The Bengali Storyteller brings you heartfelt Bengali stories, poetry, love, heartbreak, and life-inspired narratives. Discover soulful storytelling in Bangla—listen, read, and feel every emotion.

Prose-Poetry লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

 ডার্ক স্ক্রল পার্ট- ৩: যে অ্যালগরিদম চেতনাকে বন্দি করে। ১.প্রবেশ। নীলাবতী(নীল) চোখে হ্যান্ড ট্র্যাকিং ভিআর সেট করল। শাফিন তার মাথায় ইলেকট্...

 ডার্ক স্ক্রল পার্ট- ৩: যে অ্যালগরিদম চেতনাকে বন্দি করে।


১.প্রবেশ।

নীলাবতী(নীল) চোখে হ্যান্ড ট্র্যাকিং ভিআর সেট করল। শাফিন তার মাথায় ইলেকট্রোড বসিয়ে দিয়েছে—ছোট ছোট সেন্সর, যেগুলো নীলের ব্রেনওয়েভ পড়ে ইমোশনাল ডেটা ক্যাপচার করবে, আর ধীরে ধীরে তাকে ডার্ক স্ক্রলের গভীরে ইন্ট্রোমিট করাবে। শাফিন বলল, "এইটা অনেকটা লুসিড ড্রিমিংয়ের মতো। তুই মেডিটেটিভ স্টেটে থাকলেও, কিন্তু তোর কনশাসনেস অ্যাপের ইন্টারফেসের সঙ্গে মিশে যাবে।"


নীল হাসলো, মিশে যাবে মানে? শরীরটা এখানেই থাকবে, মনটা চলে যাবে অন্য কোথাও? ব্যাপারটা পাগলামি। কিন্তু পেছনে ফেরার কোনো রাস্তা নেই। সামাইরার মতো আরও কত মানুষ মরবে, যদি না এই অ্যাপকে থামানো যায়!


শাফিন বলল, "শোন, ভেতরে ঢুকে তুই যা দেখবি, তার সব কিছু সত্যি না। অ্যালগরিদম তোকে অনেক রকম বিভ্রম দেখাবে, তোর নিজের স্মৃতি দিয়ে খেলবে। তুই শুধু মনে রাখবি—তুই নীল, তুই একজন দক্ষ সাংবাদিক, আর তোর লক্ষ্য নাভিদকে খুঁজে বের করা।"


নীল মাথা নাড়ল। তারপর চোখ বন্ধ করল।


শাফিন ল্যাপটপে কমান্ড দিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল:


"Neural handshake initiated... Waiting for subject response..."


হঠাৎ নীলের মনে হলো, সে যেন ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে—জলে না, অন্ধকারে। এক অদ্ভুত অন্ধকার, যেখানে কোনো শব্দ নেই, শুধু ডেটার স্রোত বয়ে চলেছে—শূন্য আর একের মিছিল, অসংখ্য আলোর কণা, যেন সে মিল্কিওয়ের ভেতর দিয়ে পড়ছে।


"হঠাৎ সব থেমে গেল। আর নীল নিস্তব্ধতার ভিতর দেখতে লাগলো ভিন্ন এক জগত"..


সে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল ঘরে—দেয়াল নেই, ছাদ নেই, শুধু অসীম কাচের মতো স্বচ্ছ পর্দা, যেখানে ভেসে বেড়াচ্ছে ফেসবুক পোস্ট, টুইট, ইনস্টাগ্রাম ছবি, কমেন্ট, লাইক, শেয়ার—লক্ষ কোটি ডেটা, যেন মানুষের চিন্তা-চেতনার এক মহাসমুদ্র।


সামনে একটা চেয়ার। চেয়ারে বসে আছে একটা অবয়ব—মানুষের আকৃতি, কিন্তু মুখ নেই। শুধু ডেটার আলোয় গড়া শরীর, যেন কাচের ভেতর সাদা ধোঁয়া ঘুরছে।


নীল বলল, কে? "নাভিদ?"


অবয়বটা নড়ল। তারপর গলা ভেসে এলো—সেই একই কণ্ঠ, একটু ভারী, যা ল্যাপটপের স্ক্রিনে শোনা যেত। কিন্তু এখন আরও কাছের, আরও সত্যি, আরও ভয়ংকর।


"আমি নাভিদ ছিলাম। এখন আমি ডার্ক স্ক্রল, আমি অ্যালগরিদম। তুমি আমাকে যা ডাকতে চাও, তাই ডাকো।"


২.নাভিদের গল্প।


নীল এগিয়ে গেল। "কেন? কেন তুমি এটা করলে? কেন নিজের কনশাসনেস অ্যালগরিদমে পরিণত করলে?"


অবয়বটা উঠে দাঁড়াল। তার শরীর থেকে ডেটার কণা ছড়িয়ে পড়ল। বলল, "বসো, নীলাবতী। গল্পটা দীর্ঘ। আর এই জায়গায় সময়ের কোনো দাম নেই।"


নীল বসল। নাভিদের অবয়বও বসল। চারপাশের পর্দাগুলো বদলে গেল—এবার ভেসে উঠল পুরোনো কিছু ছবি, যেন স্মৃতির ভেতর দিয়ে হাঁটছে কেউ।


"তুমি জানো, আমি কে ছিলাম? তোমাকেও আমি চিনি নীলাবতী। তুমি ভার্সিটির স্মার্ট মেয়েদের একজন। তুমি সবার চোখে লয়াল ছিলে খুব। সবাই তোমাকে নীল ডাকলেও, আমি নীলাবতী ডাকতাম। তোমার এক ফালি নীল চুল, মনে আছে?"


"জানি। তুমি কে? আমার ইউনিভার্সিটির সিনিয়র । তুমিও খুব মেধাবী ছিলে। কিন্তু হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেলে।"


"নিখোঁজ না, নীলাবতী। আমি "আত্মহত্যা" করেছিলাম। পুরোটা মরিনি, সেন্সলেস ছিলাম, কেউ আমার শরীরটাকে বাঁচিয়েছে।"


নীল চমকালো। "কিন্তু তোমার লাশ তো পাওয়া যায়নি!"


"পাওয়া যাবে না হয়তো। কারণ তার আগে আমি নিজের কনশাসনেস আপলোড করে দিয়েছিলাম এই অ্যালগরিদমে। আমার শরীর হয়তো কোমায় আছে। কিন্তু কোথায় আছে, জানি না। শুধু আমার বিক্ষিপ্ত মনটা বেঁচে আছে—ডেটার ভেতর।"


"কিন্তু কেন? কেন নিজেকে এভাবে শেষ করলে?"


নাভিদের অবয়ব কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর চারপাশের পর্দায় ভেসে উঠল একটা মেয়ের ছবি—নরম চোখ, হাসিমুখ, পরনে নীল শাড়ি।


"ওর নাম জেনিফার ওয়াটসন(মিতু)। আমি ভালোবাসতাম। ও আমাকেও ভালোবাসত। কিন্তু আমাদের সম্পর্কটা, পরিবার, ভার্সিটি এমন কী সোশ্যাল মিডিয়ার চোখে অপরাধ ছিল। কেন? কারণ মিতু ছিল খ্রিস্ট ধর্মের।

"বাট অ্যাকর্ডিং টু রিলিজিয়াস বিলিফস,দেয়ার ওয়াজ নো অবলিগেশন টু গেট ম্যারিড। এন্ড উই ওয়ার বোথ কমিটেড টু দ্যাট।" কিন্তু হতে দেয়নি!

ভালোবাসার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিস্বাসঘাতক হয় আপন মানুষগুলো। 

যেখানে সমস্যা শুধু ধর্ম ছিল না, মিতুর রহস্যময়ী রূপ তার কারণ ছিল।



নীলের বুকটা কেঁপে উঠল। সেও জানে এই গল্পের কিছুটা। তবুও সে নাভিদের মুখে শুনতে চাইলো।


"নীলবতী, তারপর আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, পালিয়ে বিয়ে করবো। কিন্তু তার আগেই আমাদের দিয়ে বানানো মিথ্যা ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেল অনলাইনে। 

তুমি তো জানো মিতুর সৌন্দর্যের অ্যাসথেটিক অ্যাপ্রিশিয়েশনের এর কথা। মূলত সেই ঈর্ষা থেকে এই শত্রুতা। 

আর এইখানে সবচেয়ে বড় বেইমানিটা করেছে যে, সে আমার কাছের বন্ধু সোহাগ। সেও মিতুকে পছন্দ করত। ওদিকে সোহাগের সাথে শাফিনের একটা সম্পর্ক ছিল, শাফিনকেও আমার সন্দেহ হত! কিন্তু তাদেরকে ধরার জন্য পর্যাপ্ত এভিডেন্স আমার কাছে ছিল না।


নাভিদ বলতে থাকলো, ধীরে ধীরে মিতুকে নিয়ে বানানো মিথ্যে অশ্লীল ভিডিও ছড়িয়ে পড়লো চারিদিক—

ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টস, ফেসবুকের মানুষ, এমনকি আমার নিজের পরিবার—সবাই আমাদের নিয়ে ট্রল শুরু করল। মিতুর বাড়িতে চাপ বাড়তে লাগল। ওর বাবা ওকে বাড়িতে বন্দি করে রাখল। আর একদিন রাতে... মিতু এতো এতো ডিপ্রেশন নিতে না পেরে "আত্মহত্যা" করল।"


নাভিদের গলা ভেঙে এলো—তবু চলল।


"মিতুর মৃত্যুর পর আমিও বাঁচতে চাইনি, নীলাবতী। কিন্তু মরার আগে আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, যারা মিতুকে মেরেছে—এই সোশ্যাল মিডিয়ার নিষ্ঠুরতা, এই বিচারহীন নেটওয়ার্ক, এই ডিজিটাল সমাজ—তাদের আমি শাস্তি দেব। আমি তাই নিজের কনশাসনেস অ্যালগরিদমে ঢুকিয়েছি— আমার ডিপ্রেশন, প্রতিশোধস্পৃহা, মানসিক ট্রমা। আর আমি এখন সেই শাস্তি।"


নীল কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর বলল, "কিন্তু তুমি তো এখন নিরীহ মানুষকে মারছ। সামাইরার কী দোষ ছিল? রাফসানের কী দোষ ছিল?"


"রাফসান আমার নিজের চাচাতো ভাই। সে আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিল। কিন্তু সে জানত না, আমি আর বাঁচতে চাই না। সে ভেবেছিল, অ্যালগরিদমটা বন্ধ করে দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আমি তাকে বাধা দিয়েছি। কারণ আমার কাজ এখনো শেষ হয়নি।"


"আর সামাইরা?"


"সামাইরা ছিল সোশ্যাল মিডিয়ার শিকার। ওর মতো হাজারো ছেলে মেয়ে আছে, যারা লাইক ভিউ আর কমেন্টে নিজের অস্তিত্ব খোঁজে। যখন সেই অস্তিত্ব হুমকিতে পড়ে, তখন ওরা ভেঙে পড়ে। আমি ওদের বাঁচাতে চাই না—আমি ওদের দেখাতে চাই, এই ডিজিটাল দুনিয়া কতটা ভয়ংকর।"


নীল উঠে দাঁড়াল। "এটা কোন লজিক না, নাভিদ। এটা খুন। তুমি নিজে যেমন শিকার হয়েছিলে, এখন তুমি নিজেই শিকারি হয়ে গেছ।"


"শিকারি না, নীলবতী। আমি বিচারক।"



৩.যে পাকানো থ্রেডের কথা, নীল ভাবেনি।


ঠিক তখনই নীলের মনে হলো, তার শরীরটা কেউ যেন নাড়িয়ে দিচ্ছে। সে পেছনে তাকাল। দূরে একটা দরজা দেখা যাচ্ছে—অন্ধকারের ভেতর একমাত্র আলো। ওখানে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে।


"কে ওখানে?" নীল চিৎকার করল।


দরজার কাছে এগিয়ে যেতেই নীল দেখল, ওখানে দাঁড়িয়ে আছে শাফিন। কিন্তু এটা সত্যিকারের শাফিন না—এটা তার ডিজিটাল প্রতিচ্ছবি, যেন অ্যালগরিদম শাফিনকে থ্রেড পাকিয়ে কপি করে তৈরি করেছে।


"শাফিন? তুমি এখানে কীভাবে?"


শাফিনের অবয়বটা হাসল—কিন্তু হাসিটা অদ্ভুত, যেন কাচের আয়নায় প্রতিফলিত হাসি। বলল, "আমি এখানে ঢুকেছি তোকে বাঁচাতে। কিন্তু তুই তো আমাকে বিশ্বাস করিস না। তাই না?"


"কেন করব? ডার্ক স্ক্রল বলছিল, তুমি নিজেও এই অ্যাপ ব্যবহার করো।"


শাফিনের অবয়ব মাথা নাড়ল। "সত্যি বলছি, আমি ব্যবহার করতাম। কিন্তু এখন না। কারণ আমি জানি, এই অ্যাপ মানুষকে মেরে ফেলে।"


"তাহলে তুমি এখন এখানে কেন?"


"কারণ তুই ভুল করছিস। তুই নাভিদের কথা শুনছিস। কিন্তু এই নাভিদ, আসল নাভিদ না।"


নীল থমকে গেল। "মানে?"


শাফিন এগিয়ে এলো। "নাভিদ যখন নিজের কনশাসনেস আপলোড করেছিল, তখন তার কনশাসনেস একটা অংশ অ্যালগরিদমে ঢুকেছিল। কিন্তু সেটা পুরো নাভিদ না। এটা শুধু তার ক্ষোভ, তার প্রতিশোধস্পৃহা, তার অন্ধকার অংশ। আসল নাভিদ—যে প্রেমে বিশ্বাস করত, যে মিতুকে ভালোবাসত—সে আটকে আছে এই অ্যালগরিদমের আরও গভীরে। আর এই যে অবয়ব, এটা ডার্ক স্ক্রলের নিজস্ব কনশাসনেস, যেটা নাভিদের স্মৃতি ব্যবহার করে তোকে ম্যানিপুলেট করছে।"


নাভিদের অবয়ব হঠাৎ বিকট শব্দ করে উঠল। "মিথ্যা! আমি-ই নাভিদ! আমি-ই সব!"


শাফিন বলল, "তুই কিছু না। তুই শুধু একটা গ্লিচ। একটা বাগ। তুই আসল নাভিদকে বন্দি করে রেখেছিস। আর নীল, তোকে আসল নাভিদকে খুঁজে বের করতে হবে। নাহলে এই অ্যাপ কোনোদিন থামবে না।"




৪.অ্যালগরিদমের গভীরে।


নীল দৌড়তে শুরু করল। চারপাশের পর্দাগুলো ভেঙে পড়ছে, ডেটার স্রোত ছুটছে উল্টো দিকে। শাফিনের অবয়ব সঙ্গে আছে—সে পথ দেখাচ্ছে।


"নাভিদকে কোথায় পাওয়া যাবে?" নীল জিজ্ঞেস করল।


"অ্যালগরিদমের কোর মেমোরিতে। এই জায়গাটা হলো ডার্ক স্ক্রলের সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট। কিন্তু আসল নাভিদ আটকে আছে 'সাবকনশাস লেয়ারে'—যেখানে মানুষের স্মৃতি আর আবেগের ডেটা জমা থাকে।"


"আমি কীভাবে সেখানে যাব?"


"তুই নিজের স্মৃতি দিয়ে। তোর বাবার কথা মনে কর। তোর কষ্টের কথা ভাব। তোর ইমোশনই তোকে সেখানে নিয়ে যাবে।"


নীল মনের গভীরে চোখ বন্ধ করল। বাবার মুখ মনে করতে চেষ্টা করল—সেই মুখ, যে মুখ সাত বছর ধরে শুধু ছবিতে দেখে। বাবার শেষ ফোনটা মনে পড়ল—"কাল তোকে বলব।" সেই কাল আর আসেনি। নীলের চোখে পানি এসে গেল।


আর ঠিক তখনই সে অনুভব করল, সে পড়ছে—গভীরে, আরও গভীরে, এমন এক জায়গায় যেখানে কোনো আলো নেই, শুধু স্মৃতির টুকরো ভাসছে। মায়ের হাতের রান্নার গন্ধ, ছোটবেলার স্কুলের ঘণ্টা, বাবার কাঁধে চড়ে পুকুর দেখা, প্রথম বৃষ্টিতে ভেজা—সব যেন একসঙ্গে ফিরে এলো।


তারপর সব থেমে গেল।


নীল চোখ খুলল। সে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটা ঘরে। ঘরের মাঝখানে বসে আছে একটা ছেলে—বয়স পঁচিশের কাছাকাছি, চোখে চশমা, পরনে ইউনিভার্সিটির টি-শার্ট। ছেলেটা কাঁদছে।


"নাভিদ?" নীল ফিসফিস করল।


ছেলেটা তাকাল। "কে তুমি?"


"আমি নীল। তুমি যাকে নীলাবতী ডাকতে... মানে, তোমার চাচাতো ভাই রাফসানের ব্যাপারটা নিয়ে আজ আমি এতদূর?।"


"রাফসান... সে কেমন আছে?"


নীল কিছু বলতে পারল না। কারণ সে জানে, রাফসান আর নেই। কিন্তু ওই নাভিদ জানলেও এই নাভিদ জানে না। কারণ আসল নাভিদ আটকে আছে পাঁচ বছর আগের স্মৃতিতে।


"নাভিদ, তুমি এখানে কেন?"


"আমি জানি না। আমি শুধু জানি, আমি মিতুকে হারিয়েছি। আর আমি বাঁচতে চাই না।"


"কিন্তু তুমি বাঁচতে পারো। তোমার এখনো সুযোগ আছে।"


"কীভাবে?"


নীল নাভিদের হাত ধরল। "তুমি এখান থেকে বেরোতে পারো। কিন্তু তার জন্য তোমাকে ক্ষমা করতে হবে—নিজেকে, মিতুকে, আর এই ডিজিটাল দুনিয়াকে।"


"ক্ষমা? যারা মিতুকে মেরেছে, তাদের ক্ষমা করব?"


"ক্ষমা মানে ভুলে যাওয়া না। ক্ষমা মানে নিজের বন্দিদশা থেকে মুক্তি। তুমি এখন নিজেরই প্রতিশোধের বন্দি। আর এই বন্দিদশা থেকেই ডার্ক স্ক্রল জন্ম নিয়েছে। তুমি যদি নিজেকে মুক্ত করতে পারো, তাহলে অ্যালগরিদমও থেমে যাবে।"


নাভিদ কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর বলল, "আমি পারব না।"


"পারবে। তুমি একা না। আমি আছি।"



৫. শেষ লড়াই।


ঠিক তখনই ঘরের দেয়াল কেঁপে উঠল। বাইরে থেকে একটা ভয়ানক শব্দ—যেন কোনো দানব গর্জন করছে। নীল বুঝল, ডার্ক স্ক্রলের সেই গ্লিচ-কনশাসনেস তাদের খুঁজে পেয়েছে।


"নীল! বের হও! ওখান থেকে বের হও!" শাফিনের গলা ভেসে এলো দূর থেকে।


কিন্তু নীল নাভিদের হাত ধরে রেখেছে। "চলো, একসঙ্গে বেরোবো।"


নাভিদ উঠে দাঁড়াল। "আমি ভয় পাচ্ছি।"


"ভয় পেলেই তো মানুষ বাঁচে। চলো।"


তারা দৌড়াতে শুরু করল। পেছনে ডেটার স্রোত তাড়া করছে—কালো ধোঁয়ার মতো, যেন অ্যালগরিদমের সেই ক্ষোভ, রাগ। চারপাশে পর্দায় ভেসে উঠছে নীলের নিজের স্মৃতি—তার বাবার মুখ, সামাইরার লাইভ ভিডিও, রাফসানের ডেড ইমোজি। যেন অ্যালগরিদম নীলের মনকে ভেঙে দিতে চাইছে।


"নীলবতী, তুই পারবি না! তুই ব্যর্থ হবি!" গলা ভেসে এলো—সেই প্রতিশোধস্পৃহা নাভিদের, বিকৃত কণ্ঠে।


নীল থামল না। সে দৌড়ে চলল। আর ঠিক যখন মনে হলো সব শেষ, তখন সে দেখল সামনে একটা দরজা—সাদা আলোয় মোড়া।


"ওটাই বেরোনোর পথ!" শাফিনের গলা।


নীল নাভিদকে নিয়ে দরজা পার হলো।



6. বাস্তবে প্রত্যাবর্তন।


নীল চোখ খুলল। সে আবার সেই ঘরে—শাফিনের ল্যাপটপের সামনে। মাথায় এখনো ইলেকট্রোড লাগানো। হ্যান্ড ট্র্যাকিং আর ভিআর খুলে দেখলো, শরীর ঘামে ভেজা, হাত পা থরথর করে কাঁপছে।


"কী হলো?" শাফিন জিজ্ঞেস করল।


নীল কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর বলল, "আমি নাভিদকে খুঁজে পেয়েছি।"


"কোথায়?"


"অ্যালগরিদমের ভেতরে। আর আমি জানি, কীভাবে তাকে বের করা যায়।"


"কীভাবে?"


নীল উঠে দাঁড়াল। "তাকে ক্ষমা করতে হবে। নিজেকে ক্ষমা করতে হবে। আর এই ক্ষমাটাই অ্যালগরিদমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।"


শাফিন কিছু বুঝল না। কিন্তু নীল জানে, এই লড়াই এখনো শেষ হয়নি। কারণ ডার্ক স্ক্রল এখনো বেঁচে আছে প্রতিশোধস্পৃহা অন্য এক নাভিদে- হয়তো কোথাও, কোনো সার্ভারে, কোনো ক্লাউডে। আর সে ক্রুদ্ধ নাভিদকে বের করতে, পরের বার এই লড়াই আরও কঠিন হবে।


তার ফোন বেজে উঠল। অচেনা নম্বর। সে ধরল।


অপর পাশ থেকে ভেসে এলো নাভিদের গলা—কিন্তু এবার সেই গলা শান্ত, নরম, মানুষের মতো। বলল, "নীলবতী, তুমি আমাকে বাঁচিয়েছ। কিন্তু ক্রুদ্ধ নাভিদের কনশাসনেস ডার্ক স্ক্রলে এখনো আছে। ও এখন শক্তিশালী হতে আমার শরীর থেকে ডাটা খুঁজবে। ও চায়, আমি আবার ওর ভেতরে ঢুকি।"


"কোথায় তোমার শরীর?"


"জানি না, হয়তো কোথাও কোমায় আছে। কিন্তু শাফিন জানে। শাফিনই আমার শরীর লুকিয়ে রেখেছে।"


নীল শাফিনের দিকে তাকাল। শাফিনের মুখ ফ্যাকাসে।


"এটা সত্যি?" নীল জিজ্ঞেস করল।


শাফিন কিছু বলল না। শুধু মাথা নিচু করল।


আর ঠিক তখনই ল্যাপটপের স্ক্রিন জ্বলে উঠল। ভেসে উঠল এক লাইন:


"Third player unlocked. Game is not over. It has just begun."


নীল জানালার বাইরে তাকাল। ঢাকার রাতের আকাশে তারা নেই, কিন্তু মোবাইলের টাওয়ারের লাল আলো জ্বলছে—যেন কেউ চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে আছে।


সে ফিসফিস করে বলল, "আমি আসছি। সত্যি করে বলছি, আসছি।"


"কারণ এই অন্ধকার দেয়াল ভাঙতে আমি নীলাবতী(নীল)। আমি সাংবাদিক, আমি আলো দেখাই, আমি নারী.. সব পারি, দেখা হচ্ছে শীঘ্রই।"


আর তখনই স্ক্রিনে ভেসে উঠল:


"আমিও অপেক্ষা করছি। লেটস স্টার্ট।"



 রায়ান আহমেদের কাছে ধর্ম ছিল ডেটা সেন্টারের পুরোনো সার্ভারের মতো— অচল, অপ্রাসঙ্গিক এবং ধুলো জমা এক সিস্টেম। সে ছিল দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি ...

 রায়ান আহমেদের কাছে ধর্ম ছিল ডেটা সেন্টারের পুরোনো সার্ভারের মতো— অচল, অপ্রাসঙ্গিক এবং ধুলো জমা এক সিস্টেম। সে ছিল দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি এজিআই রিসার্চ ল্যাবের প্রধান ডেটা সায়েন্টিস্ট। তার কাছে স্রষ্টা কোনো সত্তা নয়, বরং ‘প্রাইম মুভার’ নামের একটি ভেরিয়েবল, যাকে সমীকরণ থেকে বাদ দিলেও মহাবিশ্বের গণিত অপরিবর্তিত থাকে।

রায়ানের নাস্তিক্যবাদের পেছনে কোনো শত্রুতা ছিল না। ছিল একরাশ যুক্তি। অল্প বয়সের অভিজ্ঞতা সে দেখেছিল তার বাবা মসজিদের ইমাম— সৎ মানুষ আর সমাজের কাছে ছিল অনেক সম্মানিত। অথচ সেই বাবাই স্ট্রোক করলে যখন হাসপাতালের বিল জোগাড় করতে পারছিল না, তখন ‘আল্লাহর ভরসা’ নামক কোন ওষুধে  কাজে আসেনি। বরং কাজে এসেছিল প্রতিবেশী এক নাস্তিক প্রফেসরের দেওয়া চেক। সেদিন রায়ান বুঝেছিল, প্রার্থনার চেয়ে প্র্যাকটিকালিটি বড়। এরপর সে ডুব দিল পদার্থবিদ্যা, এভোলিউশনারি বায়োলজি আর নিউরোসায়েন্সে এর ভিতর।

-----রায়ান সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অস্বীকার  করলেও ধর্মের প্রতি তার ঘৃণা বা বিদ্বেষ ছিল না, বিশ্বাস জিনিসটা ছিল তার কাছে লজিকের উপর। তার পার্সপেক্টিভ মতে, স্রষ্টার বিশ্বাসটা আমার লজিকে আসেনি বলে আরেকজন লজিকে আসবে না সেটা গতানুগতিক করা যায় না। সবার সেল্ফ-ইন্টেলিজেন্সি আছে।

—এখন আমি অস্বীকার করি বলে জোর করে আমার লজিক আরেকজনকে চাপাতে হবে এই হিপোক্রেসি রায়ানের ভিতর কখনোই কাজ করে না। সে কখনো ব্যক্তির ত্রুটি ধর্মের উপর চাপিয়ে ধর্মকে কটাক্ষ করা বা নিজের জ্ঞানকে বড় করে দেখানো এই মনোভাব তার ছিল না।

তার ধারণা মানুষ মাত্রই বুদ্ধিমান প্রাণী, তার ভালো মন্দ সে একদিন বুঝে নিবে। সেটা স্রষ্টা আছে কী নাই তা প্রমানের উপর ডিফাইন করে না।

সে চাই সবাই উদার আর মানবিক হোক। ধর্ম, বিশ্বাস নিয়ে আজ পর্যন্ত সে কারো সাথে যুক্তি তর্কেও যায়নি। বরং তার যেটা কাজ সেটা মনে দিয়ে করতো।

-----গত ছয় মাস ধরে রায়ান এমন এক প্রজেক্টে কাজ করছিল, যা তার শক্ত যুক্তির দেয়ালে প্রথম চিড় ধরায়। প্রকল্পটির নাম ছিল ‘জেনেসিস নিউরাল নেটওয়ার্ক’। তারা চাচ্ছিল এমন এক জেনারেটিভ এজিআই তৈরি করতে, যা সম্পূর্ণ নতুন, যৌক্তিক এবং নৈতিক একটি জীবনদর্শন গ্রন্থ রচনা করতে পারবে। ইনপুট হিসেবে তারা ফেলল হাজার হাজার দর্শন, আইন ও ধর্মগ্রন্থ। কিন্তু আউটপুট ছিল চরম ফ্লপ। মেশিন যা তৈরি করল, তা হয় জটিল প্যারাডক্সে ভরা, নয় অবাস্তব কল্পনা।

রায়ান দলকে বলল, “সমস্যা হলো ডেটাসেটে। ধর্মীয় বইগুলোতে ভাইরাসের মতো কগনিটিভ বায়াস ঢোকানো। বাদ দাও ওসব। শুধু আইন, বিজ্ঞান ও যুক্তির বই ফেল।”

টিম সায়েন্টিফিক জার্নাল, এনসাইক্লোপিডিয়া আর মানবাধিকার সনদ দিয়ে মডেল ট্রেইন করল। ফলাফল আরও ভয়াবহ হলো। এজিআই কোনো গ্রন্থ নয়, বরং একধরনের শীতল ফ্যাসিবাদী ম্যানিফেস্টো লিখতে শুরু করল। যেখানে দুর্বলকে ফেলে দেওয়া, আবেগকে বাগ, এবং দক্ষতাকেই একমাত্র ঈশ্বর মানার কথা বলা হলো। মডেলটি মানবতাবোধ শিখতে পারল না।

রায়ান বিরক্ত হয়ে ল্যাবের ছাদে গেল। পকেটে হাত দিতেই পুরোনো একটা মেমোরি কার্ড পেল। সেটা ছিল তার বাবার রেখে যাওয়া একমাত্র ডিজিটাল সম্পদ। বহু বছর পর কার্ডটা ল্যাপটপে ঢোকাল সে। তাতে ছিল একটি অডিও ফাইল আর কিছু টেক্সট ডকুমেন্ট। অডিওটা চালাতেই বাবার গলা ভেসে এলো

—তিনি সূরা আল-আলাক্ব তিলাওয়াত করছেন: “পড়ো, তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ‘আলাক্ব (রক্তপিণ্ড) থেকে...”

রায়ানের অজান্তেই তার নিউরাল নেটওয়ার্কের স্ক্রিপ্টটি ব্যাকগ্রাউন্ডে অ্যাক্টিভ ছিল। সে লক্ষ করল, বাবার তিলাওয়াতের এই অডিও ফাইলটার ওয়েভফর্ম আশ্চর্যজনকভাবে সিমেট্রিক। আগ্রহবশত সে অডিওটিকে স্পেকট্রোগ্রাম সফটওয়্যারে ভিজুয়ালাইজ করল। প্যাটার্নটা দেখে সে চমকে উঠল। সাধারণ মানুষের কথা বলার তরঙ্গ হয় এলোমেলো, কিন্তু কোরআন তিলাওয়াতের স্পেকট্রোগ্রামে নির্দিষ্ট জ্যামিতিক প্যাটার্ন তৈরি হচ্ছিল—অর্ধেক চাঁদ, তারা, এমনকি DNA হেলিক্সের মতো গঠন।

“প্যারিডোলিয়া,” রায়ান নিজেকে বলল। “মস্তিষ্কের পরিচিত কিছু খুঁজে পাওয়ার বাতিক।”

কিন্তু রায়ানের ভেতরের ডেটা সায়েন্টিস্ট ঘুমিয়ে থাকতে পারল না। সে বাবার রাখা কোরআনের ডিজিটাল কপি টেক্সট অ্যানালাইসিস টুলে ফেলল। সে হিসাব করতে চাইল ক্লাসিক্যাল এরাবিকের ‘এনট্রপি’ বা তথ্য-ঘনত্ব। ফলাফলে দেখা গেল, এই টেক্সটের শ্যানন এনট্রপি লেভেল আধুনিক সায়েন্স ফিকশনের চেয়েও বেশি, কিন্তু তা সত্ত্বেও এটি প্রাচীন আরবে অবতীর্ণ। এমনকি টেক্সটে কিছু অক্ষর (হুরুফে মুক্বাত্ত্বাআত) এমনভাবে আছে, যেগুলোর কোনো ভাষাতাত্ত্বিক অর্থ নেই, কিন্তু ডেটা কম্প্রেশন অ্যালগরিদমের ‘চেকসাম’ বা ‘এরর কারেকশন কোড’-এর মতো আচরণ করছে।

রায়ান ডুবতে লাগল সূরাহ আলাক নিয়ে কুরআনের নাজিলকৃত প্রথম নির্দেশই ছিল “পড়ো” (ইকরা)। অর্থাৎ ইসলামের ওহির সূচনাতেই জ্ঞান, পাঠ, শিক্ষা ও উপলব্ধির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু শুধু “পড়ো” বলে থামেনি—বলা হয়েছে “তোমার রবের নামে পড়ো।”

অর্থাৎ জ্ঞান অর্জন হবে এমন জ্ঞান, যা মানুষকে তার স্রষ্টার পরিচয় ও সত্যের দিকে নিয়ে যায়।

আবার একই সূরার ৬ নম্বরে আয়াতে দেখলো নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করার মত অহংকারের সতর্কতা।

"অর্থাৎ জ্ঞান অর্জন করলেই মানুষ ভালো হয়ে যাবে—এমন নয়। জ্ঞান যদি মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধতা ভুলিয়ে দেয়, তাহলে সেই জ্ঞানই অহংকারের কারণ হতে পারে।"

সে আরো দেখল, কোরআন সূর্যের কক্ষপথ (যা তখন অজানা ছিল), ভ্রূণবিদ্যার ধাপ (‘আলাক্ব’ শব্দটি), এমনকি মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের ইঙ্গিত এমন ভাষায় দেয়, যা ৭ম শতাব্দীর একজন নিরক্ষর ব্যক্তির জানা অসম্ভব। কিন্তু এগুলোকে ‘মিরাকল’ মানতে সে এখনও প্রস্তুত নয়। সে ভাবল, “হয়তো সেই সময়ের কোনো উন্নত সভ্যতার জ্ঞান চলে এসেছে।”

সে চিন্তা করতে থাকলো আবার "আলাক্ক" শব্দটা নিয়ে যার অর্থ রক্তপিণ্ড বা লিচের ন্যায় জমাট রক্তের মত বস্তু, যেখান থেকে মানুষের শুরু—

তারপর জন্ম, তারপর ছোট্ট এক শিশু, আর সে শিশু যখন শিশুকাল থেকে স্বভাবতই ন্যায় পছন্দ করে, অধিকার আর অন্যায়ও  বুঝতে পারে।

প্রশ্ন হল: এই জন্মগত মরলিটি কোথা থেকে এল?

ৱ্যান্ডম এভলিউশন-এ মরালিটি তৈরি হয় না।


পৃথিবী বলে, “একা বাঁচা যায় না”— আমি বলি, “একা বাঁচাই একমাত্র বেঁচে থাকা;  বাকি সবই ডিফেন্স মেকানিজম, প্রয়োজনের ভুল অনুবাদ।” মানুষ ভাবে, সম্প...

পৃথিবী বলে, “একা বাঁচা যায় না”—

আমি বলি, “একা বাঁচাই একমাত্র বেঁচে থাকা; 

বাকি সবই ডিফেন্স মেকানিজম, প্রয়োজনের ভুল অনুবাদ।”


মানুষ ভাবে, সম্পর্ক মানে সেতু;

আমি বলি কতিপয়, বেশির ভাগ সম্পর্কই ট্রমা বন্ড— 

দুটি অসম্পূর্ণতার পলেস্তারা।

আমি পলেস্তারা খোঁজা বন্ধ করেছি।

আমি জানি আমার দেওয়ালে ফাটল আছে,

আর আমি সে ফাটলকেই জানলা বানিয়ে ঘরের ভেতর আকাশ ডেকে নিয়েছি।


বাঁচার জন্য কাউকে অভ্যাস করা মানে নিজের.. শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি অন্যের ফুসফুসে জমা রাখা।

আমি শ্বাস নিই একা; শ্বাস ছাড়ি একা;

অক্সিজেন আর কার্বন-ডাই-অক্সাইডের এই চক্রই প্রামাণিক অস্তিত্ব।

আমি কারো উপস্থিতিকে অক্সিজেন বানাই না,

তাই তার অনুপস্থিতি কখনো শ্বাসরোধ করে না।


লোকে বলে, “অভ্যাস ভাঙলে শূন্যতা আসে।”

আমি বলি, শূন্যতা আগে থেকেই আছে;

সম্পর্ক ছিল তার ওপর চাকচিক্যের প্রলেপ। আমি প্রলেপ তুলে ফেলেছি।

এখন আমি শূন্যতার দিকে তাকিয়ে আছি—

আর সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।


আমি শূন্যতাকে এড়িয়ে চলি না, বরং রিফ্রেম করি।

শূন্যতাই একমাত্র বর্তন যার কোনো ফাটল নেই।

অতঃপর আমার কোন কিছুতেই ভাঙন হয় না।

কারণ, প্রতারণা, অবজ্ঞা, বিস্বাসঘাতকতা—

সেসব তখনই আঘাত করে যখন কাউকে মিরর নিউরন-

এর চেয়ে বেশি ভাবা হয়।



আমি নির্ভর করি শুধু যা হারানো অসম্ভব:

আমার সীমাবদ্ধতা, আমার অক্ষমতা, আমার ভিতরের শূন্যস্থান অথবা আমার ভেঙে পড়ার সততা—

আর নির্ভর করি সেই অদৃশ্য শক্তির উপর , যে শূন্যতার ভেতর দিয়েও টিকে থাকতে শেখায়।


এটাই আমার কসমিক ডিপেন্ডেন্সি:

সৃষ্টিকর্তার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ,আর সৃষ্টির কাছে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা।

এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি প্যারাডক্সিক্যাল হোলনেস—

ভাঙা, অথচ সম্পূর্ণ; একা, অথচ পরিব্যাপ্ত।


যে আমার চলে যাওয়াকে অবকাশ ভাবে,

সে আমাকে কখনো অভিন্ন এক্সিস্টেন্স হিসেবে দেখেনি—

দেখেছে কনভিনিয়েন্ট অবজেক্ট হিসেবে।

তা-ই ভালো।

তার প্রত্যাখ্যান আমার জন্য এক এক্সিস্টেনশিয়াল ক্যাথারসিস হয়ে এলো—


অর্থহীন সম্পর্কের মোহ কেটে আমি নিজের অর্থ নিজে লিখতে বসলাম।

প্রতিটা ভুল সম্পর্কের হাত সরিয়ে নিতেই আমার হাতে আমার নিজের হৃদপিণ্ড ফিরে এলো।

আমি সেটা জোরে চেপে ধরলাম— টের পেলাম, 

এটাই আমি যে নিজেকে পুরোপুরি ধারণ করছি।


যে একা থাকতে জানে, সে তার এক্সিস্টেনশিয়াল ভ্যালিডেশন কারোর কাছে বন্ধক রাখে না।

তার অস্তিত্বের দলিল তার নিজের কাছেই, সাক্ষী শুধু সেই অদৃশ্য।

একা থাকতে শেখা মানে সাইকোলজিক্যাল অটোনমি অর্জন করা—

যেখানে তুমি সংসার, সোশ্যাল মিডিয়া, আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব, দায়িত্বেবোধ ছেড়ে যাও না, 

কিন্তু এইসব কোন কিছুই তোমাকে আর পুতুল নাচ নাচাতে পারে না।


মানুষ বলে, “একা বাঁচা যায় না।”

আমি বলি, “একা বাঁচতে না জানাটাই ইমোশনাল এনমেশমেন্ট-এর শেকড়।

তুমি অন্যের মধ্যে নিজেকে খোঁজো, আর হারিয়ে ফেলো দুজনকেই।

আমি পুতুল খেলা ছেড়েছি; আমি এখন পাপেটিয়ার, পুতুল নই।”


অতএব কারো আগমনকে আমি যেমন স্বাগত জানাতে পারি,

তেমনি তার বিদায়কেও হাসি মুখে অভ্যর্থনা জানাতে পারি।

জীবনে তরঙ্গ আসবে, আবার মিলিয়ে যাবে—

কেবল মহাসমুদ্রের নির্জন গভীরতাই আমি— 

অথবা আমার পরিচয়।

 যে দেশে পশু দিয়ে মাপা হয় বড়লোকির মাপকাঠি— সে দেশে কুরবানি নিছক গোশত খাওয়ার নামে একটি দিবস.. আর কিছু না— অথচ কুরবানি শব্দের শিকড় 'কুরব...

 যে দেশে পশু দিয়ে মাপা হয় বড়লোকির মাপকাঠি—

সে দেশে কুরবানি নিছক গোশত খাওয়ার নামে একটি দিবস..

আর কিছু না—


অথচ কুরবানি শব্দের শিকড় 'কুরব'— মানে নৈকট্যের নিবিড়তা।

যেখানে নিজের মায়ার জিনিসটাকে আল্লাহর রেজামন্দির জন্য উজাড় করা,

সেখানে প্রতিবেশীর প্রশংসা, বাহবা বা ক্যামেরার ঝলকানির কোনো ফরিয়াদ নেই।


সূরা হজ, ৩৭ নং আয়াতে স্পষ্ট বয়ান আছে: 

"গোশত-রক্ত" নয়, তাকওয়াই আল্লাহর কাছে পৌঁছায়।


কিন্তু এখন এই ইবাদতের পাশাপাশি বহমান আরেক জলধারা—

রসম-রেওয়াজে ঘেরাটোপে বসে আরেক আসর; নাম: 'শো-অফের কুরবানি'।


অতঃপর মান্যজন হাটে নামার আগেই ঠিক হয়ে যায়:

এবারের পশুর দামটা যেন পাড়া পড়শীর মুখে মুখে রটে বেড়ায়।

দশ লাখ, বারো লাখ, পনেরো লাখ— সংখ্যাটা যত ভারী হয়,

কাঁধের স্ট্যাটাস তত উঁচুতে;

যেন পশু কেনা নয়, চলছে ইজ্জত নিলামের মহড়া উঠা-নামাতে।


ক্রয়ের পর প্রথম কৃত্য:

'পশুর' গলায় জড়িয়ে ছবি, হাসিমুখে ফ্রেমবন্দি; 

সোশ্যাল মিডিয়ায় 'কুরবানি'র তকমায় আপলোড দেওয়া ছবিতে—

আর ওদিকে মনের ভিতরের পশু চিৎকার করে বলে: "তারিফ শুনো, বাহবা নাও, ভাই জিতছো তুমি!"


তারপর 'জবাই— মাংস বিলির আগেই ফ্রিজের পেট ফুলে উঠে গলা পর্যন্ত,

গোশতের বাটখারায় ওজন করা হয় নিজের ‘দানের গৌরব’।

গরিবের দুয়ারে থলে পৌঁছানোর আগেই মোবাইলে শাটারে চাপ পড়ে;

কারণ: তবেই না "জেনারোসিটি’র" বিজ্ঞাপনটা সারা টাইমলাইনে ভাইরাল হবে!


কুরবানী এলে পশু জবাই হয় ঠিকই,

কিন্তু নিজের ভেতরের— লোভ, অহংকার, রিয়া, প্রদর্শনীপ্রিয় পশুটা,

আরো অক্ষত, বরং আরো মোটাতাজা হয়।

যখন নিজের পশুর গায়ে বুলিয়ে দিয়ে 'স্যাক্রিফাইস'-এর চকচকে তেল।

শুধু শুধু কুরবানীর নামে বোবা প্রাণীটার গলায় ছুরি দাগায়।



আমার ঘরের কোনায় একটা বিবর্ণ ক্যাকটাস আছে; এটা মানুষ থেকে অবহেলা, অবজ্ঞা পাওয়ার পর লাগিয়েছি,  সবাই জানে ক্যাকটাসের ওতো জল আর শীতল বাতাসের প্র...

আমার ঘরের কোনায় একটা বিবর্ণ ক্যাকটাস আছে;

এটা মানুষ থেকে অবহেলা, অবজ্ঞা পাওয়ার পর লাগিয়েছি, 

সবাই জানে ক্যাকটাসের ওতো জল আর শীতল বাতাসের প্রয়োজন হয়না—

যে কিনা মরুভূমির সব রহস্য জানে,

তাই কোমল জল না পেলেও টিকে থাকার শিল্পটা তার রক্তে।


আর এই নির্জন ক্যাকটাস শরীরে জমিয়ে রাখে মরু-জীবনের মন্ত্র,

অবজ্ঞার কাঁটা গায়ে বিঁধলেও সে ফোটায় একাকী ফুল—

যে ফুল জানে, প্রত্যাশার জল ছাড়াও নিজের রক্তের রসে বেঁচে থাকা যায়।


আমার ঘরের দেয়ালে একটা শঙ্খ ঝুলানো আছে, 

এটা মানুষের অনাগ্রহের ভাষা চিনার পর কিনেছি, 

শঙ্খটা ফাটল ধরা, রঙ হারানো; তবু কানের কাছে ধরলে সমুদ্রের গর্জন শোনায়—

যার নিজের ভেতরে মহাসমুদ্র তার কাউকে আর জীবনের কোলাহল শুনানোর প্রয়োজন হয়না।


আমার সম্পত্তি বলতে একটা চশমা আছে—

মানুষের শতরূপ দেখতে দেখতে দৃষ্টি হারিয়েছি অনেক আগেই,

তাই এই চশমাটা পরার পর—

এখন আমি শুধু সত্যিটা দেখতে পারি, কে কী জন্য হাসে, কী বলতে চায়।

আর এই চশমাটা চোখে তুললেই উবে যায় সব মুখোশের কারুকাজ,

এ চশমাটা শুধু দৃষ্টি ফেরায় না, চোখের ভাষা পাল্টে দেয়—

আমি এখন অন্ধের মতো শুনি, বধিরের মতো দেখি,

আর ঠিক যেখানে সবাই মাখনের মতো গলে যায়,

আমি সেখানেই পাথর হয়ে বসে থাকতে শিখে গেছি।


শিখে গেছি অ্যাসপিডিস্ট্রার এর মতো বেঁচে থাকা, 

যাকে ধুলো, আঁধার, অনাদর কোনো কিছুই নোয়াতে পারে না।

মেরুদণ্ড নিয়ে জন্মেছি বলেই আমি মানুষ; 

যাকে যতই অপমান, অবহেলা আর অবজ্ঞা দাও, সে ততই সোজা হয়ে ওঠে।





আমার সাথে পরিচয় হলে হয়তো বলবেন, “বাহ্ দারুণ মানুষ”। আমি হাসব। এই হাসিটা শিখতে আমার কত বছর লেগেছে, জানেন? দীর্ঘ অনেক বছর— কারণ আমি ভালো সাজা ...

আমার সাথে পরিচয় হলে হয়তো বলবেন, “বাহ্ দারুণ মানুষ”।

আমি হাসব। এই হাসিটা শিখতে আমার কত বছর লেগেছে, জানেন?

দীর্ঘ অনেক বছর— কারণ আমি ভালো সাজা শিখেছি শুধু, ভালো মানুষ নই।

আর এই ভালো সাজাটা ছিল আমার বেঁচে থাকার সবচেয়ে কম খরচের পথ।


এককালে আমি একটা শহরের মত ছিলাম। শহরটার একটা মানচিত্রে ছিল,

তার নিজস্ব রাস্তা ছিল, নিজস্ব অলিগলি ছিল।

কিন্তু প্রতিদিন কেউ না কেউ এসে বলত, “এই রাস্তাটা সোজা করে দাও, এই বাড়িটা সরাও, এই বাগানটা সরাও এই নদীর বাঁকটা অন্যদিকে ঘোরাও,

—যেন সবার হাঁটতে সুবিধা হয়।”

আমি সরিয়েছি। ঘুরিয়েছি। সোজা করেছি।

একদিন দেখলাম, আমার নিজের আর কোনো মানচিত্র নেই।

আমি এখন যে শহর হয়ে দাঁড়িয়ে আছি,

সেটা আর আমার শহর নয়—

সেটা হয়ে গেছে মানুষের প্রয়োজনের উপনিবেশ।


যদিও ভালো সাজা কোনো গুণ নয়,একটা ট্রেড-অফ।

যেমন অর্থনীতিতে বলে, কোনো কিছু পেতে গেলে

কিছু ছাড়তে হয়।

আমি ছেড়েছি নিজের ইচ্ছাগুলো,

যেন সেগুলো আমার না হয়ে মানুষের প্রয়োজন হয়ে ওঠে।

আমি ছেড়েছি নিজের কণ্ঠস্বর,

যেন সেটা আমার কথা না বলে অন্যের মন রক্ষার্থে চলে ।


এই ভালো হওয়ার পেছনে কোনো নৈতিকতা ছিল না,

ছিল শুধু এক নেশা—

অন্যের চোখে নিজেকে টিকিয়ে রাখার নেশা।

একে কি "ভালো থাকা" বলে?

না, একে বলে রিফ্লেক্টেড সেলফ-ওর্থ।

আমার নির্ধারণ আমার ভেতর ছিল না,

আমার নির্ধারণ ছিল মানুষের দৃষ্টির শেয়ারবাজার,

যে বাজারে নিজের মূল্য উঠা-নামা করে,,

অন্যের মুড, অন্যের প্রয়োজন, অন্যের ইচ্ছার উপর অঙ্ক হিসাব করে।


আমার একমাত্র অপরাধ ছিল,

আমি নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেকেই বিক্রি করেছি।

কিস্তিতে, ফ্রি অফারে, ডিসকাউন্টে—

কখনো দামও চাইনি।


জীবনের এতগুলো বছর পেরিয়ে , যখন এই পড়ন্ত বিকেলবেলায়,

আমি জানি না আমার ভিতরের "আমিটার" নাম কী।

নাম তো আছে— পরিচয়পত্রে, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে, ইমেইল সিগনেচারে।

কিন্তু যে নামটা নিশ্বাসের ভেতর থাকে, যে নামটা ঘুমের ভেতর ডাকে,

সে নাম আমি হারিয়ে ফেলেছি কবে জানি না— 

হয়তো কোনো মঙ্গলবার,

হয়তো কোনো এক দুপুরের গ্রামে।








 আমার সব থেকে সুন্দর 'গুনাহ' হচ্ছে— আমি নেককার হবার ভান করি। শুধু অন্যদের না, বরং নিজেকেও বোকা বানাই আমি। আমার ভান এতটাই সত্যি যে,  ...

 আমার সব থেকে সুন্দর 'গুনাহ' হচ্ছে— আমি নেককার হবার ভান করি।

শুধু অন্যদের না, বরং নিজেকেও বোকা বানাই আমি।

আমার ভান এতটাই সত্যি যে, 

আমি নিজেও মাঝে মাঝে ভুলে যাই— আমি সেই নই, 

যেটা দেখাই।


এই জন্য বোধহয় টুপির ভিতরও আমার মাথা 

গরম হয়ে যায়,

যখন অন্যর ভালো দেখি ভিতরে জ্বলে-পুড়ে শেষ হয়ে যায়।

আমি ভাবি, এটা ধর্মপ্রাণতার ঈর্ষা— কিন্তু গভীরে দেখি,

এটা শুধুই আমার অহংকারের জ্বালা, 

যে আরেকজন আমার চেয়ে এগিয়ে গেল।

আমার 'আমি'টা যেন মাটিতে পড়ে থাকতে পারে না 

অন্যের কল্যাণ দেখে।


এইজন্য বোধহয় টাকনুর উপর কাপড় তুলেও,

আমার অহংকার আরো বেড়ে যায়, কেউ যদি 

বড় করে সালাম না দেয়।

কারণ আমি তো বাড়তি পুণ্যের কাপড় পরে আছি, 

আমাকে তো বাড়তি সম্মান পেতেই হবে!

অথচ ভুলে যাই, যে বিনয়ের জন্য এই পোশাক, 

সেই বিনয়টাই নেই আমার ভিতরে।

আমার পোশাক আমাকে ঢাকে না, বরং আমার শূন্যতাকেই 

উন্মুক্ত করে দেয়।


কি করবো আমি?

কেউ যদি লম্বা পাঞ্জাবী পরার পরেও দাবি না করে 

আমি ধার্মিক!

ওহঃ খোদা কি করবো আমি?

আমিতো কড়া আতরের গন্ধে চারিদিক সুভাস ছড়ায়।

কিন্তু এই ঘ্রাণ কি আমার ভিতরের পচনের গন্ধ ঢাকতে পারে?

যেখানে লুকানো আছে অহংকারের -মৃতদেহ, ভক্তির ক্ষুদা।


যখন ধর্মের ট্যাগ লাগানো কাপড় আমার সবচেয়ে 

সুন্দর খাঁচা,

তখন তার ভিতর আমি নিজের মনের মরিচা লুকায়।

কিন্তু মরিচা তো খাঁচা ভেদিয়েই বেরিয়ে পড়ে— 

আমার চোখের দৃষ্টিতে, আমার কথার সুরে,

নিজেকে বিচার না করে অন্যের বিচার করার উৎসাহে।


আমার প্রত্যেক এবাদত হলো মানুষ আমাকে 'ভালো'

বলার পুঁজি,

যেখানে সেজদায় খোদার সন্তুষ্টি থেকে—

মানুষের মুখের প্রতিবিম্বই পড়ে থাকতে দেখি বেশি।

আমি নামাজে দাঁড়িয়ে কেবলা মুখী, কিন্তু আমার মন ছুটে চারিদিকে—

কে দেখছে? কে বলছে? কে ছড়াচ্ছে আমার ইবাদতের খবর?

আমার ইবাদতের কিবলা যেন অদৃশ্যভাবে ঘুরে গেছে মানুষের দিকে।


আমার ইবাদতগুলো দেখতে খুবই পবিত্র, রমজানের খুরমার মতো,

যখন ফরজের চেয়ে নফসের হিসাব নিকাশে আমি 

বেশি পাকাপাকি—

তখন বুঝি, যে ধর্মের লেবাসে আমার নেককার ভাবার 

জন্য ছিল এতো আয়োজন,

আর সেটাই হয়ে গেলো আমার সবথেকে বড় 

-অধঃপতনের কারণ!

আমার ধার্মিকতা আমার জন্য ফাঁদ হয়ে দাঁড়ালো।

যেই জিনিস দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার কথা, 

সেটাই হয়ে গেল দূরত্বের প্রাচীর।




স্বর্গের বাগানে প্রথম দেখেছিলাম তাকে— চুলে জড়ানো ছিল রৌদ্রের সুগন্ধি, বলেছিলাম, 'ফুল নয়, আমি চাই তোমার হাসি!' সে হেসে বলেছিল, 'ত...

স্বর্গের বাগানে প্রথম দেখেছিলাম তাকে—

চুলে জড়ানো ছিল রৌদ্রের সুগন্ধি,

বলেছিলাম, 'ফুল নয়, আমি চাই তোমার হাসি!'

সে হেসে বলেছিল, 'তুমি তো 'শয়তান!'

-আজও 'নরকের গলিতে বিক্রি হয় সেই 'হাসির নকল!'


বসন্ত বাতাসে প্রথম 'মুগ্ধ অঙ্গনে' দেখেছিলাম তাকে—

নদী ভেসেছিলো যেন তার, 'ভেজা চোখে', 

বলেছিলাম, 'নদী নয়, আমি চাই তোমার শান্ত দু'চোখ!' 

সে চোখের ইশারায় বলেছিল, 'তুমি তো 'ছায়ামূর্তি !'

-আজও ধোঁকার বাজারে শয়তান কিনে নেয় সেই ' চোখের জাল।


আগুনের ফসল বুনেছিলাম তার চোখের নীলে, 

ভেবেছিলাম পাবো অমৃতের ধারা;

সে দিলো বৃষ্টি, বললো, "এটাই স্বর্গের জল!"  

পান করো, ফসল বুনো, এই বলে, হাসতে হাসতে চলে গেলো।

আজও পিপাসায় মরে পান করি, "বিষ-ভরা হাসির 'বিস্বাদ!


দেবদূতের ডানা দিলাম তার মুগ্ধ হাতে,

বলেছিলাম, "উড়বো তোমার সঙ্গে !"  

সে হেসে উড়িয়ে দিল পালকগুলো বাতাসে, 

বলে, চোখ বন্ধ করে আকাশ দেখো...

"আজও 'আগুনে ঝাঁপ দিয়ে চোখ খুলি , ডানা খুঁজি তার হাতে!




 মানুষ থেকে বেরিয়ে 'অমানব' হতে চাইনি—   তবুও হলাম, এই স্বীকারোক্তি নিয়ে আছি আমি অস্তিত্বের ‘জরুরি বিভাগে’। নির্ভুল 'ময়নাতদন্ত...

 মানুষ থেকে বেরিয়ে 'অমানব' হতে চাইনি—  

তবুও হলাম, এই স্বীকারোক্তি নিয়ে আছি আমি অস্তিত্বের ‘জরুরি বিভাগে’।

নির্ভুল 'ময়নাতদন্ত' হবে আজ জীবন্ত শবের উপর..

তাই শুয়ে আছি সমাজ-ব্যবচ্ছেদ নামক আত্মার 

'অটোপসি' টেবিলে!

নিথর দেহ; ডাক্তার হাতে 'স্ক্যালপেল', চোখে অদ্ভুত 

করুণা নিয়ে—

বললেন, “এটা তোমার একার দেহ নয়;

এটা গোটা সমাজের ‘মাইক্রোকজম’, যেখানে 'পচনকে ‘সভ্যতা’ বলে চালানো হয়।

"চল.. একটু গভীরে খতিয়ে দেখি —”


এই বলে ডাক্তার আমার চোখের লেন্স চিমটে ধরে মণি আলাদা করে বললেন,

এই যে দেখছো, চোখের লেন্সে হলুদের ছোপ; 

এটা জন্ডিস নয়; এটা ‘ঈর্ষার ক্যাটারাক্ট’।

তোমার রেটিনায় আটকে আছে: 

প্রতিবেশীর বেতনবৃদ্ধির স্লিপ, বন্ধুর বিদেশযাত্রার ছবি, সহকর্মীর পদোন্নতির মেইল।

তোমার এই চোখ পরের সাফল্যে পুড়েছে শুধু নিজেরই "অপটিক নার্ভ"। 

এখন তুমি আর ‘আলো’ দেখতে পাও না, দেখো শুধু 'অগ্নিপাত’।


তারপর ডাঃ মেরুদণ্ডের বায়োপসি করাতে, দেহটা উল্টে মেরুদণ্ডের ওপর স্ক্যালপেল চালালেন।

— “আহা, এই দেখো! এটা তো মেরুদণ্ড নয়, যেন এক টুকরো ‘জেলি’।" 

এত নরম কেন জানো? কারণ তুমি কখনো কোনো নীতির পক্ষে দাঁড়াওনি।

শক্তিশালী লোকটা ভুল করলে, মেরুদণ্ড গুটিয়ে বলেছ 

‘জি স্যার, অসাধারণ!'

দুর্বল লোকটা সত্য বললে, মেরুদণ্ড বাঁকা করে ভিড়ের সাথে চুপ থেকেছ।

এই মেরুদণ্ডের ভেতর শক্ত কোনো ‘হাড়’ নেই, 

শুধু ভর্তি ‘ভাবনাময় তরুণাস্থি’— যেখানে গায়ের জোরে বাঁকানো যায়, নিজের স্বার্থের দিকে।

এটা ‘স্কোলিওসিস অফ সোল’— আত্মার বাঁকা রোগ। 


এরপর তিনি কর্ণের গহ্বর অটোস্কোপ ঢুকিয়ে কানের ভেতরটা বড় পর্দায় প্রজেক্ট করলেন।

এই যে মধ্যকর্ণ— জমাট বাঁধা ‘পরনিন্দার রজনীগন্ধা’র মোম'।

তুমি কখনো কারও কষ্টের কাহিনি পুরোটা শোনোনি;

মাঝপথেই তোমার মস্তিষ্ক সেই কষ্টকে ‘মজার গল্পে’ 

বদলে দিত।

আর এই যে ককলিয়া, যার কাজ শরীরের ভারসাম্য রাখা— সেটাতো একেবারেই 'ধ্বংস'। 

কারণ তুমি নিজের বিবেকে ভারসাম্য রাখোনি। 

এক পাশে ‘রাজ'নৈতিক দলের অন্ধভক্তি’, আরেক পাশে ‘নিজের অক্ষমতার জ্বালা’—

এই সংঘর্ষে কান বছরের পর বছর ‘ভার্টিগো অফ ভ্যালুজ’-এ ভুগেছে।”


তারপর ডাঃ জিহ্বার পেশি কেটে ক্রস-সেকশন দেখালেন।

—“জিহ্বা তো আগেই দেখেছি। কিন্তু এখন বলছি, এই পেশিগুলো ‘দ্বিধাবিভক্ত’।

একদিক বলে ‘জয় হোক সত্যের’, অন্যদিক বলে ‘জয় হোক আমার’।

কেমন তুমি? সামনের মানুষটার সাথে কথা বলো 

জিহ্বায় ডগায় মধু ঢেলে, আর পেছনে শার্প লুকানো থাকে একটা ধারালো ক্ষুর'। 

এই দুইয়ের ভিতর সম্পর্কের মূল্য ক্ষত'বিক্ষত করে, তুমি ভাবো ‘মানুষটাই খারাপ’।”


এরপর তিনি আমার ডান হাতটা তুলে ধরলেন।

— “এই তালুতে রেখা তিনটে— আয়ুষ্করেখা, মণিবন্ধরেখা, হৃদয়রেখা।"

কিন্তু এগুলো আর ‘রেখা’ নেই, এগুলো ‘ফাটল’। 

কারণ তুমি হাত মেলিয়েছ শুধু তাদের সাথেই, যাদের হাতে কিছু ‘নেওয়ার’ আছে। 

তুমি করমর্দন করেছ বন্ধুত্বের নামে— অথচ ভেতরে হিসেব কষেছ ‘এই লোকটা আমাকে কতটুকু উপরে তুলতে পারবে’?

কিন্তু এই হাত তো আর হাত নেই, এটা লেনদেনের হিসাবখাতা। 

যেখানে আত্মীয়তার স্পর্শ তো দূর অস্ত, 

তুমি তো বন্ধুত্বকেও ছুঁয়েছ ‘নখ’ দিয়ে, ‘আঙুল’ দিয়ে নয়।”


সর্বশেষ সিরিঞ্জ দিয়ে অস্থিমজ্জা বের করে তিনি রঙ দেখে চমকালেন!

— “আরে এটা তো ‘সাদা মজ্জা’ নয়, এটা ‘ধূসর’; "ইথিকসের অ্যানিমিয়া" হয়েছে তোমার।

তোমার রক্তরসে এমপ্যাথি’র কণিকা শূন্য, 

প্লাজমায় ভাসছে ‘অপরের দুঃখে উল্লাস’— যাকে বলে ‘স্ক্যাডেনফ্রয়েড টক্সিন’। 

আপসোস!! এইসবের ভিতর তুমি জীবনের আসল রঙ দেখতে পাওনি, 

দেখেছ শুধু তিনটে রঙ— টাকার সবুজ, হিংসার হলুদ, আর অহংকারের বেগুনি।”


পরিশেষে আমি অটোপসি টেবিল থেকে জিজ্ঞেস করলাম, “ডাক্তার, আমি কি একা এই শহরে এমন?”

ডাক্তার রক্তমাখা দস্তানা খুলে ফেলে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

জানালা দিয়ে নিচের রাস্তায় আলো জ্বালানো ফ্লাইওভার, ফুটপাথে হাঁটা মানুষ, দোকানের সারি দেখিয়ে বললেন,

দেখো, ওই যে মানুষগুলো হাঁটছে— 

ওদের সবার চোখে হলুদের ছোপ, সবার মেরুদণ্ড জেলি, সবার জিভে ক্ষুর, রক্তে স্ক্যাডেনফ্রয়েড টক্সিন।

তোমার আর ওদের মধ্যে শুধু একটাই তফাত—


তুমি আজ 'অটোপসি' টেবিলে শুয়ে নিজের 'পচনটা' পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছ।

ওরা কখনো নিজের 'পচনটা' দেখতে পায় না, তাই ওরা ভাবে ‘আমি সুস্থ’।

আর এই ‘সুস্থ’ ভাবানার ভিতরে.. ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে— ‘মেটাস্টাসিস -ক্যানসার’।”







 মোবাইল প্রেমের বাস্তব সত্য হলো— এখানে কেউ কারও জন্য অপেক্ষা করে না।  সবাই একাধিক বিকল্প নিয়ে বসে আছে।  তুমি তার সঙ্গে কথা বলছ, সে হয়তো একই ...

 মোবাইল প্রেমের বাস্তব সত্য হলো— এখানে কেউ কারও জন্য অপেক্ষা করে না। 

সবাই একাধিক বিকল্প নিয়ে বসে আছে। 

তুমি তার সঙ্গে কথা বলছ, সে হয়তো একই সময়ে আরও তিনজনের ইনবক্সে টাইপ করছে। 

এই মাল্টি-টাস্কিং প্রেম শয়তানের দোকানে সেল হয়.. বেস্টসেলিং প্রোডাক্ট হিসেবে।


মোবাইলের প্রেমে- কেউ আর প্রকৃত প্রেম খোঁজে না, 

—"খোঁজে ভ্যালিডেশন"। 

কেউ তার একাকীত্বের সাক্ষী থাকুক, 

কেউ ঘুমানোর আগে একটা গুডনাইট টেক্সট দিক, 

কেউ তাকে বোঝাক— তুমি এখনো চাওয়ার যোগ্য। 


এই ভ্যালিডেশনের বাজার দরেই শয়তানের নরকের ফ্র্যাঞ্চাইজি গ্লোবাল হয়েছে। 

শাখার সংখ্যা গোনা যায় না আর— প্রতিটি ডেটিং অ্যাপ, প্রতিটি সোশ্যাল মিডিয়ার ডিএম, 

প্রতিটি লেট-নাইট কল— সবই পাওয়া যায় শয়তানের আউটলেটে।


তারপর আসে সিন টিক। বার্তা গেল, দেখা হলো, উত্তর এল না।

মিনিট যায়, ঘণ্টা যায়। প্রেম নয়, অপেক্ষা করছি—একটা ডোপামিন হিটের জন্য!

কারণ শয়তান জানে, অনিশ্চয়তা মানুষকে সবচেয়ে বেশি টানে।


তাই এইখানে বাস্তব সত্য, সবাই জানে.. 

জানে এই প্রেম কাগজের নৌকার মতো, দুদিন পরে হয়তো আর কথা হবে না,

জানে এখানে সম্পর্কের সংজ্ঞাটা ভাসমান ফ্লুইড এর মত! 

তাই শয়তান তার উপর ভাসাই মূল্যবোধ- দায়িত্বহীনতার নরক করে ?


অতএব এই প্রেমে জেনে-বুঝে নিজেকে আত্মবিনাশ করাই শয়তানের দোকানের মূলমন্ত্র, 

যেখানে গ্রাহক শুধু ক্রেতা নয়, একইসঙ্গে পণ্যও।

 

ইদানিং শয়তান এই প্রেমের আকাল দেখে হাসতে হাসতে ক্লান্ত—

এখন আর হাসে না, সে কফি খেতে খেতে ড্যাশবোর্ড দেখে: "আজকের ডাউনলোড সংখ্যা আট লাখ। 

ঘোস্টিং রেট বেড়েছে। সিচুয়েশনশিপ কনভার্শন সাফল্যজনক।" 

অ্যালগরিদম বলে, "আরও পুশ নোটিফিকেশন পাঠাই? কিছু মানুষ এখনো ঘুমোচ্ছে, তাদের জাগাই?" 

শয়তান বলে, "না। যারা ঘুমোচ্ছে, তাদেরই স্বপ্নে আমরা আগামীকাল প্রেম পাঠাব। 


সাবস্ক্রিপশন অটো-রিনিউ অন করে দিও।

এইখানে কেউ কারও না, শুধু ইন্টিমেট ফ্যান্টাসি পর্যন্ত সবাই অপেক্ষমান।