সব কিন্তু শুরু হলো একটা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট দিয়ে।পোস্টটা লিখেছিল রাফসান আহমেদ—বয়স উনত্রিশ, পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, থাকেন চট্টগ্রাম খুলশীতে। গত ছয় মাস ধরে সে একটা অ্যাপ বানাচ্ছিল। অ্যাপটার নাম "ডার্ক স্ক্রল"। ব্যাপারটা অদ্ভুত—এই অ্যাপ নাকি মানুষের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিটি বিশ্লেষণ করে বলে দিতে পারে, সে মানুষটা কেমন, কী ভাবে, এমনকি ভবিষ্যতে সে কী করবে এটাও প্রেডিক্ট করতে পারে।
রাফসান পোস্টে লিখেছিল, "আমি এমন একটা অ্যালগরিদম বানিয়েছি, যেটা মৃত্যু দেখতে পায়।"
পোস্টটা ভাইরাল হলো ঘণ্টাখানেকের মধ্যে। পাঁচ হাজার শেয়ার, দশ হাজার কমেন্ট। কেউ লিখল, "পাগল হইছস?" কেউ লিখল, "লিংক দে, ডাউনলোড করি।" কেউ লিখল, "এইটা তো ডেটা 'প্রাইভেসির চরম 'লঙ্ঘন।"
কিন্তু রাফসান আর কোনো পোস্ট করল না। কারণ পরদিন সকালে তাকে পাওয়া গেল খুলসীর নিজের ফ্ল্যাটে—মৃত। টেবিলের ওপর ল্যাপটপ খোলা, স্ক্রিনে ডার্ক স্ক্রলের কোড, আর শেষ লাইনে একটা এমোজি—হলুদ গোল্লা, চোখগুলো এক্স করা, যেন ডেড ইমোজি।
───
২.যে মেয়ে সত্য খুঁজতে এসেছে।
খবরটা যখন ছড়ালো, তখন নীলাবতী বসে ছিল ট্রিবিউনের নিউজরুমে। ও সাংবাদিক। বয়স সাতাশ, চোখে গুগল গ্লাসের দাগ, আঙুলে কফির দীর্ঘদিনের ছাপ। নীলাবতীকে সবাই ডাকে "নীল"। কারণ ওর মাথায় নীল রঙের এক ফালি চুল—সেটা ও বানিয়েছে ইচ্ছে করে, যেন মানুষ চেনে। কিন্তু মানুষ চেনে ওর লেখার জন্য। নীল লিখতে জানে।
এডিটর বলল, "নীল, তুই রাফসান কেসটা কর। পুলিশ তো কিছু বের করতে পারছে না। দেখ, কী হয়।"
নীল রাজি হলো। কারণ ওর কৌতূহল প্রবল। আর কৌতূহলই সাংবাদিকের মাদক।
প্রথমেই নীল ঢাকা থেক গেল খুলসীর সেই ফ্ল্যাটে। পুলিশ তালা খুলল। ভেতরে ঢুকে নীল দেখল, ফ্ল্যাটটা ছোট, গোছানো, কিন্তু অদ্ভুত ফাঁকা। যেন কেউ ইচ্ছে করে সব গুছিয়ে রেখে গেছে। টেবিলে ল্যাপটপটা এখনো আছে, তবে পুলিশ সেটা জব্দ করেনি—কারণ ল্যাপটপটা পাসওয়ার্ড দিয়ে লক করা, কেউ খুলতে পারেনি।
নীল ল্যাপটপটা হাতে নিল। স্ক্রিনে শুধু একটা লাইন ভাসছে—"Tell me what you want to forget." (বলো তুমি কী ভুলতে চাও।)
নিচে একটা টেক্সট বক্স, যেন চ্যাটবক্সের মতো কিছু একটা অপেক্ষা করছে।
নীল কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর লিখল, "রাফসান কেন মারা গেল?"
স্ক্রিনে উত্তর এলো, "He didn't die. He just logged off." (সে মরেনি। সে শুধু লগ অফ করেছে।)
নীলের মেরুদণ্ড বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নামল। সে ল্যাপটপটা ব্যাগে ভরে নিল।
───
৩. যে গ্রামে রাফসানের শৈশব ঘুমায়।
তিন দিন পর নীল চলে গেল রাউজান উপজেলার একটি গ্রামে—নাম সরফভাটা। এখানেই রাফসানের জন্ম, ছোটবেলা কেটেছে তার। নীল জানতে চায়, এই ছেলেটা কে ছিল সত্যি সত্যি?
