The Bengali Storyteller

অনু নিয়মিত কলেজে যায়, কিন্তু কারও সঙ্গে মেশে না। ক্যান্টিনে একা বসে চা খায়, কানে লতানো হেডফোন থাকে। ফেসবুক আছে, কিন্তু প্রোফাইল পিকচার নেই—শ...

ক্রাইম ফিকশন: দ্য নিউজফিড মার্ডারার।

অনু নিয়মিত কলেজে যায়, কিন্তু কারও সঙ্গে মেশে না। ক্যান্টিনে একা বসে চা খায়, কানে লতানো হেডফোন থাকে। ফেসবুক আছে, কিন্তু প্রোফাইল পিকচার নেই—শুধু কালো ডিসপ্লে, কভার ফটোতে ঝাপসা কুয়াশার ছবি। বন্ধুর সংখ্যা ৪২, তার মধ্যে ৩০ জনই ডিএড অ্যাকাউন্ট। অনু কখনো পোস্ট দেয় না, কমেন্ট করে না, লাইক দেয় না। শুধু স্ক্রল করে—নির্বাক, নীরব, অদৃশ্য দর্শকের মত। 

একমাত্র যার সাথে কথা বলে সে রনি, যে নিজে ইউটিউবার, সারাক্ষণ ভিউ, লাইক, সাবস্ক্রাইবারের পেছনে দৌড়ায়।


অনুর এই অদৃশ্যতাই হয়তো তাকে এক কঠিন ফাঁদে ফেলতে যাচ্ছে। কারণ যে মানুষ সমাজে চিহ্নহীন, তাকে যে-কোনো চিহ্ন পরিয়ে দেওয়া যায়।


পর্ব ১: যে ভিডিওতে অনু ছিল না, তবু ছিল!


ফেসবুকে হঠাৎ একটা ঝাপসা সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরাল হলো। পুরান ঢাকার বড় মসজিদের গলি— রাত সাড়ে ৮টা। একটা ছেলে একা এক নারীকে থামিয়ে কিছু বলছে, তারপর আকস্মিক ধাক্কা দিয়ে একটা সাদা মাইক্রোবাসে তুলে দিচ্ছে। নারী নিখোঁজ। ভিডিওটা পনেরো সেকেন্ডের।


ভিডিওর নিচে কমেন্ট:


“এই ছেলেটাকে চেনা চেনা লাগে।”

“এটা তো আমাদের এলাকার! পুরান ঢাকার।”

“ওর নাম অনু। ওর সাথে কেউ মেশে না; এইরকম ছেলেরাই এসব করে।”


পরের কমেন্টেই কেউ একজন ট্যাগ করলো অনু’র প্রোফাইল। তারপর যা ঘটলো, সেটা রীতিমতো সোশ্যাল মিডিয়ায় আগুন। একের পর এক শেয়ার, রিয়্যাক্ট, থ্রেড। যেন সবাই অপেক্ষায় ছিল একজন মুখহীন অপরাধী পাওয়ার জন্য— আর পেয়ে গেল।


অনু ভিডিওটা দেখলো। চমকে উঠলো! সেই ছেলেটার পরনে নীল পাঞ্জাবি, কালো জিন্স—ঠিক যেটা সে সকালে পরেছিল। কিন্তু সে তো ওই জায়গায় কখনো যায়নি। তার সেদিনের অবস্থান বলছে, সে বাসায় একাই ছিল। কিন্তু প্রমাণ দেবে কে? মা মৃত। বাবা অসুস্থ, কথা বলতে পারে না।


কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার ইনবক্স ভরে গেলো থ্রেটে:


“ঘাতক, তোকে আমরা চিনি।”

“চুপচাপ আছস তো কী হয়েছে? অপরাধীরাই চুপ থাকে।”


তার প্রোফাইলে পোস্ট এলো—যা সে লেখেনি:


“আমি কিছু বলতে চাই না। কারণ কথা বললে মানুষ বেশি সন্দেহ করে।”


এই পোস্টটা কে দিলো? তার পাসওয়ার্ড তো তার কাছেই। কিন্তু এখন সেটা বিচার্য নয়। বিচার্য হলো—এই পোস্টের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়লো পুরো নিউজফিডে। ভাইরাল হলো নতুন ক্যাপশনে: “দম্ভ দেখাচ্ছে অপহরণকারী।”


রনি ফোন করলো:


“দোস্ত, তুই অনলাইনে আসছ না কেন? তোর নামে তো পুরা দেশ পাগল, আজব তুলপাড়! তুই একটা কিছু বল!”


অনু বললো না। কারণ সে জানে না কী বলবে। আর তার এই নীরবতাকেই সবচেয়ে বড় অপরাধ বানিয়ে উপস্থাপন করলো ‘ডিজিটাল ডিটেকটিভ’ নামের একটা ফেসবুক পেজ। ক্যাপশন:


“অভিযুক্তের নীরবতা। সন্দেহ আরও ঘনীভূত হলো।”


পরের এক ঘণ্টায় ‘ডিজিটাল ডিটেকটিভ’-এর পোস্টে ২৫ হাজার শেয়ার পড়লো। পেজটির ফলোয়ার রাতারাতি ১০ হাজার থেকে ৪০ হাজারে পৌঁছলো। অ্যাডমিন পোস্ট দিলো: “পরবর্তী আপডেটের জন্য পেজটি ফলো করুন।” পোস্টের নিচে প্রথম কমেন্ট: “ধন্যবাদ ভাই, এমন আপডেটের জন্যই তো আপনাকে ফলো করি।”


রাতে অনু দেখলো, তার জানালার বাইরে কয়েকটা অচেনা ছেলে দাঁড়িয়ে মোবাইলে ভিডিও করছে। তারা চিৎকার করে বলছে, “এই যে ভাই, একটু সামনে আসেন! আমরা লাইভে আছি, পাবলিক আপনারে দেখতে চায়,এক মিনিট কথা বললে দশ হাজার ভিউ! অনু পর্দা টেনে দিলো। বাইরে হাসির শব্দ।




পর্ব ২: কন্টেন্টের কারখানা।


সকাল হতে না হতেই রনি এলো। চোখে তার উত্তেজনা। ফোনের স্ক্রিনে দেখালো একটা ইউটিউব ভিডিও—থাম্বনেইলে অনু’র অস্পষ্ট মুখ, পেছনে লাল আলো। টাইটেল: “ভাইরাল 'অপহরণকারী': সাইলেন্ট সাইকোপ্যাথ?” সেখানেও ভিউ ৭ লক্ষ ছাড়িয়েছে।


রনি বললো:


“এটা বানাইছে ‘রহস্যবিশ্ব’ চ্যানেল। তাদের গত ভিডিওর ভিউ ছিল ২০ হাজার। তোরে নিয়ে ১২ ঘণ্টায় ৭ লাখ!”


“আমি তো কিছু করিনি, রনি।”


“তাতে কী? তুই এখন একটা ঘটনা। তোরে নিয়ে সবাই কন্টেন্ট বানাবে। তুই যত চুপ থাকবি, তত ভিউ বাড়বে। কারণ তোর চুপ থাকাটাই ওদের চ্যানেলের কনটেন্ট।”


সেইদিনই আরও চার-পাঁচটা পেজ ভিডিও বানালো। ‘ট্রু ক্রাইম বিডি’, ‘আরবান লিজেন্ডস’, ‘সত্য অনুসন্ধান’, ‘মিস্টেরিয়াস বাংলা’, ‘ক্রাইম ইমোজি’—সবাই একই ফুটেজ, একই ছবি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভিন্ন ভিন্ন গল্প বানাচ্ছে। 

কেউ বলছে, অনু ‘এলিয়েন’, কেউ বলছে ‘ইন্টারসার্ভিস এজেন্ট’, কেউ বলছে ‘মানব পা'চার চক্রের সদস্য’, কেউ বলছে ‘সাবেক পাগল-গারদের পলাতক রোগী’। এক চ্যানেল তো আবার ভিডিও বানালো: “অনু কি টাইম ট্রাভেলার?” থাম্বনেইলে অনু’র ছবির পাশে বসানো হলো আইনস্টাইন আর নিকোলা টেসলার ছবি। ভিউ ২ লাখ।


আর প্রতিটা ভিডিওর নিচে একই কমেন্ট সেকশন—হাসির রিয়্যাক্ট, কেয়ার ইমোজি, সাথে অ্যাংরি ইমোজির বন্যা। আর কিছু মানুষ লিখছে:


-“আমি ওকে চিনি। কলেজে কখনো কারও সাথে কথা বলত না। খুব স'ন্দেহজনক ছিল।”

-“ওর চোখের দিকে তাকালে বুঝা যায়—অন্যরকম ঠান্ডা চোখ।”


এই কমেন্টগুলোর একটাও সত্য নয়। কিন্তু কে দেখবে? সবাই শুধু গল্প চায়।


বিকেলে ফেসবুকে ট্রেন্ড করলো #Arr'estAnu। কেউ কেউ অনু’র মৃত মায়ের পুরোনো প্রোফাইল খুঁজে বের করে কমেন্ট করলো:


“আপনার ছেলেকে কী শিখাইছিলেন, ওতো 'মানুষ' না?”


একটা পোস্ট ভাইরাল হলো, যেখানে দাবি করা হচ্ছে, অনু নাকি এক সপ্তাহ আগে একটি মেয়েকে স্টক করছিলো। পোস্টটা করেছিলো ‘তানিয়া আক্তার’ নামের এক তরুণী। ক্যাপশন: “আমি ভয়ে কিছু বলিনি। এখন বলছি—এই ছেলেটা রাস্তায় আমাকেও ফলো করেছিল।” রিয়্যাক্ট পড়লো ৩০ হাজার।

পোস্টের নিচে মেয়েরা লিখতে লাগলো: “আপু, ভয় পাইয়েন না। আমরা আপনার সাথে আছি।” “এমন পুরুষদের শাস্তি হওয়া উচিত।” "পুলিশ কী করে- এরে ধরে না কেন? "



পরবর্তীতে প্রমাণিত হলো, তানিয়া আক্তার বলে কেউ নেই। প্রোফাইলটা ফে'ইক। কিন্তু সেই পোস্টের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ার পর তানিয়ার অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব কারও আগ্রহের বিষয় থাকলো না। সত্য ম'রলো, গল্প বেঁচে গেলো।

বরং আরেকটা চ্যানেল ভিডিও বানালো: “তানিয়া আক্তার: সত্যি না নাটক? ভাইরাল গোয়েন্দা কাহিনী।” ভিউ পেলো ৫ লাখ।



রাতে রনি এলো আবার। বললো:


“দোস্ত, আমি তোরে নিয়ে ভিডিও বানাইছি। ‘আমার বন্ধু অভিযুক্ত: আসল ঘটনা’। বলছি না তুই দোষী, বলছি তোর পক্ষে।”


অনু ভিডিওটা দেখলো। রনি সেখানে বলেছে, “আমার বন্ধু ভুল বুঝার শিকার। ওর নীরবতাই ওর একমাত্র অপরাধ।” কিন্তু থাম্বনেইলে রনি দিয়েছে অনু’র একটা ছবি, যেখানে সে নির্লিপ্ত মুখে বসে আছে। ছবির পাশে বড় করে লেখা: “সত্যি না মিথ্যে?” ভিউ ১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে ৩ ঘণ্টায়।


অনু বুঝলো, তার নিজের বন্ধুও তাকে কন্টেন্ট বানিয়ে ফেলেছে। এখন কেউ তাকে রক্ষা করতে চায় না—সবাই শুধু তার মৃতদেহের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের উচ্চতা মাপতে চায়।


(অনু’র ফোনে নোটিফিকেশন—তার অ্যাকাউন্ট থেকে আরও একটা পোস্ট গেছে (সে দেয়নি):


“কাল রাতে যা ঘটবে, তার জন্য প্রস্তুত থেকো।”


পোস্টের নিচে কমেন্টের সুনামি।)


পর্ব ৩: ভিউ কে চায়?


অনু ঠিক করলো, এবার সত্যি খুঁজবে। কে তার নামে পোস্ট করছে? কে এই পুরো চক্র? রনি বললো, সাইবার ক্যাফেগুলো চেক করতে। কারণ যারা ভুয়া পোস্ট করছে, তাদের ট্রেস কোথাও না কোথাও পাওয়া যাবে।


তারা খুঁজতে খুঁজতে পেল পুরান ঢাকার একটা অন্ধকার গলির পুরোনো সাইবার ক্যাফে—“নেট ওয়ার্ল্ড”। সেখানে ঢুকে দেখলো, চার-পাঁচজন তরুণ বসে আছে, বয়স ২০-২৫। সবার চোখ কম্পিউটার স্ক্রিনে। একজনের স্ক্রিনে অনু’রই প্রোফাইল খোলা। আরেকজনের স্ক্রিনে ভিডিও এডিটিং সফটওয়্যার—সেখানে সেই সিসিটিভি ফুটেজ লোড করা, আর ফুটেজে যা নেই: ভয়েস ওভার, ড্রামাটিক মিউজিক, জুম-ইন এডিট, রহস্যময় টেক্সট বসানো হচ্ছে। 

টেবিলে ছড়ানো চিপসের প্যাকেট, সিগারেটের ছাই, বিয়ার আর এনার্জি ড্রিংকের ক্যান।



একজন বললো:


“আজকের পোস্টটা কী দিবি?”


“দে—আজ রাতে ও নাকি আত্মসমর্পণ করবে। সেটাই দিয়ে দে। সাথে ওর বাবার অসুস্থতার অ্যাঙ্গেলটা টাচ করবি। বলবি, ‘বাবার চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতেই 'অপহরণ'!’ ইমোশনাল কানেক্ট দরকার। ভিউ মারবো।”


“মাইক্রোবাসের ড্রাইভার কে ছিলো, সেটাও বলবি?”


“না, সেটা কালকের জন্য রাখ। দুই পর্বে রহস্য জমবে। সাপেন্স মানেই ক্লিফহ্যাঙ্গার। প্রতিটা ভিডিও শেষে ইউজার ‘নেক্সট পার্ট’ লিখবে, তাতেই এনগেজমেন্ট রেট বাড়বে, অ্যালগরিদম পুশ করবে।”


অনু এগিয়ে গেলো। তার চোখ লাল। “তোমরা কারা? কেন এসব করছো?”


তরুণরা চমকালো, কিন্তু ভয় পেলো না। বরং তাদের টিম লিডার—কালো টিশার্ট পরা ছিপছিপে ছেলে—হেসে বললো:


“আরে, এই যে আমাদের হিরো! আয় ভাই, বস। চা খাবি?”


“তোমরা জানো আমি কিছু করিনি। তাহলে কেন?”


ছেলেটা মুখে সিগারেট আর দুই আঙুলে 'মদের' গ্লাস একটু উঁচিয়ে বললো:


“দেখ ভাই, তুই কিছু করছস কীনা, সেটা বড় কথা না। বড় কথা হলো— তুই চুপচাপ থাক কিছু বলিস না। তোর নীরবতার ওপর আমরা গল্প লিখতে পারি। পাবলিক গল্প পছন্দ করে। ভিউ আসে। ভিউ মানে টাকা। তুই জানস, গত দুই সপ্তাহে আমরা এই পেইজগুলা থেকে কত কামাই করছি?”


আরেকজন নেশার ঘোর থেকে নাক কুঁচকে টেনে যুক্ত করলো:


“আমরা কারও ক্ষতি করছি না। তোরে পুলিশে ধরলেও কিছু হবে না, কারণ তোকে ক্যামেরায় দেখা যায় নাই। কিন্তু গল্পটা দারুণ, তাই না? পুরো দেশ এখন তোরে নিয়ে ভাবছে। তুই তো ব্যাটা সেলিব্রিটি হয়ে গেছস, হাহাহা।”



অনু থরথর করে কাঁপছে। “আর ভিডিওর ওই ছেলেটা?”


প্রথম ছেলেটা হাসলো:


“ওটা ডিপফেক। তোর জামাটা আমরা তোর কলেজের ইভেন্টের পুরোনো ছবি থেকে নিছি। মুখটা আরেকজনের, বডি আরেকজনের। তোর নামটা শুধু আসল। কারণ তুই কাউকে কিছু বলবি না—এটা আমরা জানতাম।”


রনি পেছন থেকে ফিসফিস করলো:


“তাহলে প্রথম কে শুরু করলো? কে প্রথম ভিডিওটা দিলো?”


কালো টিশার্টের ছেলেটা রনির দিকে তাকিয়ে হাসলো:


“তোর বন্ধুই তো। ওরে ছাড়া আমরা এতো ইনফো পেতাম কী করে? তোকে এইখানে আনার পিছনেও ওর হাত আছে। কী রনি, বলো না দোস্তকে? সম্পর্কটা তো তোদের পাবলিকই! ‘আমার বন্ধু অভিযুক্ত’—কী দারুণ টাইটেল দিছস! ওই ভিডিওটার অ্যাড রেভিনিউ তো তুই একাই পেয়ে গেছস। তুইও এখন বড় মহাজন!”



অনু ঘুরে দাঁড়ালো রনির দিকে। রনির মুখ ফ্যাকাশে, কপালে ঘাম।। তার হাতে মোবাইল কাঁপছে। সে বলতে চাইলো কিছু, কিন্তু পারলো না।


রনি বুঝতে পারলো, তার সেই প্রথম ফেসবুক পোস্ট—‘দোস্ত, ঘটনা কিছু দেখছস?’—ওটাই ছিলো শুরু। আর তারপর যখন দেখলো ভিউ আসছে, লাইক পড়ছে, ফলোয়ার বাড়ছে, সে আর থামেনি। সে নিজেই এই গ্রুপের হয়ে কাজ করতে শুরু করে। এমনকি সেই ‘তানিয়া আক্তার’ প্রোফাইলটাও তার বানানো।


হঠাৎ রনি দৌড় দিলো। অনু একা দাঁড়িয়ে রইলো সাইবার ক্যাফেতে। পেছন থেকে ছেলেটা বললো, “চিন্তা করিস না ভাই। কালকে নিউজ হবে, ‘অভিযুক্ত ‘’আত্মহত্যা’’ করছে’—শুধু পোস্টটা দিয়ে দেবো। তারপর গল্প শেষ। তোর এই গল্প আর থাকবে না। তুই জামেলা মুক্ত! আমরা নতুন কারও পেছনে লাগব। তুই রেস্ট নে।”



পর্ব ৪: লাইভ


পরদিন ভোরে সাইবার ক্যাফের ওই দলটা তাদের মাস্টারপিস আপলোড করলো। অনু’র অ্যাকাউন্ট থেকে (যেটা এখন পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণে) একটা ফেসবুক লাইভ শুরু হলো। লাইভে একটা অন্ধকার ঘর, ক্যামেরা কাঁপছে। ভয়েস ওভার চলছে: “আমি সব স্বীকার করছি। আমি অপরাধী। কিন্তু আমি একা নই...”


ভিউয়ার ঢুকছে দলে দলে। ৫০ হাজার, ১ লাখ, ২ লাখ—সবাই অপেক্ষা করছে ‘আত্মহত্যার’ লাইভ দেখার জন্য। কমেন্টে কেউ লিখছে “কর”, কেউ লিখছে “নাটক”, কেউ লিখছে “আমি তো শুরু থেকেই বলছি ওর চোখ-মুখ সন্দেহজনক!” কেউ কেউ পপকর্ন ইমোজি দিচ্ছে। একজন লিখছে: “কেউ কি স্ক্রিন রেকর্ড করছেন? পরে ভিডিও ডিলিট হইলে পাবো কোথায়?” আরেকজন লিখছে: “শেয়ার দিয়ে রাখছি, পরে দেখব।”



এর ভিতর হঠাৎ রহস্যর ঝট ভেঙে লাইভের ফ্রেমে ঢুকলো আরেকটা মানুষ—সেটা স্বয়ং অনু। কিন্তু এবার তার চোখে-মুখে ভয় নেই, বরং শান্ত, অদ্ভুত রকমের শান্ত।


সে সরাসরি ক্যামেরায় তাকালো:


“যারা এই লাইভ দেখছেন, আমি জানি আপনারা সত্যিটা জানতে চান, আর সত্যিটা হলো—আমি যা করিনি, তার জন্য আমি মরতে রাজি নই। কিন্তু নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো—আমার বন্ধু, আমার সহপাঠী, আমার প্রতিবেশী, এই পাড়ার সবাই মিলে আমাকে মেরে ফেলেছে গত দুই সপ্তাহ ধরে। আপনাদের এনগেজমেন্ট, আপনাদের শেয়ার, আপনাদের হাসির রিয়্যাক্ট—প্রত্যেকটা ছিল আমার বুকে ছুরির মতো। আপনারা ভেবেছেন এটা গল্প। কিন্তু এটা ছিল আমার বাঁচা মরার লড়াই।


অনু হঠাৎ পেছনে তাকালো। পুলিশের সাইরেন শোনা যাচ্ছে। সাইবার ক্যাফের টিম পালানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু বাইরে পুলিশ ঘিরে ফেলেছে। কালো টিশার্টের ছেলেটা চিৎকার করছে, “কিছু না, এটা আমাদের প্রজেক্ট ছিল! সোশ্যাল এক্সপেরিমেন্ট!” কেউ শুনছে না।



অনু আবার ক্যামেরার দিকে তাকালো:


“তবে আমি আপনাদের ক্ষমা করবো না, কারণ আপনারা ক্ষমা চাইতেও আসবেন না। কাল সকালে আরেকটা ভিডিও ভাইরাল হবে, আর আপনারা এটা ভুলে যাবেন। কিন্তু আমি ভুলবো না। কারণ আমি আজও নীরব। আর নীরবতার চেয়ে ভয়ংকর কিছু নেই।”


লাইভ কেটে গেলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো—“This video is no longer available.”