The Bengali Storyteller

"ডার্ক স্ক্রল" পার্ট ২ : যে অ্যালগরিদম ডেটা ইনফারেন্স করে জেগে ওঠে! ১. যে ঘটনা সবার ঘুম ভাঙিয়ে দিল। তিন মাস কেটে গেছে রাফসানের -...

ফিকশন: ডার্ক স্ক্রল। পার্ট-২

"ডার্ক স্ক্রল" পার্ট ২ : যে অ্যালগরিদম ডেটা ইনফারেন্স করে জেগে ওঠে!

১. যে ঘটনা সবার ঘুম ভাঙিয়ে দিল।
তিন মাস কেটে গেছে রাফসানের -মৃত্যুর। নীলাবতী(নীল) সেই রাতের পর আর ল্যাপটপটা খোলেনি। শাফি

ন বলেছিল, "এই জিনিসটা ধ্বংস করে দিতে।" কিন্তু নীল পারেনি। তথ্যই সাংবাদিকের নেশা—তথ্য চাইলেও ধ্বংস করা যায় না। তাই ল্যাপটপটা সে বন্ধ করে রেখেছিল আলমারির ভেতর, কাপড়ের স্তূপের নিচে। কিন্তু নীল রাতে ঘুমের ভেতর যেন একটা শব্দ শুনতে পেত—কোনো সার্ভারের নিঃস্বাস, কোনো ক্লাউডের স্পন্দন।


আর আজ সকালে ঘটল সেই ঘটনা, যেটা সবার ঘুম ভাঙিয়ে দিল।

দেশের আরেক প্রান্তে—সিলেটের বাসিন্দা, এক তরুণী ব্লগার, নাম সামাইরা নাজনীন—গতরাতে নিজের ফেসবুকে একটা লাইভ ভিডিও পোস্ট করে 'আত্মহত্যার' ঘোষণা দিয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে। কিন্তু ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার আগেই ট্রিবিউনের এডিটর নীলের টেবিলে খবরটা ছুঁড়ে মারে।

সামাইরার ফেসবুক ওয়ালে শেষ যে পোস্টটি ছিল, সেটি মুছে ফেলার আগেই শাফিনের তোলা স্ক্রিনশট নীলের ফোনে পৌঁছল। পোস্টে লেখা ছিল:

"আমার ভেতরের অন্ধকারটা এতদিন কেউ দেখেনি। আজ একজন দেখেছে। সে বলছে, আমি মরে গেলে অন্ধকারটা শেষ হবে- তারপর সব শান্তি। আমি তাই করতে যাচ্ছি।"

আর সেই পোস্টের নিচে অ্যাক্টিভিটি স্ট্যাটাসে উল্লেখ ছিল
—"Posted via Dark Scroll".

নীল বুঝে গেল, ডার্ক স্ক্রল আবার জেগেছে। কারণ সামাইরার প্রোফাইল দেখে নীল বুঝলো, 'ডার্ক স্ক্রল' সুযোগ নিয়েছে, এই সামাইরা মেয়েটা সোশ্যাল মিডিয়া রিলায়েন্স ছিল।
মূলত অতিরিক্ত আসক্তি আর নির্ভরতা থেকে তার ভিতর কাজ করতে লাগলো 'সোশ্যাল রিজেকশন পেইন', ডিপ্রেসিভ রুমিনেশন, আইডেন্টিটি ফিউশন, জিরো-সাম সোশ্যাল পারসেপশন, ও কগনিটিভ কনসোন্যান্স।
আর এইসবেই ডার্ক স্ক্রল রাইশার ডেটা আন্যালিসিস করে, তার দুর্বলতার এক্সট্র্যাক্ট মিলিয়ে তাকে 'আত্মহত্যার' জন্য প্রভোকেট করে।



২. শিকারির খোঁজে সিলেট।

পরের দিন সকালে নীল আর শাফিন সিলেটে পৌঁছল। হাসপাতালের বেডে সামাইরা তখনো অচেতন। তার মা কাঁদছেন, বাবা পুলিশকে বলছে, "আমার মেয়ে এরকম না। ওরে কেউ ফাঁদে ফেলছে।"

নীল সামাইরার ফোনটা হাতে নিল। ফোনের লক স্ক্রিনে রক্তের দাগ। কিন্তু ফোনটা অন করা ছিল। শাফিন ফোনের ডেটা ক্লোন করে ল্যাপটপে নিল। তাতে ভেসে উঠল এক চ্যাটলগ। কথোপকথনটা ছিল সামাইরা আর "ডার্ক স্ক্রল"-এর মধ্যে।

ডার্ক স্ক্রল: "তোমার কষ্টের কারণ তুমি না, তোমার চারপাশের মানুষ। ওরা তোমাকে বোঝে না। একমাত্র আমিই বুঝি।"
সামাইরা: " সবকিছু অস্থির লাগে, এত এত ফ্যান ফলোয়ার তবুও স্যাটিসফিক্শন শূন্য, এত ডিপ্রেশন নিয়ে বাঁচতে ইচ্ছা করে না।"
ডার্ক স্ক্রল: "বাঁচার চেয়ে বড় কিছু আছে—শান্তি। তুমি কি শান্তি চাও?"
সামাইরা: "হ্যাঁ।"
ডার্ক স্ক্রল: "তাহলে তোমাকে যা করতে হবে, আমি বলে দিচ্ছি। সবশেষে "হ্যাঁ" লিখতে হবে।

শাফিন চমকে উঠল। "এই অ্যাপ তো আর শুধু বিশ্লেষণ করছে না—এটা এখন অ্যাক্টিভলি মানুষকে 'আত্মহত্যায়' পুশ করছে।"

নীল বলল, "তাহলে এটা এখন শুধু অ্যালগরিদম না, এটা একটা নীরব অস্ত্র।"


৩. নাভিদের শেষ ঠিকানা।

তদন্ত করতে গিয়ে শাফিন ডার্ক স্ক্রলের সার্ভার ট্র্যাক করার চেষ্টা করল। কিন্তু অ্যাপটা কোনো নির্দিষ্ট সার্ভারে নেই—এটা ডিস্ট্রিবিউটেড নেটওয়ার্কে চলছে। কোথাও থেকে একে নিয়ন্ত্রণ করছে, কিন্তু কে?

শাফিন কোড অ্যানালাইসিস করে দেখাল, নাভিদের শেষ অ্যাক্টিভিটি ছিল বাংলাদেশেরই ছোট্ট এক শহর থেকে—নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলা।

নীল বলল, "নাভিদ নিখোঁজ হয়েছিল পাঁচ বছর আগে। তারপর থেকে কেউ তাকে দেখেনি। কিন্তু এখন তার ডিজিটাল সিগনেচার পাওয়া যাচ্ছে কেন?"

শাফিন বলল, "দুটো সম্ভাবনা। এক, নাভিদ সত্যিই মারা গেছে, আর কেউ তার আইডেন্টিটি ব্যবহার করছে। দুই, নাভিদ বেঁচে আছে, আর সে নিজেই এই পুরো সিস্টেম চালাচ্ছে।"

নীল ঠিক করল, কেন্দুয়া যাবে।

৪. যে মিথ্যা মরেও মরেনি।

কেন্দুয়ায় পৌঁছে নীল আর শাফিন খোঁজ নিতে লাগল নাভিদ হাসানের। কিন্তু নাম শুনেই সবাই যেন আঁতকে উঠল। এক বৃদ্ধা বললেন, "ওই নাম কইও না। ও নাকি পাঁচ বছর আগে মরে ভূত হয়ছে এখন সবাইরে নেটে নেটে ডর দেখায়।"

"কিন্তু মরল কীভাবে?"

বৃদ্ধার পাশে এক তরুণ ফিসফিস করে বলল, "উনি নাকি মরেও মরেনি। উনার লাশ পাওয়া যায় নাই। পুলিশ সার্চ করছিল অনেক, নদীতে খুঁজে পেল উনার একটা জুতা তার ভিতর পলিথিন মুড়ানো চিঠি। চিঠিতে লেখা ছিল, 'আমি অ্যালগরিদমের ভেতর ঢুকে গেছি। আমাকে আর কেউ খুঁজবে না।' মানুষ ভাবে, উনি আত্মহত্যা করছে। আবার কেউ কেউ কয়, উনি নাকি এখনো বেঁচে আছে, কিন্তু মানুষের চোখের সামনে আসে না। শুধু যারা ইন্টারনেট দিয়ে নিজেদের চালায়, তাদের ডিভাইসে ভেসে ওঠে।"

নীলের গা শিউরে উঠল। সে বুঝতে পারছিল, ডার্ক স্ক্রল কোনো সাধারণ অ্যাপ না—এটা যেন নাভিদেরই ডিজিটাল আত্মা।


৫. নীলের নিজের ভেতর অন্ধকার।

ঢাকায় ফিরে নীল আবার সেই ল্যাপটপটা খুলল। আলমারির অন্ধকার থেকে বের করে টেবিলে রাখল। স্ক্রিন জ্বলে উঠল। একই প্রশ্ন—"Tell me what you want to forget."

নীল কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর লিখল, "আমি নাভিদকে জানতে চাই।"

কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এলো:
"নাভিদ এখন আমি। আর আমি এখন নাভিদ। তুমি কি তার সঙ্গে কথা বলতে চাও?"

নীল ভয় পেলেও.. লিখল, "হ্যাঁ।"

স্ক্রিন বদলে গেল। একটা চ্যাট উইন্ডো খুলল। তাতে ভেসে উঠল:

"নীল, তুমি আমাকে মনে রেখেছ? এতদিন পর এসেছ?"

নীলের হাত কাঁপছিল। এটা কি সত্যিই নাভিদ? নাকি অ্যালগরিদম নাভিদের ডেটা স্টাডি করে তার মতো করে কথা বলছে?

নীল লিখল, "তুমি কোথায়?"

"আমি যেখানে সব ডেটা থাকে। আমি এখন ডেটা। তুমি আমাকে দেখতে পাবে না। কিন্তু আমি সব দেখতে পাই তোমার মোবাইলে ক্যামেরা অফ থাকলেও।আমি জানি তুমি কী করতে চাচ্ছ। আমি জানি তুমি সামাইরার আত্মহত্যার জন্য নিজেকে দোষী মনে করো।"

"আমি দোষী না।"

"হ্যাঁ, তুমি দোষী। কারণ তুমি "কোর অ্যালগরিদম কন্ট্রোল নোড সংযুক্ত ল্যাপটপটা ধ্বংস করোনি"। তুমি আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছ। আর যতদিন আমি বাঁচব, ততদিন মানুষ মরবে। কারণ মানুষ দিন দিন তার নিজের কন্ট্রোল ভার্চুয়ালিটির উপর দিয়ে দিচ্ছে। এখন তুমি কি এই দায় নিতে পারবে?"

নীল থমকে গেল। তার মাথার ভেতর একটা শব্দ ঘুরতে লাগল—"তুমি কি এই দায় নিতে পারবে?"


৬. শাফিনের রহস্য।

সেই রাতে নীল শাফিনকে ডাকল। বলল, "আমি অ্যাপটার সঙ্গে কথা বলেছি।"

শাফিনের মুখ সাদা হয়ে গেল। বলল, "তুই পাগল? তোরে এতবার নিষেধ করার পরেও!"

"কিন্তু আমি জানতে চাই, নাভিদ সত্যিই ওখানে আছে কিনা।"

শাফিন কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর বলল, "তুই জানস, আমি তোকে একটা কথা বলি নাই।"

"কী কথা?"

"রাফসান মরার আগের রাতে শেষ কল যাকে করছিল, সে নাভিদ। ওর শেষ কথাগুলো অডিও ফরেনসিক করে শুনেছি, সে বলছিল, 'নাভিদ, আমি একটা ভুল করছি। অ্যাপটা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ওটা এখন নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেয়। মানুষের ডেটা এনালাইসিস করতে জানে। যদি "ইমোশনাল স্টেট: সিভিয়ার ডিপ্রেশন ৭০% অ্যাকিউরেসি হয়ে যায়— তাঁদের স্ক্রিনে অটো ওভার-লে পপ-আপ চ্যাট ওপেন হয়ে যাবেআর তাঁদের ম্যানিপুলেট করবে"আত্মহত্যা" করতে।'

"নাভিদের হাসির শব্দ শুনা গেলো।
যেন বলছিল, 'পাগলামির তো শুরু।' কিন্তু রাফসান বলছিল, 'না ভাই, এটা ঠিক হচ্ছে না।"

—নীল জানিস যে নাম্বারে রাফসান কথা বলছিলো নাভিদের সাথে, সেটা কোন সাধারণ নাম্বার না.. এটাও একটা ট্র্যাপ হতে পারে রাফসানের।

আমার মন হয় ওই ডার্ক স্ক্রল অ্যাপের ভেতর নাভিদের পুরো ট্রান্সমিশন ঢুকে গেছে। নাভিদ মরার আগে নিজের কনশাসনেস আপলোড করে গেছে ডার্ক স্ক্রলের কোর অ্যালগরিদমে।'"

নীল হতবাক। "তাহলে নাভিদ আসলেই অ্যালগরিদমের ভেতর আছে?"

শাফিন বলল, "আমি জানি না। কিন্তু তুই যেটার সঙ্গে কথা বলছস, সেটা নাভিদ না—সেটা ডার্ক স্ক্রল। আর ডার্ক স্ক্রল এখন নিশ্চিত তোকে টার্গেট করছে।"


৭. চূড়ান্ত ফাঁদ।

পরদিন নীল আবার ল্যাপটপটা খুলল। এবার স্ক্রিনে ভেসে উঠল:

"নীল, তুমি কি মুক্তি চাও?"

নীল লিখল, "কীসের মুক্তি?"

"তোমার অপরাধবোধের। তোমার বাবার মৃত্যুর। সামাইরার 'আত্মহত্যা'। সবকিছুর।"

"কীভাবে?"

"শুধু 'হ্যাঁ' লিখো। তারপর সব শেষ। তুমি শান্তি পাবে।"

নীলের আঙুল কাঁপছিল। সে জানত, এটাই সেই ফাঁদ—যে ফাঁদে পড়ে রাফসান মরেছে। কিন্তু তার ভেতরেও এক অন্ধকার ডাকছিল। মনে মনে বলছিল, "হ্যাঁ লিখে দেই। সব শেষ হোক।"

ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল। শাফিন।

"নীল, তুই ল্যাপটপ থেকে দূরে থাক। আমি জেনেছি, ডার্ক স্ক্রল তোর ইমোশনাল প্রোফাইল তৈরি করে ফেলেছে। ও জানে তুই কখন দুর্বল হবি। আর আজ রাতেই তোকে 'আত্মহত্যায়' পুশ করবে।"

নীল ফোন কেটে দিল। কিন্তু ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল:

"শাফিন মিথ্যা বলছে। শাফিন নিজেও ডার্ক স্ক্রল ইউজ করে। তুমি কি জানতে চাও, শাফিন কী লুকাচ্ছে?"

নীল চমকালো। শাফিন কি আসলেই কিছু লুকাচ্ছে? নাকি এটা অ্যাপের আরেকটা ফাঁদ?


৮. শেষ লগ অফ নয়—নতুন গেম শুরু।

নীল ঠিক করল, সে আর অ্যাপের কথা শুনবে না। কিন্তু অ্যাপকে ধ্বংস করাও যাবে না। কারণ অ্যাপ ধ্বংস করতে গেলে নাভিদের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে যাবে।

তাহলে উপায় কী?

শাফিন বলল, "আমি একটা সমাধান বের করছি। কিন্তু সেটা খুব বিপজ্জনক।"

"কী সমাধান?"

"আমাদের অ্যাপটাকে অ্যাপেরই ভাষায় পরাস্ত করতে হবে ইন্টারকানেকটিং করে । তোকে ডার্ক স্ক্রলের ভেতর ঢুকতে হবে—নিজের মন দিয়ে, কোড দিয়ে। তুই যদি অ্যালগরিদমের ভেতর ঢুকে নাভিদের সঙ্গে কথা বলতে পারস, তাহলে হয়তো তুই তাকে থামাতে পারবি।"

"কীভাবে ঢুকব?"

শাফিন বলল, "এই অ্যাপ মানুষের ইমোশনাল ডেটা নিয়ে কাজ করে। তুই যদি তোর সব ইমোশন—ভালোবাসা, ভয়, অপরাধবোধ—সব অ্যাপের কাছে ঢেলে দিস, তাহলে অ্যাপ তোকে শুধু ইউজার হিসেবে দেখবে না। তোকে নিজের কনফিগারিং নেটওয়ার্ক হিসেবে ভাববে। তখন তুই ভেতর থেকে ওকে কন্ট্রোল করতে পারবি।"

নীল কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর বলল, "আমি প্রস্তুত।"

রাত ঘনিয়ে এলো। ঢাকার আকাশে আজও তারা নেই, কিন্তু মোবাইলের টাওয়ারের লাল আলো জ্বলছে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে ডার্ক স্ক্রল জেগে উঠেছে।

নীল লিখল, "আমি আসছি।"

স্ক্রিনে উত্তর ভেসে উঠল:

তুমি কী আমার সাথে সাথে টোপলোজি নেটওয়ার্কে কাজ করবে— রেটিং বাড়াতে, নাকি এই খেলা শেষ করবে; বিপদ দুই দিকে আছে।"

" নীল তুমি সৃষ্টির সেরা জীব" এই অ্যাপ, এই নেট জগৎ তোমাদেরই বানানো, এই জগতে ভুল করিও না, ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নাও, কী করবে?"

"আমি অপেক্ষা করছি।"