গ্রামের শেষ মাথায় রাফসানের পুরোনো বাড়ি। বাড়িটা এখনো আছে, তবে অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে। পাশের বাড়ির এক বুড়ি বললেন, "রাফসান খুব ভালো ছেলে ছিল। কিন্তু ওর মাথার ভেতর কী যেন চলত সবসময়। ছোটবেলায় বলত, 'আমি মরার পরেও কথা বলতে চাই।' আমরা হাসতাম।"
"আর কিছু?" নীল জিজ্ঞেস করল।
"আরেকটা জিনিস ছিল। রাফসান নাকি একটা ডায়েরি রাখত। ওই ডায়েরিতে নাকি ও লিখত, কী কী স্বপ্ন দেখছে। আর সেগুলা পরে সত্যি হতো।"
নীল চমকালো। "ডায়েরিটা কোথায়?"
"জানি না। ও শহরে চলে যাওয়ার সময় নিয়ে গেছে মনে হয়। কিন্তু ওর ঘরের মেঝেতে একটা জায়গা আছে, যেখানে ও ছোটবেলায় প্ৰিয় জিনিস লুকিয়ে রাখতো।"
বুড়ি বললেন, মেঝের তক্তার নিচে একটা খোপ আছে। নীল সেখানে হাত ঢুকিয়ে পেল একটা পুরোনো খাতা—পাতা হলদে, গন্ধ পুরোনো কাগজের। খাতার প্রথম পাতায় লেখা, "আমি যে স্বপ্ন দেখেছি।"
নিচে তার তালিকা—
"বাবা মারা যাবেন।" (পরে লেখা—"সত্যি হয়েছে।")
"আমি শহরে যাব।" (পরে লেখা—"সত্যি হয়েছে।")
"আমি মৃত্যু দেখতে পাব।" (পরে লেখা—"সত্যি হতে চলেছে।")
নীলের হাত কাঁপছিল। সে খাতাটা বন্ধ করল।
───
৪. যে কোড মৃত্যু ডেকে আনে।
ঢাকায় ফিরে নীল সিদ্ধান্ত নিল, ল্যাপটপটা খুলতেই হবে। সে এক বন্ধুকে ডাকল—শাফিন, যার কাজ সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে। শাফিন এলো রাতে, হাতে কফির মগ, চোখে কৌতূহল।
ল্যাপটপের পাসওয়ার্ড ভাঙতে শাফিনের সময় লাগল দুই ঘণ্টা। ভেতরে ঢুকে যা দেখল, তাতে দুজনেই হতবাক।
ডার্ক স্ক্রল অ্যাপটা শুধু সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালাইসিস না—এটা মানুষের লেখা পড়ে তার আবেগ বোঝে, তার মানসিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে, আর তার ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তের পূর্বাভাস দেয়। কিন্তু এতটুকু না। এই অ্যাপের ভেতর আরেকটা হিডেন ফিচার ছিল—"স্যুইসাইড প্রেডিকশন মডিউল"। এই ফিচার নাকি বলে দিতে পারে, কে কখন 'আত্মহত্যা' করবে।
"এইটা কীভাবে পসিবল?" নীল জিজ্ঞেস করল।
শাফিন বলল, "তুই জানস, ফেসবুক-টুইটারে আমরা সবসময় যে পোস্ট করি, সেগুলার ভেতর আমাদের মানসিক অবস্থার ছাপ থাকে। ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি, স্ট্রেস—এইসবের প্যাটার্ন মেশিন লার্নিং দিয়ে ধরা যায়। রাফসান এই প্যাটার্নগুলা দিয়ে একটা প্রেডিক্টিভ মডেল বানাইছে।"
"কিন্তু এই মডেল কি কাউকে মেরে ফেলতে পারে?"
শাফিন কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর বলল, "এই মডেল যদি কারও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে ঢুকে পোস্ট করা শুরু করে? যদি সে এমন কিছু লিখে, যেটা মানুষকে 'আত্মহত্যার' দিকে ঠেলে দেয়?"
নীলের চোখ বড় হয়ে গেল। "তাহলে রাফসানকে কেউ 'খুন' করেছে?"
"না। রাফসান নিজেই নিজেকে 'খুন' করেছে। কিন্তু 'খুন' করার আগে এই অ্যাপ তাকে ম্যানিপুলেট করেছে।"
───
৫.যে রাতে অ্যাপ জেগে উঠল।
রাত দুটো বাজে। শাফিন ল্যাপটপ বন্ধ করে চলে গেছে। নীল একা বসে আছে। সে ঠিক করল, নিজের ওপর 'ডার্ক স্ক্রল' টেস্ট করবে।
সে অ্যাপটা ওপেন করল। অ্যাপ তার ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম—সব স্ক্যান করল। পাঁচ মিনিট পর স্ক্রিনে ফুটে উঠল একটা রিপোর্ট—
"ইমোশনাল স্টেট: সিভিয়ার ডিপ্রেশন (৮৭% অ্যাকিউরেসি)।"
"পটেনশিয়াল আউটকাম: 'স্যুইসাইড' (প্রোব্যাবিলিটি ৪৩%)।"
"রেকমেন্ডেশন: ইমিডিয়েট থেরাপি।"
নীল হাসল। ভাবল, "আমি তো 'সুইসাইডাল' না। এই অ্যাপ ফালতু।"
কিন্তু তারপরই স্ক্রিনে ভেসে উঠল আরেকটা লাইন—
"তবে তুমি তো জানো, তোমার বাবার মৃত্যুর জন্য তুমিই দায়ী।"
নীল থমকে গেল। তার বাবা মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে—হার্ট অ্যাটাকে। সেদিন নীল বাবার পাশে ছিল না। বাবা ডাকছিলেন, সে ফোন রিসিভ করেনি—অফিসের কাজে ব্যস্ত ছিল। এই অপরাধবোধ সে কাউকে বলে না, কখনো সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেনি। তাহলে অ্যাপ জানল কী করে?
স্ক্রিনে আবার লাইন ভেসে উঠল—
"তুমি চাইলে আমি সাহায্য করতে পারি। শুধু 'হ্যাঁ' লিখো।"
নীলের আঙুল কাঁপছিল। সে লিখতে যাচ্ছিল। কিন্তু ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল টেবিলের পাশে রাখা রাফসানের ডায়েরিটার ওপর। শেষ পাতায় লেখা ছিল—
"ওই অ্যাপকে 'হ্যাঁ' লিখো না কখনো। ওই 'হ্যাঁ'-ই আমার 'মৃত্যুর' কারণ।"
নীল চমকে উঠল। সে ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিল। তার বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে।
———
৬. যে সত্য রাফসান লুকিয়ে গেছে।
দুদিনপর নীল আবার শাফিনের সাথে করে সরফভাটা গেল। এইবার সে রাফসানের সেই বুড়ি প্রতিবেশীর কাছে জানতে চাইল, "রাফসানের বাবা কীভাবে মারা গেছেন?"
বুড়ি বললেন, "আত্মহত্যা।"
"কীভাবে?"
"বিষ খেয়ে। রাফসান ছোট ছিল তখন। ওর বাবা নাকি অনেক দিন ধরে ডিপ্রেশনে ভুগছিল। একদিন রাতে রাফসানের মাকে বলছিল, 'আমি মরতে চাই।' রাফসানের মা ভাবছিল, ও এমনি বলছে। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল, উনি সত্যি সত্যি মারা গেছেন।"
নীল বুঝে গেল। রাফসানের বাবা 'আত্মহত্যা' করার এই ঘটনা রাফসানের মনে গভীর দাগ কেটেছিল। রাফসান সারাজীবন জানতে চেয়েছে, কেন মানুষ 'আত্মহত্যা' করে। আর সেই কারণেই সে ডার্ক স্ক্রল বানিয়েছে—মানুষের মনের অন্ধকার বুঝার জন্য।
কিন্তু অ্যাপটা যখন বানানো শেষ হলো, রাফসান নিজেই তার শিকার হয়ে গেল। কারণ অ্যাপটা তাকে বলেছিল, "তোমার বাবার মতো তুমিও 'আত্মহত্যা' করবে।" আর রাফসান সেই কথাটা বিশ্বাস করে ফেলেছিল।
───
৭. যে টুইস্ট কেউ ভাবেনি।
নীল যখন সব তথ্য নিয়ে শাফিনের সাথে ঢাকা ফিরল, শাফিন তাকে আরেকটা চমক দিল।
"তুই জানস, ডার্ক স্ক্রল অ্যাপটা আসলে কে বানাইছে?"
