পর্ট-১, মোল্লা বাজার।
কীয়ান নৈশিক যার বাড়ির অল্প দূরত্বেই মোল্লা বাজার, এই বাজার মূলত জমে উঠে শনিবারে, গ্রামে সাধারণত এই জমে উঠা বাজারকে হাট-বার বলে, গ্রামের প্রতিটি বাজারে সপ্তাহে দুইদিন বিশেষ হাট বসে । মোল্লা বাজারের হাট হচ্ছে শনি ও বুধবার।
আজ শনিবার, দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসবে হরেক রকম জিনিস নিয়ে-- নলখাগড়ার মাদুর (যা গ্রামে ধাড়ি-পাতার বিছান হিসেবে পরিচিত) হাঁস-মুরগি, মাটির হাঁড়ি-পাতিল, খাঁচা, ঢালা- কুলা, মুড়ি-মুড়কি, খই, নাড়ু, মসলা, শাকসবজি, মৌসুমি ফল ইত্যাদি।
হাট'বারে লোক সমাগম বেশি হয় বলে; তখন হাটে গেলে এক অদ্ভুত গুঞ্জন শোনা যায় । কল্পকাহিনী অথবা হতে পারে লোকগল্প, প্রতি হাট-বারে নাকি জ্বিনরা আসে বাজার-সদাই করতে! তখন যদি একযোগে সব জ্বীন বাজারে নামে, সেদিন বাজারের কোলাহল স্বাভাবিক থেকে অনেকগুন্ বেড়ে যায় । গ্রামে আবার এইসব নিয়ে অনেক মিথও আছে।
কীয়ান নৈশিক, সাইকোলজি আর সোসিওলজি উপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে অনেকদিন পর বাজারের চায়ের দোকানে বসে নীরবে ভাবছে অতীতের সব কথা। শনিবারের এই হাটে জড়িয়ে আছে তার অনেক স্মৃতি। নৈশিকের বন্ধু অধ্বৈত, রিশান ও রুজান এর সাথেও অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই হাটকে ঘিরে, যারা সবাই আলাদা পাড়া বা মহল্লার হলেও, আড্ডা হতো এই মোল্লা বাজারে। বিশেষ করে অধ্বৈতের সাথে ঘটে যাওয়া 'প্যারালাল ঘটনার কথা মনে পড়লে নৈশিক এর বুকে এখনও রক্তক্ষরণ হয়। এমন কোন দিন নাই যে তার এই কঠিন স্মৃতির কথা মনে পড়েনি। একটা তাজা প্রাণ এই ভাবে হারিয়ে গেল তাদের জীবন থেকে, মেনে নিতে পারেনি নৈশিক কোনোদিন। কীভাবে কি হয়ে গেলো আজো তার সঠিক সুরাহা মিলেনি।
পার্ট -২, নওমী কইন্যরী ।
নৈশিক ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে গেলো নওমী কইন্যরীর কথা-- যাকে শুধুমাত্র শনিবারের হাটে দেখা যেত কিছু না কিছু বিক্রি করতে। উঠতি বয়সী এই তরুণী, যাকে দেখলে মনে হতো জাফরান কিংবা চন্দন দিয়ে স্নান করেছে সবেমাত্র। যেমন সুন্দরী তেমন ছিল লাজুকতা ভরা চালচলন। মাত্রাধিক সুন্দরের কারণে অনেকেই কইন্যরীকে মনে করতো পরী অথবা ভিন গ্রহের কেউ।
মনে করার কারণও আছে বটে, কইন্যরী যে বাড়িতে থাকত বাড়িটা অনেকটা প্রত্নতাত্ত্বিক ভৌতিক টাইপ জমিদার বাড়ির মতই ছিল, চারিদিক গাছগাছালিতে বাড়িটি যেন সারাক্ষণ কোন এক কৌতূহলে ডুবে থাকত। ভূ-সংস্কার ও জমিদারি প্রথার অবসানে হয়ত হারিয়ে গেছে কইন্যরী বংশীয় পরম্পরা; তাই কইন্যরীর জগত-সংসার এখন খুবই সীমিত, সব হারিয়ে সাথে আছে একটা ছোট ভাই আর বৃদ্ধা মা।
আজ থেকে প্রায় ১৪ বছর আগের কথা অধ্বৈতের বয়স তখন উনিশ কি বিশ, আর নওমী কইন্যরী যার বয়স পনেরো হবে নয়তো একটু বেশি। এই উড়ন্ত বয়সে একটা মেয়ে বাজারে আসা, তার উপর বেপরোয়া সুন্দরী, সব মিলিয়ে কইন্যরীকে বাজারে আসা-যাওয়া নিয়ে অনেক কাঠখড় পোহাতে হতো। কিন্তু কইন্যরীর চেহারায় কখনো সেই ভয়-ভীতির চাপ বোঝা যেত না।সবসময় একদম সাবলীল থাকত, কারো দিকে প্রয়োজন ছাড়া তাকাত না। তবে, প্রয়োজনের বাইরে শুধু অধ্বৈতের দিকেই তাকাতো। আর তাতেই বাঁধে যত বিপত্তি, কারণ এলাকার 'রক্ত গরম 'ছাত্রনেতারা এইটা নিয়ে অধ্বৈতকে অনেক 'হুমকি 'ধামকিও দিত। হুমকি দেয়ার আরও অনেক কারণ আছে, কারণ এই অধ্বৈতের কারণে এলাকার বখাটেরা কইন্যরীর কোন ক্ষতি করতে পারত না। আর বখাটে গ্রুপের লিডার ছিল চেয়ারম্যান এর ছেলে পর্ণব।
অধ্বৈত ছিল নৈশিকের বন্ধুদের মধ্যে সব থেকে সাহসী আর বিচক্ষণ; আর রিশান ছিল একটু আত্মকেন্দ্রিক আর সুযোগ সন্ধানী, ওইদিক থেকে রুজান ছিল বাস্তববাদী আর মেয়ে-বিদ্বেষী।। অধ্বৈত কইন্যরীর প্রতি এত মহানুভবতা রুজান ভাল চোখে দেখত না তেমন -- তারপরেও কোন সহযোগিতা চাইলে এগিয়ে আসতো। সেদিন শনির হাটে কইন্যরী শীতল পাটি বিক্রি করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে যায়, তাই অধ্বৈত তার বন্ধুরা মিলে সিদ্ধান্ত নিল কইন্যরীকে বাড়ি পোঁছে দিয়ে আসবে। অবশেষে, আশেপাশে অনেক বখাটে ছেলের উৎপাত উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত কইন্যরীকে বাড়ির সামনে নিয়ে আসলো। এসে সবাই একটু অবাক হল বাড়ির সামনে ফুলের বাগানে কোন ফুলের গাছ নাই-- নতুন করে ফুলের চারা রোপণ করতে হয়তো মাটি উর্বর করতে উৎখনন করা হয়ছে।।
…ভাবতে ভাবতে নৈশিকের অন্য একটা কথা মনে পড়ে গেল-- বন্ধুদের মধ্যে অধ্বৈত ছিল অনেক স্টাইলিশ অ্যান্ড ম্যানলি লুকের যার দরুন গভীর জলের মেয়েরা অধ্বৈতের প্রেমে হাবুডুবু খেত। তখন বন্ধুরা সবাই লেদারের ওয়ালেট ব্যাবহার করলেও অধ্বৈত ব্যাবহার করত লেদার মুড়ানো মেটালের ওয়ালেট; তার আরেকটা কারণ ও একটু দিকভ্রান্ত ছিল, ঠিকানা ভুলে যেত! তাই তার মামার বাড়ির একটা ঠিকানা ওয়ালেট যত্ন করে রাখতো সবসময়, যদিও লেদারের ওয়ালেট অত অরক্ষিত নই! আর এইটা নিয়ে সব বন্ধুরা অনেক হাসাহাসি করত, ঠিকানা রাখার এই অদ্ভুত কাণ্ড নিয়ে-- অধ্বৈত মোটেও কর্ণপাত করত না তাতে।
পার্ট-৩, অধ্বৈত নেই কোথাও!
সেদিন শনির হাটে কইন্যরী আসেনি, অধ্বৈতও যেন কিছু একটা লুকচ্ছে কিন্তু বলতে পারছে না।। নৈশিক জিগ্যেস করলে বলে-- জানিনা কেন আসেনি? এক পর্যায়ে নৈশিক চেয়েছিল কইন্যরীর বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিতে কিন্তু অধ্বৈত রাজি হয়নি, শেষ পর্যন্ত সবাই যার যার মত চলে গেল।
…পরদিন সকালে বন্ধুরা সবাই মোল্লার বাজারে এলো কিন্তু অধ্বৈত আসেনি। অধ্বৈতের বাড়ি গিয়েও খোঁজ করে পাওয়া যায়নি; তার মাকে জিগ্যেস করতেই বলে, আমিতো ভাবছি ও তোমাদের সাথে ছিল রাতে! এই বলে অধ্বৈতের মা চিৎকার করে উঠলো, আমার ছেলে কই? কই গেছে আমার ছেলে, অধ্বৈতের বাড়িতে কান্নার শোরগোল পড়ে গেল।
নৈশিক তার বাকি বন্ধুরা তন্নতন্ন করে সব জাগায় খুঁজতে লাগলো কোথাও খোঁজ পেল না , অবশেষে মনে হল তাদের কইন্যরীর বাড়িতে গিয়ে একবার খোঁজ নেয়া দরকার যদিও অধ্বৈত একা ওই বাড়িতে যাওয়ার কোন কারণ নেই তবুও গেল তারা।।
গিয়ে দেখে একটি ‘উপড়ে ফেলা চোখ ‘রক্তাত হয়ে পড়ে আছে কইন্যরীর ঘরের সামনে সিঁড়ির উপর , নৈশিকের এই দৃশ্য দেখে হাত পা কাপতে শুরু করল !! ভয়ে ভয়ে আবছা লাগানো দরজা খুলতেই দেখে-- পুরো ঘর ‘রক্ত দিয়ে ভেসে আছে, তার উপর একটা ‘কাটা হাত, কালচে ‘রক্তে জমাট বেঁধে পড়ে আছে; হাতে এখনও মুড়ানো আছে অস্পষ্ট একটা ঘড়ি! নৈশিক আর নিজেক স্থির রাখতে পারল না , কি ঘটছে এসব, হচ্ছেটা কি!!...
এরমধ্যই রিশান কেটে পড়ে, নৈশিক আর রুজানের আতঙ্গ আর ভয়ে ঠোঁট শুকিয়ে আসছে, তারা দুজনে অস্পষ্ট কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলছে, না এইটা অধ্বৈত না, অধ্বৈত না-- কিন্তু ঘড়িটা পরখ করতে দেখে নৈশিক চিৎকার করে বলে, এইটা অধ্বৈতের টাগ হেওয়ের ঘড়ি; ম্যানটাহান থেকে ওর বাবা পাঠিয়েছে, এই ঘড়ি, এই এলাকায় আর কারো কাছে নেই।
সকাল গড়িয়ে বিকেল হল; 'পুলিশ এসে ঘেরাও করে দিল বাড়ির চারিদিক-- শোকের কালোছায়া নেমে আসল পুরো এলাকা জুড়ে, সবার মুখে একটি কথা কে করছে এই 'খুন, আর 'লাশ গেল কই? অনেক খোঁজাখুঁজি করেও অধ্বৈতের লাশ পাওয়া গেল না আর।
এলাকায় রটে গেল কইন্যরী নিয়ে নানান কথা, ও মানুষ ছিল না!! ‘প্রেতাত্মা অথবা রাক্ষসি ছিল, অধ্বৈতকে 'মেরে 'ডাইনির মত খেয়ে পালিয়ে গেছে। এরপর আরও 'গুজব ছড়াতে লাগল শনির হাট নিয়ে, কইন্যরীকে নাকি মাঝে মাঝে দেখা যায় এই শনির হাটে । সেইসময়ে শনিবারে সন্ধ্যা হবার আগেই সবাই ঘরে চলে যেত। পুরো মোল্লা বাজার কি এলাকা জুড়ে কইন্যরী নাম ছিল একটা আতংকের ।
রিশান আর রুজানও মনে করত অধ্বৈতকে কইন্যরী ‘খুন করছে, কারণ, কইন্যরী স্বাভাবিক মানুষ ছিল না; ‘সাইকো ছিল ।
একমাত্র নৈশিক মানতে পারেনি এই কথা কিন্তু সমাজ আর মানুষের এই ধারণাকে সেই চাইলেও পালটাতে পারবেনা, তাই চুপ থাকতো সবসময়। বিখ্যাত মনোবিদ সোলোমন অ্যাশ বলছিল, ''অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিরা সঠিক উত্তর জানার পরেও গোষ্ঠীর ভুল উত্তর মেনে নেন শুধু গোষ্ঠীর সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য''। সেক্ষেত্রে নৈশিকের ধারণা, অপরাধ যদি হয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রভাবে তাহলে প্রশাসন থেকে জনগণ সবাই জেনেও না জানার ভান করে থাকে। অধ্বৈত নিশ্চিত ‘খুনের, তবুও আলামত পাওয়া গেছে, কিন্তু কইন্যরী এইভাবে কয় হারিয়ে গেল?
পার্ট -৪, বাস্তবতার উর্ধ প্রনয়।
একটা অমীমাংসিত খুনের কারণ উদ্ঘাটন করতে হয়ত কীয়ান নৈশিক এর সাইকোলজির ও সোসিওলজি উপর পড়াশুনা। যদিও তার প্রিয় সাবজেক্ট ছিল ফিলোসফি।
নৈশিক এর সবসময় মনে হত যে বা যারা খুন করছে সে হয়ত হাত ‘কাটা ঘড়ি রাখার পিছনে এইটাই প্রমাণ করতে চেয়েছে যে এইটা অধ্বৈত যাতে রহস্য বা তদন্ত এইখানে নিষ্পত্তি হয়ে যায়। না হয় এতো দামি ঘড়ি রেখে যেত না। আর গ্রামের মানুষকে সহজে বুঝিয়ে দিয়েছে, রাক্ষস খোক্ষসের গল্প। এইক্ষেত্রে ফ্রয়েডের তত্ত্ব অনেকটাই ঠিক, "মানুষের চিন্তা ও আচরণ তার অবচেতন মন থেকে প্রভাবিত হয়, যা মানুষের সচেতন চিন্তা বা অনুভূতি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা"।
অনেকদিন পর বাড়িতে এসে নৈশিক এইসব ভেবে একটুও ঘুমাতে পারেনি, তার উপর সন্ধ্যায় তার ফুফার লাশ দাফন করে এলো, সব মিলায় নৈশিক বিষণ্ণতা নিয়ে বালিশে মাথা রাখতেই তন্দ্রাই ভেসে উঠলো, কইন্যরীর সেই ফুলবিহীন বাগান আর তার ফুফার ‘কবরের প্রতিছব্বি!! দু’টার মধ্যে কেমন জানি অন্তমিল আছে । নৈশিক লাফ দিয়ে উঠে ঘরের তালা লাগিয়ে বেরিয়ে গেল, এত রাতে বাসায় কেউ থাকলে হয়ত যেতে দিত না, কিন্তু বাসায় কেউ নেই, সবাই গেছে ফুফার বাড়িতে।
রাত তখন বারোটা কনকনে শীতের আবহ, নৈশিক বাড়ির উঠোনে অস্থায়ী রান্নাঘর থেকে ‘খন্তা ‘কোদাল নিয়ে হাটা দিল কইন্যরীর বাড়ির দিকে। অধ্বৈত এর ‘মৃত্যুর পর হয়ত এই বাড়িতে আর কেউ আসেনি, অনেক ঝোপঝাড় আর গাছগাছালিতে বদলে গেছে পুরনো দৃশ্য, কিন্তু বদলায়নি স্মৃতি, আর সেই স্মৃতির হাত ধরেই নৈশিক কইন্যরীর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে একা! বন্ধুত্বের সেই ‘খুনের ক্ষত নৈশিককে ভুলিয়ে দিয়েছে ভয় বলতে কোন শব্দ নেই।
অবশেষে নৈশিক চিন্তা করতে লাগল জমিতে যদি চাষাবাদের জন্য মাটি অদলবদল করে আলগা করা হয়, সেখানে অন্য কিছু ‘পুঁতে রাখলেও তার বৈপরীত্য সহজে ধরা পড়বে না। কিন্তু কইন্যরীর ফুলের বাগান তো ছোট ছিল না-- যারা খুন করছে তারা হয়ত অত বোকা না যে বাগানের মাঝখানে ‘লাশ ‘পুঁতে রাখবে, এই ভেবে নৈশিক ঠিক করল প্রথমে ঘরের দূরত্বে বাম পাশে খনন করবে, তারপর ডান পাশে, নৈশিকের সাইকোলজি হচ্ছে ''যারা অপরাধ করে তাদের ডান আকস্মিকভাবে বাম হয়ে যায়'', হয়ত এইটা সৃষ্টিকর্তার থেকে প্রদত্ত।
এই ভেবে নৈশিক খনন শুরু করল, আর ভাবতে লাগল এত নিখুঁত ভাবে কীভাবে একটা মানুষকে ফুল চাষ করা বাগানে কবর দেয়া যায়? এক বিন্দু রক্তের চিহ্ন ছাড়া, এত নিখুঁত ব্যপারটা একজন দ্বারা হয়নি, একা ‘অপরাধ করতে যে ভয় আর উৎকণ্ঠা কাজ করে, তাতে ভুল হয়-- কাজটা হয়েছে দলবদ্ধভাবে যার কারণে সহজে সেইটা ধামাচাপা পড়ে গেছে।
তন্মধ্যে নৈশিকের এই ভাবনা আকস্মিক পাল্টে গিয়ে ধাক্কা দিল!! আমি হয়ত যেইভাবে ভাবছি তা নাও হতে পারে হয়ত অন্য কোথাও অধ্বৈতের কবর হয়ছে নয়ত ‘রাসয়ানিক ‘তেজস্ক্রিয়তাই মিশিয়ে ফেলা হয়েছে!!
...আনমনে খননের মধ্যে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ খন্তার সাথে ষ্টীল কিংবা ধাতব কিছুর সংঘর্ষ হল। নৈশিক আর কোপ দিল না ধাতব বস্তুটা হাতে নিয়ে দেখে, চামড়া খসে যাওয়া একটা মেটালের ওয়ালেট! নৈশিক টর্চের আলোয় ভালো করে দেখতেই, নৈশিকের চোখে অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো! আর একটি কোপ দিল না যদি অসাবধানতায় অধ্বৈতের ‘হাড়গোড়ে ‘কোপ লেগে ব্যথা লাগে, মাটি ভরাট করে নৈশিক ‘কবর যিয়ারত করে হাঁটা দিল বাড়ির দিকে।
কীভাবে এত ঘাত প্রতিঘাতের ভিতর অধ্বৈত এই ওয়ালেট তার কাছে রেখেছিল, এই রহস্য নৈশিকের জানা নেই, কিছু রহস্য সৃষ্টিকর্তা কোনদিন উদ্ঘাটন করতে দেই না, উনি নিখুঁত রহস্যময়ী । এই সেই ভাবতে ভাবতে নৈশিক ওয়ালেট খুলে দেখে কিছু সেঁতসেঁতে টাকা আর কইন্যরীর সাদা কালো একটা ছবি, মেয়েটা কি অদ্ভুত সুন্দরী ছিল? নৈশিক দুই আঙ্গুল দিয়ে ভিতরে হাতড়াতে বেরিয়ে এলো একটা বাগদানের আংটি, এক টুকরো কাগজ যত্নে রাখা মামার বাড়ির ঠিকানা, যে ঠিকানার দূরত্ব টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া।
নৈশিক জানে না, অধ্বৈতের এই কোন মামার বাড়ি, তবুও যদি বন্ধুর কোন স্মৃতি পাই, যদি পুরনো কোন ছবি, তাই নৈশিক অধ্বৈতের আম্মাকে কিছু না জানিয়ে রওনা দিল শীতের কুয়াশা ঢাকা মামা বাড়ির ঠিকানার পথে-- লঞ্চ, বাস, ট্রেন, রিকশা... অবশেষ পায়ে হেঁটে হেঁটে ঠিকানার দুয়ারে হাজির হল নৈশিক--
…এতদিন পর দীর্ঘ এতদিন পর কইন্যরী, নৈশিককে দেখে চিনতে ভুল করেনি, আকস্মিক এক দমকা হাওয়া লাগলো যেন তার চোখে-মুখে-- কইন্যরী দিশেহারা 'আহত পাখির মত ছুটতে গিয়ে, উনুনে বলক উঠা ভাতের হাড়ি শাড়িতে পেঁচিয়ে, জলসে যেত একটু হলেই!! কিন্তু কইন্যরী জানে না তার আগ-পিছ কি চলছে, অপেক্ষার চোদ্দটি বছরের যে আকুলতা নিয়ে কইন্যরী পথ চেয়েছিল অধ্বৈত আসবে বলে তার এই ঠিকানায়, সে অপেক্ষার তৃষ্ণা নিয়ে কইন্যরী নৈশিক এর সামনে ছুটে আসে ধূমকেতুর মত। কত লক্ষ যুগ অপেক্ষায়মান দুটি চোখ কথা বলেনি-- অভিমান ভিজা চোখে বিড়বিড় করে কইন্যরী নৈশিককে একটাই কথা বলে যাচ্ছিল ''আমার অধ্বৈত কই? ওর না আসার কথা ছিল''?

0 Comments: