Sajidullah Farhad

The Bengali Storyteller

ইমরাজ বেশ কিছুদিন ধরে ফ্যান্টোসমিয়ায় ভুগছে, বিষয়টা অনেকটা ফ্যান্টম স্মেল বা গন্ধজনিত বিভ্রান্তির মত। নিউরোলজিক্যাল বা ডিপ্রেশন কারণে এই সমস্...

ফিকশন: ভাঙা দেয়াল।

ইমরাজ বেশ কিছুদিন ধরে ফ্যান্টোসমিয়ায় ভুগছে, বিষয়টা অনেকটা ফ্যান্টম স্মেল বা গন্ধজনিত বিভ্রান্তির মত। নিউরোলজিক্যাল বা ডিপ্রেশন কারণে এই সমস্যা হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে এলো তার বন্ধুর চেম্বারে।


ইমরাজের বন্ধু ,নাম কাইরু। 

অনেকদিন পর কাইরু ইমরাজকে দেখে অবাক হয়ে বলে, তুই আবার কোন জামেলা নিয়ে আসছস আমার কাছে? কারণ, দুনিয়ার অদ্ভুত যত জামেলা তোর সাথে ঘটবে; জামেলা ছাড়া তুই আমার কাছে আসবি না জানি; এখন বল কি জামেলা নিয়ে আসছস? আর তোকে বলছি আমি একজন অবস্টেট্রিশিয়ান কোন নিউরোলজিস্ট বা সাইকোলজিস্ট না। 


কাইরু তোর মনে আছে একটা জায়গার কথা?

কোন জায়াগার কথা বলছস? নাম না বললে কিভাবে জানবো! 

ওই যে আমরা আগে সন্ধ্যায় আড্ডা দিতাম, একটু অন্ধকার ছিল, পাশে ঝোপঝাড়, কিছু ভাঙ্গা দেয়াল, আমরা ভুতের দুর্গ বলতাম!

মনে পড়ছে ইমরাজ! তা ওইখানে কী হয়ছে হঠাৎ! আর তুই কি এখনও ওই জাগায় যাস?

মাঝে মাঝে সন্ধ্যায় হাঁটতে বের হলে ওই পাশ দিয়ে যায়। কিন্তু ইদানিং ওই জায়গা থেকে অদ্ভুত বিশ্রী একটা গন্ধ পাই, আমি জানিনা এত বাজে গন্ধও পৃথিবীতে থাকতে পারে।..


.. বলিস কী,, কিসের গন্ধ, কিছু মরে পড়ে আছে হয়তো?

না, কাইরু আমি দিনে গিয়েও দেখেছি ওইরকম কিছু দেখি নাই। আর অবাক ব্যাপার হল দিনে গেলে এই গন্ধ আর থাকে না। 

তা তুই কি প্রায় রাতে ওইখানে যাস এখন?

হুম, কাইরু! এই অদ্ভুত গন্ধের হদিস আমাকে বের করতে হবে। 

কি বলিস, তুই না গন্ধ নিয়ে এতো খুঁতখুঁতে এক শার্ট দুইবার পরস না, কারো গায়ের গন্ধ পাবি বলে দূরত্ব নিয়ে থাকস সবমসয়। সে জাগায় তুই এতো বাজে গন্ধ পেয়েও বার বার যাস। বিষয়টা স্বাভাবিক না, আমি তোকে ভালো একজন সাইকোলজিস্ট রেফার করে দিচ্ছি,, আর আপাতত এই ওষুধগুলা নিয়ে যা।


---------


তার পরের দিন সন্ধ্যায় ইমরাজ কাইরুকে নিয়ে এল সেই নির্জন স্থানে। জায়গাটাতে পা রাখতেই ইমরাজ অদ্ভুত সেই গন্ধ আবার অনুভব করে। 

কিন্তু কাইরু? সে কিছুই অনুভব করল না। ইমরাজ অবাক হয়ে তাকে বারবার জিজ্ঞাসা করল, “তুই সত্যিই কোনো গন্ধ টের পাস না?” কাইরু কেবল না বলে মাথা নাড়ল, আর বিড়বিড় করে বলতে লাগলো তুই এইখানে আর আসিস না; আর আসিস না ইমরাজ। 


ইমরাজের কাইরুর এমন আচরণে কৌতূহল তাতে আরো বেড়ে গেল। আশেপাশের পথচারীদের থামিয়ে জিজ্ঞেস করল, কেউ কি গন্ধটা পাচ্ছে? কেউই কিছু টের পেল না।

তবে ইমরাজের মনে হলো, গন্ধটা যেন ক্রমশ তার ভেতরেই বাড়ছে। 

বিভ্রান্ত ইমরাজ, কেন একমাত্র সে-ই এই গন্ধ অনুভব করছে? এই গন্ধ কি তার জন্য কোনো বার্তা, নাকি শুধুই তার মস্তিষ্কের বিভ্রম? 

-------

রাতে ইমরাজ একটুও ঘুমাতে পারেনি, কিছু খেতে গেলে ইমরাজের সেই দুর্গন্ধটা নাকে এসে বারবার ঝাঁঝালো হয়ে উঠে। 

ইমরাজ এদিক সেদিক করতে করতে যখন ঘড়ির কাঁটা রাত বারোটা ছুঁই ছুঁই— ইমরাজ সিদ্ধান্ত নিল তাকে এই গন্ধের রহস্য বের করতেই হবে। 

ইমরাজ কালো চাদর আর টর্চ নিয়ে আস্তে আস্তে বের হল; গেটের কাছাকাছি আসতেই বজলু দারোয়ান বলে উঠে-- ভাইজান এতো রাতে কই যান, এত রাতেতো গেট খুলা যাবে না! 

ইমরাজ বাড়াবাড়ি না করে বলল-- বজলু মিয়াঁ তোমার বউ প্রায় আমাকে ফোন করে তুমি কি কর না কর খোঁজ খবর জানতে ! আমি কিন্তু এখনও বলি নাই তুমি যে পাশের বাসার কাজের বুয়ার পিছে পিছে হাঁট। 

আরে ভাইজান যে কি বলেন! আমিতো মশকরা করছি, আপ্নের লাইগা কী রাত দিন কোন কথা; আপ্নে যখন ইচ্ছা আইবেন যাইবেন। হাহাহা 

ঠিক আছে! আর এইসব করিও না তোমার বউ কিন্তু অনেক ভালো মানুষ। 

ইমরাজ এই বলে হাঁটা ধরল কিন্তু বজলু মিয়াঁর বউ যে ইমরাজরে কল করে কথাটা সত্যি না, কিন্তু বজলু মিয়াঁ বউয়ের আড়ালে যা করে তা কিন্তু সত্যি; তাই হঠাৎ শক খেয়ে বজলু মিয়াঁ ভুলে গেছে বলতে-- আমার বউ আপনার নাম্বার পাইল কই? এইটাকে বলে ‘ডিসোসিয়েটিভ অ্যামনেশিয়া এফেক্ট’ নিজের দুর্বলতার কারণে প্রকৃত কারণ ভুলে যাওয়া।


ইমরাজ ভাবনার স্রোতে ভেসে চলতে চলতে কখন যে ভূতের দুর্গে এসে পৌঁছেছে, সে নিজেই জানে না। চারিদিকে নিকষ কালো অন্ধকার। জনমানবশূন্য, এইখানে এখন ঝিঁঝিঁ পোকার মিহি ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। চারপাশ এতটাই নিস্তব্ধ যে নিজের শ্বাসের শব্দও ভারী মনে হয়।


ইমরাজ ভয়ের অনেক কারণ থাকার কথা। কিন্তু তার জীবন একের পর এক ট্রমার অভিজ্ঞতায় এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে ভয়ের অনুভূতি যেন তার থেকে পালিয়ে গেছে। ভয় নেই বললেই চলে—তবুও আজ কেন যেন শরীরটা শিরশির করছে। তার হাতে টর্চ থাকতেও জ্বালাচ্ছে না। ভেতরের কোথাও একটা ভয়—যদি আলো জ্বালাতেই কোনো অদ্ভুত কিছু সামনে দাঁড়িয়ে থাকে!


এমন সময়, অন্ধকারের নিস্তব্ধতা ভেঙে এক মায়াবী কান্নার আওয়াজ শোনা গেল। রকিম থমকে দাঁড়িয়ে গেল। কান্নাটা কার? মানুষের? নাকি কোনো জীব-জন্তুর? সে বুঝতে পারছে না। কান্নার শব্দ ক্রমশ তীব্র হচ্ছে, যেন কেউ গভীর কোনো ফাঁদে আটকে প্রাণপণে মুক্তি চায়ছে।

ইমরাজের গলা শুকিয়ে আসছে, অথচ তার পা পিছোচ্ছে না। ভেতরের কৌতূহল আর ভয় মিলে তাকে ঘিরে ফেলেছে ভয়ঙ্কর এক বিস্ময়। সামনে কী অপেক্ষা করছে—সে জানে না।


ইমরাজ হঠাৎ এক ভয়ঙ্কর কণ্ঠ শুনতে পেল— ইমরাজ তুই চলে যা ইমরাজ চলে যা!! কিন্তু ভয়ঙ্কর হলেও এই কণ্ঠ ঠিক তার বন্ধু কাইরুর মত—পিছনে ফিরে টর্চ জ্বালাতেই ইমরাজ চমকে উঠে দেখে কাইরু 'স্ক্যালপেল হাতে ধারালো 'ব্লেড!!!! তার হাত থেকে রক্ত ঝরছে ঝরঝর করে –

ইমরাজ কাছে যেতেই দেখে কাইরু ভয়ঙ্কর কণ্ঠে বলতে লাগলো -- কাছে আসিস না ইমরাজ পেট কেটে ফেলব কিন্তু— এইটা বলতেই না বলতেই ভাঙ্গা দেয়ালের ভিতর থেকে ছোট ছোট বাচ্চারা মায়াবী কান্না করে বেড়িয়ে আসার তীব্র চেষ্টা করছে, তার পাশে কিছু 'ভয়ঙ্কর চেহারার নারী যাদের শরীর থেকে 'দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে,, যাদের পেটের 'নাড়িভুঁড়ি পচে তীব্র এই গন্ধ যা ইমরাজ এতদিন পেয়ে আসছে, কিন্তু সেই 'নারীগুলো কেন 'বাচ্চাগুলোকে গলা টিপে মেরে ফেলতে চায়ছে? — ইমরাজের হাত পা কাঁপছে থরথর করে এইসব কী সত্যি ঘটছে,, সত্যি ঘটছে,, কী হচ্ছে এইসব তার চারপাশে!! কখন যে তার হাত থেকে লাইট পড়ে জ্বলে রইল সে নিজেও জানে না। 


কোমল শিশুগুলো তীব্র শক্তি নিয়ে গড়গড় বলতে চাইছে-- আমার বাবা কে? আমাকে কেন মেরা ফেলা হচ্ছে? আমার কি অপরাধ? আমার কি অপরাধ? আমাকে কেন মেরে ফেলছ। আমি বাঁচতে চাই। 


ইমরাজ বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে এইসব এই 'নারীগুলা কেন হাসছে এমন কুশ্রী করে? আহা কি 'দুর্গন্ধ সেই হাসির। রকিমের সেই গন্ধে ধীরে ধীরে হাত পা অবশ হয়ে যেতে লাগলো আর তার চোখে ভাসতে লাগলো,, কাইরু 'রক্তমাখা টাকার বান্ডিল কামড়িয়ে,, 'ব্লেড নিয়ে 'অপরিপক্ক 'অন্তসত্ত্বা মহিলাদের ‘ভ্রূণ ‘হত্যা করে বের করছে প্রেমিক নামক ‘নরপশুর দেওয়া ফুর্তির ফসল, ভুলগুলো ফুলের শরীর নিয়ে প্রতিনিয়ত 'কবর হয় ভূতের দুর্গের ভাঙ্গা দেয়ালের নিচে। 


হঠাৎ অবশ শরীরের ভিতর ইমরাজের কানে ভেসে আসে আজানের সুর, কাল রাতে ঘটে যাওয়া দুঃস্বপ্নের ঘোর তার এখনও কাটেনি তবু নিজেক অনেক কষ্টে টেনে গাছের সাথে হেলান করে ঘুমিয়ে যায় ইমরাজ —সে ঘুম ভাঙ্গে তার সূর্যের আলো যখন এসে চোখে পড়ে— বিষন্ন রাতের স্মৃতি নিয়ে আকস্মিক তার চোখ পড়ল কালো পর্দায় আবৃত এক মা তার ছেলেকে নিয়ে যাচ্ছে মক্তবের দিকে, ছোট হরিণের ছানার মত ছেলেটা এদিক সেদিক করতে করতে ইমরাজের মনে একটাই কথা বলে উঠল- 

‘’সৃষ্টিকর্তার নিয়মের বাহিরে, এই পৃথিবীতে আর কোন নিয়ম নাই; যা দিয়ে পৃথিবী সুন্দর হবে’’।



0 Comments: