শীত কুয়াশার আঁচলে ঢাকা গ্রাম- সকাল সকাল ঘুম ভেঙ্গে বারান্দায় দাঁড়াতে অনিকের চোখে পড়ল লাল জবায় স্নিগ্ধ শিশির ঝুলছে মুক্তোর মত। অনিকের ঠাণ্ডা অনুভূত হতে ঘরের ভিতরে গিয়ে শাল জড়িয়ে পুনরায় বারান্দায় দাঁড়াতেই খানিক আগ মুহূর্ত দেখা জবা ফুলটি নেই আর; রীতিমতো উদাও হয়ে গেল!
অনিক অবাক হয়ে চারদিক তাকাতেই দেখে এক উর্বশী রমণী মেরুন রঙের শাল গায়ে খোঁপায় জবা ফুল গুঁজে হেঁটে যাচ্ছে ধীরে ধীরে- অনিক পিছন থেকে ডাকতে লাগলো এই যে কে আপনি? দাঁড়ান বলছি! কিন্তু রমণী একটুও কর্ণপাত করল না হাঁটতে লাগলো আপন গতিতে। অনিক হাঁটার গতি বাড়িয়ে পিছন থেকে বার বার ডাকতে লাগল; রমণী শুনেও না শুনার ভান করে মৃদু মৃদু পায়ে কুয়াশার ভিতর হারিয়ে গেল।
অনিক অনেক খুজেও আর পায়নি, কে এই রমণী কেনইবা তার বাগান থেকে জবা নিয়ে কিছু না বলে এইভাবে অদৃশ্য গন্তব্যে মিশে গেল। এতো ছন্দ নিয়ে হাঁটে যে রমণী যার গড়নে ফোটে অস্পষ্ট নদীর ঢেউ, মোহনা দেখিয়ে চোখের সামনে থেকে কেন হারিয়ে গেল এমন অপলক।
অনিক ফিরে এসে বারান্দায় দাঁড়াতে চোখ পড়ল জবা গাছে যে ফুলটি ছিল না একটু আগে, সে ফুলটি ঠিকঠাক ঝুলছে। অনিক বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে তার সাথে। Change Blindness এর সমস্যা হলে তো এমন হবার কথা না হয়তো ফুল নেই বা আছে এইটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধতা থাকতো। কিন্তু সাক্ষাৎ একটি রমণী যার পরনে নীল শাড়ি তার উপর মেরুন রঙের শাল জড়ানো- যেন শীতের সকালে পৃথিবীর সব সৌন্দর্য নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, সেতো মিথ্যে হতে পারে না।
অনিক বুঝতে পারছে না তার হ্যালুসিনেশনের সমস্যা হচ্ছে কিনা? কিন্তু তারতো ঘুম থেকে শুরু করে সবকিছু ঠিকঠাক হচ্ছে তাহলে এমন বিভ্রান্তি কেন হচ্ছে। রমণী ফুল নিয়ে চলে গেছে বা কুয়াশার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেছে ব্যপারটা মানা যায়। কিন্তু ফুল নেই; ফুল আছে। এইটা সত্যি অনিকের কাছে রহস্যের চেয়ে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে।
অনিক চা বানিয়ে বারান্দায় দাঁড়াতে মনে মনে জোর দিয়ে ভাবল যেন জবা ফুলটি উদাও হয়ে যায়, কিন্তু না জবা ফুলটি ঠিকই দুলছে সকালের সোনালী রোদে। অনিক বার বার চোখ ফিরিয়ে আবার তাকায় কিন্তু জবা ফুলটি আর অদৃশ্য হয় না। অনিক ভুলতে চাইছে খুব- স্ট্র্যাপ স্যান্ডেল পরা রমণী যার হাঁটার মধ্যেই যেন প্রকৃতির এক শিল্প লুকিয়ে আছে, যার কোমল আবরণে ঢাকা চাঁদের গল্প যেন কুয়াশার মত নরম স্নেহপূর্ণ প্রতিচ্ছবি আঁকা। এমন রমণী যার কালো কেশে লাল টকটকে জবা ফুল শোভা পায়। সে চোখের পাতায় অদৃশ্য হলেও মনের ঘরে বার বার উঁকি দিয়ে ফিরে আসে। যদি ফিরে তাকাতো রমণী একবার যদি দেখা হত তার কোমল রোদে সকালের আলোর মত মুখখানি।
---
অনিক; অনিক ওঠো ওঠো শব্দে-- অনিকের ঘুম ভাঙল; স্বপ্নের ঘোর কেটে অনিক বুঝতে পারছে না কে ডাকছে? চারপাশে দেয়াল, ফ্লোরে শুয়ে আছে তার মত আরও অনেক 'আসামী যারা কেউ 'খুন করছে কেউবা বড় কোন অপরাধ!! অনিকও 'খুন করে জেলের ভিতর বিচারিক প্রক্রিয়ায় অপেক্ষার প্রহর গুনছে 'ফাঁসির । অনিক উঠে বসতে দেখে লোহার শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে পূর্ণিমা যার অস্পষ্ট মুখটি দেখতে স্বপ্নের ভিতর হাঁসফাঁস হয়ছিল খুব সে দাঁড়িয়ে আছে সেলের বাহিরে ভেজা চোখে। এতো অপরুপ এতো মায়াভরা সুন্দর মুখ নিয়ে কেউ যদি সেলের গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে এই কারাগারে আজীবন বন্ধি থাকা যায় অনায়াসে।
কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে, 'ভয়ংকর 'অপরাধীদের সাথে সীমিত সময়ের জন্য প্রিয়জনদের সাথে দেখা মিলে।
অনিক অনেক কষ্টে উঠে পূর্ণিমার কাছকাছি দাঁড়ালো গ্রিলে হাত রেখে। পূর্ণিমার খোঁপায় জবা ফুল দেখতে জিজ্ঞেস করল?
তুমি কি এইখানে আসার আগে আমার বাগানে গিয়েছ জবা ফুল তুলতে?
হুম্ম!
তোমার একদম ঠিক হয়নি; এই ফুলই তো তোমার সর্বনাশ এর কারণ হল।
যে ফুল একবার ঝরে যায় অনিক! সে ফুলের আর ঝরার ভয় থাকে না, আমি না হয় ঝরে গেলাম কিন্তু তুমি কেন আমার জন্য তোমার জীবনটা শেষ করে দিলে।
পূর্ণিমা আমি একজন 'ধর্ষককে 'খুন করছি, আর এই 'খুনে আমার নিজের কাছে কোন 'অপরাধবোধ কাজ করে না।
অনিক আমার কারণে কেন তুমি শাস্তি পেতে হবে?
পৃথিবীর কোন 'ধর্ষকের বেঁচে থাকার অধিকার নাই! আমার যদি ক্ষমতা থাকতো পুরো পৃথিবীর 'ধর্ষকদের 'খুন করতাম! তার জন্য যদি হাজারবার 'মরা লাগে 'মরতে রাজী আছি।
অনিক আমার ক্ষত বিক্ষত ঝরে পড়া ফুলটাকে কী তুমি এখনও ভালোবাসো? যাকে সমাজের এক প্রভাবশালীর রাজপুত্র হেসে হেসে 'ধর্ষণ করছে তোমার বাগান থেকে জবা নিয়ে খোঁপায় গুজতে যাওয়ার পথেই,, আহা কুয়াশা ঢাকা ছিল তখন চারিদিক আমার 'চিৎকার কেউ শুনেনি সেদিন, একজন 'ধর্ষকের হাত পশুর মত অনেক হিংস্র হয়,, থামিয়ে দেয় নিরীহ প্রানের 'আর্তনাদ।
প্লিজ! প্লিজ পূর্ণিমা আমি শুনতে চাই না আর, শুনতে চাই না; শুনতে চাই না,, তুমি থামবে পূর্ণিমা তুমি থামবে!
অনিক এমন কেন করছ আমিতো অনেক আগে 'মরেই গেছি, আমার এখন কোন কিছুতে কোন আক্ষেপ নাই। আচ্ছা অনিক তুমিতো আমাকে কোনদিন দেখনি; যতদিন তোমার বাগানে গেছি মুখ ঢেকে যেতাম; তোমার কত ইচ্ছে ছিল আমাকে দেখার, আর যেদিন তোমাকে আমার চন্দ্র মুখের শোভা দেখাতে চেয়েছি সেদিনি আমি 'ধর্ষিতা হলাম।
পূর্ণিমা থাম তুমি; থাম! তোমাকে আমার ভিতর লালন করেছি পাখির মত, তোমাকে চিনতে চাঁদকে দেখেছি সারারাত,, তোমার চুলে শোভা দিতে জবা গাছের যত্ন নিয়েছি প্রতিদিন।
অনিক ভয়ানক আঁচড়ের দাগ শরীরে বেশি দিন থাকে না, কিন্তু ক্ষত বিক্ষত এই মন থেকে এই দাগ কোনদিন যায় না! শরীর যে মনের বোঝা এই বয়ে বেড়ানো যায় না,, তুমি যে রুপে আমাকে এখন দেখছ এইটা তোমার কল্পনার রুপ, তোমার কল্পনা থেকে আমি আরও বেশি সুন্দর ছিলাম। কিন্তু নিয়তি তোমাকে কোনদিন আমার সুন্দর মুখ দেখতে দেয়নি,, দেখো সবাই হাসছে তুমি সেলের গ্রিল ধরে আমাকে কল্পনা করে কথা বলছ দেখে, আমি বরং চলে যায় অদৃশ্য জগতে যে জগতে কষ্ট কিংবা দুঃখ নাই।
না পূর্ণিমা যেও না! দেখো, তোমার জন্য কারাগারের দেয়ালে জবা ফুল এঁকেছি আঙ্গুলের নখ ক্ষত বিক্ষত করে। ফিরে আসো তুমি, ফিরে আসো। একটাবার শুধু একটাবার তোমার খোঁপায় জবা ফুল গুঁজে দিয়ে দেখতে চাই, আমি!

0 Comments: