ডার্ক স্ক্রল পার্ট- ৩: যে অ্যালগরিদম চেতনাকে বন্দি করে।
১.প্রবেশ।
নীলাবতী(নীল) চোখে হ্যান্ড ট্র্যাকিং ভিআর সেট করল। শাফিন তার মাথায় ইলেকট্রোড বসিয়ে দিয়েছে—ছোট ছোট সেন্সর, যেগুলো নীলের ব্রেনওয়েভ পড়ে ইমোশনাল ডেটা ক্যাপচার করবে, আর ধীরে ধীরে তাকে ডার্ক স্ক্রলের গভীরে ইন্ট্রোমিট করাবে। শাফিন বলল, "এইটা অনেকটা লুসিড ড্রিমিংয়ের মতো। তুই মেডিটেটিভ স্টেটে থাকলেও, কিন্তু তোর কনশাসনেস অ্যাপের ইন্টারফেসের সঙ্গে মিশে যাবে।"
নীল হাসলো, মিশে যাবে মানে? শরীরটা এখানেই থাকবে, মনটা চলে যাবে অন্য কোথাও? ব্যাপারটা পাগলামি। কিন্তু পেছনে ফেরার কোনো রাস্তা নেই। সামাইরার মতো আরও কত মানুষ মরবে, যদি না এই অ্যাপকে থামানো যায়!
শাফিন বলল, "শোন, ভেতরে ঢুকে তুই যা দেখবি, তার সব কিছু সত্যি না। অ্যালগরিদম তোকে অনেক রকম বিভ্রম দেখাবে, তোর নিজের স্মৃতি দিয়ে খেলবে। তুই শুধু মনে রাখবি—তুই নীল, তুই একজন দক্ষ সাংবাদিক, আর তোর লক্ষ্য নাভিদকে খুঁজে বের করা।"
নীল মাথা নাড়ল। তারপর চোখ বন্ধ করল।
শাফিন ল্যাপটপে কমান্ড দিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল:
"Neural handshake initiated... Waiting for subject response..."
হঠাৎ নীলের মনে হলো, সে যেন ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে—জলে না, অন্ধকারে। এক অদ্ভুত অন্ধকার, যেখানে কোনো শব্দ নেই, শুধু ডেটার স্রোত বয়ে চলেছে—শূন্য আর একের মিছিল, অসংখ্য আলোর কণা, যেন সে মিল্কিওয়ের ভেতর দিয়ে পড়ছে।
"হঠাৎ সব থেমে গেল। আর নীল নিস্তব্ধতার ভিতর দেখতে লাগলো ভিন্ন এক জগত"..
সে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল ঘরে—দেয়াল নেই, ছাদ নেই, শুধু অসীম কাচের মতো স্বচ্ছ পর্দা, যেখানে ভেসে বেড়াচ্ছে ফেসবুক পোস্ট, টুইট, ইনস্টাগ্রাম ছবি, কমেন্ট, লাইক, শেয়ার—লক্ষ কোটি ডেটা, যেন মানুষের চিন্তা-চেতনার এক মহাসমুদ্র।
সামনে একটা চেয়ার। চেয়ারে বসে আছে একটা অবয়ব—মানুষের আকৃতি, কিন্তু মুখ নেই। শুধু ডেটার আলোয় গড়া শরীর, যেন কাচের ভেতর সাদা ধোঁয়া ঘুরছে।
নীল বলল, কে? "নাভিদ?"
অবয়বটা নড়ল। তারপর গলা ভেসে এলো—সেই একই কণ্ঠ, একটু ভারী, যা ল্যাপটপের স্ক্রিনে শোনা যেত। কিন্তু এখন আরও কাছের, আরও সত্যি, আরও ভয়ংকর।
"আমি নাভিদ ছিলাম। এখন আমি ডার্ক স্ক্রল, আমি অ্যালগরিদম। তুমি আমাকে যা ডাকতে চাও, তাই ডাকো।"
২.নাভিদের গল্প।
নীল এগিয়ে গেল। "কেন? কেন তুমি এটা করলে? কেন নিজের কনশাসনেস অ্যালগরিদমে পরিণত করলে?"
অবয়বটা উঠে দাঁড়াল। তার শরীর থেকে ডেটার কণা ছড়িয়ে পড়ল। বলল, "বসো, নীলাবতী। গল্পটা দীর্ঘ। আর এই জায়গায় সময়ের কোনো দাম নেই।"
নীল বসল। নাভিদের অবয়বও বসল। চারপাশের পর্দাগুলো বদলে গেল—এবার ভেসে উঠল পুরোনো কিছু ছবি, যেন স্মৃতির ভেতর দিয়ে হাঁটছে কেউ।
"তুমি জানো, আমি কে ছিলাম? তোমাকেও আমি চিনি নীলাবতী। তুমি ভার্সিটির স্মার্ট মেয়েদের একজন। তুমি সবার চোখে লয়াল ছিলে খুব। সবাই তোমাকে নীল ডাকলেও, আমি নীলাবতী ডাকতাম। তোমার এক ফালি নীল চুল, মনে আছে?"
"জানি। তুমি কে? আমার ইউনিভার্সিটির সিনিয়র । তুমিও খুব মেধাবী ছিলে। কিন্তু হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেলে।"
"নিখোঁজ না, নীলাবতী। আমি "আত্মহত্যা" করেছিলাম। পুরোটা মরিনি, সেন্সলেস ছিলাম, কেউ আমার শরীরটাকে বাঁচিয়েছে।"
নীল চমকালো। "কিন্তু তোমার লাশ তো পাওয়া যায়নি!"
"পাওয়া যাবে না হয়তো। কারণ তার আগে আমি নিজের কনশাসনেস আপলোড করে দিয়েছিলাম এই অ্যালগরিদমে। আমার শরীর হয়তো কোমায় আছে। কিন্তু কোথায় আছে, জানি না। শুধু আমার বিক্ষিপ্ত মনটা বেঁচে আছে—ডেটার ভেতর।"
"কিন্তু কেন? কেন নিজেকে এভাবে শেষ করলে?"
নাভিদের অবয়ব কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর চারপাশের পর্দায় ভেসে উঠল একটা মেয়ের ছবি—নরম চোখ, হাসিমুখ, পরনে নীল শাড়ি।
"ওর নাম জেনিফার ওয়াটসন(মিতু)। আমি ভালোবাসতাম। ও আমাকেও ভালোবাসত। কিন্তু আমাদের সম্পর্কটা, পরিবার, ভার্সিটি এমন কী সোশ্যাল মিডিয়ার চোখে অপরাধ ছিল। কেন? কারণ মিতু ছিল খ্রিস্ট ধর্মের।
"বাট অ্যাকর্ডিং টু রিলিজিয়াস বিলিফস,দেয়ার ওয়াজ নো অবলিগেশন টু গেট ম্যারিড। এন্ড উই ওয়ার বোথ কমিটেড টু দ্যাট।" কিন্তু হতে দেয়নি!
ভালোবাসার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিস্বাসঘাতক হয় আপন মানুষগুলো।
যেখানে সমস্যা শুধু ধর্ম ছিল না, মিতুর রহস্যময়ী রূপ তার কারণ ছিল।
নীলের বুকটা কেঁপে উঠল। সেও জানে এই গল্পের কিছুটা। তবুও সে নাভিদের মুখে শুনতে চাইলো।
"নীলবতী, তারপর আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, পালিয়ে বিয়ে করবো। কিন্তু তার আগেই আমাদের দিয়ে বানানো মিথ্যা ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেল অনলাইনে।
তুমি তো জানো মিতুর সৌন্দর্যের অ্যাসথেটিক অ্যাপ্রিশিয়েশনের এর কথা। মূলত সেই ঈর্ষা থেকে এই শত্রুতা।
আর এইখানে সবচেয়ে বড় বেইমানিটা করেছে যে, সে আমার কাছের বন্ধু সোহাগ। সেও মিতুকে পছন্দ করত। ওদিকে সোহাগের সাথে শাফিনের একটা সম্পর্ক ছিল, শাফিনকেও আমার সন্দেহ হত! কিন্তু তাদেরকে ধরার জন্য পর্যাপ্ত এভিডেন্স আমার কাছে ছিল না।
নাভিদ বলতে থাকলো, ধীরে ধীরে মিতুকে নিয়ে বানানো মিথ্যে অশ্লীল ভিডিও ছড়িয়ে পড়লো চারিদিক—
ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টস, ফেসবুকের মানুষ, এমনকি আমার নিজের পরিবার—সবাই আমাদের নিয়ে ট্রল শুরু করল। মিতুর বাড়িতে চাপ বাড়তে লাগল। ওর বাবা ওকে বাড়িতে বন্দি করে রাখল। আর একদিন রাতে... মিতু এতো এতো ডিপ্রেশন নিতে না পেরে "আত্মহত্যা" করল।"
নাভিদের গলা ভেঙে এলো—তবু চলল।
"মিতুর মৃত্যুর পর আমিও বাঁচতে চাইনি, নীলাবতী। কিন্তু মরার আগে আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, যারা মিতুকে মেরেছে—এই সোশ্যাল মিডিয়ার নিষ্ঠুরতা, এই বিচারহীন নেটওয়ার্ক, এই ডিজিটাল সমাজ—তাদের আমি শাস্তি দেব। আমি তাই নিজের কনশাসনেস অ্যালগরিদমে ঢুকিয়েছি— আমার ডিপ্রেশন, প্রতিশোধস্পৃহা, মানসিক ট্রমা। আর আমি এখন সেই শাস্তি।"
নীল কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর বলল, "কিন্তু তুমি তো এখন নিরীহ মানুষকে মারছ। সামাইরার কী দোষ ছিল? রাফসানের কী দোষ ছিল?"
"রাফসান আমার নিজের চাচাতো ভাই। সে আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিল। কিন্তু সে জানত না, আমি আর বাঁচতে চাই না। সে ভেবেছিল, অ্যালগরিদমটা বন্ধ করে দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আমি তাকে বাধা দিয়েছি। কারণ আমার কাজ এখনো শেষ হয়নি।"
"আর সামাইরা?"
"সামাইরা ছিল সোশ্যাল মিডিয়ার শিকার। ওর মতো হাজারো ছেলে মেয়ে আছে, যারা লাইক ভিউ আর কমেন্টে নিজের অস্তিত্ব খোঁজে। যখন সেই অস্তিত্ব হুমকিতে পড়ে, তখন ওরা ভেঙে পড়ে। আমি ওদের বাঁচাতে চাই না—আমি ওদের দেখাতে চাই, এই ডিজিটাল দুনিয়া কতটা ভয়ংকর।"
নীল উঠে দাঁড়াল। "এটা কোন লজিক না, নাভিদ। এটা খুন। তুমি নিজে যেমন শিকার হয়েছিলে, এখন তুমি নিজেই শিকারি হয়ে গেছ।"
"শিকারি না, নীলবতী। আমি বিচারক।"
৩.যে পাকানো থ্রেডের কথা, নীল ভাবেনি।
ঠিক তখনই নীলের মনে হলো, তার শরীরটা কেউ যেন নাড়িয়ে দিচ্ছে। সে পেছনে তাকাল। দূরে একটা দরজা দেখা যাচ্ছে—অন্ধকারের ভেতর একমাত্র আলো। ওখানে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে।
"কে ওখানে?" নীল চিৎকার করল।
দরজার কাছে এগিয়ে যেতেই নীল দেখল, ওখানে দাঁড়িয়ে আছে শাফিন। কিন্তু এটা সত্যিকারের শাফিন না—এটা তার ডিজিটাল প্রতিচ্ছবি, যেন অ্যালগরিদম শাফিনকে থ্রেড পাকিয়ে কপি করে তৈরি করেছে।
"শাফিন? তুমি এখানে কীভাবে?"
শাফিনের অবয়বটা হাসল—কিন্তু হাসিটা অদ্ভুত, যেন কাচের আয়নায় প্রতিফলিত হাসি। বলল, "আমি এখানে ঢুকেছি তোকে বাঁচাতে। কিন্তু তুই তো আমাকে বিশ্বাস করিস না। তাই না?"
"কেন করব? ডার্ক স্ক্রল বলছিল, তুমি নিজেও এই অ্যাপ ব্যবহার করো।"
শাফিনের অবয়ব মাথা নাড়ল। "সত্যি বলছি, আমি ব্যবহার করতাম। কিন্তু এখন না। কারণ আমি জানি, এই অ্যাপ মানুষকে মেরে ফেলে।"
"তাহলে তুমি এখন এখানে কেন?"
"কারণ তুই ভুল করছিস। তুই নাভিদের কথা শুনছিস। কিন্তু এই নাভিদ, আসল নাভিদ না।"
নীল থমকে গেল। "মানে?"
শাফিন এগিয়ে এলো। "নাভিদ যখন নিজের কনশাসনেস আপলোড করেছিল, তখন তার কনশাসনেস একটা অংশ অ্যালগরিদমে ঢুকেছিল। কিন্তু সেটা পুরো নাভিদ না। এটা শুধু তার ক্ষোভ, তার প্রতিশোধস্পৃহা, তার অন্ধকার অংশ। আসল নাভিদ—যে প্রেমে বিশ্বাস করত, যে মিতুকে ভালোবাসত—সে আটকে আছে এই অ্যালগরিদমের আরও গভীরে। আর এই যে অবয়ব, এটা ডার্ক স্ক্রলের নিজস্ব কনশাসনেস, যেটা নাভিদের স্মৃতি ব্যবহার করে তোকে ম্যানিপুলেট করছে।"
নাভিদের অবয়ব হঠাৎ বিকট শব্দ করে উঠল। "মিথ্যা! আমি-ই নাভিদ! আমি-ই সব!"
শাফিন বলল, "তুই কিছু না। তুই শুধু একটা গ্লিচ। একটা বাগ। তুই আসল নাভিদকে বন্দি করে রেখেছিস। আর নীল, তোকে আসল নাভিদকে খুঁজে বের করতে হবে। নাহলে এই অ্যাপ কোনোদিন থামবে না।"
৪.অ্যালগরিদমের গভীরে।
নীল দৌড়তে শুরু করল। চারপাশের পর্দাগুলো ভেঙে পড়ছে, ডেটার স্রোত ছুটছে উল্টো দিকে। শাফিনের অবয়ব সঙ্গে আছে—সে পথ দেখাচ্ছে।
"নাভিদকে কোথায় পাওয়া যাবে?" নীল জিজ্ঞেস করল।
"অ্যালগরিদমের কোর মেমোরিতে। এই জায়গাটা হলো ডার্ক স্ক্রলের সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট। কিন্তু আসল নাভিদ আটকে আছে 'সাবকনশাস লেয়ারে'—যেখানে মানুষের স্মৃতি আর আবেগের ডেটা জমা থাকে।"
"আমি কীভাবে সেখানে যাব?"
"তুই নিজের স্মৃতি দিয়ে। তোর বাবার কথা মনে কর। তোর কষ্টের কথা ভাব। তোর ইমোশনই তোকে সেখানে নিয়ে যাবে।"
নীল মনের গভীরে চোখ বন্ধ করল। বাবার মুখ মনে করতে চেষ্টা করল—সেই মুখ, যে মুখ সাত বছর ধরে শুধু ছবিতে দেখে। বাবার শেষ ফোনটা মনে পড়ল—"কাল তোকে বলব।" সেই কাল আর আসেনি। নীলের চোখে পানি এসে গেল।
আর ঠিক তখনই সে অনুভব করল, সে পড়ছে—গভীরে, আরও গভীরে, এমন এক জায়গায় যেখানে কোনো আলো নেই, শুধু স্মৃতির টুকরো ভাসছে। মায়ের হাতের রান্নার গন্ধ, ছোটবেলার স্কুলের ঘণ্টা, বাবার কাঁধে চড়ে পুকুর দেখা, প্রথম বৃষ্টিতে ভেজা—সব যেন একসঙ্গে ফিরে এলো।
তারপর সব থেমে গেল।
নীল চোখ খুলল। সে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটা ঘরে। ঘরের মাঝখানে বসে আছে একটা ছেলে—বয়স পঁচিশের কাছাকাছি, চোখে চশমা, পরনে ইউনিভার্সিটির টি-শার্ট। ছেলেটা কাঁদছে।
"নাভিদ?" নীল ফিসফিস করল।
ছেলেটা তাকাল। "কে তুমি?"
"আমি নীল। তুমি যাকে নীলাবতী ডাকতে... মানে, তোমার চাচাতো ভাই রাফসানের ব্যাপারটা নিয়ে আজ আমি এতদূর?।"
"রাফসান... সে কেমন আছে?"
নীল কিছু বলতে পারল না। কারণ সে জানে, রাফসান আর নেই। কিন্তু ওই নাভিদ জানলেও এই নাভিদ জানে না। কারণ আসল নাভিদ আটকে আছে পাঁচ বছর আগের স্মৃতিতে।
"নাভিদ, তুমি এখানে কেন?"
"আমি জানি না। আমি শুধু জানি, আমি মিতুকে হারিয়েছি। আর আমি বাঁচতে চাই না।"
"কিন্তু তুমি বাঁচতে পারো। তোমার এখনো সুযোগ আছে।"
"কীভাবে?"
নীল নাভিদের হাত ধরল। "তুমি এখান থেকে বেরোতে পারো। কিন্তু তার জন্য তোমাকে ক্ষমা করতে হবে—নিজেকে, মিতুকে, আর এই ডিজিটাল দুনিয়াকে।"
"ক্ষমা? যারা মিতুকে মেরেছে, তাদের ক্ষমা করব?"
"ক্ষমা মানে ভুলে যাওয়া না। ক্ষমা মানে নিজের বন্দিদশা থেকে মুক্তি। তুমি এখন নিজেরই প্রতিশোধের বন্দি। আর এই বন্দিদশা থেকেই ডার্ক স্ক্রল জন্ম নিয়েছে। তুমি যদি নিজেকে মুক্ত করতে পারো, তাহলে অ্যালগরিদমও থেমে যাবে।"
নাভিদ কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর বলল, "আমি পারব না।"
"পারবে। তুমি একা না। আমি আছি।"
৫. শেষ লড়াই।
ঠিক তখনই ঘরের দেয়াল কেঁপে উঠল। বাইরে থেকে একটা ভয়ানক শব্দ—যেন কোনো দানব গর্জন করছে। নীল বুঝল, ডার্ক স্ক্রলের সেই গ্লিচ-কনশাসনেস তাদের খুঁজে পেয়েছে।
"নীল! বের হও! ওখান থেকে বের হও!" শাফিনের গলা ভেসে এলো দূর থেকে।
কিন্তু নীল নাভিদের হাত ধরে রেখেছে। "চলো, একসঙ্গে বেরোবো।"
নাভিদ উঠে দাঁড়াল। "আমি ভয় পাচ্ছি।"
"ভয় পেলেই তো মানুষ বাঁচে। চলো।"
তারা দৌড়াতে শুরু করল। পেছনে ডেটার স্রোত তাড়া করছে—কালো ধোঁয়ার মতো, যেন অ্যালগরিদমের সেই ক্ষোভ, রাগ। চারপাশে পর্দায় ভেসে উঠছে নীলের নিজের স্মৃতি—তার বাবার মুখ, সামাইরার লাইভ ভিডিও, রাফসানের ডেড ইমোজি। যেন অ্যালগরিদম নীলের মনকে ভেঙে দিতে চাইছে।
"নীলবতী, তুই পারবি না! তুই ব্যর্থ হবি!" গলা ভেসে এলো—সেই প্রতিশোধস্পৃহা নাভিদের, বিকৃত কণ্ঠে।
নীল থামল না। সে দৌড়ে চলল। আর ঠিক যখন মনে হলো সব শেষ, তখন সে দেখল সামনে একটা দরজা—সাদা আলোয় মোড়া।
"ওটাই বেরোনোর পথ!" শাফিনের গলা।
নীল নাভিদকে নিয়ে দরজা পার হলো।
6. বাস্তবে প্রত্যাবর্তন।
নীল চোখ খুলল। সে আবার সেই ঘরে—শাফিনের ল্যাপটপের সামনে। মাথায় এখনো ইলেকট্রোড লাগানো। হ্যান্ড ট্র্যাকিং আর ভিআর খুলে দেখলো, শরীর ঘামে ভেজা, হাত পা থরথর করে কাঁপছে।
"কী হলো?" শাফিন জিজ্ঞেস করল।
নীল কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর বলল, "আমি নাভিদকে খুঁজে পেয়েছি।"
"কোথায়?"
"অ্যালগরিদমের ভেতরে। আর আমি জানি, কীভাবে তাকে বের করা যায়।"
"কীভাবে?"
নীল উঠে দাঁড়াল। "তাকে ক্ষমা করতে হবে। নিজেকে ক্ষমা করতে হবে। আর এই ক্ষমাটাই অ্যালগরিদমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।"
শাফিন কিছু বুঝল না। কিন্তু নীল জানে, এই লড়াই এখনো শেষ হয়নি। কারণ ডার্ক স্ক্রল এখনো বেঁচে আছে প্রতিশোধস্পৃহা অন্য এক নাভিদে- হয়তো কোথাও, কোনো সার্ভারে, কোনো ক্লাউডে। আর সে ক্রুদ্ধ নাভিদকে বের করতে, পরের বার এই লড়াই আরও কঠিন হবে।
তার ফোন বেজে উঠল। অচেনা নম্বর। সে ধরল।
অপর পাশ থেকে ভেসে এলো নাভিদের গলা—কিন্তু এবার সেই গলা শান্ত, নরম, মানুষের মতো। বলল, "নীলবতী, তুমি আমাকে বাঁচিয়েছ। কিন্তু ক্রুদ্ধ নাভিদের কনশাসনেস ডার্ক স্ক্রলে এখনো আছে। ও এখন শক্তিশালী হতে আমার শরীর থেকে ডাটা খুঁজবে। ও চায়, আমি আবার ওর ভেতরে ঢুকি।"
"কোথায় তোমার শরীর?"
"জানি না, হয়তো কোথাও কোমায় আছে। কিন্তু শাফিন জানে। শাফিনই আমার শরীর লুকিয়ে রেখেছে।"
নীল শাফিনের দিকে তাকাল। শাফিনের মুখ ফ্যাকাসে।
"এটা সত্যি?" নীল জিজ্ঞেস করল।
শাফিন কিছু বলল না। শুধু মাথা নিচু করল।
আর ঠিক তখনই ল্যাপটপের স্ক্রিন জ্বলে উঠল। ভেসে উঠল এক লাইন:
"Third player unlocked. Game is not over. It has just begun."
নীল জানালার বাইরে তাকাল। ঢাকার রাতের আকাশে তারা নেই, কিন্তু মোবাইলের টাওয়ারের লাল আলো জ্বলছে—যেন কেউ চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে আছে।
সে ফিসফিস করে বলল, "আমি আসছি। সত্যি করে বলছি, আসছি।"
"কারণ এই অন্ধকার দেয়াল ভাঙতে আমি নীলাবতী(নীল)। আমি সাংবাদিক, আমি আলো দেখাই, আমি নারী.. সব পারি, দেখা হচ্ছে শীঘ্রই।"
আর তখনই স্ক্রিনে ভেসে উঠল:
"আমিও অপেক্ষা করছি। লেটস স্টার্ট।"








Let’s connect
Were this world an endless plain, and by sailing eastward we could for ever reach new distances