১.
মাদ্রাসার ছাত্র রহমানের বয়স ১৩। পরনে সবসময় পুরনো সাদা কুর্তা, পায়ে ছেঁড়া স্যান্ডেল, আর বাঁ চোখটা ইচ্ছে করে একটু টেরা রাখে। যাতে ভন্ড মৌলভী কাসেমের "কুদৃষ্টি" না পড়ে।
একটু পাগলাটে স্বভাবের সারাক্ষন পকেটে একটা কাঠের চামচ থাকে— যেটা দিয়ে সে মাথা চুলকায়, থুতনিতে ঠুকঠুক শব্দ তোলে, কখনো বা শূন্যে পিঁপড়ের লাইন আঁকে।কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে আগে চামচটা দিয়ে মাথা চুলকায়, তারপর অপ্রাসঙ্গিক কিছু একটা বলে বসে—যেমন, “নিম গাছের বোটানিক্যাল নাম আজাদিরাক্টা ইন্ডিকা।”
গ্রামের লোকে তাকে ‘পাগলা রহমান’ বলে ডাকে। কিন্তু মাদ্রাসার ছোট ছাত্ররা তাকে ভালোবাসে। কারণ রহমান তাদের পিঁপড়াদের লাইন ধরে মার্চ করায়, তেলাপোকার পিঠে সুতো বেঁধে "পেঁয়াজি হুজুরদের উড়তে" দেখায়। তারা হাসে, রহমানকে খুব আপন ভেবে হাসে।
তবে রহমানের পাগলামির নিচে যে জ্ঞান লুকিয়ে আছে, তা খুব কম মানুষই জানে। একজনই একটু আধটু জানে, নাম হাফেজ আব্বাস।
হাফেজ আব্বাস—একসময়ের প্রখ্যাত আলেম, যিনি এলাকার প্রভাবশালী মৌলভী কাসেমের ভণ্ডামি টের পেয়ে মাদ্রাসা ছেড়ে পুরনো মসজিদের এক কোণে সাদামাটা জীবন কাটাচ্ছেন। ছোট্ট একটা দোকান নিয়ে।
আর তিনিই মূলত রহমানের মধ্যে সত্যর আগুন দেখেছিলেন। মাঝে মাঝে বলে, “তোর মাথার ভেতর আল্লাহ এমন এক আলো জ্বালিয়ে দিয়েছেন, যা অনেক বড় বড় আলেমেরও থাকে না।”
সেই থেকে রহমান প্রতি রাতে পুরনো মসজিদে যায়। হাফেজ আব্বাস তাকে শেখান কুরআনের তাফসির, হাদিসের ব্যাখ্যা, ফিকহের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মাসআলা। রহমানের মাথায় সেসব এমনভাবে গেঁথে যায়, যেন সে জন্ম থেকেই জানে। তিন মাসের মধ্যে সে মুখস্থ করে ফেলে ইমাম গাজ্জালির ‘ইহইয়া উলুমিদ্দিন’-এর পুরো প্রথম খণ্ড। ছয় মাসে শেখ সাদির ‘গুলিস্তাঁ’র ফারসি কবিতার অনুবাদ করে বাংলায়। হাফেজ আব্বাস অবাক হয়ে বলেন, “তুই পাগল না, রহমান। তুই তো এক মহা জ্ঞান-পাগল।”
কিন্তু এসব জ্ঞান সে প্রয়োজন ছাড়া কাউকে দেখায় না। কারণ সে জানে, জ্ঞান দেখাতে গেলে অহংকার বাড়ে। তাই সে চামচ ঘষে, টেরা চোখে তাকায়, আর পিঁপড়েদের সাথে কথা বলে। অথচ তার ভেতরে প্রতিদিন গেঁথে যাচ্ছে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর তীব্র ইচ্ছা—ঠিক যেন কুরআনের সেই আয়াত তার রক্তে মিশে গেছে:
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়ের পতাকা বহনকারী হিসেবে দাঁড়াও, সাক্ষী থাকো সুবিচারের। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের সুবিচার থেকে বিচ্যুত না করে। সুবিচার করো, এটাই তাকওয়ার নিকটতর।” (সূরা মায়েদা: ৮)
২..
মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক মৌলভী কাসেম সাহেবের ঘরটা সবার কাছে রহস্য। দরজায় বড় তালা, জানালায় কালো পর্দা। রাতে সেই ঘর থেকে ভেসে আসে চাপা কান্নার আওয়াজ। কেউ জিজ্ঞেস করলে কাসেম সাহেব বলেন, এটা ‘বিশেষ তালিমের আওয়াজ’।
একদিন আট বছর বয়সী রিয়াদ রহমানকে নির্জনে ডেকে নিল। চোখে ভয়, গলা কাঁপা। ফিসফিস করে বলল, “রহমান ভাই, আপনার সাথে একটা কথা আছে।”
“বল।”
“রাতে হুজুরের ঘরের পেছনে ভূতের নাচ হয়।”
“ভূত নাচে?”
“হুম, দেয়ালে ছায়া দেখি দুইটা। একটা বড়, একটা ছোট। ছোটটা কাঁদে আর বড়টা নাচে।”
রহমানের বুকের ভেতর ঢেউ ওঠে। চামচটা পকেটে নিজে থেকেই কাঁপতে থাকে।
এক নিঝুম রাতে রহমান চুপিচুপি সে জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয়। যা দেখে, তাতে তার রক্ত হিম হয়ে যায়।
ছেলেটার নাম ফয়সাল, বয়স ১১, মাদ্রাসার সবচেয়ে লাজুক ছেলে— এখন দেয়াল থেবড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর কাসেম হুজুর তার দিকে ঝুঁকে আছেন। এক হাতে ফয়সালের ঘাড় চেপে ধরা, অন্য হাত চলে গেছে পাজামার ভেতরে। ফয়সালের মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না, শুধু ঠোঁট ফ্যাকাসে হয়ে কাঁপছে, আর চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। দেয়ালের সাদা টালিতে নখের আঁচড় কেটে আছে—যেন কোনো বন্দী পাখির ডানার শেষ ঝাপটানি।
আর একটু পর পর হিংস্র কাসেম বলে উঠে, “চুপ, এটা তা’লিমের অঙ্গ।” একটাসময় কাসেম গলা নিচু করে, সাপের মত হিসহিস শব্দ করে। “ নড়িস না, নড়লে জাহান্নামের আগুন, জানিস তো?” এই কথা কাউকে বললেও "তোকে জাহান্নামে যেতে হবে"। কারণ আমি তোর হুজুর, এটা তোর খেদমত।
রহমান দেখল, ফয়সালের শরীর কাঠ হয়ে গেছে। তার নিজের মুঠোয় চামচটা এত জোরে চাপা পড়ল যে কাঠ গরম হয়ে গেল।
এরপর থেকে সে দেখে প্রতি সকালে যে ছাত্ররা কাসেমের ঘর থেকে বেরোয়, তাদের চোখ থাকে ফোলা, ঠোঁট কামড়ানো, জামা এলোমেলো। তারা হাঁটতে পারে না ঠিকমতো। কেউ কেউ প্রস্রাব করে ফেলে ভয়ে। কারো পায়জামা রক্তাক্ত। আর রহমানের চামচটা তখন পকেটে কেঁপে ওঠে—যেন বলতে চায়, “আর নয়।”
৩..
রহমান প্রথমেই হাফেজ আব্বাসের কাছে গেল। পুরনো মসজিদের ভাঙা মিম্বরে বসে সব শোনাল। হাফেজ আব্বাস চোখ বন্ধ করে অনেকক্ষণ চুপ রইলেন। তারপর বললেন, “সাক্ষ্য লাগবে, বাবা। কাসেম এলাকার প্রভাবশালী। মুখের কথায় কিছু হবে না।”
“আমি যোগাড় করব।”
“কীভাবে?”
রহমান চামচটা মাথায় ঘষতে ঘষতে বলল, “পিপড়ার লাইন ধরে যেমন খাবার খুঁজে পাওয়া যায়, তেমনি সত্যিও খুঁজে পাওয়া যায়—যদি সত্যর লাইনে চলা যায়।”
রহমানের পরিকল্পনা ছিল সহজ। ভন্ড কাসেম প্রতিদিন রাতে নিজের ঘরে ছেলেদের ডেকে তার অপকর্মের ভিডিও করেন—‘তাফসির সিরিজ’ নাম দিয়ে। সেই ভিডিও তিনি নির্জনে দেখেন আর পাশবিক আনন্দ নেন। আর সেই ফোনটা সবসময় উনার তোষকের নিচে থাকে ।
এর ভিতর রহমান মার থেকে টাকা নিয়ে এক বোতল লাল রং এর কৌটা কিনলো।
গভীর রাতে কাসেম হুজুরের ঘরের দরজার সামনে পিঁপড়ের লাইন আঁকল— এটা তার পাগলামির ছদ্মবেশ। তারপর দরজার নিচে লাল রঙের ছিটা ফেলে আসে যেন রক্তের ফোঁটা।
দেয়ালে লিখে রাখে কুরআনের আয়াত: “তারা মনে করে তারা চতুরতা করছে, অথচ তারাই নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনছে, কিন্তু তারা বোঝে না।” (সূরা বাকারা: ৯)
পরদিন সকালে পুরো মাদ্রাসায় গুঞ্জন ওঠে। কাসেম সাহেব দরজার খুলে থমকে যান। দেয়ালে আয়াত দেখে তাঁর হাত কাঁপে। ফিসফিস করে বলেন, “জ্বিনের আসর। বিশেষ আমল করতে হবে।”
ভয় পেয়ে সেই রাতেই ভন্ড কাসেম তোষকের নিচ থেকে ফোনটা বের করে বারান্দার একটা টবে পুঁতে রাখেন। রহমান গাছের আড়াল থেকে সব দেখে। কাসেম চলে গেলে সে চামচ দিয়ে মাটি খুঁড়ে ফোন বের করে আনে। ফোনের স্ক্রিন ভাঙা, কিন্তু অক্ষত।
৪..
রহমান ফোনটা নিয়ে গেল নবাব ভাইয়ের কাছে। নবাব ভাই এলাকার মোবাইল মেকানিক সাথে ইউটিউবারও—ভুয়া হুজুর আর ভুয়া ওয়াজের সমালোচনা করে ভিডিও বানান, কিন্তু ভিউ কম। রহমান ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “তোমার জন্য নতুন কিছু, ভণ্ডামির রহস্য এটার ভেতরে আছে, নবাব ভাই।”
নবাব ভাই ফোন রিকভার করলেন, কিন্তু ফাইলগুলো পাসওয়ার্ড চাচ্ছিল। রহমান চামচ ঘষতে ঘষতে বলল, “ট্রাই করো ‘নাউজুবিল্লাহ’। কারণ উনি বিপদে এটাই বেশি বলেন, আর নিজের ঘৃণ্য কাজকেও এই শব্দে ঢাকেন।”
নবাব ভাই অবাক। ফোনের পাসওয়ার্ড 'নাউজুবিল্লাহ' বসাতেই ফোন ফাইল আনলক হলো। ভেতরে ‘তাফসির সিরিজ’ নামের ফোল্ডারে ভরা, ছোট ছোট ছেলেদের উপর পাশবিক অত্যাচারের ভিডিওতে। নবাব ভাই কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “এটা তো মানুষ না, শয়তান।”
রহমান শান্ত গলায় বলল, “শয়তানও তো একসময় আল্লাহর দরবারে ইবাদত করত, নবাব ভাই। তারপর অবাধ্য অহংকার পেয়ে বসেছিল। কাসেমও তাই— অবাধ্য অহংকারী। আর আল্লাহ অহংকারীকে পছন্দ করেন না।”
নবাব ভাই কষ্টে চোখ মুছলেন। “তুই এত জানিস কী করে?”
“জানি না কিছু। শুধু পিপড়ের লাইন ধরি।” রহমান চামচটা নবাব ভাইয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে হাসল। “আগামী সপ্তাহে কাসেমের একটা মাহফিল আছে, তখন সব খোলা হবে।”
৫..
মাহফিলের দিন মাঠ লোকে লোকারণ্য। কাসেম সাহেব সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, কাঁধে চাদর, দাড়ি পাকা, চোখে কাজলের টান। মিষ্টি গলায় ওয়াজ করছেন: “হে যুবক আল্লাহর ভয়ে কাঁদো! জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে কাঁদো!”
মানুষ কাঁদছে। ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি ভেসে আসছে। কাসেম সাহেব রুমাল দিয়ে চোখ মুছছেন—সেই বিখ্যাত পেঁয়াজি রুমাল, যা দিয়ে তিনি কৃত্রিম চোখের জল ফোটান।
ঠিক তখন মাইকে গোলমাল। এক কোণ থেকে রিয়াদ আর ফয়সাল মিলে মাইকের তার খুলে দিয়েছে। রহমান উঠে দাঁড়ায়। তার হাতে চামচ। টেরা চোখ সোজা করে তাকিয়ে সে মাইকের সামনে আসে। নবাব ভাই বড় স্ক্রিনে লাইভ চালু করে দিলেন।
কাসেম সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাকান। “এটা কী হচ্ছে?”
রহমান চামচ দিয়ে মাথা চুলকায়। তারপর বলে, “হুজুর, আপনার ওয়াজ শুনছিলাম। আপনি বললেন, কাঁদতে। কিন্তু কাঁদার আগে আমার কিছু প্রশ্ন আছে।”
“প্রশ্ন?” কাসেম হুজুর হাসেন। “আরে তুই তো পাগল।”
“জ্বি, পাগল। কিন্তু পাগলেরও প্রশ্ন থাকে।” রহমান চামচটা সামনে বাড়িয়ে ধরে।
“হুজুর, সূরা নিসার ১৬ নম্বর আয়াতটা একটু পড়বেন? আল্লাহ সেখানে পাপীদের তওবার কথা বলেছেন।
কিন্তু তার আগে ১৫ নম্বর আয়াতে এও বলেছেন, "তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা অশ্লীল কাজে লিপ্ত, তাঁর শাস্তি প্রদানের আগে চারজন সাক্ষী উপস্থাপন করো।" সাক্ষী চারজন চান আল্লাহ। অথচ আপনি তো বলেন, আপনার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে তাকে জাহান্নামে যেতে হবে।
তাহলে আল্লাহর আইনের সাথে আপনার আইন মিলছে না কেন?”
মাঠে ফিসফিস শুরু হয়। কাসেমের মুখ লাল হয়ে ওঠে। “তুই কুরআনের অপব্যাখ্যা করছিস!”
“অপব্যাখ্যা?” রহমান চামচটা ঘোরায়। “তাহলে আসুন একটু তাফসির করি। সূরা হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াত পড়ি: ‘হে ঈমানদারগণ! যদি কোনো পাপী তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তা যাচাই করো।’ মানে আল্লাহ বলছেন, সত্য যাচাই করতে। আর আপনি? আপনি তো ছোট ছেলেদের বলেছেন, ‘নড়লে জাহান্নামের আগুন’—এটা কোন কিতাবে পেলেন, এটা তো তাফসির না, হুজুর, এটা তো ভয় দেখানো।”
জনতা ভন্ড কাসেমের অপকর্ম দেখতে রাগে গোঙাতে থাকে। কাসেম মাইক ধরে চিৎকার করেন, “এসব জ্বিনের প্রভাব! এই ছেলেকে জ্বিনে ধরছে, এ পাগল, এরে ধরো!”
কিন্তু তখনই একে একে রিয়াদ, ফয়সালসহ আরো অনেকে ছুটে আসে। কাঁদতে কাঁদতে মাইকের সামনে এসে বলে, “আমার সাথেও... আমার সাথেও উনি... সেই ‘তাফসির সিরিজ’...”
“ফয়সাল!” ভন্ড কাসেমের গলা তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। “তোর বাবা তোকে মেরে ফেলবে, আমার বিরুদ্ধে কিছু বললে !”
“না, মারবে না।” রহমানের গলা এবার নরম, কিন্তু পাথরের মতো শক্ত। “কারণ এখন আমরাই সাক্ষী। চারজন না, চল্লিশজন না, হাজার হাজার সাক্ষী। আর আল্লামা ইবনে তাইমিয়া লিখেছেন, ‘যখন অপরাধ প্রমাণিত হয়, তখন অপরাধীকে আর মুখ লুকানোর সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।’”
নবাব ভাই লাইভে অপ্রীতিকর দৃশ্য ব্লার রেখে ভিডিওর কিছু কিছু অংশ দেখাতে শুরু করেন। প্রথমে কিছু লোক বুঝতে পারে না। তারপর এক বৃদ্ধ চিৎকার করে ওঠেন, “এ কী! এই ভন্ড শয়তানের মুখে কেন কোরানের বাণী, এতো ধর্মের সাথে বেঈমানী করছে, এ তো শয়তান!”
জনতা গর্জে ওঠে। কিছু লোক এগিয়ে আসে কাসেমকে মারতে । কিন্তু রহমান চামচ উঁচিয়ে থামায়। “থামেন! কুরআনে আছে—‘অন্যায়কারীকে তোমরা মারো না। কারণ আল্লাহ বলেন, সুবিচার করো, এটাই তাকওয়ার নিকটতর।’ একে পুলিশে দিন। ওর শাস্তি আইন আদালত ঠিক করবেন। আমরা যেন ঘৃণায় অন্ধ না হই।”
জনতা থমকে যায়। সেই বৃদ্ধ বললেন, “এই পাগলা ছেলের চোখে মুখে কী সত্য, আল্লাহর বাণী কী জ্বলজ্বল করে ! আল্লাহর কী ইশারা!”
পুলিশ আসে। কাসেমকে গ্রেপ্তার করার সময় আচমকা তাঁর পাকা দাড়ির এক কোণ সরে যায়। নিচ থেকে বেরিয়ে আসে কালো রং করা আসল দাড়ি। পকেট থেকে পড়ে যায় পেঁয়াজ কাটা রুমাল—যে রুমাল দিয়ে তিনি ওয়াজের আগে কৃত্রিম চোখের জল ফোটাতেন।আর তার এসব ভণ্ডামি দেখে হাসি ও ঘৃণার এক অদ্ভুত মিশ্রণে মাঠ কেঁপে ওঠে।
৬..
পরে, যখন সব শান্ত হয়, হাফেজ আব্বাস মাইকে নিয়ে বলেন, “ইসলাম এদের মত দুষ্কৃতীকারীদের থেকে মুক্ত। আজ একটি পাগলা ছেলে আমাদের দেখিয়ে দিল, সত্যকে কিভাবে দাঁড় করাতে হয়। আর সে শুধু কুরআনের আয়াত পড়েনি, সে বুঝিয়েছে—ইসলামের আসল সৌন্দর্য হচ্ছে সুবিচার, প্রতিশোধ না। যেখানে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ইবাদত, আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সবচেয়ে বড় তাকওয়া।”
রহমান তখন পেছনে দাঁড়িয়ে। তার মা পেছন থেকে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরেন। রহমান চামচটা মায়ের পিঠে আলতো করে বোলায় আর ফিসফিস করে বলে, “আম্মা, আল্লাহ বলেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনকে সহজ করেছেন।’ সহজ মানে— ভালো মানুষ হতে হবে, এই তো।”
একটা ছোট বাচ্চা ছুটে এসে বলে, “রহমান ভাই, আপনি কি পাগল?”
রহমান চামচটা বাচ্চাটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে হাসে। “যা, এটা তোকে দিলাম। যখন খুব ভয় পাবি, চামচ দিয়ে মাথা চুলকাস। দেখবি, ভাবনা আসবে। আর ভাবনা এলেই সত্যিটা খুঁজে পাবি। সত্যিই তো কুরআন বলেছে—সুবিচারই তাকওয়া।”
৭.
গভীর রাত। সব শান্ত। রহমান পুরনো মসজিদে ফিরে গেছে। হাফেজ আব্বাস তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোর এত জ্ঞান এল কোথা থেকে?”
রহমান হাসল সুন্দর চোখে। চামচটা নেই—সেটা তো সে বাচ্চাটাকে দিয়ে দিয়েছে। তাই সে এবার খালি হাতে মাথা চুলকালো। “জানি না। তবে একটা স্বপ্ন দেখি প্রায়ই।”
“কী স্বপ্ন?”
“একটা অন্ধকার ঘর। সেখানে একটা ছেলে বসে আছে। তার চোখটা উজ্জ্বল সুন্দর । কিন্তু সে হাসছে না, কাঁদছে। আর তার পাশে বসে থাকা একজন বুড়ো তাকে বলছেন, ‘পাগলামিই তোর অস্ত্র। জ্ঞান তোর ঢাল। আর যখন সময় আসবে, তুই একা থাকবি না। কারণ আরও একজন আছে, যে জানে।’”
হাফেজ আব্বাস চুপ করে গেলেন। অনেকক্ষণ পর বললেন, “আর কে জানে?”
“জানি না। তবে আজ ভন্ড কাসেম যখন গ্রেপ্তার হলো, তার চোখে আমি অদ্ভুত কিছু দেখলাম। সে ভয় পেয়েছে—কিন্তু আমাকে দেখে না। সে ভয় পেয়েছে অন্য কাউকে দেখে।”
“কাকে?”
রহমান জানালার বাইরে তাকায়। চাঁদের আলোয় মাদ্রাসার ছাদে কেউ দাঁড়িয়ে আছে—স্থির, নিথর, যেন পাথরের মূর্তি।
“তাকেই,” রহমান ফিসফিস করে বলে। “যে এতদিন আমাকে দেখছিল। আর আজ নিজেকে দেখাল।”
ছাদের মানুষটা ধীরে ধীরে নেমে আসে সিঁড়ি দিয়ে। হাফেজ আব্বাস তাকে দেখে থমথমে গলায় বলেন, “এটা তো... তুই...!”
রহমান হাসে। সেই অদ্ভুত হাসি—যেন সে আগে থেকেই সব জানে। “জ্বি, হুজুর। আমার পাগলামির পেছনে আরও কেউ ছিল। যে আমার চেয়েও বেশি জানে। যে আমাকে শিখিয়েছে, জীবন মানে পুরোটাই জ্ঞান, আর সত্যকে জানার আগ্রহ। আর যে আজ নিজেকে প্রকাশ করল।”
একটা সত্য, আলো, জ্ঞান, বিশ্বাস আর ঈমান নিয়ে সে এগিয়ে আসে। হাফেজ আব্বাসের চোখ বিস্ফারিত। “এটা কিভাবে ?”
“এটা আমার অন্তর্যামীর ছায়া আমার বিবেক বোধ আমার ভিতরের আসল শিক্ষক। যার কথা আমি কাউকে বলিনি। যে আমাকে শিখিয়েছে— সত্য আর জ্ঞান একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।”
অন্তর্যামীর ছায়াটা হাসে। তার মুখে চাঁদের আলো পড়তেই বোঝা যায়—নির্মল চোখ। হুবহু রহমানের মতো দেখতে, কিন্তু বয়সে যেন একটু বড়। সে বলে, “আমি থাকি আকাশের উপরে, রহমান। কিন্তু আজ থেকে তোমার সাথেই থাকব। কারণ কাজ তো শেষ হয়নি। কাসেম তো শুধু শুরু। ওর পেছনে আরও বড় শয়তান আছে।”
রহমান মাথা নাড়ে। “জানি। ওই যে কাসেম গ্রেপ্তারের সময় বারবার বলছিল, ‘আমার পিছে লোক আছে আমাকে রক্ষা করবেন।’ কে সেই ‘তিনি’?”
রহমান আব্বাস হুজুরের দিকে তাকিয়ে বলে, “সেই তো আমাদের আসল টার্গেট। যে বা যারা আমার ধর্মকে খাটো করতে চাই, যারা আমার ধর্মের নৈতিক সৌন্দর্য থেকে আড়াল করতে চাই। তাঁদের মুখোশ উম্মচন করবোই।
–
