Sajidullah Farhad

The Bengali Storyteller

বৃক্ষ যেমন তার শিকড়ের উপর ভর করে বেড়ে ওঠে সজীব-প্রাণবন্ত হয়, একটা মানুষের ক্ষেত্রেও শিকড়ের প্রভাব গাছের ন্যায়।  দ্বীপ একটি বিচ্ছিন্ন সমুদ্রে...

গল্প: শিকড়ের খোঁজে।

বৃক্ষ যেমন তার শিকড়ের উপর ভর করে বেড়ে ওঠে সজীব-প্রাণবন্ত হয়, একটা মানুষের ক্ষেত্রেও শিকড়ের প্রভাব গাছের ন্যায়। 


দ্বীপ একটি বিচ্ছিন্ন সমুদ্রের নাম। যার বয়স সাত কি আট হবে তখনি  বিছিন্ন হতে হয় তার বাবার কাছ থেকে। বয়সের স্বল্পতা আর সামাজিক মর্যাদার টানাপোড়েন তখন বুঝতে না পারলেও দ্বীপ এখন বুঝতে পারে তার মমতাময়ী মা 'রূপকথা' কেন কনভারশন ডিসঅর্ডারে পুরোপুরি বোবা না হলেও কথা বলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে চিরতরে। 


দ্বীপের বাবা পড়াশোনার বয়সে পারিপারিবকভাবে সচ্ছল না হবার কারণে তার মায়ের বান্ধুবি মানে দ্বীপের শাহেদা ফুফির সুবাধে দ্বীপের নানার বাড়িতে জাইগীর মাস্টার হিসেবে পড়াশুনা করতেন এবং পড়াতেন। দ্বীপের মা ছিলেন দ্বীপের বাবার ছাত্রি; দ্বীপের বাবার শিষ্টাচার, নম্রতা-ভদ্রতা  দেখে দ্বীপের  বাবার প্রতি দ্বীপের মার ভালোলাগা জন্ম নেয়  আর এই ভালো লাগা একসময় পরিবারের বাধ্যবাধকতা ডিঙিয়ে বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় দ্বীপের নানীর আর্শীবাদে। দ্বীপের নানাও মেয়ের একরুপ অবস্থানের জন্য শেষ পর্যন্ত মেনে নেয়। "ভালোবাসার ক্ষেত্রে একরুপ মানুষগুলো বড় অন্যরকম এদের চাইলেও পৃথিবীর কোন কিছু দিয়ে বদলানো যায় না, হয়তো ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করবে নয়তো সারাজীবন একাকিত্বকেই মেনে নিবে। বহুরূপী মানুষের কাছে প্রকৃত ভালোবাসা কখনো স্থান পায় না।"


সে যাইহোক দ্বীপের বাবা তখন সংসারের অর্থকষ্টের ভিতর দ্বীপের মাকে ঘরে তুলে সারাজীবনের প্রতিজ্ঞাবদ্ধতায়।

ঐদিকে দ্বীপের নানা মানুষের কানকথা শুনতো খুব যখন মানুষ বলতো, আপনি এতো ধনী আর নামী বংশের মানুষ হয়েও কিভাবে মেয়েকে একটা সামান্য জাগির মাস্টারের কাছে তুলে দিলেন। একসময় মানুষের কথা শুনতে শুনতে অতিষ্ট হয়ে মেয়েকে অভাবের সংসার থেকে মুক্ত করতে ডিভোর্স এর জন্য বাধ্য করেও পারেনি। মেয়ের একটাই কথা স্বামীর ঘর ছেড়ে কোথাও যাবে না। অতঃপর মেয়ের দৃঢ়তার কাছে হেরে গিয়ে মেয়ের জন্য উনার বাড়ির কপাট চিরতরে বন্ধ করে দেয়।


.......


হঠাৎ বিয়ের সাত বছর পর দ্বীপের নানা এই বন্ধ কপাট খুলতে কানাডা থেকে(এর ভিতর দেশে আরও দুই এক বার আসলেও মেয়ের সাথে যোগাযোগ করে নাই) এসে মেয়েকে মেনে নেবার ভান করে কৌশলে দ্বীপের মা আর তার নাতিকে নিয়ে কানাডা পাড়ি জমান, দ্বীপের বাবার জন্য কাগজ-পত্র রেডি হচ্ছে বলে দ্বীপের মাকে আশ্বস্ত করেন; এমনকি কিছু ভুয়া কাগজ পত্রও দেখান যাতে দ্বীপের মার সন্দেহ না হয়। 


কিন্তু কানাডা যাবার পর দ্বীপের মা বুঝতে পারে তার নানার কৌশল ছিল এইটা, তার নানা এই সামান্য জাইগীর মাষ্টারকে কোনদিন মেনে নিতে পারেননি। অনেকটা চাপের মুখে দ্বীপের বাবার কাছে ডিভোর্স লেটার পাঠাতে বাধ্য করে যদিও তালাক-এ-তফভিজে তা দাখিল ছিল না তবুও তার বাবাকে বুঝানো যে আমার মেয়ে আর তোমার মত ছোটলোকের  কাছে যাবে না কোনদিন। মর্যাদার কাছে দ্বীপের বাবা হেরে গিয়ে একসময় দ্বীপ আর দ্বীপের মার শুন্যতা মেনে নিতে না পেরে এই কঠিন পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে চলে যান চিরতরে। 

........


দ্বীপের মা কানাডা থেকে ফিরে আসার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হয় দ্বীপের নানা আর মামাদের কাছে, তার মার তবুও বিশ্বাস ছিল একদিন তার বাবার কাছে যাবে; কিন্তু যখন খবর আসে তার বাবা আর নাই এই পৃথিবীতে তার মা মানসিক আঘাত থেকে এক ধরনের  অ্যামনেশিয়ায় আক্রান্ত হয়ে যায়; সাথে কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলে। 


দ্বীপের মা অতিরিক্ত সুন্দরী হবার কারণে অনেকে তখন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসলে, তার মায়ের মানসিক ও শারীরিক অবস্থা আরো বেগতিক হয়ে যেত , তাই বিয়ে নিয়ে কেউ আর পীড়াপীড়ি করেনি। 


দ্বীপ তার মাকে জ্ঞান বয়স থেকে কোনদিন হাসতে দেখেনি, দেখেনি কোনদিন প্রান ভরে কথা বলতে। একটা সময় নাকি দ্বীপের  মা শুদ্ধ বলতে পারলেও তার  বাবার পছন্দ ছিল আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা, তাই তার  মা সবসময় সন্দ্বীপের ভাষায় কথা বলতেন। 

-----

কানাডার আলবার্টা প্রদেশে অবস্থিত ফোর্ট মাকমারে শহর যার চারপাশে বরফাচ্ছন্ন ঘেরা, খুব কম সংখ্যক মানুষ বাস করে এই উপত্যকায়, পরিবেশ আর জীবনের কঠিন অধ্যায়ের ভিতর দ্বীপও হয়ে উঠে এক অন্তর্মুখী মানুষের প্রতিছব্বি। হয়তো  সময়ের পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে একটা সময় পুরনো পৃষ্ঠার কথা মানুষ ভুলে যায়, দ্বীপও তাই।  


অদ্ভুত এই শহরের একটি পুরনো লাইব্রেরী আছে যেখানে গিয়ে দ্বীপ মাঝে মাঝে অজানা সব বই পড়ে, একদিন লাইব্রেরী গিয়ে বই নাড়াচাড়া করতে করতে দ্বীপের চোখে পড়ল অ্যালেক্স হেইলির  লিখা ‘’দ্যা রুট’’ বইটির দিকে। দ্বীপ বইটি নিয়ে পড়তে পড়তে কখন যে বিকেল থেকে রাত দশটা বেজে যায় টেরও পায়নি সে।  


দ্বীপ ধীরে ধীরে বইয়ের শেষ প্রান্তে যেতে  উপলব্ধি করতে থাকে নিজের শিকড় বা পরিচয়ের গভীরতা কি? দ্বীপ বুঝতে পারে অতীত, পরিবার, সংস্কৃতি, এবং ঐতিহ্য আমাদের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটা সময় দ্বীপ গ্রন্থাগারিক থেকে বইটি নিয়ে বাসায় ফিরে যায়। 


দ্বীপ সিদ্ধান্ত নিল নিজের জীবনের গভীর অর্থ বুঝতে বা নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সঠিক সত্ত্বার খুঁজ বের করতে, তাঁকে তার শিকড়ের কাছে যেতে হবে। তাই তার ইচ্ছের কথা গিয়ে তার মামাদের কাছে বলল, কিন্ত তার মামারা দ্বীপের মুখের উপর 'না' করে দেয়। কিন্তু দ্বীপ এখন আর সেই ছোট দ্বীপ নেই,  মাকমারে বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বিদ্যাপীঠ অনেকটা শেষের দিকে। তার এই সিদ্ধান্তের কথা যে তার কোন বন্ধুকে জানাবে সেরকম কোন বন্ধুও নাই তার। অতিরিক্ত ইন্ট্রোভার্ট হওয়ার কারণে মেয়েতো দূর তার ভালো কোন ছেলে বন্ধুও নেই।কিন্তু এই শহরের মেয়েদের প্রতি তার যে আগ্রহ কাজ করে তাও কিন্তু না, ভালোলাগা বা কথা বলার জন্য তার এই শহরে আপন কেউ নেই। 

.

অবশেষে দ্বীপ জানুয়ারি ছয় তারিখ এর জন্য টিকিট বুকিং দেয়, প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে দ্বীপ অপেক্ষা করছে কখন সকাল হবে। সকাল হতেই দ্বীপ সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গেল মায়ের ঘরে, মাকে সালাম করে জড়িয়ে ধরে, মা অশ্রুসিক্ত চোখে অনেক কিছু বলতেও গিয়ে বলতে পারলেন না, মাথায় হাত বুলিয়ে হয়তো বলতে চাইছেন ‘’ তুই তোর বাবার রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতি, তোকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি আমি, নিজের যত্ন নিস বাবা।

.....


দ্বীপ উড়োজাহাজে বসে বসে ভাবছে এতদিন পর দেশে যাচ্ছে, পথঘাট তেমন চিনা নাই কোথায় কিভাবে যেতে হবে। ভাবতে ভাবতে দেশের মাটিতে যখন উড়োজাহাজের চাকার ধাক্কা লাগে দ্বীপের ভিতর এক অজানা শিহরণ জেগে ওঠে। আহাঃ দেশের মাটি সংস্পর্শ কতই না প্রলুব্ধ করে ভিতর। দ্বীপ এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে  মিট অ্যান্ড গ্রিট সার্ভিস করে চট্টগ্রাম হোটেল পেনিনসুলা যেতে যেতে চারিদিক খুব উৎসাহ দেখতে লাগল, দোকান-পাট দেশের মানুষ। একসময় ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বলল—


আপনার নাম কি, ব্রাদার?

আমার নাম মজনু।

খুব সুন্দর নাম, মজনু ভাই আমি প্রায় বিশ বছর পর দেশে আসছি, তেমন কিছু চিনি না, আপনি আমার একটা উপকার করতে পারবেন?

কি যে বলেন ভাইজান, পারব না মানে আপনি শুধু বলে দেখেন!

আমার একটা সিম লাগবে!

আরে সামনে টেলিফোনের দোকান আছে ভাইজান নিয়ে নিব।

মজনু ভাই আমাকে আরেকটা হেল্প করতে হবে?

বলেন ভাইজান?

আমি কালকে সন্দীপ যাব, আপনি কি আমাকে ড্রপ করতে পারবেন কাল সকালে?

ভাইজান আমিতো হোটেলের সার্ভিস এর বাহিরে ভাড়া মারতে পারি না, চিন্তা কইরেন না ভাইজান আমার একটা ছোটভাই আছে ও আপ্নারে নিয়া যাবে, আপনি ওর নাম্বারটা নিয়া নেন। 

.

পরদিন সকালে দ্বীপ কুমিরা ঘাটে এসে টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়াতে তার ভিতর অদ্ভুত এক ভালো লাগা ছুঁয়ে গেল। এই নদী, এই জন্মভূমির মানুষগুলো কতই না আপন। দ্বীপের বেশভূষা দেখে দ্বীপকে বেশিক্ষণ লাইনে দাঁড়াতে দিল না তার প্রিয় সন্দ্বীপবাসী; দ্বীপ টিকেট কেটে স্পিড বোটে উঠতেই তার ভিতর উত্তেজনা শুরু হল শিকড়ের টানে। 

.

কুয়াশার চাদরে ঢাকা আবছা আবছা সন্দ্বীপ যতই স্পষ্ট হচ্ছে দ্বীপের চোখে, দ্বীপের ভিতরের উচ্ছ্বাস যেন অন্তর্মুখী সত্ত্বাকে বহির্মুখী করে তুলে— তার খুব প্রানখুলে বলতে ইচ্ছে করে এইটাই আমার অস্তিত্ব আমার প্রানের অনন্ত চাওয়া পাওয়ার  সবটুকু, আমার প্রিয় সন্দীপ।


দ্বীপ গুপ্তচড়া ঘাটে নামার আগে পায়ের জুতা খুলে খালি পায়ে তার প্রিয় মাতৃভূমি স্পর্শ করলো, মায়ের মত শীতল মমতার আদরে তার পুরো শরীর যেন শিকড়ের সংস্পর্শে সজীব হয়ে উঠল। দ্বীপদের বাড়ির  নাম জিলাপির’গো বাড়ি, দ্বীপ  ভ্যান থেকে নেমে, মুখ থেকে বাড়ির নাম বলার আগেই ট্যাক্সিওয়ালারা টানাটানি শুরু করে দিল।


.

অবশেষে দ্বীপ বাড়ি এসে পরিচয় দিতে তার চাচা আবেগে জড়িয়ে ধরে ঘরে নিয়ে যায়, তার চাচার ভিতর আবেগ ভয় দুইটা কাজ করতাছে এতদিন পর ভাতিজা এসে আবার জায়গা সম্পত্তির ভাগ বসাবে কিনা। তাই অতিরিক্ত খুশি হয়েও হতে পারলেন না। কিন্তু দ্বীপের চাচি দ্বীপকে দেখে মায়ের মত আপন করে দ্বীপের জন্য খাবার দাবারের আয়োজন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। 

.

দ্বীপ দুপুরের খাবার খেয়ে শর্ট  ন্যাপ নিয়ে বিকেলে তার চাচাতো ভাই তনিমকে নিয়ে বের হল শাহেদা ফুফির বাড়ির উদ্দেশে— অনেক বছর পর রিক্সা চড়া অভিজ্ঞতা দ্বীপকে সত্যি মুগ্ধ করছে আশপাশের অরণ্যঘেরা গাছ-গাছালি দেখে। দ্বীপের চাচাতো ভাই হুট করে  শিবের হাটে রিক্সা থামাল, বিনা-শাহ’র দোকানের মিষ্টি খাওয়ার জন্য। দ্বীপ মিষ্টি খেয়ে অবাক হয়ে বলল এমন সাদামাটা একটা দোকান এত সুস্বাদু সুইট এর আগে আমি কখনও খাইনি। 


.

দ্বীপ অপেক্ষার পথ ফেরিয়ে এখন ফুফিদের ঘরের সামনে, তার ফুফি বসে আছে ঘরের সিঁড়িতে, দ্বীপ চিনে না ফুফিকে, ফুফিও চিনে না দ্বীপকে, তাই তার ফুফি তনিমকে  জিজ্ঞেস করে, কে উনি? তনিম বলল- ফুফি আমদের  দ্বীপ ভাইয়া।.. এই কথা শুনে তার ফুফি গলা ফাটা চিৎকার দিয়ে এমন ভাবে দাঁড়ালো আরেকটু হলে হয়তো শাড়ি পেঁচিয়ে পড়ে ঠেং ভাংত, জানিনা কি আবেগ তার ফুফির ভিতর জমে ছিল; ফুফিরা কেন এমন হয় কেন এমন আপন করে ভালবাসতে পারে— দ্বীপকে জড়িয়ে ধরে দ্বীপের ফুফি শুরু করে দিল 'মরা কান্না আর জোরে জোরে বলতে লাগল আমার বাপ কত বড় হয়ে গেছে আমার আব্বা কোথায় ছিল এতোদিন ফুফিরে ভুলি। বাড়ির সবাই ঘর থেকে বের হয়ে গেল ফুফির এমন ভয়ঙ্গর কান্না দেখে। 

.

দ্বীপ একে একে সবার সাথে পরিচিত হতেই;  হঠাৎ তার চোখ আঁটকে গেল অন্যরকম এক ভাললাগায় লাজুক আর মায়াবী চোখে, দ্বীপ এর আগে এমন নিখুঁত সুন্দর দেখিনি কখনো, বিকিনি আর অশ্লীল পোশাকের ভিতর বেড়ে উঠা দ্বীপের কাছে এমন শালীন সুন্দরী মানবী যে থাকতে পারে পৃথিবীতে, দ্বীপ সে কথা ভুলেই গিয়েছিল একদম!! দ্বীপ এই লাজুক মেয়েটা কে ফুফিকে জিজ্ঞেস করতেই ফুফি বলে— আরে এটা আমার মেয়ে সন্ধ্যা!! অনেক লাজুক, তোর সামনে আসতে অনেক লজ্জা পাচ্ছিল বাবা।


.

ফুফির শেষ কথা যতদিন দেশে থাকবে তার বাড়িতে থাকতে হবে- তাই তনিমকে দিয়ে দ্বীপের  ব্যাগ নিয়ে আসলো । ফুফির রান্না-বান্না ব্যস্ততা শেষে একটা সময় যখন  রাতে খাবারের জন্য টেবিলে বসলো দ্বীপ লক্ষ্য করল সোলারের বাতির ক্ষীণ আলোয় একটা অপরুপ আলো তার চোখকে বার বার টেনে নিয়ে যাচ্ছে,, আর এই আলো কোন সাধারণ আলো না;  সন্ধ্যার আলো । খাওয়ার এক ফাঁকে তার ফুফি দ্বীপকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল-  দ্বীপ কাল সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হবে কিন্তু? 

কেন ফুফু?

সেইটা ঘুম থেকে উঠলেই বুঝবি। 

ঠিক আছে ফুফু। 

.

দ্বীপ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করতেই তার ফুফি বলল রেডি হয়ে নে দ্বীপ, সন্ধ্যাকে তার কলেজে পৌঁছে দিতে হবে। দ্বীপ এই কথা শুনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না; দ্বীপের ভিতর হঠাৎ একরকমের ভয় কাজ করতে লাগলো, এমনতো কখনও হয়নি, কত শত মেয়ে তার চোখের সামনে দোলাচল খেল, এই প্রথম দ্বীপ বুঝতে পারলো এইটা সাধারণ কোন অনুভুতি না।  ওইদিকে সন্ধ্যা দ্বীপের সাথে যাওয়ার কথা শুনে লজ্জায় সাজগুজ ভুলে কি পড়বে না পড়বে মাথা না আঁচড়িয়ে সাদামাটা হয়ে বেড়িয়ে গেল। না সাজলেও যে কিছু রমণী প্রকৃতির প্রকৃত সুন্দরের প্রতিচ্ছবি সেইটা হয়তো সন্ধ্যাও জানে না। 


.

দ্বীপ আর সন্ধ্যা একি রিক্সায় দুজনে দুপাশ ঘেঁষে ঝুবুথুবু হয়ে বসে আছে, সন্ধ্যার লাজুকতা দেখে দ্বীপ ভাঙ্গা ভাঙ্গা ভাষায় একটি  শব্দ উচ্চারণ করল- সন্ধ্যা? 

সন্ধ্যা নিচের দিকে চেয়ে বলল- হুম্ম।

আমাকে তোমার খুব অপরিচিত মনে হয়?


নাতো ! আপনার কথা আম্মা এতো বেশি বলছে যে, আমাদের ফ্যামিলিতে আপনার একটা ছায়া থাকতো সবসময়। গত দুদিন আগে আম্মা জালি পিঠা বানাই কান্না করতে করতে বলে--  দ্বীপের জালি পিঠা কত পছন্দ ছিল। আর আব্বা দেশে আসার সময় আম্মা সবসময় তাগিদ দিয়ে  বলত সবার জন্য কিছু আনলে  দ্বীপের জন্য আনতে হবে। আপনার জন্য কত জিনিস আছে আলামারি খুললে দেখবেন। 


দ্বীপ হঠাৎ আপসোস করে বলে উঠে, এতদিন এই মমতাময়ী ফুফুর ভালোবাসা থেকে বঞ্ছিত ছিলাম আমি। আচ্ছা সন্ধ্যা জালি পিঠা কি?


পঁচা পিঠা বলে সন্দ্বীপের ভাষায়।


সন্ধ্যা তুমি আমার সাথে সন্দ্বীপের ভাষায় কথা বল, আমি বলতে না পারলেও বুঝি কিন্তু?


সন্ধ্যা লাজুক হাসি দিয়ে বলে মামারও সন্দ্বীপের ভাষা খুব পছন্দ ছিল। 


তুমি কিভাবে জানো?


সন্ধ্যা এইবার অন্যদিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে আগ্রহ থাকলে সব জানা যায়। 


-----

দ্বীপ এক পা এগোয় আবার পিছায় কিভাবে ফুফিকে বলা যায়, ফুফা থাকে দেশের বাহিরে; কিভাবে বলবে ফুফিকে তার মনের কথা! সময়ও বেশিদিন নাই  সব মিলিয়ে দ্বীপ অস্থিরতা নিয়ে 

ফুফিকে ডাকল—

ফুফি দ্বীপের সামনে বসে আছে। 

দ্বীপ কি বলে শুরু করা যায় ভাবতে ভাবতে হঠাৎ বলে উঠল— ফুফু তুমিতো জানো আম্মা আব্বাকে কত ভালবাসত, নানা মারা যাবার পর মামারা উনাকে কত জোর করছে অন্য জাগায় বিয়ে দিতে আম্মাকে কোনদিন টলাতে পারিনি। আমার মামার বাড়ির কাউকে আম্মা তেমন একটা পছন্দ করেন না, পরিস্থিতির কারণে উনি বাধ্য হয়ে উনাদের সাথে থাকতে হয়। ফুফু তোমার কাছে একটা আবদার করলে রাখবে?


বল কি করতে পারি তোর জন্য এই ফুফি?


আরে আরে ফুফু তুমি কাঁদছ কেন? আমিতো জানি আম্মা তোমার ভাবী না শুধু বান্ধুবিও ছিল। ফুফু প্লিজ কেঁদনা! 


আমার সই আমার আদরের ভাবী কেন এমন হল সব!!  আচ্ছা বল কি বলবি?


ফুফি আমার আম্মা ছাড়া আমার আপন শিকড় বলতে তেমন কেউ নাই, আমি চাই সন্ধ্যাকে কানাডায় নিয়ে যেতে। 


দ্বীপের মুখে এই কথা শুনে তার ফুফির কান্না আরও তীব্র হল, যেন তার মনের সুপ্ত বাসনা পূরণ হবার এক আনন্দ অশ্রু মিশানো এই কান্নার বিলাপ। 


.......


দ্বীপ সন্ধ্যার বিয়ে হল- বিয়ের এক সপ্তাহ পর দ্বীপকে কানাডা চলে আসতে হল জব ইন্টারভিওর জন্য। সন্ধ্যার জন্য প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ঠিকঠাক করে আসলো। দ্বীপ জব ইন্টারভিও দিয়ে বাসায় ফিরে তার মামাদের বিয়ের খবর জানাতেই বাসায় এক লঙ্কাকাণ্ড বেঁধে গেল- তার মামারা চিৎকার চেঁচামেচি করে বলতে লাগলো- তুই আমাদের না জানিয়ে নিজের ইচ্ছেমত, ছোটজাতের মেয়েকে বিয়ে করছস, তোর এতো বড় স্পর্ধা,  যে বংশে বিয়ে করার জন্য তোর মার এই অবস্থা!! তুই কোন সাহসে আবার ওই ওই বংশের মেয়ে বিয়ে করলি। তোরে ছোটবেলা থেকে মানুষ করার এই প্রতিদান দিলি। আজকের পর থেকে তোর সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নাই। 

.

তিন মাস পর দ্বীপ আর তার মাকে নিয়ে স্থায়ী হল কানাডা  ড্যান্সিং লাইটস ভ্যালিতে, যেখানে রাতের আকাশে অরোরা দেখা যায়, যা এই উপত্যকাটিকে আরো রহস্যময় করে তোলে। দ্বীপের মা এখন পুরোপুরি কথা না বলতে পারলেও আগের চেয়ে অনেক প্রাণচঞ্চল আর সাবলীল। 

..

পরিশেষ.. দ্বীপ আর তার মা এখন এয়ারপোর্ট-এ,  অপেক্ষা করে আছে কখন সন্ধ্যা আসবে । দ্বীপের মা বার বার অস্থির চোখে তাকায় কারণ সে জানে না সন্ধ্যার দেখতে কেমন। হঠাৎ ট্রেন্স কোট পরা হিজাব মুখে এক নারী দ্বীপের কাছাকাছি হাসিমুখে আসতে দেখে দ্বীপের মা বুঝতে বাকী রইল না- এইটাই সন্ধ্যা! 

সন্ধ্যা সালাম করতেই দ্বীপের মা ঝাঁপিয়ে ধরল সন্ধ্যাকে- আহা সেকি মমতায় তার মুখ তার হাত আদরে স্পর্শে বুলাতে লাগলো এই সেই সন্ধ্যা যার গায়ের রক্তিম শিকড়ের গন্ধ দ্বীপের বাবার গন্ধের সাথে মিলে যায় হয়তো। দ্বীপ হঠাৎ আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করল দ্বীপের মা কথা বলছে অস্রুসজল চোখে সন্ধ্যাকে বুকে জড়িয়ে। 






0 Comments: