The Bengali Storyteller brings you heartfelt Bengali stories, poetry, love, heartbreak, and life-inspired narratives. Discover soulful storytelling in Bangla—listen, read, and feel every emotion.

পৃথিবী বলে, “একা বাঁচা যায় না”— আমি বলি, “একা বাঁচাই একমাত্র বেঁচে থাকা;  বাকি সবই ডিফেন্স মেকানিজম, প্রয়োজনের ভুল অনুবাদ।” মানুষ ভাবে, সম্প...

পৃথিবী বলে, “একা বাঁচা যায় না”—

আমি বলি, “একা বাঁচাই একমাত্র বেঁচে থাকা; 

বাকি সবই ডিফেন্স মেকানিজম, প্রয়োজনের ভুল অনুবাদ।”


মানুষ ভাবে, সম্পর্ক মানে সেতু;

আমি বলি কতিপয়, বেশির ভাগ সম্পর্কই ট্রমা বন্ড— 

দুটি অসম্পূর্ণতার পলেস্তারা।

আমি পলেস্তারা খোঁজা বন্ধ করেছি।

আমি জানি আমার দেওয়ালে ফাটল আছে,

আর আমি সে ফাটলকেই জানলা বানিয়ে ঘরের ভেতর আকাশ ডেকে নিয়েছি।


বাঁচার জন্য কাউকে অভ্যাস করা মানে নিজের.. শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি অন্যের ফুসফুসে জমা রাখা।

আমি শ্বাস নিই একা; শ্বাস ছাড়ি একা;

অক্সিজেন আর কার্বন-ডাই-অক্সাইডের এই চক্রই প্রামাণিক অস্তিত্ব।

আমি কারো উপস্থিতিকে অক্সিজেন বানাই না,

তাই তার অনুপস্থিতি কখনো শ্বাসরোধ করে না।


লোকে বলে, “অভ্যাস ভাঙলে শূন্যতা আসে।”

আমি বলি, শূন্যতা আগে থেকেই আছে;

সম্পর্ক ছিল তার ওপর চাকচিক্যের প্রলেপ। আমি প্রলেপ তুলে ফেলেছি।

এখন আমি শূন্যতার দিকে তাকিয়ে আছি—

আর সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।


আমি শূন্যতাকে এড়িয়ে চলি না, বরং রিফ্রেম করি।

শূন্যতাই একমাত্র বর্তন যার কোনো ফাটল নেই।

অতঃপর আমার কোন কিছুতেই ভাঙন হয় না।

কারণ, প্রতারণা, অবজ্ঞা, বিস্বাসঘাতকতা—

সেসব তখনই আঘাত করে যখন কাউকে মিরর নিউরন-

এর চেয়ে বেশি ভাবা হয়।



আমি নির্ভর করি শুধু যা হারানো অসম্ভব:

আমার সীমাবদ্ধতা, আমার অক্ষমতা, আমার ভিতরের শূন্যস্থান অথবা আমার ভেঙে পড়ার সততা—

আর নির্ভর করি সেই অদৃশ্য শক্তির উপর , যে শূন্যতার ভেতর দিয়েও টিকে থাকতে শেখায়।


এটাই আমার কসমিক ডিপেন্ডেন্সি:

সৃষ্টিকর্তার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ,আর সৃষ্টির কাছে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা।

এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি প্যারাডক্সিক্যাল হোলনেস—

ভাঙা, অথচ সম্পূর্ণ; একা, অথচ পরিব্যাপ্ত।


যে আমার চলে যাওয়াকে অবকাশ ভাবে,

সে আমাকে কখনো অভিন্ন এক্সিস্টেন্স হিসেবে দেখেনি—

দেখেছে কনভিনিয়েন্ট অবজেক্ট হিসেবে।

তা-ই ভালো।

তার প্রত্যাখ্যান আমার জন্য এক এক্সিস্টেনশিয়াল ক্যাথারসিস হয়ে এলো—


অর্থহীন সম্পর্কের মোহ কেটে আমি নিজের অর্থ নিজে লিখতে বসলাম।

প্রতিটা ভুল সম্পর্কের হাত সরিয়ে নিতেই আমার হাতে আমার নিজের হৃদপিণ্ড ফিরে এলো।

আমি সেটা জোরে চেপে ধরলাম— টের পেলাম, 

এটাই আমি যে নিজেকে পুরোপুরি ধারণ করছি।


যে একা থাকতে জানে, সে তার এক্সিস্টেনশিয়াল ভ্যালিডেশন কারোর কাছে বন্ধক রাখে না।

তার অস্তিত্বের দলিল তার নিজের কাছেই, সাক্ষী শুধু সেই অদৃশ্য।

একা থাকতে শেখা মানে সাইকোলজিক্যাল অটোনমি অর্জন করা—

যেখানে তুমি সংসার, সোশ্যাল মিডিয়া, আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব, দায়িত্বেবোধ ছেড়ে যাও না, 

কিন্তু এইসব কোন কিছুই তোমাকে আর পুতুল নাচ নাচাতে পারে না।


মানুষ বলে, “একা বাঁচা যায় না।”

আমি বলি, “একা বাঁচতে না জানাটাই ইমোশনাল এনমেশমেন্ট-এর শেকড়।

তুমি অন্যের মধ্যে নিজেকে খোঁজো, আর হারিয়ে ফেলো দুজনকেই।

আমি পুতুল খেলা ছেড়েছি; আমি এখন পাপেটিয়ার, পুতুল নই।”


অতএব কারো আগমনকে আমি যেমন স্বাগত জানাতে পারি,

তেমনি তার বিদায়কেও হাসি মুখে অভ্যর্থনা জানাতে পারি।

জীবনে তরঙ্গ আসবে, আবার মিলিয়ে যাবে—

কেবল মহাসমুদ্রের নির্জন গভীরতাই আমি— 

অথবা আমার পরিচয়।

 যে দেশে পশু দিয়ে মাপা হয় বড়লোকির মাপকাঠি— সে দেশে কুরবানি নিছক গোশত খাওয়ার নামে একটি দিবস.. আর কিছু না— অথচ কুরবানি শব্দের শিকড় 'কুরব...

 যে দেশে পশু দিয়ে মাপা হয় বড়লোকির মাপকাঠি—

সে দেশে কুরবানি নিছক গোশত খাওয়ার নামে একটি দিবস..

আর কিছু না—


অথচ কুরবানি শব্দের শিকড় 'কুরব'— মানে নৈকট্যের নিবিড়তা।

যেখানে নিজের মায়ার জিনিসটাকে আল্লাহর রেজামন্দির জন্য উজাড় করা,

সেখানে প্রতিবেশীর প্রশংসা, বাহবা বা ক্যামেরার ঝলকানির কোনো ফরিয়াদ নেই।


সূরা হজ, ৩৭ নং আয়াতে স্পষ্ট বয়ান আছে: 

"গোশত-রক্ত" নয়, তাকওয়াই আল্লাহর কাছে পৌঁছায়।


কিন্তু এখন এই ইবাদতের পাশাপাশি বহমান আরেক জলধারা—

রসম-রেওয়াজে ঘেরাটোপে বসে আরেক আসর; নাম: 'শো-অফের কুরবানি'।


অতঃপর মান্যজন হাটে নামার আগেই ঠিক হয়ে যায়:

এবারের পশুর দামটা যেন পাড়া পড়শীর মুখে মুখে রটে বেড়ায়।

দশ লাখ, বারো লাখ, পনেরো লাখ— সংখ্যাটা যত ভারী হয়,

কাঁধের স্ট্যাটাস তত উঁচুতে;

যেন পশু কেনা নয়, চলছে ইজ্জত নিলামের মহড়া উঠা-নামাতে।


ক্রয়ের পর প্রথম কৃত্য:

'পশুর' গলায় জড়িয়ে ছবি, হাসিমুখে ফ্রেমবন্দি; 

সোশ্যাল মিডিয়ায় 'কুরবানি'র তকমায় আপলোড দেওয়া ছবিতে—

আর ওদিকে মনের ভিতরের পশু চিৎকার করে বলে: "তারিফ শুনো, বাহবা নাও, ভাই জিতছো তুমি!"


তারপর 'জবাই— মাংস বিলির আগেই ফ্রিজের পেট ফুলে উঠে গলা পর্যন্ত,

গোশতের বাটখারায় ওজন করা হয় নিজের ‘দানের গৌরব’।

গরিবের দুয়ারে থলে পৌঁছানোর আগেই মোবাইলে শাটারে চাপ পড়ে;

কারণ: তবেই না "জেনারোসিটি’র" বিজ্ঞাপনটা সারা টাইমলাইনে ভাইরাল হবে!


কুরবানী এলে পশু জবাই হয় ঠিকই,

কিন্তু নিজের ভেতরের— লোভ, অহংকার, রিয়া, প্রদর্শনীপ্রিয় পশুটা,

আরো অক্ষত, বরং আরো মোটাতাজা হয়।

যখন নিজের পশুর গায়ে বুলিয়ে দিয়ে 'স্যাক্রিফাইস'-এর চকচকে তেল।

শুধু শুধু কুরবানীর নামে বোবা প্রাণীটার গলায় ছুরি দাগায়।



অনু নিয়মিত কলেজে যায়, কিন্তু কারও সঙ্গে মেশে না। ক্যান্টিনে একা বসে চা খায়, কানে লতানো হেডফোন থাকে। ফেসবুক আছে, কিন্তু প্রোফাইল পিকচার নেই—শ...

অনু নিয়মিত কলেজে যায়, কিন্তু কারও সঙ্গে মেশে না। ক্যান্টিনে একা বসে চা খায়, কানে লতানো হেডফোন থাকে। ফেসবুক আছে, কিন্তু প্রোফাইল পিকচার নেই—শুধু কালো ডিসপ্লে, কভার ফটোতে ঝাপসা কুয়াশার ছবি। বন্ধুর সংখ্যা ৪২, তার মধ্যে ৩০ জনই ডিএড অ্যাকাউন্ট। অনু কখনো পোস্ট দেয় না, কমেন্ট করে না, লাইক দেয় না। শুধু স্ক্রল করে—নির্বাক, নীরব, অদৃশ্য দর্শকের মত। 

একমাত্র যার সাথে কথা বলে সে রনি, যে নিজে ইউটিউবার, সারাক্ষণ ভিউ, লাইক, সাবস্ক্রাইবারের পেছনে দৌড়ায়।


অনুর এই অদৃশ্যতাই হয়তো তাকে এক কঠিন ফাঁদে ফেলতে যাচ্ছে। কারণ যে মানুষ সমাজে চিহ্নহীন, তাকে যে-কোনো চিহ্ন পরিয়ে দেওয়া যায়।


পর্ব ১: যে ভিডিওতে অনু ছিল না, তবু ছিল!


ফেসবুকে হঠাৎ একটা ঝাপসা সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরাল হলো। পুরান ঢাকার বড় মসজিদের গলি— রাত সাড়ে ৮টা। একটা ছেলে একা এক নারীকে থামিয়ে কিছু বলছে, তারপর আকস্মিক ধাক্কা দিয়ে একটা সাদা মাইক্রোবাসে তুলে দিচ্ছে। নারী নিখোঁজ। ভিডিওটা পনেরো সেকেন্ডের।


ভিডিওর নিচে কমেন্ট:


“এই ছেলেটাকে চেনা চেনা লাগে।”

“এটা তো আমাদের এলাকার! পুরান ঢাকার।”

“ওর নাম অনু। ওর সাথে কেউ মেশে না; এইরকম ছেলেরাই এসব করে।”


পরের কমেন্টেই কেউ একজন ট্যাগ করলো অনু’র প্রোফাইল। তারপর যা ঘটলো, সেটা রীতিমতো সোশ্যাল মিডিয়ায় আগুন। একের পর এক শেয়ার, রিয়্যাক্ট, থ্রেড। যেন সবাই অপেক্ষায় ছিল একজন মুখহীন অপরাধী পাওয়ার জন্য— আর পেয়ে গেল।


অনু ভিডিওটা দেখলো। চমকে উঠলো! সেই ছেলেটার পরনে নীল পাঞ্জাবি, কালো জিন্স—ঠিক যেটা সে সকালে পরেছিল। কিন্তু সে তো ওই জায়গায় কখনো যায়নি। তার সেদিনের অবস্থান বলছে, সে বাসায় একাই ছিল। কিন্তু প্রমাণ দেবে কে? মা মৃত। বাবা অসুস্থ, কথা বলতে পারে না।


কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার ইনবক্স ভরে গেলো থ্রেটে:


“ঘাতক, তোকে আমরা চিনি।”

“চুপচাপ আছস তো কী হয়েছে? অপরাধীরাই চুপ থাকে।”


তার প্রোফাইলে পোস্ট এলো—যা সে লেখেনি:


“আমি কিছু বলতে চাই না। কারণ কথা বললে মানুষ বেশি সন্দেহ করে।”


এই পোস্টটা কে দিলো? তার পাসওয়ার্ড তো তার কাছেই। কিন্তু এখন সেটা বিচার্য নয়। বিচার্য হলো—এই পোস্টের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়লো পুরো নিউজফিডে। ভাইরাল হলো নতুন ক্যাপশনে: “দম্ভ দেখাচ্ছে অপহরণকারী।”


রনি ফোন করলো:


“দোস্ত, তুই অনলাইনে আসছ না কেন? তোর নামে তো পুরা দেশ পাগল, আজব তুলপাড়! তুই একটা কিছু বল!”


অনু বললো না। কারণ সে জানে না কী বলবে। আর তার এই নীরবতাকেই সবচেয়ে বড় অপরাধ বানিয়ে উপস্থাপন করলো ‘ডিজিটাল ডিটেকটিভ’ নামের একটা ফেসবুক পেজ। ক্যাপশন:


“অভিযুক্তের নীরবতা। সন্দেহ আরও ঘনীভূত হলো।”


পরের এক ঘণ্টায় ‘ডিজিটাল ডিটেকটিভ’-এর পোস্টে ২৫ হাজার শেয়ার পড়লো। পেজটির ফলোয়ার রাতারাতি ১০ হাজার থেকে ৪০ হাজারে পৌঁছলো। অ্যাডমিন পোস্ট দিলো: “পরবর্তী আপডেটের জন্য পেজটি ফলো করুন।” পোস্টের নিচে প্রথম কমেন্ট: “ধন্যবাদ ভাই, এমন আপডেটের জন্যই তো আপনাকে ফলো করি।”


রাতে অনু দেখলো, তার জানালার বাইরে কয়েকটা অচেনা ছেলে দাঁড়িয়ে মোবাইলে ভিডিও করছে। তারা চিৎকার করে বলছে, “এই যে ভাই, একটু সামনে আসেন! আমরা লাইভে আছি, পাবলিক আপনারে দেখতে চায়,এক মিনিট কথা বললে দশ হাজার ভিউ! অনু পর্দা টেনে দিলো। বাইরে হাসির শব্দ।




পর্ব ২: কন্টেন্টের কারখানা।


সকাল হতে না হতেই রনি এলো। চোখে তার উত্তেজনা। ফোনের স্ক্রিনে দেখালো একটা ইউটিউব ভিডিও—থাম্বনেইলে অনু’র অস্পষ্ট মুখ, পেছনে লাল আলো। টাইটেল: “ভাইরাল 'অপহরণকারী': সাইলেন্ট সাইকোপ্যাথ?” সেখানেও ভিউ ৭ লক্ষ ছাড়িয়েছে।


রনি বললো:


“এটা বানাইছে ‘রহস্যবিশ্ব’ চ্যানেল। তাদের গত ভিডিওর ভিউ ছিল ২০ হাজার। তোরে নিয়ে ১২ ঘণ্টায় ৭ লাখ!”


“আমি তো কিছু করিনি, রনি।”


“তাতে কী? তুই এখন একটা ঘটনা। তোরে নিয়ে সবাই কন্টেন্ট বানাবে। তুই যত চুপ থাকবি, তত ভিউ বাড়বে। কারণ তোর চুপ থাকাটাই ওদের চ্যানেলের কনটেন্ট।”


সেইদিনই আরও চার-পাঁচটা পেজ ভিডিও বানালো। ‘ট্রু ক্রাইম বিডি’, ‘আরবান লিজেন্ডস’, ‘সত্য অনুসন্ধান’, ‘মিস্টেরিয়াস বাংলা’, ‘ক্রাইম ইমোজি’—সবাই একই ফুটেজ, একই ছবি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভিন্ন ভিন্ন গল্প বানাচ্ছে। 

কেউ বলছে, অনু ‘এলিয়েন’, কেউ বলছে ‘ইন্টারসার্ভিস এজেন্ট’, কেউ বলছে ‘মানব পা'চার চক্রের সদস্য’, কেউ বলছে ‘সাবেক পাগল-গারদের পলাতক রোগী’। এক চ্যানেল তো আবার ভিডিও বানালো: “অনু কি টাইম ট্রাভেলার?” থাম্বনেইলে অনু’র ছবির পাশে বসানো হলো আইনস্টাইন আর নিকোলা টেসলার ছবি। ভিউ ২ লাখ।


আর প্রতিটা ভিডিওর নিচে একই কমেন্ট সেকশন—হাসির রিয়্যাক্ট, কেয়ার ইমোজি, সাথে অ্যাংরি ইমোজির বন্যা। আর কিছু মানুষ লিখছে:


-“আমি ওকে চিনি। কলেজে কখনো কারও সাথে কথা বলত না। খুব স'ন্দেহজনক ছিল।”

-“ওর চোখের দিকে তাকালে বুঝা যায়—অন্যরকম ঠান্ডা চোখ।”


এই কমেন্টগুলোর একটাও সত্য নয়। কিন্তু কে দেখবে? সবাই শুধু গল্প চায়।


বিকেলে ফেসবুকে ট্রেন্ড করলো #Arr'estAnu। কেউ কেউ অনু’র মৃত মায়ের পুরোনো প্রোফাইল খুঁজে বের করে কমেন্ট করলো:


“আপনার ছেলেকে কী শিখাইছিলেন, ওতো 'মানুষ' না?”


একটা পোস্ট ভাইরাল হলো, যেখানে দাবি করা হচ্ছে, অনু নাকি এক সপ্তাহ আগে একটি মেয়েকে স্টক করছিলো। পোস্টটা করেছিলো ‘তানিয়া আক্তার’ নামের এক তরুণী। ক্যাপশন: “আমি ভয়ে কিছু বলিনি। এখন বলছি—এই ছেলেটা রাস্তায় আমাকেও ফলো করেছিল।” রিয়্যাক্ট পড়লো ৩০ হাজার।

পোস্টের নিচে মেয়েরা লিখতে লাগলো: “আপু, ভয় পাইয়েন না। আমরা আপনার সাথে আছি।” “এমন পুরুষদের শাস্তি হওয়া উচিত।” "পুলিশ কী করে- এরে ধরে না কেন? "



পরবর্তীতে প্রমাণিত হলো, তানিয়া আক্তার বলে কেউ নেই। প্রোফাইলটা ফে'ইক। কিন্তু সেই পোস্টের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ার পর তানিয়ার অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব কারও আগ্রহের বিষয় থাকলো না। সত্য ম'রলো, গল্প বেঁচে গেলো।

বরং আরেকটা চ্যানেল ভিডিও বানালো: “তানিয়া আক্তার: সত্যি না নাটক? ভাইরাল গোয়েন্দা কাহিনী।” ভিউ পেলো ৫ লাখ।



রাতে রনি এলো আবার। বললো:


“দোস্ত, আমি তোরে নিয়ে ভিডিও বানাইছি। ‘আমার বন্ধু অভিযুক্ত: আসল ঘটনা’। বলছি না তুই দোষী, বলছি তোর পক্ষে।”


অনু ভিডিওটা দেখলো। রনি সেখানে বলেছে, “আমার বন্ধু ভুল বুঝার শিকার। ওর নীরবতাই ওর একমাত্র অপরাধ।” কিন্তু থাম্বনেইলে রনি দিয়েছে অনু’র একটা ছবি, যেখানে সে নির্লিপ্ত মুখে বসে আছে। ছবির পাশে বড় করে লেখা: “সত্যি না মিথ্যে?” ভিউ ১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে ৩ ঘণ্টায়।


অনু বুঝলো, তার নিজের বন্ধুও তাকে কন্টেন্ট বানিয়ে ফেলেছে। এখন কেউ তাকে রক্ষা করতে চায় না—সবাই শুধু তার মৃতদেহের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের উচ্চতা মাপতে চায়।


(অনু’র ফোনে নোটিফিকেশন—তার অ্যাকাউন্ট থেকে আরও একটা পোস্ট গেছে (সে দেয়নি):


“কাল রাতে যা ঘটবে, তার জন্য প্রস্তুত থেকো।”


পোস্টের নিচে কমেন্টের সুনামি।)


পর্ব ৩: ভিউ কে চায়?


অনু ঠিক করলো, এবার সত্যি খুঁজবে। কে তার নামে পোস্ট করছে? কে এই পুরো চক্র? রনি বললো, সাইবার ক্যাফেগুলো চেক করতে। কারণ যারা ভুয়া পোস্ট করছে, তাদের ট্রেস কোথাও না কোথাও পাওয়া যাবে।


তারা খুঁজতে খুঁজতে পেল পুরান ঢাকার একটা অন্ধকার গলির পুরোনো সাইবার ক্যাফে—“নেট ওয়ার্ল্ড”। সেখানে ঢুকে দেখলো, চার-পাঁচজন তরুণ বসে আছে, বয়স ২০-২৫। সবার চোখ কম্পিউটার স্ক্রিনে। একজনের স্ক্রিনে অনু’রই প্রোফাইল খোলা। আরেকজনের স্ক্রিনে ভিডিও এডিটিং সফটওয়্যার—সেখানে সেই সিসিটিভি ফুটেজ লোড করা, আর ফুটেজে যা নেই: ভয়েস ওভার, ড্রামাটিক মিউজিক, জুম-ইন এডিট, রহস্যময় টেক্সট বসানো হচ্ছে। 

টেবিলে ছড়ানো চিপসের প্যাকেট, সিগারেটের ছাই, বিয়ার আর এনার্জি ড্রিংকের ক্যান।



একজন বললো:


“আজকের পোস্টটা কী দিবি?”


“দে—আজ রাতে ও নাকি আত্মসমর্পণ করবে। সেটাই দিয়ে দে। সাথে ওর বাবার অসুস্থতার অ্যাঙ্গেলটা টাচ করবি। বলবি, ‘বাবার চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতেই 'অপহরণ'!’ ইমোশনাল কানেক্ট দরকার। ভিউ মারবো।”


“মাইক্রোবাসের ড্রাইভার কে ছিলো, সেটাও বলবি?”


“না, সেটা কালকের জন্য রাখ। দুই পর্বে রহস্য জমবে। সাপেন্স মানেই ক্লিফহ্যাঙ্গার। প্রতিটা ভিডিও শেষে ইউজার ‘নেক্সট পার্ট’ লিখবে, তাতেই এনগেজমেন্ট রেট বাড়বে, অ্যালগরিদম পুশ করবে।”


অনু এগিয়ে গেলো। তার চোখ লাল। “তোমরা কারা? কেন এসব করছো?”


তরুণরা চমকালো, কিন্তু ভয় পেলো না। বরং তাদের টিম লিডার—কালো টিশার্ট পরা ছিপছিপে ছেলে—হেসে বললো:


“আরে, এই যে আমাদের হিরো! আয় ভাই, বস। চা খাবি?”


“তোমরা জানো আমি কিছু করিনি। তাহলে কেন?”


ছেলেটা মুখে সিগারেট আর দুই আঙুলে 'মদের' গ্লাস একটু উঁচিয়ে বললো:


“দেখ ভাই, তুই কিছু করছস কীনা, সেটা বড় কথা না। বড় কথা হলো— তুই চুপচাপ থাক কিছু বলিস না। তোর নীরবতার ওপর আমরা গল্প লিখতে পারি। পাবলিক গল্প পছন্দ করে। ভিউ আসে। ভিউ মানে টাকা। তুই জানস, গত দুই সপ্তাহে আমরা এই পেইজগুলা থেকে কত কামাই করছি?”


আরেকজন নেশার ঘোর থেকে নাক কুঁচকে টেনে যুক্ত করলো:


“আমরা কারও ক্ষতি করছি না। তোরে পুলিশে ধরলেও কিছু হবে না, কারণ তোকে ক্যামেরায় দেখা যায় নাই। কিন্তু গল্পটা দারুণ, তাই না? পুরো দেশ এখন তোরে নিয়ে ভাবছে। তুই তো ব্যাটা সেলিব্রিটি হয়ে গেছস, হাহাহা।”



অনু থরথর করে কাঁপছে। “আর ভিডিওর ওই ছেলেটা?”


প্রথম ছেলেটা হাসলো:


“ওটা ডিপফেক। তোর জামাটা আমরা তোর কলেজের ইভেন্টের পুরোনো ছবি থেকে নিছি। মুখটা আরেকজনের, বডি আরেকজনের। তোর নামটা শুধু আসল। কারণ তুই কাউকে কিছু বলবি না—এটা আমরা জানতাম।”


রনি পেছন থেকে ফিসফিস করলো:


“তাহলে প্রথম কে শুরু করলো? কে প্রথম ভিডিওটা দিলো?”


কালো টিশার্টের ছেলেটা রনির দিকে তাকিয়ে হাসলো:


“তোর বন্ধুই তো। ওরে ছাড়া আমরা এতো ইনফো পেতাম কী করে? তোকে এইখানে আনার পিছনেও ওর হাত আছে। কী রনি, বলো না দোস্তকে? সম্পর্কটা তো তোদের পাবলিকই! ‘আমার বন্ধু অভিযুক্ত’—কী দারুণ টাইটেল দিছস! ওই ভিডিওটার অ্যাড রেভিনিউ তো তুই একাই পেয়ে গেছস। তুইও এখন বড় মহাজন!”



অনু ঘুরে দাঁড়ালো রনির দিকে। রনির মুখ ফ্যাকাশে, কপালে ঘাম।। তার হাতে মোবাইল কাঁপছে। সে বলতে চাইলো কিছু, কিন্তু পারলো না।


রনি বুঝতে পারলো, তার সেই প্রথম ফেসবুক পোস্ট—‘দোস্ত, ঘটনা কিছু দেখছস?’—ওটাই ছিলো শুরু। আর তারপর যখন দেখলো ভিউ আসছে, লাইক পড়ছে, ফলোয়ার বাড়ছে, সে আর থামেনি। সে নিজেই এই গ্রুপের হয়ে কাজ করতে শুরু করে। এমনকি সেই ‘তানিয়া আক্তার’ প্রোফাইলটাও তার বানানো।


হঠাৎ রনি দৌড় দিলো। অনু একা দাঁড়িয়ে রইলো সাইবার ক্যাফেতে। পেছন থেকে ছেলেটা বললো, “চিন্তা করিস না ভাই। কালকে নিউজ হবে, ‘অভিযুক্ত ‘’আত্মহত্যা’’ করছে’—শুধু পোস্টটা দিয়ে দেবো। তারপর গল্প শেষ। তোর এই গল্প আর থাকবে না। তুই জামেলা মুক্ত! আমরা নতুন কারও পেছনে লাগব। তুই রেস্ট নে।”



পর্ব ৪: লাইভ


পরদিন ভোরে সাইবার ক্যাফের ওই দলটা তাদের মাস্টারপিস আপলোড করলো। অনু’র অ্যাকাউন্ট থেকে (যেটা এখন পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণে) একটা ফেসবুক লাইভ শুরু হলো। লাইভে একটা অন্ধকার ঘর, ক্যামেরা কাঁপছে। ভয়েস ওভার চলছে: “আমি সব স্বীকার করছি। আমি অপরাধী। কিন্তু আমি একা নই...”


ভিউয়ার ঢুকছে দলে দলে। ৫০ হাজার, ১ লাখ, ২ লাখ—সবাই অপেক্ষা করছে ‘আত্মহত্যার’ লাইভ দেখার জন্য। কমেন্টে কেউ লিখছে “কর”, কেউ লিখছে “নাটক”, কেউ লিখছে “আমি তো শুরু থেকেই বলছি ওর চোখ-মুখ সন্দেহজনক!” কেউ কেউ পপকর্ন ইমোজি দিচ্ছে। একজন লিখছে: “কেউ কি স্ক্রিন রেকর্ড করছেন? পরে ভিডিও ডিলিট হইলে পাবো কোথায়?” আরেকজন লিখছে: “শেয়ার দিয়ে রাখছি, পরে দেখব।”



এর ভিতর হঠাৎ রহস্যর ঝট ভেঙে লাইভের ফ্রেমে ঢুকলো আরেকটা মানুষ—সেটা স্বয়ং অনু। কিন্তু এবার তার চোখে-মুখে ভয় নেই, বরং শান্ত, অদ্ভুত রকমের শান্ত।


সে সরাসরি ক্যামেরায় তাকালো:


“যারা এই লাইভ দেখছেন, আমি জানি আপনারা সত্যিটা জানতে চান, আর সত্যিটা হলো—আমি যা করিনি, তার জন্য আমি মরতে রাজি নই। কিন্তু নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো—আমার বন্ধু, আমার সহপাঠী, আমার প্রতিবেশী, এই পাড়ার সবাই মিলে আমাকে মেরে ফেলেছে গত দুই সপ্তাহ ধরে। আপনাদের এনগেজমেন্ট, আপনাদের শেয়ার, আপনাদের হাসির রিয়্যাক্ট—প্রত্যেকটা ছিল আমার বুকে ছুরির মতো। আপনারা ভেবেছেন এটা গল্প। কিন্তু এটা ছিল আমার বাঁচা মরার লড়াই।


অনু হঠাৎ পেছনে তাকালো। পুলিশের সাইরেন শোনা যাচ্ছে। সাইবার ক্যাফের টিম পালানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু বাইরে পুলিশ ঘিরে ফেলেছে। কালো টিশার্টের ছেলেটা চিৎকার করছে, “কিছু না, এটা আমাদের প্রজেক্ট ছিল! সোশ্যাল এক্সপেরিমেন্ট!” কেউ শুনছে না।



অনু আবার ক্যামেরার দিকে তাকালো:


“তবে আমি আপনাদের ক্ষমা করবো না, কারণ আপনারা ক্ষমা চাইতেও আসবেন না। কাল সকালে আরেকটা ভিডিও ভাইরাল হবে, আর আপনারা এটা ভুলে যাবেন। কিন্তু আমি ভুলবো না। কারণ আমি আজও নীরব। আর নীরবতার চেয়ে ভয়ংকর কিছু নেই।”


লাইভ কেটে গেলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো—“This video is no longer available.”




আমার ঘরের কোনায় একটা বিবর্ণ ক্যাকটাস আছে; এটা মানুষ থেকে অবহেলা, অবজ্ঞা পাওয়ার পর লাগিয়েছি,  সবাই জানে ক্যাকটাসের ওতো জল আর শীতল বাতাসের প্র...

আমার ঘরের কোনায় একটা বিবর্ণ ক্যাকটাস আছে;

এটা মানুষ থেকে অবহেলা, অবজ্ঞা পাওয়ার পর লাগিয়েছি, 

সবাই জানে ক্যাকটাসের ওতো জল আর শীতল বাতাসের প্রয়োজন হয়না—

যে কিনা মরুভূমির সব রহস্য জানে,

তাই কোমল জল না পেলেও টিকে থাকার শিল্পটা তার রক্তে।


আর এই নির্জন ক্যাকটাস শরীরে জমিয়ে রাখে মরু-জীবনের মন্ত্র,

অবজ্ঞার কাঁটা গায়ে বিঁধলেও সে ফোটায় একাকী ফুল—

যে ফুল জানে, প্রত্যাশার জল ছাড়াও নিজের রক্তের রসে বেঁচে থাকা যায়।


আমার ঘরের দেয়ালে একটা শঙ্খ ঝুলানো আছে, 

এটা মানুষের অনাগ্রহের ভাষা চিনার পর কিনেছি, 

শঙ্খটা ফাটল ধরা, রঙ হারানো; তবু কানের কাছে ধরলে সমুদ্রের গর্জন শোনায়—

যার নিজের ভেতরে মহাসমুদ্র তার কাউকে আর জীবনের কোলাহল শুনানোর প্রয়োজন হয়না।


আমার সম্পত্তি বলতে একটা চশমা আছে—

মানুষের শতরূপ দেখতে দেখতে দৃষ্টি হারিয়েছি অনেক আগেই,

তাই এই চশমাটা পরার পর—

এখন আমি শুধু সত্যিটা দেখতে পারি, কে কী জন্য হাসে, কী বলতে চায়।

আর এই চশমাটা চোখে তুললেই উবে যায় সব মুখোশের কারুকাজ,

এ চশমাটা শুধু দৃষ্টি ফেরায় না, চোখের ভাষা পাল্টে দেয়—

আমি এখন অন্ধের মতো শুনি, বধিরের মতো দেখি,

আর ঠিক যেখানে সবাই মাখনের মতো গলে যায়,

আমি সেখানেই পাথর হয়ে বসে থাকতে শিখে গেছি।


শিখে গেছি অ্যাসপিডিস্ট্রার এর মতো বেঁচে থাকা, 

যাকে ধুলো, আঁধার, অনাদর কোনো কিছুই নোয়াতে পারে না।

মেরুদণ্ড নিয়ে জন্মেছি বলেই আমি মানুষ; 

যাকে যতই অপমান, অবহেলা আর অবজ্ঞা দাও, সে ততই সোজা হয়ে ওঠে।





আমার সাথে পরিচয় হলে হয়তো বলবেন, “বাহ্ দারুণ মানুষ”। আমি হাসব। এই হাসিটা শিখতে আমার কত বছর লেগেছে, জানেন? দীর্ঘ অনেক বছর— কারণ আমি ভালো সাজা ...

আমার সাথে পরিচয় হলে হয়তো বলবেন, “বাহ্ দারুণ মানুষ”।

আমি হাসব। এই হাসিটা শিখতে আমার কত বছর লেগেছে, জানেন?

দীর্ঘ অনেক বছর— কারণ আমি ভালো সাজা শিখেছি শুধু, ভালো মানুষ নই।

আর এই ভালো সাজাটা ছিল আমার বেঁচে থাকার সবচেয়ে কম খরচের পথ।


এককালে আমি একটা শহরের মত ছিলাম। শহরটার একটা মানচিত্রে ছিল,

তার নিজস্ব রাস্তা ছিল, নিজস্ব অলিগলি ছিল।

কিন্তু প্রতিদিন কেউ না কেউ এসে বলত, “এই রাস্তাটা সোজা করে দাও, এই বাড়িটা সরাও, এই বাগানটা সরাও এই নদীর বাঁকটা অন্যদিকে ঘোরাও,

—যেন সবার হাঁটতে সুবিধা হয়।”

আমি সরিয়েছি। ঘুরিয়েছি। সোজা করেছি।

একদিন দেখলাম, আমার নিজের আর কোনো মানচিত্র নেই।

আমি এখন যে শহর হয়ে দাঁড়িয়ে আছি,

সেটা আর আমার শহর নয়—

সেটা হয়ে গেছে মানুষের প্রয়োজনের উপনিবেশ।


যদিও ভালো সাজা কোনো গুণ নয়,একটা ট্রেড-অফ।

যেমন অর্থনীতিতে বলে, কোনো কিছু পেতে গেলে

কিছু ছাড়তে হয়।

আমি ছেড়েছি নিজের ইচ্ছাগুলো,

যেন সেগুলো আমার না হয়ে মানুষের প্রয়োজন হয়ে ওঠে।

আমি ছেড়েছি নিজের কণ্ঠস্বর,

যেন সেটা আমার কথা না বলে অন্যের মন রক্ষার্থে চলে ।


এই ভালো হওয়ার পেছনে কোনো নৈতিকতা ছিল না,

ছিল শুধু এক নেশা—

অন্যের চোখে নিজেকে টিকিয়ে রাখার নেশা।

একে কি "ভালো থাকা" বলে?

না, একে বলে রিফ্লেক্টেড সেলফ-ওর্থ।

আমার নির্ধারণ আমার ভেতর ছিল না,

আমার নির্ধারণ ছিল মানুষের দৃষ্টির শেয়ারবাজার,

যে বাজারে নিজের মূল্য উঠা-নামা করে,,

অন্যের মুড, অন্যের প্রয়োজন, অন্যের ইচ্ছার উপর অঙ্ক হিসাব করে।


আমার একমাত্র অপরাধ ছিল,

আমি নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেকেই বিক্রি করেছি।

কিস্তিতে, ফ্রি অফারে, ডিসকাউন্টে—

কখনো দামও চাইনি।


জীবনের এতগুলো বছর পেরিয়ে , যখন এই পড়ন্ত বিকেলবেলায়,

আমি জানি না আমার ভিতরের "আমিটার" নাম কী।

নাম তো আছে— পরিচয়পত্রে, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে, ইমেইল সিগনেচারে।

কিন্তু যে নামটা নিশ্বাসের ভেতর থাকে, যে নামটা ঘুমের ভেতর ডাকে,

সে নাম আমি হারিয়ে ফেলেছি কবে জানি না— 

হয়তো কোনো মঙ্গলবার,

হয়তো কোনো এক দুপুরের গ্রামে।








শীত কুয়াশার আঁচলে ঢাকা গ্রাম- সকাল সকাল ঘুম ভেঙ্গে বারান্দায় দাঁড়াতে অনিকের চোখে পড়ল লাল জবায় স্নিগ্ধ শিশির ঝুলছে মুক্তোর মত। অনিকের ঠাণ্ডা ...

শীত কুয়াশার আঁচলে ঢাকা গ্রাম- সকাল সকাল ঘুম ভেঙ্গে বারান্দায় দাঁড়াতে অনিকের চোখে পড়ল লাল জবায় স্নিগ্ধ শিশির ঝুলছে মুক্তোর মত। অনিকের ঠাণ্ডা অনুভূত হতে ঘরের ভিতরে গিয়ে শাল জড়িয়ে পুনরায় বারান্দায় দাঁড়াতেই খানিক আগ মুহূর্ত দেখা জবা ফুলটি নেই আর; রীতিমতো উদাও হয়ে গেল!


অনিক অবাক হয়ে চারদিক তাকাতেই দেখে এক উর্বশী রমণী মেরুন রঙের শাল গায়ে খোঁপায় জবা ফুল গুঁজে হেঁটে যাচ্ছে ধীরে ধীরে- অনিক পিছন থেকে ডাকতে লাগলো এই যে কে আপনি? দাঁড়ান বলছি! কিন্তু রমণী একটুও কর্ণপাত করল না হাঁটতে লাগলো আপন গতিতে। অনিক হাঁটার গতি বাড়িয়ে পিছন থেকে বার বার ডাকতে লাগল; রমণী শুনেও না শুনার ভান করে মৃদু মৃদু পায়ে কুয়াশার ভিতর হারিয়ে গেল। 


অনিক অনেক খুজেও আর পায়নি, কে এই রমণী কেনইবা তার বাগান থেকে জবা নিয়ে কিছু না বলে এইভাবে অদৃশ্য গন্তব্যে মিশে গেল। এতো ছন্দ নিয়ে হাঁটে যে রমণী যার গড়নে ফোটে অস্পষ্ট নদীর ঢেউ, মোহনা দেখিয়ে চোখের সামনে থেকে কেন হারিয়ে গেল এমন অপলক। 

অনিক ফিরে এসে বারান্দায় দাঁড়াতে চোখ পড়ল জবা গাছে যে ফুলটি ছিল না একটু আগে, সে ফুলটি ঠিকঠাক ঝুলছে। অনিক বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে তার সাথে। Change Blindness এর সমস্যা হলে তো এমন হবার কথা না হয়তো ফুল নেই বা আছে এইটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধতা থাকতো। কিন্তু সাক্ষাৎ একটি রমণী যার পরনে নীল শাড়ি তার উপর মেরুন রঙের শাল জড়ানো- যেন শীতের সকালে পৃথিবীর সব সৌন্দর্য নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, সেতো মিথ্যে হতে পারে না।  


অনিক বুঝতে পারছে না তার হ্যালুসিনেশনের সমস্যা হচ্ছে কিনা? কিন্তু তারতো ঘুম থেকে শুরু করে সবকিছু ঠিকঠাক হচ্ছে তাহলে এমন বিভ্রান্তি কেন হচ্ছে। রমণী ফুল নিয়ে চলে গেছে বা কুয়াশার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেছে ব্যপারটা মানা যায়। কিন্তু ফুল নেই; ফুল আছে। এইটা সত্যি অনিকের কাছে রহস্যের চেয়ে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। 

অনিক চা বানিয়ে বারান্দায় দাঁড়াতে মনে মনে জোর দিয়ে ভাবল যেন জবা ফুলটি উদাও হয়ে যায়, কিন্তু না জবা ফুলটি ঠিকই দুলছে সকালের সোনালী রোদে। অনিক বার বার চোখ ফিরিয়ে আবার তাকায় কিন্তু জবা ফুলটি আর অদৃশ্য হয় না। অনিক ভুলতে চাইছে খুব- স্ট্র্যাপ স্যান্ডেল পরা রমণী যার হাঁটার মধ্যেই যেন প্রকৃতির এক শিল্প লুকিয়ে আছে, যার কোমল আবরণে ঢাকা চাঁদের গল্প যেন কুয়াশার মত নরম স্নেহপূর্ণ প্রতিচ্ছবি আঁকা। এমন রমণী যার কালো কেশে লাল টকটকে জবা ফুল শোভা পায়। সে চোখের পাতায় অদৃশ্য হলেও মনের ঘরে বার বার উঁকি দিয়ে ফিরে আসে। যদি ফিরে তাকাতো রমণী একবার যদি দেখা হত তার কোমল রোদে সকালের আলোর মত মুখখানি।

 

---

 অনিক; অনিক ওঠো ওঠো শব্দে-- অনিকের ঘুম ভাঙল; স্বপ্নের ঘোর কেটে অনিক বুঝতে পারছে না কে ডাকছে? চারপাশে দেয়াল, ফ্লোরে শুয়ে আছে তার মত আরও অনেক 'আসামী যারা কেউ 'খুন করছে কেউবা বড় কোন অপরাধ!! অনিকও 'খুন করে জেলের ভিতর বিচারিক প্রক্রিয়ায় অপেক্ষার প্রহর গুনছে 'ফাঁসির । অনিক উঠে বসতে দেখে লোহার শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে পূর্ণিমা যার অস্পষ্ট মুখটি দেখতে স্বপ্নের ভিতর হাঁসফাঁস হয়ছিল খুব সে দাঁড়িয়ে আছে সেলের বাহিরে ভেজা চোখে। এতো অপরুপ এতো মায়াভরা সুন্দর মুখ নিয়ে কেউ যদি সেলের গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে এই কারাগারে আজীবন বন্ধি থাকা যায় অনায়াসে। 


কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে, 'ভয়ংকর 'অপরাধীদের সাথে সীমিত সময়ের জন্য প্রিয়জনদের সাথে দেখা মিলে। 

অনিক অনেক কষ্টে উঠে পূর্ণিমার কাছকাছি দাঁড়ালো গ্রিলে হাত রেখে। পূর্ণিমার খোঁপায় জবা ফুল দেখতে জিজ্ঞেস করল?

তুমি কি এইখানে আসার আগে আমার বাগানে গিয়েছ জবা ফুল তুলতে?

হুম্ম! 

তোমার একদম ঠিক হয়নি; এই ফুলই তো তোমার সর্বনাশ এর কারণ হল। 

যে ফুল একবার ঝরে যায় অনিক! সে ফুলের আর ঝরার ভয় থাকে না, আমি না হয় ঝরে গেলাম কিন্তু তুমি কেন আমার জন্য তোমার জীবনটা শেষ করে দিলে। 


পূর্ণিমা আমি একজন 'ধর্ষককে 'খুন করছি, আর এই 'খুনে আমার নিজের কাছে কোন 'অপরাধবোধ কাজ করে না। 

অনিক আমার কারণে কেন তুমি শাস্তি পেতে হবে? 

পৃথিবীর কোন 'ধর্ষকের বেঁচে থাকার অধিকার নাই! আমার যদি ক্ষমতা থাকতো পুরো পৃথিবীর 'ধর্ষকদের 'খুন করতাম! তার জন্য যদি হাজারবার 'মরা লাগে 'মরতে রাজী আছি। 

অনিক আমার ক্ষত বিক্ষত ঝরে পড়া ফুলটাকে কী তুমি এখনও ভালোবাসো? যাকে সমাজের এক প্রভাবশালীর রাজপুত্র হেসে হেসে 'ধর্ষণ করছে তোমার বাগান থেকে জবা নিয়ে খোঁপায় গুজতে যাওয়ার পথেই,, আহা কুয়াশা ঢাকা ছিল তখন চারিদিক আমার 'চিৎকার কেউ শুনেনি সেদিন, একজন 'ধর্ষকের হাত পশুর মত অনেক হিংস্র হয়,, থামিয়ে দেয় নিরীহ প্রানের 'আর্তনাদ। 


প্লিজ! প্লিজ পূর্ণিমা আমি শুনতে চাই না আর, শুনতে চাই না; শুনতে চাই না,, তুমি থামবে পূর্ণিমা তুমি থামবে! 

অনিক এমন কেন করছ আমিতো অনেক আগে 'মরেই গেছি, আমার এখন কোন কিছুতে কোন আক্ষেপ নাই। আচ্ছা অনিক তুমিতো আমাকে কোনদিন দেখনি; যতদিন তোমার বাগানে গেছি মুখ ঢেকে যেতাম; তোমার কত ইচ্ছে ছিল আমাকে দেখার, আর যেদিন তোমাকে আমার চন্দ্র মুখের শোভা দেখাতে চেয়েছি সেদিনি আমি 'ধর্ষিতা হলাম। 

পূর্ণিমা থাম তুমি; থাম! তোমাকে আমার ভিতর লালন করেছি পাখির মত, তোমাকে চিনতে চাঁদকে দেখেছি সারারাত,, তোমার চুলে শোভা দিতে জবা গাছের যত্ন নিয়েছি প্রতিদিন।


অনিক ভয়ানক আঁচড়ের দাগ শরীরে বেশি দিন থাকে না, কিন্তু ক্ষত বিক্ষত এই মন থেকে এই দাগ কোনদিন যায় না! শরীর যে মনের বোঝা এই বয়ে বেড়ানো যায় না,, তুমি যে রুপে আমাকে এখন দেখছ এইটা তোমার কল্পনার রুপ, তোমার কল্পনা থেকে আমি আরও বেশি সুন্দর ছিলাম। কিন্তু নিয়তি তোমাকে কোনদিন আমার সুন্দর মুখ দেখতে দেয়নি,, দেখো সবাই হাসছে তুমি সেলের গ্রিল ধরে আমাকে কল্পনা করে কথা বলছ দেখে, আমি বরং চলে যায় অদৃশ্য জগতে যে জগতে কষ্ট কিংবা দুঃখ নাই। 


না পূর্ণিমা যেও না! দেখো, তোমার জন্য কারাগারের দেয়ালে জবা ফুল এঁকেছি আঙ্গুলের নখ ক্ষত বিক্ষত করে। ফিরে আসো তুমি, ফিরে আসো। একটাবার শুধু একটাবার তোমার খোঁপায় জবা ফুল গুঁজে দিয়ে দেখতে চাই, আমি!



বৃক্ষ যেমন তার শিকড়ের উপর ভর করে বেড়ে ওঠে সজীব-প্রাণবন্ত হয়, একটা মানুষের ক্ষেত্রেও শিকড়ের প্রভাব গাছের ন্যায়।  দ্বীপ একটি বিচ্ছিন্ন সমুদ্রে...

বৃক্ষ যেমন তার শিকড়ের উপর ভর করে বেড়ে ওঠে সজীব-প্রাণবন্ত হয়, একটা মানুষের ক্ষেত্রেও শিকড়ের প্রভাব গাছের ন্যায়। 


দ্বীপ একটি বিচ্ছিন্ন সমুদ্রের নাম। যার বয়স সাত কি আট হবে তখনি  বিছিন্ন হতে হয় তার বাবার কাছ থেকে। বয়সের স্বল্পতা আর সামাজিক মর্যাদার টানাপোড়েন তখন বুঝতে না পারলেও দ্বীপ এখন বুঝতে পারে তার মমতাময়ী মা 'রূপকথা' কেন কনভারশন ডিসঅর্ডারে পুরোপুরি বোবা না হলেও কথা বলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে চিরতরে। 


দ্বীপের বাবা পড়াশোনার বয়সে পারিপারিবকভাবে সচ্ছল না হবার কারণে তার মায়ের বান্ধুবি মানে দ্বীপের শাহেদা ফুফির সুবাধে দ্বীপের নানার বাড়িতে জাইগীর মাস্টার হিসেবে পড়াশুনা করতেন এবং পড়াতেন। দ্বীপের মা ছিলেন দ্বীপের বাবার ছাত্রি; দ্বীপের বাবার শিষ্টাচার, নম্রতা-ভদ্রতা  দেখে দ্বীপের  বাবার প্রতি দ্বীপের মার ভালোলাগা জন্ম নেয়  আর এই ভালো লাগা একসময় পরিবারের বাধ্যবাধকতা ডিঙিয়ে বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় দ্বীপের নানীর আর্শীবাদে। দ্বীপের নানাও মেয়ের একরুপ অবস্থানের জন্য শেষ পর্যন্ত মেনে নেয়। "ভালোবাসার ক্ষেত্রে একরুপ মানুষগুলো বড় অন্যরকম এদের চাইলেও পৃথিবীর কোন কিছু দিয়ে বদলানো যায় না, হয়তো ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করবে নয়তো সারাজীবন একাকিত্বকেই মেনে নিবে। বহুরূপী মানুষের কাছে প্রকৃত ভালোবাসা কখনো স্থান পায় না।"


সে যাইহোক দ্বীপের বাবা তখন সংসারের অর্থকষ্টের ভিতর দ্বীপের মাকে ঘরে তুলে সারাজীবনের প্রতিজ্ঞাবদ্ধতায়।

ঐদিকে দ্বীপের নানা মানুষের কানকথা শুনতো খুব যখন মানুষ বলতো, আপনি এতো ধনী আর নামী বংশের মানুষ হয়েও কিভাবে মেয়েকে একটা সামান্য জাগির মাস্টারের কাছে তুলে দিলেন। একসময় মানুষের কথা শুনতে শুনতে অতিষ্ট হয়ে মেয়েকে অভাবের সংসার থেকে মুক্ত করতে ডিভোর্স এর জন্য বাধ্য করেও পারেনি। মেয়ের একটাই কথা স্বামীর ঘর ছেড়ে কোথাও যাবে না। অতঃপর মেয়ের দৃঢ়তার কাছে হেরে গিয়ে মেয়ের জন্য উনার বাড়ির কপাট চিরতরে বন্ধ করে দেয়।


.......


হঠাৎ বিয়ের সাত বছর পর দ্বীপের নানা এই বন্ধ কপাট খুলতে কানাডা থেকে(এর ভিতর দেশে আরও দুই এক বার আসলেও মেয়ের সাথে যোগাযোগ করে নাই) এসে মেয়েকে মেনে নেবার ভান করে কৌশলে দ্বীপের মা আর তার নাতিকে নিয়ে কানাডা পাড়ি জমান, দ্বীপের বাবার জন্য কাগজ-পত্র রেডি হচ্ছে বলে দ্বীপের মাকে আশ্বস্ত করেন; এমনকি কিছু ভুয়া কাগজ পত্রও দেখান যাতে দ্বীপের মার সন্দেহ না হয়। 


কিন্তু কানাডা যাবার পর দ্বীপের মা বুঝতে পারে তার নানার কৌশল ছিল এইটা, তার নানা এই সামান্য জাইগীর মাষ্টারকে কোনদিন মেনে নিতে পারেননি। অনেকটা চাপের মুখে দ্বীপের বাবার কাছে ডিভোর্স লেটার পাঠাতে বাধ্য করে যদিও তালাক-এ-তফভিজে তা দাখিল ছিল না তবুও তার বাবাকে বুঝানো যে আমার মেয়ে আর তোমার মত ছোটলোকের  কাছে যাবে না কোনদিন। মর্যাদার কাছে দ্বীপের বাবা হেরে গিয়ে একসময় দ্বীপ আর দ্বীপের মার শুন্যতা মেনে নিতে না পেরে এই কঠিন পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে চলে যান চিরতরে। 

........


দ্বীপের মা কানাডা থেকে ফিরে আসার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হয় দ্বীপের নানা আর মামাদের কাছে, তার মার তবুও বিশ্বাস ছিল একদিন তার বাবার কাছে যাবে; কিন্তু যখন খবর আসে তার বাবা আর নাই এই পৃথিবীতে তার মা মানসিক আঘাত থেকে এক ধরনের  অ্যামনেশিয়ায় আক্রান্ত হয়ে যায়; সাথে কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলে। 


দ্বীপের মা অতিরিক্ত সুন্দরী হবার কারণে অনেকে তখন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসলে, তার মায়ের মানসিক ও শারীরিক অবস্থা আরো বেগতিক হয়ে যেত , তাই বিয়ে নিয়ে কেউ আর পীড়াপীড়ি করেনি। 


দ্বীপ তার মাকে জ্ঞান বয়স থেকে কোনদিন হাসতে দেখেনি, দেখেনি কোনদিন প্রান ভরে কথা বলতে। একটা সময় নাকি দ্বীপের  মা শুদ্ধ বলতে পারলেও তার  বাবার পছন্দ ছিল আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা, তাই তার  মা সবসময় সন্দ্বীপের ভাষায় কথা বলতেন। 

-----

কানাডার আলবার্টা প্রদেশে অবস্থিত ফোর্ট মাকমারে শহর যার চারপাশে বরফাচ্ছন্ন ঘেরা, খুব কম সংখ্যক মানুষ বাস করে এই উপত্যকায়, পরিবেশ আর জীবনের কঠিন অধ্যায়ের ভিতর দ্বীপও হয়ে উঠে এক অন্তর্মুখী মানুষের প্রতিছব্বি। হয়তো  সময়ের পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে একটা সময় পুরনো পৃষ্ঠার কথা মানুষ ভুলে যায়, দ্বীপও তাই।  


অদ্ভুত এই শহরের একটি পুরনো লাইব্রেরী আছে যেখানে গিয়ে দ্বীপ মাঝে মাঝে অজানা সব বই পড়ে, একদিন লাইব্রেরী গিয়ে বই নাড়াচাড়া করতে করতে দ্বীপের চোখে পড়ল অ্যালেক্স হেইলির  লিখা ‘’দ্যা রুট’’ বইটির দিকে। দ্বীপ বইটি নিয়ে পড়তে পড়তে কখন যে বিকেল থেকে রাত দশটা বেজে যায় টেরও পায়নি সে।  


দ্বীপ ধীরে ধীরে বইয়ের শেষ প্রান্তে যেতে  উপলব্ধি করতে থাকে নিজের শিকড় বা পরিচয়ের গভীরতা কি? দ্বীপ বুঝতে পারে অতীত, পরিবার, সংস্কৃতি, এবং ঐতিহ্য আমাদের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটা সময় দ্বীপ গ্রন্থাগারিক থেকে বইটি নিয়ে বাসায় ফিরে যায়। 


দ্বীপ সিদ্ধান্ত নিল নিজের জীবনের গভীর অর্থ বুঝতে বা নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সঠিক সত্ত্বার খুঁজ বের করতে, তাঁকে তার শিকড়ের কাছে যেতে হবে। তাই তার ইচ্ছের কথা গিয়ে তার মামাদের কাছে বলল, কিন্ত তার মামারা দ্বীপের মুখের উপর 'না' করে দেয়। কিন্তু দ্বীপ এখন আর সেই ছোট দ্বীপ নেই,  মাকমারে বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বিদ্যাপীঠ অনেকটা শেষের দিকে। তার এই সিদ্ধান্তের কথা যে তার কোন বন্ধুকে জানাবে সেরকম কোন বন্ধুও নাই তার। অতিরিক্ত ইন্ট্রোভার্ট হওয়ার কারণে মেয়েতো দূর তার ভালো কোন ছেলে বন্ধুও নেই।কিন্তু এই শহরের মেয়েদের প্রতি তার যে আগ্রহ কাজ করে তাও কিন্তু না, ভালোলাগা বা কথা বলার জন্য তার এই শহরে আপন কেউ নেই। 

.

অবশেষে দ্বীপ জানুয়ারি ছয় তারিখ এর জন্য টিকিট বুকিং দেয়, প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে দ্বীপ অপেক্ষা করছে কখন সকাল হবে। সকাল হতেই দ্বীপ সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গেল মায়ের ঘরে, মাকে সালাম করে জড়িয়ে ধরে, মা অশ্রুসিক্ত চোখে অনেক কিছু বলতেও গিয়ে বলতে পারলেন না, মাথায় হাত বুলিয়ে হয়তো বলতে চাইছেন ‘’ তুই তোর বাবার রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতি, তোকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি আমি, নিজের যত্ন নিস বাবা।

.....


দ্বীপ উড়োজাহাজে বসে বসে ভাবছে এতদিন পর দেশে যাচ্ছে, পথঘাট তেমন চিনা নাই কোথায় কিভাবে যেতে হবে। ভাবতে ভাবতে দেশের মাটিতে যখন উড়োজাহাজের চাকার ধাক্কা লাগে দ্বীপের ভিতর এক অজানা শিহরণ জেগে ওঠে। আহাঃ দেশের মাটি সংস্পর্শ কতই না প্রলুব্ধ করে ভিতর। দ্বীপ এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে  মিট অ্যান্ড গ্রিট সার্ভিস করে চট্টগ্রাম হোটেল পেনিনসুলা যেতে যেতে চারিদিক খুব উৎসাহ দেখতে লাগল, দোকান-পাট দেশের মানুষ। একসময় ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বলল—


আপনার নাম কি, ব্রাদার?

আমার নাম মজনু।

খুব সুন্দর নাম, মজনু ভাই আমি প্রায় বিশ বছর পর দেশে আসছি, তেমন কিছু চিনি না, আপনি আমার একটা উপকার করতে পারবেন?

কি যে বলেন ভাইজান, পারব না মানে আপনি শুধু বলে দেখেন!

আমার একটা সিম লাগবে!

আরে সামনে টেলিফোনের দোকান আছে ভাইজান নিয়ে নিব।

মজনু ভাই আমাকে আরেকটা হেল্প করতে হবে?

বলেন ভাইজান?

আমি কালকে সন্দীপ যাব, আপনি কি আমাকে ড্রপ করতে পারবেন কাল সকালে?

ভাইজান আমিতো হোটেলের সার্ভিস এর বাহিরে ভাড়া মারতে পারি না, চিন্তা কইরেন না ভাইজান আমার একটা ছোটভাই আছে ও আপ্নারে নিয়া যাবে, আপনি ওর নাম্বারটা নিয়া নেন। 

.

পরদিন সকালে দ্বীপ কুমিরা ঘাটে এসে টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়াতে তার ভিতর অদ্ভুত এক ভালো লাগা ছুঁয়ে গেল। এই নদী, এই জন্মভূমির মানুষগুলো কতই না আপন। দ্বীপের বেশভূষা দেখে দ্বীপকে বেশিক্ষণ লাইনে দাঁড়াতে দিল না তার প্রিয় সন্দ্বীপবাসী; দ্বীপ টিকেট কেটে স্পিড বোটে উঠতেই তার ভিতর উত্তেজনা শুরু হল শিকড়ের টানে। 

.

কুয়াশার চাদরে ঢাকা আবছা আবছা সন্দ্বীপ যতই স্পষ্ট হচ্ছে দ্বীপের চোখে, দ্বীপের ভিতরের উচ্ছ্বাস যেন অন্তর্মুখী সত্ত্বাকে বহির্মুখী করে তুলে— তার খুব প্রানখুলে বলতে ইচ্ছে করে এইটাই আমার অস্তিত্ব আমার প্রানের অনন্ত চাওয়া পাওয়ার  সবটুকু, আমার প্রিয় সন্দীপ।


দ্বীপ গুপ্তচড়া ঘাটে নামার আগে পায়ের জুতা খুলে খালি পায়ে তার প্রিয় মাতৃভূমি স্পর্শ করলো, মায়ের মত শীতল মমতার আদরে তার পুরো শরীর যেন শিকড়ের সংস্পর্শে সজীব হয়ে উঠল। দ্বীপদের বাড়ির  নাম জিলাপির’গো বাড়ি, দ্বীপ  ভ্যান থেকে নেমে, মুখ থেকে বাড়ির নাম বলার আগেই ট্যাক্সিওয়ালারা টানাটানি শুরু করে দিল।


.

অবশেষে দ্বীপ বাড়ি এসে পরিচয় দিতে তার চাচা আবেগে জড়িয়ে ধরে ঘরে নিয়ে যায়, তার চাচার ভিতর আবেগ ভয় দুইটা কাজ করতাছে এতদিন পর ভাতিজা এসে আবার জায়গা সম্পত্তির ভাগ বসাবে কিনা। তাই অতিরিক্ত খুশি হয়েও হতে পারলেন না। কিন্তু দ্বীপের চাচি দ্বীপকে দেখে মায়ের মত আপন করে দ্বীপের জন্য খাবার দাবারের আয়োজন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। 

.

দ্বীপ দুপুরের খাবার খেয়ে শর্ট  ন্যাপ নিয়ে বিকেলে তার চাচাতো ভাই তনিমকে নিয়ে বের হল শাহেদা ফুফির বাড়ির উদ্দেশে— অনেক বছর পর রিক্সা চড়া অভিজ্ঞতা দ্বীপকে সত্যি মুগ্ধ করছে আশপাশের অরণ্যঘেরা গাছ-গাছালি দেখে। দ্বীপের চাচাতো ভাই হুট করে  শিবের হাটে রিক্সা থামাল, বিনা-শাহ’র দোকানের মিষ্টি খাওয়ার জন্য। দ্বীপ মিষ্টি খেয়ে অবাক হয়ে বলল এমন সাদামাটা একটা দোকান এত সুস্বাদু সুইট এর আগে আমি কখনও খাইনি। 


.

দ্বীপ অপেক্ষার পথ ফেরিয়ে এখন ফুফিদের ঘরের সামনে, তার ফুফি বসে আছে ঘরের সিঁড়িতে, দ্বীপ চিনে না ফুফিকে, ফুফিও চিনে না দ্বীপকে, তাই তার ফুফি তনিমকে  জিজ্ঞেস করে, কে উনি? তনিম বলল- ফুফি আমদের  দ্বীপ ভাইয়া।.. এই কথা শুনে তার ফুফি গলা ফাটা চিৎকার দিয়ে এমন ভাবে দাঁড়ালো আরেকটু হলে হয়তো শাড়ি পেঁচিয়ে পড়ে ঠেং ভাংত, জানিনা কি আবেগ তার ফুফির ভিতর জমে ছিল; ফুফিরা কেন এমন হয় কেন এমন আপন করে ভালবাসতে পারে— দ্বীপকে জড়িয়ে ধরে দ্বীপের ফুফি শুরু করে দিল 'মরা কান্না আর জোরে জোরে বলতে লাগল আমার বাপ কত বড় হয়ে গেছে আমার আব্বা কোথায় ছিল এতোদিন ফুফিরে ভুলি। বাড়ির সবাই ঘর থেকে বের হয়ে গেল ফুফির এমন ভয়ঙ্গর কান্না দেখে। 

.

দ্বীপ একে একে সবার সাথে পরিচিত হতেই;  হঠাৎ তার চোখ আঁটকে গেল অন্যরকম এক ভাললাগায় লাজুক আর মায়াবী চোখে, দ্বীপ এর আগে এমন নিখুঁত সুন্দর দেখিনি কখনো, বিকিনি আর অশ্লীল পোশাকের ভিতর বেড়ে উঠা দ্বীপের কাছে এমন শালীন সুন্দরী মানবী যে থাকতে পারে পৃথিবীতে, দ্বীপ সে কথা ভুলেই গিয়েছিল একদম!! দ্বীপ এই লাজুক মেয়েটা কে ফুফিকে জিজ্ঞেস করতেই ফুফি বলে— আরে এটা আমার মেয়ে সন্ধ্যা!! অনেক লাজুক, তোর সামনে আসতে অনেক লজ্জা পাচ্ছিল বাবা।


.

ফুফির শেষ কথা যতদিন দেশে থাকবে তার বাড়িতে থাকতে হবে- তাই তনিমকে দিয়ে দ্বীপের  ব্যাগ নিয়ে আসলো । ফুফির রান্না-বান্না ব্যস্ততা শেষে একটা সময় যখন  রাতে খাবারের জন্য টেবিলে বসলো দ্বীপ লক্ষ্য করল সোলারের বাতির ক্ষীণ আলোয় একটা অপরুপ আলো তার চোখকে বার বার টেনে নিয়ে যাচ্ছে,, আর এই আলো কোন সাধারণ আলো না;  সন্ধ্যার আলো । খাওয়ার এক ফাঁকে তার ফুফি দ্বীপকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল-  দ্বীপ কাল সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হবে কিন্তু? 

কেন ফুফু?

সেইটা ঘুম থেকে উঠলেই বুঝবি। 

ঠিক আছে ফুফু। 

.

দ্বীপ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করতেই তার ফুফি বলল রেডি হয়ে নে দ্বীপ, সন্ধ্যাকে তার কলেজে পৌঁছে দিতে হবে। দ্বীপ এই কথা শুনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না; দ্বীপের ভিতর হঠাৎ একরকমের ভয় কাজ করতে লাগলো, এমনতো কখনও হয়নি, কত শত মেয়ে তার চোখের সামনে দোলাচল খেল, এই প্রথম দ্বীপ বুঝতে পারলো এইটা সাধারণ কোন অনুভুতি না।  ওইদিকে সন্ধ্যা দ্বীপের সাথে যাওয়ার কথা শুনে লজ্জায় সাজগুজ ভুলে কি পড়বে না পড়বে মাথা না আঁচড়িয়ে সাদামাটা হয়ে বেড়িয়ে গেল। না সাজলেও যে কিছু রমণী প্রকৃতির প্রকৃত সুন্দরের প্রতিচ্ছবি সেইটা হয়তো সন্ধ্যাও জানে না। 


.

দ্বীপ আর সন্ধ্যা একি রিক্সায় দুজনে দুপাশ ঘেঁষে ঝুবুথুবু হয়ে বসে আছে, সন্ধ্যার লাজুকতা দেখে দ্বীপ ভাঙ্গা ভাঙ্গা ভাষায় একটি  শব্দ উচ্চারণ করল- সন্ধ্যা? 

সন্ধ্যা নিচের দিকে চেয়ে বলল- হুম্ম।

আমাকে তোমার খুব অপরিচিত মনে হয়?


নাতো ! আপনার কথা আম্মা এতো বেশি বলছে যে, আমাদের ফ্যামিলিতে আপনার একটা ছায়া থাকতো সবসময়। গত দুদিন আগে আম্মা জালি পিঠা বানাই কান্না করতে করতে বলে--  দ্বীপের জালি পিঠা কত পছন্দ ছিল। আর আব্বা দেশে আসার সময় আম্মা সবসময় তাগিদ দিয়ে  বলত সবার জন্য কিছু আনলে  দ্বীপের জন্য আনতে হবে। আপনার জন্য কত জিনিস আছে আলামারি খুললে দেখবেন। 


দ্বীপ হঠাৎ আপসোস করে বলে উঠে, এতদিন এই মমতাময়ী ফুফুর ভালোবাসা থেকে বঞ্ছিত ছিলাম আমি। আচ্ছা সন্ধ্যা জালি পিঠা কি?


পঁচা পিঠা বলে সন্দ্বীপের ভাষায়।


সন্ধ্যা তুমি আমার সাথে সন্দ্বীপের ভাষায় কথা বল, আমি বলতে না পারলেও বুঝি কিন্তু?


সন্ধ্যা লাজুক হাসি দিয়ে বলে মামারও সন্দ্বীপের ভাষা খুব পছন্দ ছিল। 


তুমি কিভাবে জানো?


সন্ধ্যা এইবার অন্যদিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে আগ্রহ থাকলে সব জানা যায়। 


-----

দ্বীপ এক পা এগোয় আবার পিছায় কিভাবে ফুফিকে বলা যায়, ফুফা থাকে দেশের বাহিরে; কিভাবে বলবে ফুফিকে তার মনের কথা! সময়ও বেশিদিন নাই  সব মিলিয়ে দ্বীপ অস্থিরতা নিয়ে 

ফুফিকে ডাকল—

ফুফি দ্বীপের সামনে বসে আছে। 

দ্বীপ কি বলে শুরু করা যায় ভাবতে ভাবতে হঠাৎ বলে উঠল— ফুফু তুমিতো জানো আম্মা আব্বাকে কত ভালবাসত, নানা মারা যাবার পর মামারা উনাকে কত জোর করছে অন্য জাগায় বিয়ে দিতে আম্মাকে কোনদিন টলাতে পারিনি। আমার মামার বাড়ির কাউকে আম্মা তেমন একটা পছন্দ করেন না, পরিস্থিতির কারণে উনি বাধ্য হয়ে উনাদের সাথে থাকতে হয়। ফুফু তোমার কাছে একটা আবদার করলে রাখবে?


বল কি করতে পারি তোর জন্য এই ফুফি?


আরে আরে ফুফু তুমি কাঁদছ কেন? আমিতো জানি আম্মা তোমার ভাবী না শুধু বান্ধুবিও ছিল। ফুফু প্লিজ কেঁদনা! 


আমার সই আমার আদরের ভাবী কেন এমন হল সব!!  আচ্ছা বল কি বলবি?


ফুফি আমার আম্মা ছাড়া আমার আপন শিকড় বলতে তেমন কেউ নাই, আমি চাই সন্ধ্যাকে কানাডায় নিয়ে যেতে। 


দ্বীপের মুখে এই কথা শুনে তার ফুফির কান্না আরও তীব্র হল, যেন তার মনের সুপ্ত বাসনা পূরণ হবার এক আনন্দ অশ্রু মিশানো এই কান্নার বিলাপ। 


.......


দ্বীপ সন্ধ্যার বিয়ে হল- বিয়ের এক সপ্তাহ পর দ্বীপকে কানাডা চলে আসতে হল জব ইন্টারভিওর জন্য। সন্ধ্যার জন্য প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ঠিকঠাক করে আসলো। দ্বীপ জব ইন্টারভিও দিয়ে বাসায় ফিরে তার মামাদের বিয়ের খবর জানাতেই বাসায় এক লঙ্কাকাণ্ড বেঁধে গেল- তার মামারা চিৎকার চেঁচামেচি করে বলতে লাগলো- তুই আমাদের না জানিয়ে নিজের ইচ্ছেমত, ছোটজাতের মেয়েকে বিয়ে করছস, তোর এতো বড় স্পর্ধা,  যে বংশে বিয়ে করার জন্য তোর মার এই অবস্থা!! তুই কোন সাহসে আবার ওই ওই বংশের মেয়ে বিয়ে করলি। তোরে ছোটবেলা থেকে মানুষ করার এই প্রতিদান দিলি। আজকের পর থেকে তোর সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নাই। 

.

তিন মাস পর দ্বীপ আর তার মাকে নিয়ে স্থায়ী হল কানাডা  ড্যান্সিং লাইটস ভ্যালিতে, যেখানে রাতের আকাশে অরোরা দেখা যায়, যা এই উপত্যকাটিকে আরো রহস্যময় করে তোলে। দ্বীপের মা এখন পুরোপুরি কথা না বলতে পারলেও আগের চেয়ে অনেক প্রাণচঞ্চল আর সাবলীল। 

..

পরিশেষ.. দ্বীপ আর তার মা এখন এয়ারপোর্ট-এ,  অপেক্ষা করে আছে কখন সন্ধ্যা আসবে । দ্বীপের মা বার বার অস্থির চোখে তাকায় কারণ সে জানে না সন্ধ্যার দেখতে কেমন। হঠাৎ ট্রেন্স কোট পরা হিজাব মুখে এক নারী দ্বীপের কাছাকাছি হাসিমুখে আসতে দেখে দ্বীপের মা বুঝতে বাকী রইল না- এইটাই সন্ধ্যা! 

সন্ধ্যা সালাম করতেই দ্বীপের মা ঝাঁপিয়ে ধরল সন্ধ্যাকে- আহা সেকি মমতায় তার মুখ তার হাত আদরে স্পর্শে বুলাতে লাগলো এই সেই সন্ধ্যা যার গায়ের রক্তিম শিকড়ের গন্ধ দ্বীপের বাবার গন্ধের সাথে মিলে যায় হয়তো। দ্বীপ হঠাৎ আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করল দ্বীপের মা কথা বলছে অস্রুসজল চোখে সন্ধ্যাকে বুকে জড়িয়ে। 






 আমার সব থেকে সুন্দর 'গুনাহ' হচ্ছে— আমি নেককার হবার ভান করি। শুধু অন্যদের না, বরং নিজেকেও বোকা বানাই আমি। আমার ভান এতটাই সত্যি যে,  ...

 আমার সব থেকে সুন্দর 'গুনাহ' হচ্ছে— আমি নেককার হবার ভান করি।

শুধু অন্যদের না, বরং নিজেকেও বোকা বানাই আমি।

আমার ভান এতটাই সত্যি যে, 

আমি নিজেও মাঝে মাঝে ভুলে যাই— আমি সেই নই, 

যেটা দেখাই।


এই জন্য বোধহয় টুপির ভিতরও আমার মাথা 

গরম হয়ে যায়,

যখন অন্যর ভালো দেখি ভিতরে জ্বলে-পুড়ে শেষ হয়ে যায়।

আমি ভাবি, এটা ধর্মপ্রাণতার ঈর্ষা— কিন্তু গভীরে দেখি,

এটা শুধুই আমার অহংকারের জ্বালা, 

যে আরেকজন আমার চেয়ে এগিয়ে গেল।

আমার 'আমি'টা যেন মাটিতে পড়ে থাকতে পারে না 

অন্যের কল্যাণ দেখে।


এইজন্য বোধহয় টাকনুর উপর কাপড় তুলেও,

আমার অহংকার আরো বেড়ে যায়, কেউ যদি 

বড় করে সালাম না দেয়।

কারণ আমি তো বাড়তি পুণ্যের কাপড় পরে আছি, 

আমাকে তো বাড়তি সম্মান পেতেই হবে!

অথচ ভুলে যাই, যে বিনয়ের জন্য এই পোশাক, 

সেই বিনয়টাই নেই আমার ভিতরে।

আমার পোশাক আমাকে ঢাকে না, বরং আমার শূন্যতাকেই 

উন্মুক্ত করে দেয়।


কি করবো আমি?

কেউ যদি লম্বা পাঞ্জাবী পরার পরেও দাবি না করে 

আমি ধার্মিক!

ওহঃ খোদা কি করবো আমি?

আমিতো কড়া আতরের গন্ধে চারিদিক সুভাস ছড়ায়।

কিন্তু এই ঘ্রাণ কি আমার ভিতরের পচনের গন্ধ ঢাকতে পারে?

যেখানে লুকানো আছে অহংকারের -মৃতদেহ, ভক্তির ক্ষুদা।


যখন ধর্মের ট্যাগ লাগানো কাপড় আমার সবচেয়ে 

সুন্দর খাঁচা,

তখন তার ভিতর আমি নিজের মনের মরিচা লুকায়।

কিন্তু মরিচা তো খাঁচা ভেদিয়েই বেরিয়ে পড়ে— 

আমার চোখের দৃষ্টিতে, আমার কথার সুরে,

নিজেকে বিচার না করে অন্যের বিচার করার উৎসাহে।


আমার প্রত্যেক এবাদত হলো মানুষ আমাকে 'ভালো'

বলার পুঁজি,

যেখানে সেজদায় খোদার সন্তুষ্টি থেকে—

মানুষের মুখের প্রতিবিম্বই পড়ে থাকতে দেখি বেশি।

আমি নামাজে দাঁড়িয়ে কেবলা মুখী, কিন্তু আমার মন ছুটে চারিদিকে—

কে দেখছে? কে বলছে? কে ছড়াচ্ছে আমার ইবাদতের খবর?

আমার ইবাদতের কিবলা যেন অদৃশ্যভাবে ঘুরে গেছে মানুষের দিকে।


আমার ইবাদতগুলো দেখতে খুবই পবিত্র, রমজানের খুরমার মতো,

যখন ফরজের চেয়ে নফসের হিসাব নিকাশে আমি 

বেশি পাকাপাকি—

তখন বুঝি, যে ধর্মের লেবাসে আমার নেককার ভাবার 

জন্য ছিল এতো আয়োজন,

আর সেটাই হয়ে গেলো আমার সবথেকে বড় 

-অধঃপতনের কারণ!

আমার ধার্মিকতা আমার জন্য ফাঁদ হয়ে দাঁড়ালো।

যেই জিনিস দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার কথা, 

সেটাই হয়ে গেল দূরত্বের প্রাচীর।




স্বর্গের বাগানে প্রথম দেখেছিলাম তাকে— চুলে জড়ানো ছিল রৌদ্রের সুগন্ধি, বলেছিলাম, 'ফুল নয়, আমি চাই তোমার হাসি!' সে হেসে বলেছিল, 'ত...

স্বর্গের বাগানে প্রথম দেখেছিলাম তাকে—

চুলে জড়ানো ছিল রৌদ্রের সুগন্ধি,

বলেছিলাম, 'ফুল নয়, আমি চাই তোমার হাসি!'

সে হেসে বলেছিল, 'তুমি তো 'শয়তান!'

-আজও 'নরকের গলিতে বিক্রি হয় সেই 'হাসির নকল!'


বসন্ত বাতাসে প্রথম 'মুগ্ধ অঙ্গনে' দেখেছিলাম তাকে—

নদী ভেসেছিলো যেন তার, 'ভেজা চোখে', 

বলেছিলাম, 'নদী নয়, আমি চাই তোমার শান্ত দু'চোখ!' 

সে চোখের ইশারায় বলেছিল, 'তুমি তো 'ছায়ামূর্তি !'

-আজও ধোঁকার বাজারে শয়তান কিনে নেয় সেই ' চোখের জাল।


আগুনের ফসল বুনেছিলাম তার চোখের নীলে, 

ভেবেছিলাম পাবো অমৃতের ধারা;

সে দিলো বৃষ্টি, বললো, "এটাই স্বর্গের জল!"  

পান করো, ফসল বুনো, এই বলে, হাসতে হাসতে চলে গেলো।

আজও পিপাসায় মরে পান করি, "বিষ-ভরা হাসির 'বিস্বাদ!


দেবদূতের ডানা দিলাম তার মুগ্ধ হাতে,

বলেছিলাম, "উড়বো তোমার সঙ্গে !"  

সে হেসে উড়িয়ে দিল পালকগুলো বাতাসে, 

বলে, চোখ বন্ধ করে আকাশ দেখো...

"আজও 'আগুনে ঝাঁপ দিয়ে চোখ খুলি , ডানা খুঁজি তার হাতে!