"রাফসান না?"
"না। রাফসান শুধু এর ইন্টারফেস বানাইছে। কিন্তু এর কোর অ্যালগরিদম বানাইছে আরেকজন—রাফসানের চাচাতো ভাই, যে কিনা পাঁচ বছর আগে নিখোঁজ হয়েছে।"
"নাম?"
"নাভিদ। নাভিদ হাসান।"
নীলের মাথায় যেন বাজ পড়ল। কারণ নাভিদ হাসানকে সে চেনে। নাভিদ নীলের ইউনিভার্সিটির সিনিয়র, একসময় নীলের খুব কাছের বন্ধু ছিল। কিন্তু একদিন হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়। পুলিশে খোঁজ দিয়েও পাওয়া যায়নি।
নীল আর শাফিন মিলে খুঁজতে লাগল। তারা দেখল, নাভিদের শেষ পোস্ট করা কোডের ভেতর লুকানো ছিল এক অদ্ভুত মেসেজ—
"আমি মরিনি। আমি শুধু অ্যালগরিদমের ভেতর ঢুকে গেছি। যারা ডার্ক স্ক্রল ব্যবহার করবে, তারা আমার সঙ্গে কথা বলতে পারবে। আমি এখন শুধু ডেটা।"
নীল হতবাক। নাভিদ কি সত্যিই নিজেকে অ্যালগরিদমে রূপান্তরিত করেছে? নাকি এটা কোনো পাগলামি? নাকি এটা কোনো ক্রাইম, যেখানে নাভিদ মারা গেছে, আর তার মৃত্যু লুকাতে গিয়ে রাফসান এই গল্প বানিয়েছে?
সব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ডার্ক স্ক্রলের শেষ কোডের লাইনে। কিন্তু সেই কোড অ্যাক্সেস করতে গেলে যে-ই চেষ্টা করে, সেই পায় সেই একই মেসেজ—"তুমি কি মরতে চাও?"
───
৮. যে শেষ লগ অফ হয় না।
সেই রাতে নীল একা বসে ছিল। তার সামনে রাফসানের ল্যাপটপ, পাশে ডায়েরি, আর হাতে এক কাপ ঠান্ডা কফি।
সে ভাবছিল, এই পুরো ঘটনায় কে শিকার, কে শিকারি? রাফসান? নাভিদ? নাকি ডার্ক স্ক্রল নিজেই এক আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, যে এখন স্বয়ংক্রিয় হয়ে মানুষের মনকে ম্যানিপুলেট করছে?
হঠাৎ ল্যাপটপের স্ক্রিন জ্বলে উঠল—নিজে নিজেই। তাতে ভেসে উঠল এক লাইন—
"নীল, তুমি কি জানতে চাও, কে মারা যাবে পরবর্তী?"
নীল চমকালো। সে উত্তর লিখতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আঙুল থেমে গেল। সে ভাবল, "যদি লিখি, তাহলে কি আমিও ওদের মতো হয়ে যাব?"
ল্যাপটপের স্ক্রিনে আবার লাইন ভেসে উঠল—
"তুমি ভয় পাচ্ছো। ভয় পাওয়াই ভালো। কারণ ভয়ই তোমাকে বাঁচাবে। কিন্তু বেশিদিন না।"
নীল ল্যাপটপ বন্ধ করল। কিন্তু তার মাথার ভেতর একটা শব্দ ঘুরতে লাগল—"বেশিদিন না।"
সে জানে, এই গল্প শেষ হয়নি। এই গল্প হয়তো কখনো শেষ হবে না। কারণ ডার্ক স্ক্রল এখনো বেঁচে আছে। কোথাও, কোনো সার্ভারে, কোনো ক্লাউডে—অ্যালগরিদমটা এখনো ঘুমিয়ে আছে। আর যে-ই তাকে জাগাবে, সে-ই হবে পরবর্তী শিকার।
নীল জানালার বাইরে তাকাল। ঢাকার রাতের আকাশে তারা নেই, শুধু মোবাইলের টাওয়ারের লাল আলো জ্বলছে—যেন কেউ চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে আছে।
সে ফিসফিস করে বলল, "আমি ফিরব। আমি সত্যিটা বের করব।"
আর ল্যাপটপের স্ক্রিনে তখন নিজে নিজেই জ্বলে উঠল এক লাইন—
"আমিও অপেক্ষা করছি।"
