Sajidullah Farhad

The Bengali Storyteller

 মানুষ থেকে বেরিয়ে 'অমানব' হতে চাইনি—   তবুও হলাম, এই স্বীকারোক্তি নিয়ে আছি আমি অস্তিত্বের ‘জরুরি বিভাগে’। নির্ভুল 'ময়নাতদন্ত...

মুক্তগদ্য: আত্মার-অটোপসি।

 মানুষ থেকে বেরিয়ে 'অমানব' হতে চাইনি—  

তবুও হলাম, এই স্বীকারোক্তি নিয়ে আছি আমি অস্তিত্বের ‘জরুরি বিভাগে’।

নির্ভুল 'ময়নাতদন্ত' হবে আজ জীবন্ত শবের উপর..

তাই শুয়ে আছি সমাজ-ব্যবচ্ছেদ নামক আত্মার 

'অটোপসি' টেবিলে!

নিথর দেহ; ডাক্তার হাতে 'স্ক্যালপেল', চোখে অদ্ভুত 

করুণা নিয়ে—

বললেন, “এটা তোমার একার দেহ নয়;

এটা গোটা সমাজের ‘মাইক্রোকজম’, যেখানে 'পচনকে ‘সভ্যতা’ বলে চালানো হয়।

"চল.. একটু গভীরে খতিয়ে দেখি —”


এই বলে ডাক্তার আমার চোখের লেন্স চিমটে ধরে মণি আলাদা করে বললেন,

এই যে দেখছো, চোখের লেন্সে হলুদের ছোপ; 

এটা জন্ডিস নয়; এটা ‘ঈর্ষার ক্যাটারাক্ট’।

তোমার রেটিনায় আটকে আছে: 

প্রতিবেশীর বেতনবৃদ্ধির স্লিপ, বন্ধুর বিদেশযাত্রার ছবি, সহকর্মীর পদোন্নতির মেইল।

তোমার এই চোখ পরের সাফল্যে পুড়েছে শুধু নিজেরই "অপটিক নার্ভ"। 

এখন তুমি আর ‘আলো’ দেখতে পাও না, দেখো শুধু 'অগ্নিপাত’।


তারপর ডাঃ মেরুদণ্ডের বায়োপসি করাতে, দেহটা উল্টে মেরুদণ্ডের ওপর স্ক্যালপেল চালালেন।

— “আহা, এই দেখো! এটা তো মেরুদণ্ড নয়, যেন এক টুকরো ‘জেলি’।" 

এত নরম কেন জানো? কারণ তুমি কখনো কোনো নীতির পক্ষে দাঁড়াওনি।

শক্তিশালী লোকটা ভুল করলে, মেরুদণ্ড গুটিয়ে বলেছ 

‘জি স্যার, অসাধারণ!'

দুর্বল লোকটা সত্য বললে, মেরুদণ্ড বাঁকা করে ভিড়ের সাথে চুপ থেকেছ।

এই মেরুদণ্ডের ভেতর শক্ত কোনো ‘হাড়’ নেই, 

শুধু ভর্তি ‘ভাবনাময় তরুণাস্থি’— যেখানে গায়ের জোরে বাঁকানো যায়, নিজের স্বার্থের দিকে।

এটা ‘স্কোলিওসিস অফ সোল’— আত্মার বাঁকা রোগ। 


এরপর তিনি কর্ণের গহ্বর অটোস্কোপ ঢুকিয়ে কানের ভেতরটা বড় পর্দায় প্রজেক্ট করলেন।

এই যে মধ্যকর্ণ— জমাট বাঁধা ‘পরনিন্দার রজনীগন্ধা’র মোম'।

তুমি কখনো কারও কষ্টের কাহিনি পুরোটা শোনোনি;

মাঝপথেই তোমার মস্তিষ্ক সেই কষ্টকে ‘মজার গল্পে’ 

বদলে দিত।

আর এই যে ককলিয়া, যার কাজ শরীরের ভারসাম্য রাখা— সেটাতো একেবারেই 'ধ্বংস'। 

কারণ তুমি নিজের বিবেকে ভারসাম্য রাখোনি। 

এক পাশে ‘রাজ'নৈতিক দলের অন্ধভক্তি’, আরেক পাশে ‘নিজের অক্ষমতার জ্বালা’—

এই সংঘর্ষে কান বছরের পর বছর ‘ভার্টিগো অফ ভ্যালুজ’-এ ভুগেছে।”


তারপর ডাঃ জিহ্বার পেশি কেটে ক্রস-সেকশন দেখালেন।

—“জিহ্বা তো আগেই দেখেছি। কিন্তু এখন বলছি, এই পেশিগুলো ‘দ্বিধাবিভক্ত’।

একদিক বলে ‘জয় হোক সত্যের’, অন্যদিক বলে ‘জয় হোক আমার’।

কেমন তুমি? সামনের মানুষটার সাথে কথা বলো 

জিহ্বায় ডগায় মধু ঢেলে, আর পেছনে শার্প লুকানো থাকে একটা ধারালো ক্ষুর'। 

এই দুইয়ের ভিতর সম্পর্কের মূল্য ক্ষত'বিক্ষত করে, তুমি ভাবো ‘মানুষটাই খারাপ’।”


এরপর তিনি আমার ডান হাতটা তুলে ধরলেন।

— “এই তালুতে রেখা তিনটে— আয়ুষ্করেখা, মণিবন্ধরেখা, হৃদয়রেখা।"

কিন্তু এগুলো আর ‘রেখা’ নেই, এগুলো ‘ফাটল’। 

কারণ তুমি হাত মেলিয়েছ শুধু তাদের সাথেই, যাদের হাতে কিছু ‘নেওয়ার’ আছে। 

তুমি করমর্দন করেছ বন্ধুত্বের নামে— অথচ ভেতরে হিসেব কষেছ ‘এই লোকটা আমাকে কতটুকু উপরে তুলতে পারবে’?

কিন্তু এই হাত তো আর হাত নেই, এটা লেনদেনের হিসাবখাতা। 

যেখানে আত্মীয়তার স্পর্শ তো দূর অস্ত, 

তুমি তো বন্ধুত্বকেও ছুঁয়েছ ‘নখ’ দিয়ে, ‘আঙুল’ দিয়ে নয়।”


সর্বশেষ সিরিঞ্জ দিয়ে অস্থিমজ্জা বের করে তিনি রঙ দেখে চমকালেন!

— “আরে এটা তো ‘সাদা মজ্জা’ নয়, এটা ‘ধূসর’; "ইথিকসের অ্যানিমিয়া" হয়েছে তোমার।

তোমার রক্তরসে এমপ্যাথি’র কণিকা শূন্য, 

প্লাজমায় ভাসছে ‘অপরের দুঃখে উল্লাস’— যাকে বলে ‘স্ক্যাডেনফ্রয়েড টক্সিন’। 

আপসোস!! এইসবের ভিতর তুমি জীবনের আসল রঙ দেখতে পাওনি, 

দেখেছ শুধু তিনটে রঙ— টাকার সবুজ, হিংসার হলুদ, আর অহংকারের বেগুনি।”


পরিশেষে আমি অটোপসি টেবিল থেকে জিজ্ঞেস করলাম, “ডাক্তার, আমি কি একা এই শহরে এমন?”

ডাক্তার রক্তমাখা দস্তানা খুলে ফেলে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

জানালা দিয়ে নিচের রাস্তায় আলো জ্বালানো ফ্লাইওভার, ফুটপাথে হাঁটা মানুষ, দোকানের সারি দেখিয়ে বললেন,

দেখো, ওই যে মানুষগুলো হাঁটছে— 

ওদের সবার চোখে হলুদের ছোপ, সবার মেরুদণ্ড জেলি, সবার জিভে ক্ষুর, রক্তে স্ক্যাডেনফ্রয়েড টক্সিন।

তোমার আর ওদের মধ্যে শুধু একটাই তফাত—


তুমি আজ 'অটোপসি' টেবিলে শুয়ে নিজের 'পচনটা' পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছ।

ওরা কখনো নিজের 'পচনটা' দেখতে পায় না, তাই ওরা ভাবে ‘আমি সুস্থ’।

আর এই ‘সুস্থ’ ভাবানার ভিতরে.. ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে— ‘মেটাস্টাসিস -ক্যানসার’।”







0 Comments: