছু নেই সেখানে।"
"আছে, মায়ের কবরটা আছে; যতদিন না পুরো কংক্রিট ঢালছে, ততদিন আছে।"
আমরা দুজনে ট্রেনে উঠলাম.. জয়দেবপুর থেকে সিএনজি নিয়ে মধুপুরের দিকে। পথে কত গঞ্জ, কত বাজার; সব বদলে গেছে। যে পুকুরে আমরা স্নান করতাম, সেটা এখন ভরাট হয়ে মার্কেট হয়েছে। যে আমতলায় আমরা জমায়েত হতাম, সেখানে এখন পেট্রোল পাম্প।
সন্ধ্যার আগে আমরা পৌঁছলাম। শালবনের শেষ প্রান্তে, যেখানে বুলডোজারগুলো এখনো পুরোপুরি পৌঁছায়নি।
গাছের সংখ্যা কমে গেছে। কিন্তু এখনো কিছু শালগাছ দাঁড়িয়ে আছে, পুরনো সৈনিকের মতো। মাটি খোঁড়াখুড়ি হয়েছে, কিছু জায়গায় লাল মাটি উল্টে পড়ে আছে।
আর আমাদের গুহাটা?
বন্ধ! মুখটা বড় বড় পাথর দিয়ে চাপা দেওয়া। উপরে সাইনবোর্ড—"ভবিষ্যৎ রেস্টুরেন্টের স্থান"।
আমি পাথরের ওপর হাত রাখলাম, পাথর ঠান্ডা। ভেতর থেকে কোনো সাড়া নেই; আমার মা ভেতরে ঘুমিয়ে আছেন, ঘুম ভাঙানো যাবে না। কারণ তিনি এখন আর আমাদের জগতের নন! তিনি এখন মানুষের জগতের "অবৈধ দখলদার"।
মালতি কাঁদছিল; ওর কান্নার শব্দ বাতাসে মিশে গেল।
আমি কাঁদিনি, আমি জানি; কান্না মানুষের দুর্বলতা। আর আমি মানুষ নই।
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম। আরেকবার আইনজীবীর কাছে যাব, নতুন করে বলব; যদি না শোনে, তবে অন্য পথ দেখব। কারণ আমাদের একটা অস্ত্র আছে যা মানুষের নেই।
আমরা অপেক্ষা করতে জানি।
যেটা আমার লাভার-বয় শালিক জানে না- ও জানে আমি মানুষ, প্রিতু বলে ডাকে, সবসময় বলে, আমি নাকি একটু বেশিই রাত জাগি, একটু বেশিই চুপচাপ, আর আমার হাতের নখগুলো নাকি অন্যের সবার মতো না, একটু বেশিই ধারালো!
কিন্তু সে জানে না আমার চামড়ার নিচে আরেকটা তৃতীয় চোখ ঘুমিয়ে আছে, জাগলে বুঝতো, সাতশো বছরের পুরনো আগুন, যা মানুষ এখন “দুদিনের অবৈধ প্রেমের” ভিতর রাখে; যার স্থায়িত্ব শরীর পর্যন্ত।
তাই শালিকের অধৈর্যর কারণ আমি বুঝি! সুযোগ পেলে কাছে আসতে চায়, আমার ঠান্ডা শরীর, হাত রাখতেই চমকে উঠে; দূরে সরে যায়। মাঝে মাঝে সন্দেহ করে আমি মানুষ কিনা? কিন্তু ও জানে না আমার ভিতর সেরকম শারীরিক উত্তেজনা নাই, যা প্রকাশ্যে এলে মানুষ চক্ষুলজ্জার ভয় পায়।
আমার উত্তেজনা শুধু অবিশ্বাসের মধ্যে ভয় ঢুকানো। ভয়ই আমাদের শেষ সম্বল।
ঘটনা লম্বা, অন্য কোনো গল্পে বলবো “শালিকের কথা”।
৫.
পরের দিন সকালে আবার চেম্বারে গেলাম, এবার সঙ্গে আনলাম গাবুকে। ও কারখানার নাইট শিফট শেষ করে সোজা এসেছে; জামায় তেলের দাগ, চোখে ক্লান্তি।
আইনজীবী অবাক হলেন! "এঁকে আনলেন কেন?"
আমি বললাম, "উনি আমার সাক্ষী; উনি বলবেন, আমরা সেখানে ছিলাম।"
গাবু বলল, "জ্বি স্যার, আমি সেই টিলায় জন্মাইছি। আমার দাদি ওই গুহায় মানুষ খাইছিল! মানে, থাকত।"
আইনজীবী হাসলেন, "মানুষ খাইছিল?"
গাবু থতমত খেয়ে গেল! আমি তাড়াতাড়ি বললাম, "আমার চাচা মানে, রূপক অর্থে বলছে। আমরা ওখানকার আদিবাসী। আমাদের ভাষায় 'মানুষ খাওয়া' মানে নতুন মানুষকে আপন করে নেওয়া।"
আইনজীবী সন্দেহের চোখে তাকালেন! তারপর বললেন, "দেখুন, আপনাদের বিশ্বাস করতে আমার আপত্তি নেই; কিন্তু আদালতে প্রমাণ লাগবে। আপনাদের কোনো এনজিও আছে? কেউ আছেন যিনি বলবেন আপনারা ভূমিহীন আদিবাসী?"
এনজিও! এই শব্দটা শুনে আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো।
আমি বললাম, "আমি এনজিও খুলব।"
৬.
এনজিও খোলা সহজ না। কিন্তু অসম্ভব না! আমার সাতশো বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগল।
মানুষকে কীভাবে প্রভাবিত করতে হয়, আমি জানি। টাকা জোগাড় করতে গেলাম পুরান ঢাকার এক ধনী ব্যবসায়ীর কাছে। লোকটা সোনার দোকান চালায়, আর মনে মনে খুব ভীত। ওর দাদা নাকি একদিন রাতের বেলা শূন্য হাটে হারিয়ে গিয়েছিল। সেই গল্প ওর পরিবারে আজও কেউ ভোলে না।
আমি ওর দোকানে গেলাম, কিছু বললাম না। শুধু ওর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার চোখের রং বদলে গেল— গুহার অন্ধকারের মতো গাঢ় লাল।
ব্যবসায়ী কাঁপতে লাগল! বলল, "আপনি কে?"
আমি বললাম, "আমার নাম মায়া বেগম, আমি শালবনের শেষ মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করি। আপনি টাকা দিলে আমরা আইনি লড়াই করতে পারব। আর না দিলে... আপনার দাদার কথা মনে আছে?"
পরের দিনই ওর লায়ন মেম্বার চেক আমার এনজিওর অ্যাকাউন্টে জমা হলো।
এনজিওর নাম রাখলাম "শালবন অধিকার আন্দোলন"। ঠিকানা দিলাম মতিঝিলের সেই ভাঙা ভবনটা। রেজিস্ট্রেশন হলো।
এখন আমার কাছে একটা বৈধ প্রতিষ্ঠান আছে। আইনজীবী খুশি! বললেন, "এবার মামলা করা যাবে।"
কিন্তু আমি জানি, মামলা জেতা সহজ নয়। জিতলেও রিসোর্ট বন্ধ হবে না। কারণ যে ব্যবসায়ী রিসোর্ট বানাচ্ছে, প্রশাসন তার ইশারায় নাচে, তার টাকা আছে, লোক আছে, রাজনৈতিক শক্তি আছে। আর আমাদের আছে শুধু সাতশো বছরের স্মৃতি।
৭.
একদিন সন্ধ্যায় আমি বসে আছি ধানমন্ডির লেকের পাড়ে। পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে মানুষ-- কেউ কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে গান শুনছে, কেউ মোবাইলে কথা বলছে, কেউ জগিং করছে।
একটা মেয়ে আমার পাশে এসে বসল; বয়স চব্বিশ-পঁচিশ। পরনে সালোয়ার কামিজ, চোখে চশমা; ওর মুখটা খুব ক্লান্ত।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, "কী হয়েছে?"
মেয়েটা বলল, কিছু না! শুধু খুব একা লাগে.. সারাদিন অফিস করি, রাতে বাসায় ফিরে মোবাইল দেখি। কারও সঙ্গে কথা বলার নেই,, বাবা-মা গ্রামে, ভাই বিদেশে; বিয়ের কথা উঠলে সবাই শুধু পণ চায়। আমার চাকরিটাই আমার সব। কিন্তু সে চাকরিটাও নিরাপদ না! মনে হয়, কোনো অন্ধকার আমাকে গিলে খাচ্ছে।"
আমি ওর দিকে তাকালাম; ওর চোখের ভেতর সেই পরিচিত ভয় দেখলাম। সেই ভয় যা আমি সাতশো বছর ধরে চিনি। শুধু তখন মানুষ ভয় পেত পেঁচা, ভূতের, বনের অজানা শব্দের। এখন তারা ভয় পায় একাকিত্বের, ব্যর্থতার, বেকারত্বের, পণের, মোবাইল নোটিফিকেশনের।
আমি ওর হাত ধরলাম, আমার হাত ঠান্ডা। বললাম, "ভয় পেও না, তুমি একা না; এই শহরের আনাচেকানাচে আমরা আছি; যারা একা, তারাই জানে আমরা কারা।"
মেয়েটা বলল, "আপনি কে?"
আমি হাসলাম! "আমি মায়া, পুরনো হাওয়া! যা আছে কিন্তু নেই।"
মেয়েটা উঠে চলে গেল.. কিন্তু যাওয়ার আগে ওর মুখে একটু শান্তি দেখলাম।
হঠাৎ আমি বুঝতে পারলাম, আমাদের যুদ্ধ শুধু জমির জন্য না। আমাদের যুদ্ধ এই নতুন মানুষের জন্যও। যারা নিজেদের ভেতরের অন্ধকার চেনে না, কিন্তু সেই অন্ধকারেই ডুবে যাচ্ছে।
আমাদেরও যদিও ভয় দেখানোর ক্ষমতা আর বাঘের মতো দাঁত কাজ করছে না— যে ভয় দেখিয়ে আমরা পৈশাচিকভাবে হাসতাম, সে হাসি এখন মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া ট্রোলিং আর বুলিং করে হাসে, আর কেউ সম্মান হারানোর ভয়ে ঘরের ফ্যানে ঝুলে, এটাই আধুনিকতা এখন, যেখানে ইএমআই-র বকেয়া ভয়কে ভূতের চেয়েও বেশি পাত্তা দেয়।
আর আমাদের ছায়া টিকে থাকে ভিন্ন নয়তো অন্য রূপে।
আমি বুঝলাম, আমরা হারাইনি। আমরা শুধু রূপ বদলেছি।
৮.
রিট পিটিশন আদালতে গৃহীত হয়েছে; শুনানি হবে আগামী মাসে; আমি জানি জিতব না! কিন্তু হারাটাও একটা জায়গা দখল করা। কারণ মানুষ দেখবে, আমরা ছিলাম, লড়েছি! আমাদের নাম ইতিহাসের পাতায় থাকবে।
আর তার চেয়ে বড় কথা, আমি নতুন এক পথ খুঁজে পেয়েছি।
রিসোর্ট হবেই, গুহা ধ্বংস হবে! মায়ের কবর চাপা পড়বে কংক্রিটের নিচে।
কিন্তু আমি থাকব! আমরা থাকব!
এখন থেকে আমরা আর জঙ্গলে থাকব না। আমরা থাকব মানুষের ভেতরে উদ্বেগ হয়ে। যে ছেলে রাত জেগে ফেসবুক স্ক্রল করে আর ভাবে তার জীবনের কোনো মানে নেই, আমি তার পাশে থাকব। যে মেয়ে অফিসের বসের বেড টাচের ভয়ে আর অপমানে কাঁদে কিন্তু কাউকে বলতে পারে না, আমি তার বালিশের নিচে থাকব।
যে বৃদ্ধ তার ছেলের বিয়ের পর ফোনের অপেক্ষায় দিন গোনে, আমি তার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকব। যে মেয়ে বেডরুমে পুরুষের উপর বিশ্বাস হারিয়ে, আবার কাউকে বিশ্বাস করতে ভয় পায়, আমি তার ভাঙা আস্থায় থাকব।। যে মানুষটা ভার্চুয়াল জগতে ঢুকে ভিড়ের মধ্যে থেকেও একা লাগে—আমি তার চারপাশের শূন্যতায় থাকব।
আমাদের নতুন নাম হবে নিঃসঙ্গতা!
আর এই নিঃসঙ্গতার কোনো আদালত নেই! কোনো পিটিশন হয় না; কোনো রিট কাজ করে না।
এটাই আমাদের প্রতিশোধ! এটাই আমাদের টিকে থাকা।
কারণ, এখানকার মাটি, নদী, বর্ষা, আর শহরের গলিঘুঁজিতে প্রাচীন ভূতের ভয় বিশ্বাস-অবিশ্বাস থাকলেও সৌন্দর্য ছিল, কিন্তু বর্তমানে আধুনিকতার যে সংঘাত, তা ইউরোপ-আমেরিকার গথিক ফ্যান্টাসির চেয়েও বেশি উদ্বেগ আর ভয়ের।
৯.
কাল শুনানি! আমি আদালতে যাব; আমার পরনে সাদা সালোয়ার কামিজ, মাথায় ওড়না, হাতে ফাইল। দেখতে একদম সাধারণ নারী। যে নারী তার জমির জন্য লড়ছে।
কেউ জানবে না আমি সাতশো বছরের পুরনো হাওয়া।
বিচারক যখন প্রশ্ন করবেন, আমি উত্তর দেব। যখন বলবেন "মামলা খারিজ", আমি মাথা নিচু করব। যখন সাংবাদিকরা ছবি তুলবে, আমি মুখ লুকাব।
তারপর আমি ফিরে আসব মতিঝিলের সেই ভাঙা ভবনে। সিঁড়ির নিচে বসে চা খাব; আর অপেক্ষা করব পরবর্তী মানুষের জন্য, যে তার নিঃসঙ্গতা বুঝতে পারবে না, কিন্তু আমার স্পর্শ চিনবে।
কারণ আমি মায়া বেগম (প্রিতু)।
আমি অলীক! যা আছে কিন্তু নেই।
আর এখন থেকে আমি সবার।

0 Comments: