আমার সাথে পরিচয় হলে হয়তো বলবেন, “বাহ্ দারুণ মানুষ”।
আমি হাসব। এই হাসিটা শিখতে আমার কত বছর লেগেছে, জানেন?
দীর্ঘ অনেক বছর— কারণ আমি ভালো সাজা শিখেছি শুধু, ভালো মানুষ নই।
আর এই ভালো সাজাটা ছিল আমার বেঁচে থাকার সবচেয়ে কম খরচের পথ।
এককালে আমি একটা শহরের মত ছিলাম। শহরটার একটা মানচিত্রে ছিল,
তার নিজস্ব রাস্তা ছিল, নিজস্ব অলিগলি ছিল।
কিন্তু প্রতিদিন কেউ না কেউ এসে বলত, “এই রাস্তাটা সোজা করে দাও, এই বাড়িটা সরাও, এই বাগানটা সরাও এই নদীর বাঁকটা অন্যদিকে ঘোরাও,
—যেন সবার হাঁটতে সুবিধা হয়।”
আমি সরিয়েছি। ঘুরিয়েছি। সোজা করেছি।
একদিন দেখলাম, আমার নিজের আর কোনো মানচিত্র নেই।
আমি এখন যে শহর হয়ে দাঁড়িয়ে আছি,
সেটা আর আমার শহর নয়—
সেটা হয়ে গেছে মানুষের প্রয়োজনের উপনিবেশ।
যদিও ভালো সাজা কোনো গুণ নয়,একটা ট্রেড-অফ।
যেমন অর্থনীতিতে বলে, কোনো কিছু পেতে গেলে
কিছু ছাড়তে হয়।
আমি ছেড়েছি নিজের ইচ্ছাগুলো,
যেন সেগুলো আমার না হয়ে মানুষের প্রয়োজন হয়ে ওঠে।
আমি ছেড়েছি নিজের কণ্ঠস্বর,
যেন সেটা আমার কথা না বলে অন্যের মন রক্ষার্থে চলে ।
এই ভালো হওয়ার পেছনে কোনো নৈতিকতা ছিল না,
ছিল শুধু এক নেশা—
অন্যের চোখে নিজেকে টিকিয়ে রাখার নেশা।
একে কি "ভালো থাকা" বলে?
না, একে বলে রিফ্লেক্টেড সেলফ-ওর্থ।
আমার নির্ধারণ আমার ভেতর ছিল না,
আমার নির্ধারণ ছিল মানুষের দৃষ্টির শেয়ারবাজার,
যে বাজারে নিজের মূল্য উঠা-নামা করে,,
অন্যের মুড, অন্যের প্রয়োজন, অন্যের ইচ্ছার উপর অঙ্ক হিসাব করে।
আমার একমাত্র অপরাধ ছিল,
আমি নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেকেই বিক্রি করেছি।
কিস্তিতে, ফ্রি অফারে, ডিসকাউন্টে—
কখনো দামও চাইনি।
জীবনের এতগুলো বছর পেরিয়ে , যখন এই পড়ন্ত বিকেলবেলায়,
আমি জানি না আমার ভিতরের "আমিটার" নাম কী।
নাম তো আছে— পরিচয়পত্রে, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে, ইমেইল সিগনেচারে।
কিন্তু যে নামটা নিশ্বাসের ভেতর থাকে, যে নামটা ঘুমের ভেতর ডাকে,
সে নাম আমি হারিয়ে ফেলেছি কবে জানি না—
হয়তো কোনো মঙ্গলবার,
হয়তো কোনো এক দুপুরের গ্রামে।

0 Comments: